সিলভিয়া প্লাথ-এর দুটি কবিতার অনুবাদ

অনুবাদক: শ্রীময়ী আলো


সিলভিয়া প্লাথ একজন প্রতিভাবান কবি, ঔপন্যাসিক এবং ছোটগল্প রচয়িতা। তাঁর জন্ম ১৯৩২ সালে আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস্ স্টেইটের বোস্টনে। মাত্র তিরিশ বছরের স্বল্প জীবনে নানা ব্যক্তিগত অনুভবের অনন্য দর্শন তাঁর সাহিত্য জীবনে প্রতিফলিত। বিংশ শতাব্দীর একজন উল্লেখযোগ্য নারীবাদী সাহিত্যিক। মাত্র ৮ বছর বয়সে পিতৃহীন হয়ে ঈশ্বরের প্রতি তাঁর বিশ্বাস ক্ষীণ হয়ে আসে। আর তখন থেকেই তার বিষণ্ণ জীবনের শুরু। স্কুলের পাট চুকিয়ে স্মিথ কলেজ থেকে সর্বোচ্চ সম্মান নিয়ে স্নাতক করেন এবং ফুলব্রাইট স্কলারশিপ নিয়ে কেমব্রিজের নিউনহ্যাম কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষ করেন।

ততদিনে তিনি কবি। ১৯৫৬ সালে সেই সময়েরই বিখ্যাত কবি টেড হিউ এর সাথে তাঁর বিবাহ হয়। কিন্তু হতাশা কোনোদিন পিছু ছাড়েনি। ১৯৫৩ সালে ঘুমের ওষুধ খেয়ে প্রথম আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। কিন্তু মৃত্যু আসেনি। দুই সন্তানের জননী হবার পর আবিষ্কার করলেন স্বামী টেডের বন্ধু-পত্নীর প্রতি আসক্তি। নিজেকে পরিত্যক্তা অনুভব করলেন তিনি। আর ডুবে গেলেন আদিগন্ত বিষণ্ণতায়। আগ্রহ হারিয়ে ফেললেন জীবনের। তিক্ত অভিজ্ঞতার নির্যাসে লিখতে থাকলেন একের পর এক কবিতা। মাত্র একটি মাসেই, অক্টোবর ১৯৬২-তে লিখে ফেললেন, ‘Lady Lazarus’ সহ একাধিক কবিতা। অভিমানী এই কবি, যিনি প্রতিটি দশকে স্বেচ্ছামৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছিলেন, অবশেষে লিখেছিলেন —‘Dying/ is an art, like everything else / I do it exceptionally well.’। তারপর একদিন, ১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৩’র শীতল সকালে গ্যাস ওভেনের আগুনে প্রাণ নিলেন নিজের। তাঁকে সমাধিস্থ করা হয় হেপস্টনস্টলের সেইন্ট থমাস চার্চের সমাধীক্ষেত্রে।

মৃত্যুর আগে মা’কে লিখেছিলেন, ‘আই অ্যাম রাইটিং দ্য বেস্ট পোয়েমস অব মাই লাইফ; দে উইল মেইক মাই নেইম।’ তাঁর প্রতিটা কবিতায় উঠে এসেছে তাঁর নিজস্ব জীবনের অভিজ্ঞতা। মনের ভেতরের ঝড়কে তিনি অক্ষরে বেঁধেছেন। ‘দ্য বেল জার’ বইটিতে তুলে ধরেছেন জীবনের বিভিন্ন গল্প, নানা স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের গল্প লিখেছেন। চল্লিশটির বেশি কবিতা নিয়ে যে ‘এরিয়ল’ গ্রন্থ, সমালোচকদের মতে তাঁর শ্রেষ্ঠ সাহিত্য কীর্তি, সেখানে ‘ড্যাডি’ ও ‘লেডি ল্যাজারস’ কবিতাদুটির মধ্যে প্লাথের ক্রমশ ভঙ্গুর মানসিক অবস্থার অনুষঙ্গ ধরা যায়। মৃত্যুর ঊনিশ বছর পর তাঁর ‘দি কালেকটেড পোয়েমস্’-এর জন্যে তিনি পুলিটজার পুরস্কার পান। যার সম্পাদনা করেছেন স্বয়ং টেড হিউজ যা ইংরেজিতে লিখিত বিংশ শতাব্দীর সর্বাধিক বিক্রিত কবিতা সংকলনের একটি। প্লাথের লেখায় বারবার এসেছে নানা চিত্রকল্প এসেছে চাঁদ, আয়না রক্ত, হাসপাতালের গন্ধ, ভ্রূণ, করোটি। প্লাথের কবিতায় ডিলান টমাস, ইয়েটস, আর মারিয়ান মুরের প্রত্যক্ষ প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। ১৯৬০-এর পর কবিতায় পাওয়া যায় পরাবাস্তব নিসর্গচিত্র। সঙ্গে বন্দিদশার অব্যক্ত যন্ত্রণা আর মৃত্যুর নিঃশব্দ পদসঞ্চার। তাই হয়তো তাঁর মৃত্যুর এত বছর পরও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ তাঁর লেখায় নিজেদের খুঁজে পান যারা প্রতি নিয়ত মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও জীবনের কাছে ফিরে ফিরে আসেন এক অমোঘ আকর্ষণে –– সম্ভাবনার।


পূর্বরাগিণীর তান
(Mad girl’s love song by Sylvia Plath)
অনুবাদ – শ্রীময়ী আলো


চোখ বন্ধ করলে
নিভে আসে পৃথিবীর আলো
খুললেই বেঁচে ওঠে সব

ভিতর ভিতর গড়ে উঠেছ তুমি

নীল লাল নক্ষত্র ভেসে বেড়ায়
ইচ্ছেমতো ধেয়ে আসে অন্ধকার
চোখ বুজলে স্তব্ধ হয়ে আসে সব

স্বপ্ন ও শয্যা
তোমার উন্মত্ত চুম্বন
মাথার ভিতর তৈরি হচ্ছো তুমি

ঈশ্বরের উৎখাৎ
নরকের আগুন ম্লান
দেবদূত আর শয়তানের যৌথ প্রস্থান
বদ্ধ দৃষ্টি — নিথর সংসার

ভেবেছিলাম ফিরবে
যেভাবে কথা ছিল

বয়স বেড়েছে ভুলেছি নাম

কল্পনা নির্মাণ করছে তোমায়

হয়তো বজ্রধ্বনি প্রেমিক হতে পারত
বসন্ত ফিরে এলে গর্জন শোনা যেত
চোখ বন্ধ করলেই স্তব্ধ বসুমতী
চোখ মেললেই জেগে ওঠে সব।


মূল কবিতা : Mad Girl’s Love Song
Sylvia Plath


“I shut my eyes and all the world drops dead;
I lift my lids and all is born again.
(I think I made you up inside my head.)

The stars go waltzing out in blue and red,
And arbitrary blackness gallops in:
I shut my eyes and all the world drops dead.

I dreamed that you bewitched me into bed
And sung me moon-struck, kissed me quite insane.
(I think I made you up inside my head.)

God topples from the sky, hell’s fires fade:
Exit seraphim and Satan’s men:
I shut my eyes and all the world drops dead.

I fancied you’d return the way you said,
But I grow old and I forget your name.
(I think I made you up inside my head.)

I should have loved a thunderbird instead;

At least when spring comes they roar back again.
I shut my eyes and all the world drops dead.
(I think I made you up inside my head.)”



বিভ্রান্তি
(Mad girl’s love song by Sylvia Plath)
অনুবাদ – শ্রীময়ী আলো


এখানে যা কিছু রং, ধূসর বেগুনি
বাকি শরীরটুকু নিস্তেজ
মুক্তোর মতো

পাহাড়ের ক্ষুদ্র কোটরে
প্রচণ্ড সাগর ঢুকে পড়ে
শুষে নেয় সবটুকু নির্যাস-ভরা শূন্যতায়

অদৃষ্টের চিহ্ন দেয়াল বেয়ে নেমে আসে
মাছির মতো

হৃদয় রুদ্ধ হয়ে আসে
সমুদ্র পাশ ফিরে শোয়
আয়নাগুলো পড়ে থাকে — নির্বাক।


মূল কবিতা : Contusion
Sylvia Plath

Color floods to the spot, dull purple.
The rest of the body is all washed out,
The color of pearl.

In a pit of rock
The sea sucks obsessively,
One hollow the whole sea’s pivot.

The size of a fly,
The doom mark
Crawls down the wall.

The heart shuts,
The sea slides back,
The mirrors are sheeted.


লেখক পরিচিতি: শ্রীময়ী আলো

নিজেকে কবি বলতে অসুবিধে বিস্তর। বরং ‘লেখার মানুষ’ ভালো সম্বোধন । শব্দের দেহে দর্শনের খোঁজ করাই লেখা জীবনের উদ্দেশ্য। বাকিটা শব্দেতর আত্মানুসন্ধান। ঠিক গুছিয়ে বলা যায় না। অসংখ্য মানুষের ঐকান্তিক ভালবাসা লেখা জীবনের প্রাপ্তি।আত্মীয় উৎসবে পাওয়া নতুন নাম। একটা একটা অক্ষরের ফাঁক ফোকর বেয়ে যত টুকু আলো আসে তাকে জানলা ধরে নিয়ে বাইরেটা দেখতে চাওয়া। ভাঙা গড়ার তুমুল পরাবাস্তব-লেখা জীবন। কৈশোরে কুড়িয়ে পাওয়া ঘুড়ির উড়ন্ত চোখে রামধনু বেঁধে দিগন্তের দিকে যে পাখি বন্ধু খুঁজতে গিয়েছিলো তাকে হারিয়ে ফেলার ভয় লিখিয়ে নিয়েছে বিগত আঠেরো বছর। জন্ম: ভালোবাসার জন্য, মৃত্যু ও রেখে যেতে চাই ভালোবাসার কারণে।প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ : অন্তরমহল। পত্রিকা : রানার, ঋ লি, মরীচিকা, শব্দযান , আদরের নৌকো,উন্মেষ, ক্ষেপচুরিয়াস, অনির্বাণ, খেয়া, গ্রন্থনা মালদা, হেলো টেস্টিং, রংমিলানতি, শূন্যকাল, র (দূর্গাপুর), রঙ রাখাল, চাকা, নির্জন স্বাক্ষর, সাহিত্য ওয়েব ম্যাগাজিন, জনবাক আলিপুরদুয়ার, হরপ্পা, শব্দসাঁকো, যাচ্ছেতাই, দেহলিজ, কবিতার ছন্দ, সাতসকাল সহ একাধিক পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি।


শেয়ার করে বন্ধুদেরও পড়ার সুযোগ করে দিন
  •  
  •  
  •  
  •  

7 Comments

  1. Somabho Raychaudhuri

    দুর্দান্ত অনুবাদ হুয়েছে।। তবে,অনুবাদক-কবিকে আরেকটু স্বাধীনতা দেওয়া উচিৎ ছিলো। যেহেতু মূলগুলি আমার পঠিত, তাই মনে হলো, ভাবানুবাদ হলে আরো ভালো হোতো। যাই হোক, অসামান্য হয়েছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।