লেখক : অরিত্র চট্টোপাধ্যায়
(এই গল্পের সব চরিত্র কাল্পনিক, এবং কিছু কল্পনা চারিত্রিক)
লোকটা লুকিয়ে মদ খায় এবং প্রকাশ্যে মাতলামি করে। লুকিয়ে রাখার জায়গাটা অবশ্য লুকোনো থাকে না সবসময়। কেউ কেউ তা জেনে যায়। যদিও লোকটার মনে হয় লুকিয়ে রাখার জায়গাটা যথেষ্ট সুরক্ষিত। অন্তত এই ভাবনাটা তাকে ভাল রাখে।
ঘামে ভেজা দুপুর পার করে স্নিগ্ধ সন্ধ্যা আসে। পুরোনো বইয়ের র্যাক থেকে বেরিয়ে আসে লুকোনো আনন্দ। ঝপ করে এক ঢোক গলায় ঢেলে চোখ বুজলেই মাথাটা ঝিমঝিম করে ওঠে। পেগের মাপ নেই। লুকোনো যাপনে সবই খাপছাড়া, মাপজোখহীন। ঝট ঝট করে দু’-তিন ঢোক উদরস্থ হলেই যবনিকা পড়ে বর্তমানে। চোখের সামনে আলো হয়ে ভাসে ফেলে আসা দিনের ভাসা ভাসা ছবি…
‘তখন অবশ্য বড়জোর শ্মশ্রুহীন কৈশোর’ – মধুবংশীর গলি পেরিয়ে সে কিশোর এসে পড়েছে কল্লোলিনীর কোলে। স্কুলের গণ্ডি পার করে, মফঃস্বলের বেড়া ডিঙিয়ে, বড় শহরে। কলকাতার বিরাট ক্যানভাসের সামনে দাঁড়িয়ে ব্যাগের এক কোণে পড়ে থাকা কবিতার খাতা কেমন যেন অপাংক্তেয় মনে হয়। তার মফঃস্বলী যাপনকথা কি এবার দেগে দেওয়া হবে ‘প্রান্তিক’, ‘আঞ্চলিক’ বিশেষণে?
“একটু জল লাগবে? বেশি কড়া হয়ে গেছে না?” বিগত জন্মের দরজা ঠেলে বর্তমান এসে কড়া নাড়ে।
এসব অবান্তর কেজো কথায় বিরক্ত হয় লোকটা, রেগে যায়। মনে মনে মাতাল হয়ে ওঠে।
“দূর বোকাচোদা! আমি আজ নিট খাবো, নিট। হে অতীত, তুমি হৃদয়ে আমার কথা কও, কথা কও…”
বাজখাঁই গলার আবৃত্তি শুনে বর্তমান দরজা বন্ধ করে।
আবৃত্তি ছেলেটা ভালই করে। পড়ার থেকে শোনার দিকে ঝোঁক বেশি। শুরুর দিনের সংকোচের বিহ্বলতা ও সংকটের কল্পনা কাটিয়ে সে এখন ধাতস্থ হয়েছে কিছুটা। আত্মস্থ করছে কলকাতাকে – কবিতায়, গানে, নাটকে। কলেজের পড়ার পাশাপাশি চুটিয়ে চলছে থিয়েটার, আবৃত্তি। মোটামুটি এক নামজাদা নাটকের দলের নিয়মিত সদস্য হয়ে পরিচিতি বেড়েছে খানিক। ক্লান্ত রাত্তিরে কবিতার খাতা যখন খুলে বসে তখন ‘রিকশ’র নূপুর, সুদূর ট্রামের মর্মর, ধাবমান মোটরের ক্ল্যাকসন হর্ণ’ আগের মত তাকে আর অশান্ত করে না। এরা এখন তার নিজস্ব জগতের চরিত্র, বিড়ি আর বিয়ারের মত।
কলেজের পর প্রায়ই ঠেক জমে কফি হাউসে। আড্ডার ফাঁকে ফাঁকে ছেঁড়া কাগজে কখনও কখনও ফুটে ওঠে কয়েক লাইন। এই যেমন সেদিন লিখেছিল:
যে-পথ ভুলেছে পথ
সে যায়, কেবলই যায়?
আসে না কি ফিরে?
সে-পথে আমি হেঁটে গেছি রোজ
যে-পথ ফেরে না ঘরে।
“ফিরতে চান না বুঝি?” লাজুক চোখের মেয়েটি বলেছিল ‘পাখির নীড়ের মত’ চোখ তুলে।
“কে চায় রোজ ওই বাঁধা ঠিকানায় ফিরতে?” উত্তরে বলেছিল ছেলেটি, “চলুন, একটু হাঁটবেন নাকি?”
এক সাথে এক তালে
দুই জোড়া পা চলে
এক পথে যায় তারা?
বৃষ্টি নেমেছে শহরজুড়ে। আদুরে মেঘের অভিমানগলা বৃষ্টি। অঝোরধারা। ভিজছে শহর, ভিজছে দুটি শরীর “আকাশ-ছেঁচা জলে”।
“শেষ হলো? খাবার টাবার খাবে না, নাকি?”
উফ্, আবার এসেছে সে। জ্বালাধরা এখনকাল। বিরক্তি বাড়ে। সঙ্গে মাতলামিও।
“না, বাল… হবে না শেষ” খেঁকিয়ে বলে। চড়া গলায় খ্যাক খ্যাক করে হাসে। গান ধরে – ‘আমারে তুমি অশেষ করেছ, এমনি লীলা তব…’। লীলাই বটে শালা। লীলা আর এলো না জীবনে। ‘খোল খোল দ্বার…’ গলার স্বর চড়ে, সুর সরে যায়। বর্তমান সজোরে দ্বার বন্ধ করে…
সেবার জানুয়ারিতে তাদের দল ‘শাহজাহান’ নাটকটা করবে। জোর মহড়া চলছে। লীলা রয়েছে জাহানারার ভূমিকায়। ‘আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। ঝড় উঠবে। একটা নদী পার হয়েছি, এ আর এক নদী – ভীষণ কল্লোলিত তরঙ্গসংকুল…’ ডায়লগ আওড়াতে আওড়াতে ক্রমশ নিজেকে ঔরঙ্গজেব করে তুলছে সে। নদী পার হওয়ার আগেই অবশ্য ঝড় উঠেছিল। খবরটা এনেছিল লীলাই। বাবার লীলা সাঙ্গ হয়েছে।
বাবা নেই! এ বাবা যে শাহজাহান নয়, তার নিজের বাবা… বিশ্বাস করতে পারেনি। যে বাবা একটু আগেও প্রেজেন্ট টেন্স ছিল, যে বাবার কিছু অংশ মনে মনে রাখা ছিল ফিউচার টেন্সের ঘরে, সেই বাবা হঠাৎ পাস্ট টেন্স হয়ে গেল মুহূর্তে। চারপাশ হঠাৎ বড় ধূসর, নগ্ন, নগণ্য মনে হয়। মাথার মধ্যে কে যেন হাতুড়ি পেটাচ্ছে… বেজে যাচ্ছে ফার্স্ট বেল, সেকেন্ড বেল, থার্ড বেল…
পর্দা আর ওঠেনি। পড়াশোনা মাঝপথে ছেড়ে চাকরি, ভাইয়ের পড়াশোনা, মায়ের চিকিৎসা, বিয়ে…ইত্যাদি, ইত্যাদি। যেমনটা হয় আর কী। পথের নেশায় যে ছেলেটি পথ খুঁজতে বেরিয়েছিল, সে হারিয়ে গেছে। এই লোকটি গৃহস্থ, গৃহপালিত। এই ঘরোয়া নাটকে অভিনয়ের জন্য কোনও প্রস্তুতি ছিল না তার। একটা সংলাপও কোনোদিন বলতে পারেনি ঠিক করে। মাঝে মাঝে ভেতর থেকে কে যেন চিৎকার করে বলে, ‘এ তো ভুল লোককে এনেছে। ভুল মানুষ, ভুল মানুষ…’
শুধু লোরকারাই কি মরে এ’ভাবে? মরে আরও অনেক সামান্যবিত্ত প্রাণ। প্রতিদিন। দৈনন্দিনতার বুলেটে ঝাঁঝরা হয়ে।
তবু স্বপ্ন আঁকে
বাতাসে, শ্বাসে-প্রশ্বাসে
হাঁটে পথ, অগস্ত্য-অভ্যাসে
অনাগত জীবনসুখে ভাসে
ফিরবে না জেনে…
….ছেলে-জন্মে লেখা শব্দগুলো স্মৃতি হয়ে ওড়াউড়ি করে। ঘোরাঘুরি করে মাথার ভিতরে। যেন দুই জন্ম বসে আছে মুখোমুখি, স্মৃতির সিন্দুক খুলে। নির্বাক। বন্ধ সময়ের ঘড়ি। ও-জন্মের মুক্ত জীবনের, নদী-মাঠ-বনের সুবাসে মিশে যাচ্ছে এ-জন্মের ঘামের গন্ধ, মদের গন্ধ…
‘তোমার ঘরে বসত করে কয় জনা, মন জান না…’
দীর্ঘ নিশ্বাস বেরিয়ে আসে অজান্তেই। উদাসী সুরের ঘোর মেখে শেষ পেগটা শেষ করে মরিয়া হয়ে যেন লোকটা বলতে চায়, ‘যদি পরজন্মে পাই রে হতে…’
লোডশেডিং!
অন্ধকার। কথা জড়িয়ে যায়…
ছেলেটা চলে গেছে। থেকে গেছে লোকটা – যে রোজ মদ খেতে খেতে ভবিষ্যৎ আঁধার করে অতীতের আলো জ্বালে। প্রকাশ্যে বর্তমানকে খিস্তি দেয়, ঘেন্না করে।
এখন, লোকটা লুকিয়ে মদ খায়, আর প্রকাশ্যে মাতলামি করে।
লেখক পরিচিতি : অরিত্র চট্টোপাধ্যায়
জন্ম মালদায় হলেও জন্ম বা কর্মসূত্রে সেরকম মাল-দার হওয়া গেল না যখন, তখন মাল বা ঐশ্বর্যের সন্ধানে সময় কাটে বই পড়ে, গান শুনে, একটু-আধটু আবৃত্তি-চর্চায়। তারই ফাঁকে ফাঁকে খাতায় চলে হিজিবিজি কাটা, সে অবিশ্যি শেষ অব্দি লেখা হয়ে ওঠে কি না সে বিচারের দায় লেখকের নয়।
আমি বিভোর হয়ে পড়েছি।আপ্লূত হয়েছি।লেখকের মুখোমুখি হলে নিয়মিত লেখার জন্য আমার সর্বশেষ শক্তি দিয়ে মনোযোগী লেখক না হওয়ার জন্য অনুনয় করে বলতাম—এমনি কিছু লেখা আলগোছে লিখে ফেল ইচ্ছে হওয়া মাত্র।এটাই নিয়মিতের নিয়তি।
রতন চক্রবর্তী।
রতনদা, প্রণাম নেবেন। অগোছালো জীবন আলগোছে লিখতে ইচ্ছে হলে, লিখব কখনও…