গান্ধীর হাসি

লেখক : রুবাই শুভজিৎ ঘোষ

“দাদা চেঞ্জটা দিন। আমার স্টপ এসে গেছে।” বাসের গেটের কাছে উঠে এসে কন্ডাক্টারকে বললেন অবনীশ হালদার। কন্ডাক্টার তার হাতের আঙুলটা থেকে পাঁচটা মোড়া নোট বার করে অবনীশ হালদারের হাতে দিলেন। অবনীশের স্টপ এসেই গেছিল, নোট পাঁচটা শুধু দেখে নিলেন একবার, হ্যাঁ নব্বই টাকাই আছে। তারপর বাস থেকে নেমে গেলেন তিনি।

অবনীশ হালদার, আগে তার নিজের এলাকার লোকাল কাউন্সিলর ছিলেন। নেতা হিসাবে খুব আদর্শবাদী লোক ছিলেন। এলাকার মানুষজন খুব মানত। তা সে যে পার্টিরই হোক না কেন। না মানারই বা কী ছিল, সব সময় মানুষের জন্য কাজ করতেন। আর এই মানুষের জন্য কাজ করতে করতেই পার্টির সঙ্গে দূরত্ব তৈরী হয়েছিল। তার আদর্শ আর পার্টির আদর্শ যেন আলাদা হয়ে গিয়েছিল। পার্টি থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন তিনি। তার ক্ষমতা চলে গিয়েছিল। আর তখনই লক্ষ করেছিলেন মানুষ তাকে আর মান্য করছে না। তার বদলে আসা নতুন কাউন্সিলর ঋজু অধিকারীকে খুব মানছে মানুষ। লোকটা এক নম্বরের ঘুষখোর, কিন্তু হলে কী হবে, ক্ষমতা এখন তার, তাই মানুষও তার।

মোড়া নোটগুলোকে এবার খুলে দেখলেন অবনীশ হালদার। একটা পঞ্চাশ টাকা আর চারটে দশ টাকা। কিন্তু এ কী! একটা দশ টাকার মাঝখানটা রীতিমত ছেঁড়া। এ তো চলবে না। তখন কেন খুলে দেখলেন না! তাহলে তখনই পাল্টে নেওয়া যেত। এখন আর কী করা যাবে! কাউকে না কাউকে তো গছাতেই হবে এখন।

কথাটা ভাবতেই কেমন খারাপ লাগল তার। তার মতো আদর্শবাদী লোক, তিনি তো জানেন টাকাটা ছেঁড়া, আর জেনেশুনে কাউকে গছানো মানে তো তাকে ঠকাবেন। তারপরই মনে হল এসব ভাবছেনই কেন তিনি? ভুলভাল যত ভাবনা। তাকেও তো কন্ডাক্টার এভাবে ঠকিয়েছে। আর এটা হল ঠকানোর যুগ, ঠকাতে পারবে তো টিকে যাবে। ঋজু অধিকারীকেই দেখো না, লোক ঠকিয়ে কেমন চেপে বসে রয়েছে কাউন্সিলরের গদিতে। তিনি তো কাজ করেছিলেন মানুষের জন্য, তাই সরে যেতে হয়েছিল তাকে।

এসব ভাবতে ভাবতে একবার ছেঁড়া দশ টাকাটার দিকে চাইলেন তিনি। চাইতেই চমকে উঠলেন। কী ব্যাপারটা হল? নোটের মধ্যে গান্ধীর ছবির হাসিটা যেন অনেকটা লম্বা। এতটা তো হাসে না গান্ধী। খুৎ! তার মনের ভুল। আবার দেখলেন। না! সত্যিই তাই। মনে হচ্ছে গান্ধী তাকে ব্যঙ্গ করে হাসছে। যেন বলছে, কী রে! কী হল তোর আদর্শের?

নোটটা মুড়ে নিলেন তিনি। তারপর আস্তে আস্তে আবার খুললেন। না! গান্ধী সত্যিই হাসছেন। এবার একটু রাগ হল তার! হাসছেন তো হাসছেন। তিনি কী করতে পারেন! তাকে এক্ষুনি নোটটা বিদেয় করতে হবে। না হলে সারাদিন এই নোটটা নিয়েই ভাবতে হবে।

হনহন করে এগিয়ে চলেছেন তিনি। সামনে একটা পান বিড়ির দোকান। এখানে নোটটা চালিয়ে দিলে কেমন হয়? ভালই হবে। তাড়াতাড়ি দোকানে এসে দশ টাকার পানটা চাইলেন। যদিও পান এখন খাবেন না তিনি। বাড়ি ফিরে তারপর ভাত খাওয়ার পর খাবেন, কিন্তু কী দরকার! খাবেনই যখন, এখন নিয়ে নেওয়াই ভাল। টাকাটাকে তো আগে বিদেয় করা দরকার। পানটা নিয়েই টাকাটা দিলেন তিনি। দেওয়ার সময় কায়দা করে ছেঁড়া জায়গাটা আঙুলে চেপে দিলেন। দোকানদারও ব্যস্ত মানুষ। পান সাজতে ব্যস্ত সে অবনীশের মুখের দিকে বা টাকাটার দিকে প্রায় দেখল না বললেই চলে। টাকাটা নিয়েই তার পাশের মার্বেল বেদীতে ফেলে দিল। আর অবনীশ হালদারও নিশ্চিন্ত মনে বাড়ির দিকে চললেন।

দোকানদার প্রথমে টাকাটা খেয়াল না করলেও অবনীশ হালদার দোকান থেকে যাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই খেয়াল করল। হাতের কাজ থামিয়ে রেখে টাকাটা তুলে দেখল। টাকাটার মাঝ বরাবর ছেঁড়া। “বজ্জাত লোক তো।” ছেঁড়া নোট কাউকে তো চালাতে হবে। দোকানদার এটা ভাবার কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা তাড়াহুড়োর খদ্দের পেয়ে গেল সে। “ভাই একটা পান দে! জলদি!” পান নিয়ে একটা কুড়ি টাকার নোট দিল খদ্দেরটা। আর ছেঁড়া দশ টাকাটা নিয়ে জলদিই চলে গেল দোকান থেকে। কিছু দূরে তার গলার আওয়াজ আরেকবার শুনতে পেল দোকানদার, “রিক্সা-আ-আ-আ!” যাক বাবা রিক্সায় উঠে গেছে তাহলে, এবার নিশ্চিন্তি। মনে মনে ভাবল দোকানদার। মন দিয়ে পান সাজতে লাগল তারপর।

রিক্সায় উঠে ভূপতিবাবু অর্থাৎ এইমাত্র পানের দোকান থেকে যিনি পান কিনলেন, রিক্সা অনেকটা চলে যাবার পর খেয়াল করলেন নোটটাকে। পান চিবোতে চিবোতে তিনি দেখলেন দোকানদার যে নোটটা তাকে ফেরৎ দিয়েছে সেটা একটা ছেঁড়া দশ টাকা। মেজাজটা বিগড়ে গেল তার।

ভূপতিবাবু স্কুলে পড়ান। এখন তিনি স্কুলেই যাচ্ছেন। ছাত্রদের তিনি সবসময় নীতিবোধ, শৃঙ্খলতা এইসবের জ্ঞান দিয়ে থাকেন। ছাত্রদের তিনি বলেন, “কোনও কারণে যদি নিজের ক্ষতিও হয়ে যায়, তাহলেও অন্যকে ঠকানোর কথা, অন্যকে প্রতারণার কথা ভাববে না। নিজের ক্ষতি স্বীকার করে নেবে। কিন্তু জীবনে ন্যায় নীতির কথা ভুলবে না।”

কিন্তু আজ ভূপতিবাবুও তার এই দশ টাকার ক্ষতি মেনে নিতে পারছেন না। এখন তার কোনো ন্যায় নীতির বাণী মাথায় আসছে না। তার মনে হচ্ছে কখন কোথায় এই নোটটাকে ব্যবহার করবেন, কার কাছে চালান করবেন, এটাকে কীভাবে তার কাছ থেকে বিদায় করবেন। ভাবতে ভাবতেই তার বিরক্তিভরা চোখটা আরেকবার নোটটার ওপর পড়ল। পড়বার সাথে সাথে চোখের বিরক্তিভাব কেটে গিয়ে আশ্চর্যভাব জাগল দুচোখে। রিক্সার বাইরে নর্দমার কাছাকাছি পানের পিক ফেলে হাত দিয়ে মুখটা মুছলেন তিনি। আবার চাইলেন নোটটার দিকে। বিস্ময়ের ভাবটা, আশ্চর্যের ভাবটা তার বেড়ে গেল বহুগুণ। এ তিনি ঠিক দেখছেন তো?

নোটের মধ্যে গান্ধী হেসে চলেছেন। স্পষ্ট দেখছেন তিনি। তার ভাবনার ওপর হেসে চলেছেন গান্ধী, সমাজের ভাবনার ওপর হেসে চলেছেন গান্ধী। আজকাল কেউ নিজের ক্ষতি মেনে নিতে পারে না। সবাই নিজের সামান্যতম ক্ষতিও অন্যের ঘাড়ে চাপাতে ব্যস্ত, একজন অপরজনকে ঠকাতে ব্যস্ত। যদি অবনীশ হালদারের মত আদর্শবাদী নেতারা বা ভূপতিবাবুর মত শিক্ষকরাও এরকম ভাবতে থাকেন, তাহলে সমাজটার কী হবে?

রিক্সা এসে থামল স্কুলের গেটের মুখে। এতক্ষণে ভূপতিবাবুর মাথায় বুদ্ধি খেলে গেছে কাকে গছাতে হবে নোটটা। রিক্সাওয়ালার থেকে আর ভাল লোক এখন কাকেই বা পাবেন! একবার টাকাটা রিক্সাওয়ালার হাতে ধরিয়ে স্কুলের মধ্যে ঢুকে পড়তে পারলেই হল, তাকে আর ধরবে কে? একবারও রিক্সাওয়ালার মত গরীব লোকের ক্ষতিটা তিনি ভাবলেন না। পকেট থেকে আরও পাঁচটা টাকা বার করলেন তিনি। রিক্সাভাড়া হয়েছে পনেরো টাকা। দশ টাকার নোটটা দুভাঁজ করে পাঁচ টাকার একটা কয়েন তার ওপরে ধরে রিক্সাওয়ালাকে দিলেন তিনি। তারপর হনহন করে পা চালিয়ে স্কুলের গেটটার ভিতরে ঢুকে পড়লেন। টাকাটার ভাঁজ খুলে ছেঁড়া অংশটা চোখে পড়বার আগেই তিনি রিক্সাওয়ালার চোখের বাইরে, নাগালের বাইরে, স্কুলের ভিতর চলে আসবেন। এই ভেবে দ্রুতপদে হেঁটে চললেন তিনি।

কিন্তু এতক্ষণে একটা হাল্কা হাসির শব্দ শুনতে পেয়েছেন তিনি। গান্ধী! হ্যাঁ গান্ধী! নোটের গান্ধী! তিনিই হাসছেন! তিনিই নিশ্চয়ই হাসছেন। ভূপতিবাবু প্রথমে সেটাকে উপেক্ষা করে এগিয়ে চললেন। তবে হাসিটাও বেড়েই চলল ক্রমশ। একসময় আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে ছড়িয়ে পড়ল হাসিটা। ভূপতিবাবু দুইকান চেপে বসে পড়লেন। গান্ধী তখনও হেসে চলেছেন বজ্রপাতের মত।

“স্যার টাকাটা পালটে দিন না! ফাটা আছে।” রিক্সাওয়ালার গলায় মুখ তুলে তাকালেন তিনি। রিক্সাওয়ালা গেটের মধ্যে দিয়ে ভেতরে ঢুকে এসেছে। ছেঁড়া নোটটা ভূপতিবাবুর দিকে বাড়িয়ে রয়েছে সে। পকেট থেকে একটা ঠিকঠাক দশ টাকার নোট বার করে রিক্সাওয়ালার দিকে বাড়িয়ে দিলেন তিনি। রিক্সাওয়ালা তাঁর হাতে ছেঁড়া দশ টাকার নোটটা ধরিয়ে গেটের বাইরে চলে গেল। ভূপতিবাবু ভয়ে ভয়ে নোটটার দিকে চাইলেন। না! গান্ধী আর হাসছেন না এখন, অন্যান্য নোটের ছবির মতই লাগছে এখন তাকে।

তবে গান্ধীর হাসি আবার শুনলেন তিনি। ক্ষীণ হলেও শুনতে পেলেন স্পষ্ট। পরীক্ষাহলে গার্ড দেবার সময় শুনতে পেলেন। গান্ধীর হাসি শুনে তিনি একটা ছেলেকে টুকলি করার সময়ে হাতেনাতে ধরলেন ।

এর পরেও তিনি শুনেছেন গান্ধীর হাসি। কেউ যখনই কাউকে ঠকানোর চেষ্টা করে তখনই হেসে ওঠেন নোটের গান্ধী। যদি ঠকানোটা বন্ধ হয়, তাহলে থেমে যায় হাসিও, অন্যথায় হাসতেই থাকেন গান্ধী। হাসতে থাকেন তিনি আমাদের ওপর, হাসতে থাকেন সমাজের ওপর। হাসতে থাকেন গান্ধী, ছেঁড়া দশ টাকা নোটটার গান্ধী।


লেখক পরিচিতি : রুবাই শুভজিৎ ঘোষ
লেখকের জন্ম পশ্চিমবাংলায়। পেশায় একটি বহুজাতিক সংস্থার তথ্যপ্রযুক্তিবিদ। লেখা তাঁর নেশা। বাঙালির জনপ্রিয় ওয়েবসাইট সববাংলায় এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা তিনি। কবিতা থেকে শুরু করে গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস, চিত্রনাট্য সবকিছুই লিখতে ভালবাসেন। লিটিল ম্যাগাজিন থেকে শুরু করে বাণিজ্যিক বিভিন্ন ম্যাগাজিনে নিয়মিত লিখেছেন। দৃষ্টি, বালিঘড়ি এবং স্মরণে রবি এই কবিতার সংকলনগুলিতে রয়েছে তাঁর কবিতা । এছাড়া তথ্যচিত্র বা শর্ট ফিল্ম পরিচালনা করেন তিনি। ধর্ম এবং বিজ্ঞান তাঁর প্রিয় বিষয়। ঘুরতে খুবই ভালবাসেন। অন্যান্য শখের মধ্যে রয়েছে স্কেচ, ফটোগ্রাফি, ছবি ডিজাইন করা।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।