লেখক : সবিতা রায় বিশ্বাস
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন নরমপন্থী ও চরমপন্থী এই দুটি ধারায় সম্পন্ন হয়েছিল। ভারতের সর্বস্তরের মানুষের মিলিত আন্দোলনের ফলে ভারতবর্ষ স্বাধীনতা লাভ করে। অবিভক্ত ভারতে ১৮৫৭ সালের যুদ্ধ ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, যা প্রথম স্বাধীনতাযুদ্ধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সে সংঘর্ষের বিশেষত্বের মধ্যে ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছ থেকে অবিভক্ত ভারতের স্বাধীনতা অর্জন করা এবং ব্রিটিশদের শোষণের বিরুদ্ধে সমাজের সব অংশের জনগণকে একত্রিত করা। ভারতীয় সেনাবাহিনীর একটা বড় অংশ যে নারীদের গঠিত শক্তি কাজ করেছিল তা খুব কম মানুষই জানেন। হাতে গোনা কিছু পরিচিত নারীরা ছাড়াও একাধিক নারী শক্তি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ভয়ংকর যুদ্ধ করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন দলিত, উপজাতি ও পতিতা নারী। স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসাবে ইতিহাসের পাতায় তাঁদের নাম নেই বললেই চলে।
স্বাধীনতাযুদ্ধে অচ্ছুত দলিত সম্প্রদায়ের এক কিংবদন্তি ও দুঃসাহসিক নারী যোদ্ধা ছিলেন ঝলকারি বাই। তিনি ছিলেন ঝাঁসীর রানী লক্ষ্মীবাইয়ের উপদেষ্টা ও নারী সেনাবাহিনীর কমান্ডার। ঝাঁসির ‘দুর্গা দল’ বা মহিলা ব্রিগেডের নেত্রী ছিলেন তিনি। তাঁর স্বামীও ছিলেন ঝাঁসী সেনাবাহিনীর একজন সৈনিক। ঝলকারি তীরন্দাজী আর তলোয়ার চালানোয় প্রশিক্ষিত ছিলেন। লক্ষ্মীবাইয়ের সাথে তাঁর চেহারার মিলের কারণে তিনি নিজেকে প্রায়শই রানির ‘ডাবল’ হিসেবে ব্যবহার করতেন। ব্রিটিশরা যখন ঝাঁসির দুর্গ অবরোধ করে, তখন ঝলকারি অসীম সাহসিকতার সঙ্গে লড়াই করেছিলেন এবং তাঁর নিজের সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। সব থেকে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল, যুদ্ধ চলার সময় রানীকে ছোট পুত্রসন্তানসহ পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছিলেন এবং নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রানীর অনুপস্থিতিতে যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। ঝলকারি বাইয়ের রণকৌশল মুগ্ধ করত রানিকেও। রানির সাথে তিনিও যুদ্ধের বিশ্লেষণ, রণকৌশল নিয়ে আলোচনা করতেন।
ইংরেজরা প্রথমে ঝলকারি বাইকেই রানী ভেবেছিল কিন্তু যখন বুঝতে পারে তখন তাঁকে ছেড়ে দেয়। ব্রিটিশ জেনারেল হিউ রোজ ছদ্মবেশের আড়ালে ঝলকারি বাইকে চিনতে না পেরে খুশি হয়েছিল এই ভেবে যে, অবশেষে ঝাঁসির রানী তাদের হাতের মুঠোয় বন্দী হয়েছে। জেনারেল রোজ প্রশ্ন করেছিলেন, “এখন তোমাকে কি করা উচিত?” ঝলকারি বাই চোখে চোখ রেখে উত্তর দিয়েছিলেন, “আমাকে ফাঁসি দিন”। এতে জেনারেল খুশি হয়ে বলেছিলেন, “ভারতবর্ষে যদি তোমার মত এক শতাংশ নারী থাকে, তাহলে ব্রিটিশদের ভারত ছেড়ে চলে যেতে হবে”। যখন ব্রিটিশরা আসল সত্য জানতে পারে ঝলকারি বাইকে মুক্তি দেয়। এর পরে ঝলকারি বাই ১৮৯০ সাল পর্যন্ত বেঁচেছিলেন। তিনি না থাকলেও তাঁর সম্প্রদায়ের মানুষ শ্রদ্ধার সঙ্গে তাঁকে স্মরণ করে। বুন্দেলখন্ডের লোকগান এবং লোককাহিনিতে ঝলকারি বাইয়ের গল্প শোনা যায়। ঝাঁসির দুর্গা দল ছিল অনেক নারীর সংগ্রামের সাক্ষী। মান্দার, সুন্দরী বৌ, মুন্ডারী বাই, মতি বাই- এরা কেউই কারো চেয়ে কোনো অংশে কম ছিলেন না। এরা অকুতোভয় চিত্তে স্বামীদের যুদ্ধে পাঠিয়েই ক্ষান্ত হননি, অলসভাবে বৈধব্য গ্রহণ করতে এদের অনীহা ছিল। ‘চুড়ি ফরওয়াই কে নেওতা/সিন্দুর পোছওয়াই কে নেওতা’(চুড়ি ভাঙার আমত্রণ, সিঁদুর মুছে ফেলার আমন্ত্রণ) স্বীকার করার সঙ্গে সঙ্গে, তারা নিজেরাও লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে দলিত, উপজাতি নারী সংগ্রামের কথায় অনিবার্যভাবে আসে অষ্টাদশ শতকের নারী যোদ্ধা কুইলির কথা। কুইলি ছিলেন বর্তমান তামিলনাড়ুর শিবগঙ্গাইয়ের রানী ভেলু নাছিয়ারের সেনাধ্যক্ষা। এই রানিই প্রথম ভারতীয় শাসক, যিনি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। সিপাহী বিদ্রোহের প্রায় সাতাত্তর বছর আগে ১৭৮০ সালে এই যুদ্ধ হয়। যে রণকৌশল রানীকে জিততে সাহায্য করেছিল তা তার সেনাধ্যক্ষা কুইলির মস্তিষ্কপ্রসূত ছিল।
এত বছর পরেও কুইলিকে তামিলভাষায় কেউ ‘বীরথালাপ্যাথি’ (সাহসী সমরনায়িকা) বলেন। আবার কেউ বলেন ‘বীরামঙ্গাই’(সাহসী নারী)। কুইলি ছিলেন অরুণথিয়ার তফসিলি জাতিভুক্ত। কুইলি ১৮০০ শতকে শিবগঙ্গাই জেলার কুদঞ্চাবাদিতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর বাবা ছিলেন পেরিয়ামুথান ও মা ছিলেন রাকা নামের সাহসী কিষাণী। রাকা বন্য পাগলা ষাঁড়ের হাত থেকে মাঠের ফসল বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছিলেন। কুইলির বাবা তখন স্ত্রীর শোকে বিধ্বস্ত, তিনি সব কিছু ছেড়ে কন্যাকে নিয়ে শিবগঙ্গাইয়ের কাছে চলে আসেন। সেখানে এসে তিনি মুচির কাজ করতেন আর মায়ের বীরত্বের কাহিনী শুনিয়ে কন্যা কুইলিকে বড় করেন।
কুইলির বাবা ভেলু নাছিয়ারের একজন গুপ্তচর নিযুক্ত হন। যুদ্ধের সময় বাবা ও মেয়ে রানীর পাশাপাশি থেকে যুদ্ধ করেছিলেন। এর ফলে কুইলি রানি ভেলু নাছিয়ারের ঘনিষ্ঠ হন। রানি কুইলিকে তাঁর ব্যক্তিগত দেহরক্ষী করে নেন। যখন ব্রিটিশরা ভেলু নাছিয়ারের পরিকল্পনা জানার জন্য কুইলিকে চাপ দিতে থাকে, তখন কুইলি কিছুতেই মাথা নত করেনি। এর ফলে দলিত বস্তিতে ব্রিটিশরা লাগামছাড়া অত্যাচার শুরু করে।
রানির বিশ্বাস অর্জন করার পরে কুইলি সেনাবাহিনীর সর্বময় কর্ত্রী হয়ে ওঠে। ১৭৭২ সালে শিবগঙ্গার দ্বিতীয় রাজা মুথুভাদুগানাথ পেরিয়া উদায়া থেভার আর্কটের নবাবের দাবি মানতে অস্বীকার করবার জন্য নবাবের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। ব্রিটিশরা নবাবের পক্ষ অবলম্বন করে, রাজা ওই যুদ্ধে হেরে যান এবং মৃত্যুবরণ করেন।
এর আট বছর পরে রানি ভেলু নাছিয়ার মারুথু পান্ডিয়ার্স, হায়দর আলি এবং টিপু সুলতানের সাথে জোট বেঁধে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। তাঁদের সেনাবাহিনী সুপ্রশিক্ষিত ছিল এবং কয়েকটি যুদ্ধে তাঁরা জিতেছিলেন। কিন্তু ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর উন্নত অস্ত্রের কারণে তাঁরা শেষপর্যন্ত হেরে যান।
এই সময় কুইলি শেষ কৌশল প্রয়োগ করেন। শিবগঙ্গাই কোট্টাই(দুর্গ)-এ নবরাত্রির দশম দিনে, রাজরাজেশ্বরী আম্মানের মন্দিরে বিজয়া দশমী উত্সব। সেই উপলক্ষে মহিলাদের দুর্গে প্রবেশের অনুমতি পাওয়া গিয়েছিল। কুইলি এই সুযোগকে কাজে লাগালেন। ফল ও ফুলের ঝুড়ির ভিতর অস্ত্র লুকিয়ে মহিলারা দুর্গে প্রবেশ করলেন। এবং রানির ইঙ্গিতে ব্রিটিশদের আক্রমণ করল। কুইলি ইতিমধ্যেই ব্রিটিশদের অস্ত্রাগারের হদিস পেয়ে গিয়েছিলেন। চারিদিকে যখন বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি, সেই সময় কুইলি প্রদীপ জ্বালানোর সমস্ত তেল, ঘি তাঁর উপরে ঢালতে বললেন। তারপর ব্রিটিশদের অস্ত্রাগারে নিজেকে জ্বালিয়ে আত্মঘাতী হয়ে ব্রিটিশদের সমস্ত অস্ত্র ধ্বংস করে দেন। এরপরেই ভেলু নাছিয়ারের জয় নিশ্চিত হয়ে যায়। এই ঘটনাতে কুইলিকে ভারতীয় ইতিহাসে প্রথম আত্মঘাতী বোমারু ও ‘প্রথম নারী শহীদ’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তামিলনাড়ু সরকার প্রায় এক দশক ধরে প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পর অবশেষে শিবগঙ্গা জেলায় কুইলির একটি স্মারক তৈরী করেছে।
ব্রিটিশদের সাথে যুদ্ধ করেছিলেন এমন অসংখ্য নারী সৈনিক ছিলেন যাঁরা উচ্চবর্ণের কাছে ছিলেন অচ্ছুত। এরা দলিত সম্প্রদায়ের ‘বীরাঙ্গনা’ নামে পরিচিত। তাঁদের অনেকের নামের পাশে ‘দেবী’ বা ‘বাই’ রয়েছে। তাঁরা অত্যন্ত নৈতিকতাপূর্ণ, প্রচন্ড সাহসী, তুখোড় জাতীয়তাবাদী দলিত নারী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিলেন। বলা হয়, তাঁরা ছিলেন অসীম শক্তির প্রতীক। তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন পাসি গোষ্ঠীর উদা দেবী (উড়া দেবী)।
উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যার একটা ছোট্ট গ্রামে উদা দেবীর জন্ম হয়। খুব ছোট বয়স থেকেই চারপাশে প্রবল ব্রিটিশ বিরোধী মনোভাব লক্ষ্ম্য করে উদা দেবী নিকটবর্তী বেগম হযরত মহলে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য নাম লেখান। যুদ্ধের প্রস্তুতির জন্য বেগম তাঁকে একটা নারী বাহিনী গড়ে তোলার জন্য সাহায্য করেন। অবশেষে ‘বীরাঙ্গিনী’ নামে একটা নারীবাহিনী বেগমের সহায়তায় গড়ে ওঠে। উদা দেবী ঠিক করেন, এই বাহিনী নিয়েই ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়বেন। সেই মত তিনি সেনাবাহিনীর কম্যান্ডারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি ও তাঁর স্বামী মক্কা পাসি (একজন মহান কুস্তিগীর) সশস্ত্র প্রতিরোধে সামিল হন। তাঁর স্বামী চিনহাটের যুদ্ধে শহীদ হন এবং উদা দেবী প্রতিশোধ নেবার সিদ্ধান্ত নেন।
১৮৫৭ সালে সিকান্দার বাগের যুদ্ধে উদা দেবী অংশগ্রহণ করেন। সিকান্দার বাগ আক্রমণ করেছিলেন ব্রিটিশ সেনাপতি ক্যাম্পবেল। তিনি দলিত নারী বাহিনীর আক্রমণের মুখে পড়েছিলেন। দলিত নারী যোদ্ধাদের নিয়ে লোকমুখে প্রচলিত আছে—
“কোই উনকো হাবসি কেহতা, কো-ই কেহতা নীচ অচ্ছুত।
অবলা কোই উনহে বাতলায়ে, কোই কাহে উনহে মজবুত”।
(কেউ তাদের বলে কৃষ্ণাংগ আফ্রিকান নারী, কেউ বলে অচ্ছুত। কেউ বলে তারা দুর্বল, আর কেউ বলে বীর।)
উদা দেবী তাঁর স্বামীর মৃত্যুর প্রতিশোধ নেবার জন্য পুরুষের ছদ্মবেশে একটা পিপুল গাছে উঠে পড়েন। ওই পথেই ব্রিটিশ সৈন্যরা অগ্রসর হচ্ছিল সিকান্দার বাগের দিকে। উদা দেবী গাছের আড়াল থেকে লক্ষ্য করে পরপর বত্রিশ জন ব্রিটিশ সৈন্যকে গুলি করে হত্যা করেন। যুদ্ধ চলাকালীন এক অফিসার লক্ষ্য করেন বেশিভাগ ব্রিটিশ সৈন্যই গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যাচ্ছেন এবং সেই গুলির গতিপথ অনেকটা উপর থেকে নীচে নেমে আসছে যেন। এই সন্দেহ হওয়া মাত্র তিনি চারিদিকে সতর্ক দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দেখতে পেলেন গাছের মাথায় একটা স্নাইপার বন্দুক। সেই বন্দুক লক্ষ্য করে গুলি চালানো মাত্র এক বিপ্লবীর গুলিবিদ্ধ মৃতদেহ গাছ থেকে পড়ে যায়। সেই বীর বিপ্লবী ছিলেন ছদ্মবেশী উদা দেবী।
শোনা যায়, ব্রিটিশ অফিসার ক্যাম্পবেল উদা দেবীর সাহসিকতায় মুগ্ধ হয়ে তাঁর মৃতদেহের সামনে মাথা নত করেছিলেন। উইলিয়াম ফোবর্স মিচেলের লেখা বই ‘রেমিনিসেন্সেস অফ দ্য গ্রেট মিউটিনি’ থেকে জানা যায় উদা দেবীর কাছে এক জোড়া পুরনো মডেলের পিস্তল ছিল যার মধ্যে একটা তাঁর বেল্টে গুলি ভর্তি অবস্থায় ছিল আর একটি পিস্তল ছিল তাঁর হাতে ধরা, যাতে ছিল অর্ধেক গুলি ভরা।
সংখ্যালঘু দলিত নারী জাতির কাছে উদা দেবী এক অনুপ্রেরণার নাম। প্রতি বছর তাঁর মৃত্যুদিনে (১৬ ই নভেম্বর) মানুষ উদা দেবীর মৃত্যুস্থলে অর্থাত লখনৌয়ের সিকান্দার বাগে তাঁর মূর্তির পাদদেশে এসে উপস্থিত হন এবং অদম্য সাহসিকতার জন্য তাঁকে সম্মান দেন।
কোম্পানির শাসনকালে দেশীয় রাজ্য কিট্টুরের রানি ছিলেন চেন্নামা। পঞ্চমশালী লিঙ্গায়েত জাতির (বর্তমানে ও বি সি) এই রানি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে সশস্ত্র বাহিনীর নেতৃত্ব দেন। ইংরেজদের সঙ্গে তাঁর সংঘাত বাধে, কারণ তিনি স্বত্ব বিলোপ নীতি অমান্য করেন। প্রথম দুটি যুদ্ধে কোম্পানি ব্যর্থ হলেও তৃতীয় যুদ্ধে কিট্টুর চেন্নামা পরাজিত হন ও ব্রিটিশরা তাঁকে বন্দী করে।
১৭৭৮ সালের ২৩ শে অক্টোবর বর্তমান ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের বেলাগাভি জেলার কাকাতি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন চেন্নামা। অল্প বয়সেই অশ্ব চালনা, তীর নিক্ষেপ, তরবারি চালনা প্রভৃতি সমরবিদ্যা শিখেছিলেন। ১৫ বছর বয়সে দেশাই পরিবারের রাজা মল্লসারজার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
১৮২৪ সালে এক পুত্র ও তাঁকে রেখে তাঁর স্বামী পরলোকগমন করেন। রানি রাজ্য সামলাতে শুরু করেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, সেই বছরই তাঁর পুত্রসন্তানের মৃত্যু হয়। পুত্রসন্তানের মৃত্যুর পর তিনি শিবলিঙ্গাপ্পাকে দত্তক নেন। এবং কিট্টুর রাজ্যের উত্তরাধিকারী ঘোষণা করেন। এই বিষয়টি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সুনজরে দেখেনি। কোম্পানি কর্তৃপক্ষ ‘ডকট্রাইন অফ ল্যাপস’ নীতি অনুসরণ করার কথা বলেন। এই নীতি অনুযায়ী যদি কোনো দেশীয় রাজ্যের শাসক নিঃসন্তান অবস্থায় মারা যান, বা তাঁর কোনো সন্তান যদি উত্তরাধিকারী হবার জন্য বেঁচে না থাকে, তবে সে রাজ্য কোম্পানি অধিগ্রহণ করবে।
এরপর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি রাজ্যটি অধিগ্রহণ করে এবং প্রতিনিধি নিযুক্ত করে। রানি কিট্টুর চেন্নাম্মা বিষয়টির শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য বম্বে প্রেসিডেন্সির তত্কালীন গভর্নর মাউন্টস্টুয়ার্ট এলফিনস্টোনের কাছে চিঠি পাঠান। কিন্তু দুই পক্ষ সমঝোতায় না পৌঁছানোয় বিষয়টি যুদ্ধ পর্যন্ত গড়ায়।
বিশ হাজারের বেশি সৈন্য নিয়ে ব্রিটিশরা ঝাঁপিয়ে পড়ে কিট্টুর রাজ্যের সেনাবাহিনীর উপরে। প্রথম যুদ্ধে ব্রিটিশরা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। ব্রিটিশদের রাজনৈতিক এজেন্ট সেন্ট জন থ্যাকারে যুদ্ধে নিহত হন। রানি চেন্নাম্মার সেনাবাহিনীর বীর লেফটেন্যান্ট আমাতুর বালাপ্পা অসাধারণ রণনৈপুণ্য প্রদর্শন করেন। স্যার ওয়াল্টার এলিয়ট এবং স্টিভেনসন বন্দী হন, পরে চেন্নাম্মার নির্দেশে তাদের মুক্তি দেওয়া হয়।
দ্বিতীয় যুদ্ধে ব্রিটিশদের পক্ষে সলাপুরের সাব কালেক্টর মুনরো মারা যান। এবং দুর্ভাগ্যক্রমে রানি কিট্টুর চেন্নাম্মা বন্দী হন। বালি হোংগল দুর্গে তাঁকে বন্দী করে রাখা হয় এবং সেখানেই ১৮২৯ সালের ২ রা ফেব্রুয়ারী তাঁর মৃত্যু ঘটে।
২০০৭ সালে ভারতের প্রথম মহিলা রাষ্ট্রপতি প্রতিভা পাটিল নয়াদিল্লির পার্লামেন্ট হাউসে রানি কিট্টুর চেন্নাম্মার মূর্তি স্থাপন করেন এবং নিজেই মূর্তিটির আবরণ উন্মোচন করেন।
স্বাধীনতা আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য ছিল শুধু উচ্চবর্ণ নয়, শুধু পুরুষ নয়, দলিত, উপজাতি নারীরাও স্বতঃস্ফুর্ত অংশগ্রহণ করেছিলেন। মুজফ্ফরনগর জেলার মুন্ডভার গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন মহাবীরী দেবী। অশিক্ষিত হলেও তিনি ছিলেন খুবই বুদ্ধিমতী ও প্রচন্ড সাহসী। তিনি অল্প বয়স থেকেই যে কোনো ধরণের শোষনের বিরোধিতা করতেন। ব্রিটিশদের ঠেকাতে ১৮৫৭ সালে ২২ জন মহিলাকে নিয়ে তিনি একটি দল তৈরি করেন। সহযোদ্ধাদের নিয়ে সাহসের সঙ্গে ব্রিটিশদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলেন এবং গেরিলা কায়দায় কয়েকজন ব্রিটিশ সৈন্যকে হত্যা করেছিলেন। অবশেষে তিনি ও তাঁর সহযোদ্ধা সবাই শহীদ হন।
১৮৫৫ সালে স্বাধীনতা সংগ্রামের নায়ক হিসাবে সিধু, কানুর নাম আমরা সবাই জানি। কিন্তু এমন কিছু স্মরণীয় নারী আছেন যাদের নাম আমাদের অজানা। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন ফুলো আর ঝানো। এরা ছিলেন পূর্ব ভারতের সাঁওতাল উপজাতির মুর্মু উপগোষ্ঠীর মেয়ে। তাদের বাসভূমি আজকের ঝাড়খন্ড। ১৮৫৫-৫৬ সালের সাঁওতাল বিদ্রোহ ছিল ব্রিটিশদের অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে, শোষক ব্যবসায়ী ও মহাজনদের বিরুদ্ধে। সাঁওতালরা চেয়েছিল নিজের দেশ ‘দামিন-ই-কোহ’ স্থাপন করতে। মহান সিধু ও কানু মুর্মুর সংগ্রাম ও আত্মত্যাগ শুধু ভারতবর্ষের ইতিহাসে নয়, পৃথিবীর ইতিহাসে একটি বিরল ঘটনা। সাঁওতালরা খুবই শান্তিপ্রিয় মানুষ, কিন্তু দিনে দিনে ইংরেজ ও মহাজনদের অত্যাচার সাঁওতাল নারীদের দিকে এগিয়ে আসে। এতে শান্তিপ্রিয় সাঁওতালরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে।
স্বাধীনতা সংগ্রামে শুধু পুরুষরা নয়, নারীরাও পুরুষের হাতে হাত রেখে এই যুদ্ধে সামিল হয়েছিলেন। এই বিদ্রোহ ‘হুল’ বিদ্রোহ নামে খ্যাত। এই সময় দুই সাঁওতাল নারী ফুলো আর ঝানো নিজেদের জীবন বাজি রেখে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। এই বিদ্রোহের ফলস্বরূপ সাঁওতাল নারীদের উপর ভয়ংকর অত্যাচার নেমে আসে। প্রায় ১২০০০ মহিলা ও যুবতী ধর্ষিতা হন। এবং ৩০০০ নারীকে ধর্ষণ করে খুন করা হয়। ব্রিটিশ সিপাইরা ফুলোকে নির্মমভাবে ধর্ষণ ও হত্যা করে তাঁর দেহ রেললাইনে ফেলে দেয়। ইতিহাসের প্রথম বীরাঙ্গনা হিসাবে সাঁওতাল জাতিসত্তা আজও তাঁকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে। ঐতিহাসিক জন মিলে তাঁর ‘History of British India’ গ্রন্থে বলেন, ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাসে সাঁওতাল নারীদের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ অথচ ইতিহাসের পাতায় তাঁরা বঞ্চিত থেকে গেল। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে অনেক নারীর কথা লেখা থাকলেও অসম সাহসিনী ফুলো আর ঝানোকে খুঁজে পাওয়া যায়না। কিন্তু শোনা যায় এঁরা সৈন্য শিবিরে ছুটে গিয়ে অন্ধকারে কুড়ুল চালিয়ে একুশ জন ব্রিটিশ সৈন্যকে নির্মূল করেছিলেন।
বিংশ শতকে মণিপুর ও নাগাল্যান্ড থেকে ঔপনিবেশিক শাসকদের তাড়ানোর আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন আদিবাসী রানি গাইদিনলিউ। ২৬ শে জানুয়ারী ১৯১৫ সালে বর্তমান মণিপুরের তামেংলং জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯২৭ সালে ১৩ বছর বয়সে তাঁর কাকাতো ভাই হাইপো জাদোনাংসহ হেরাকা আন্দোলনে যোগ দেন। যার লক্ষ্য ছিল নাগা উপজাতি ধর্মের পুনরুজ্জীবন ও ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটিয়ে নাগাদের স্বশাসন প্রতিষ্ঠা করা।
১৯৩২ সালে যখন তাঁর বয়স মাত্র ১৬ বছর তখন তাঁকে গ্রেফতার করে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেওয়া হয়েছিল। ১৯৩২ থেকে ১৯৪৭ সালের মধ্যে তাঁকে বিভিন্ন কারাগারে রাখা হয়েছিল। ১৯৪৭ সালে মুক্তি পাবার পরে তিনি তাঁর সম্প্রদায়ের উন্নতির জন্য কাজ চালিয়ে যান। পন্ডিত নেহেরু গাইদিনলিউকে ‘পাহাড়ের কন্যা’ হিসাবে বর্ণনা করেছিলেন। তিনি ১৯৭২ সালে তাম্রপাত্র মুক্তিযোদ্ধা পুরস্কার, ১৯৮২ সালে পদ্মভূষণ এবং ১৯৮৩ সালে বিবেকানন্দ সেবা পুরস্কারে ভূষিত হন। ভারত সরকার তাঁর সম্মানে ১৯৯৬ সালে একটা পোস্টাল স্ট্যাম্প ও ২০১৫ সালে একটা স্মারক মুদ্রা চালু করে। মরণোত্তর বিরসা মুন্ডা পুরস্কারেও ভূষিত হন তিনি।
রানি অবন্তী বাঈ লোধী ছিলেন রামগড়ের রাজা বিক্রমাদিত্য সিংয়ের স্ত্রী। অসুস্থতার কারণে রাজা রাষ্ট্রের বিষয়গুলি ঠিকমত পরিচালনা করতে পারছিলেন না। ব্রিটিশরা তাঁকে অযোগ্য বলে ঘোষণা করে, তারা তাঁর ছেলে আমান সিং ও শের সিংকেও উত্তরাধিকারী হিসেবে ঘোষণা করেনি। অবন্তী বাঈ লোধী রাজ্যের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। কিন্তু ব্রিটিশ শাসকরা তাঁকে বৈধ শাসক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি।
১৮৫১ সালে ব্রিটিশরা রামগড়কে ‘ওয়ার্ড কোর্ট’ হিসাবে ঘোষণা করে এবং তাদের নিজস্ব শাসক নিযুক্ত করে। রানি ব্রিটিশ শাসককে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। অবন্তী বাঈ লোধী যুদ্ধে যোগ দেবার জন্য প্রতিবেশী রাজ্যের শাসকদের কাছে যুদ্ধে যোগ দেবার জন্য দূত পাঠিয়েছিলেন। ১৮৫৭ সালের মধ্যে সমগ্র উত্তরাঞ্চল সশস্ত্র বিদ্রোহে যোগ দেয়। অবন্তী বাঈ লোধী চার হাজার সৈন্য নিয়ে সেনাবাহিনী গড়ে তোলেন এবং নিজে তার নেতৃত্ব দেন। ব্রিটিশদের সাথে তাঁর প্রথম যুদ্ধ ম্যান্ডেলার কাছে কেরী গ্রামে অনুষ্ঠিত হয়। অবন্তী বাঈ লোধী যুদ্ধে ব্রিটিশ বাহিনীকে পরাস্ত করে। পরাজিত ব্রিটিশরা ফিরে এসে রামগড় আক্রমণ করে। অবন্তী বাঈ লোধী নিরাপত্তার জন্য দেবহারগড় পাহাড়ে চলে যান। ব্রিটিশ সেনাবাহিনী রামগড়ে অগ্নিসংযোগ করে প্রতিশোধ নেবার জন্য দেবহারগড় রওনা হয়। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীকে ফাঁদে ফেলার জন্য অবন্তী বাঈ লোধী গেরিলা যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। কিন্তু তাঁর সাহস ও যুদ্ধের সরঞ্জাম ব্রিটিশদের সামরিক সরঞ্জামের কাছে যথেষ্ট ছিলনা। প্রায় পরাজয়ের মুখোমুখি হয়ে অবন্তী বাঈ লোধী চিন্তা করেন, তিনি আত্মসমর্পণ করবেন না। নিজের জীবন উত্সর্গ করবেন। ১৮৫৮ সালের ২০শে মার্চ তিনি নিজের তরবারি দিয়ে নিজেকে হত্যা করে শহীদ হন।
সিপাহী বিদ্রোহের আগে পর্যন্ত নৃত্যবিদ্যার পেশা ছিল শিল্পকলার একটা দিক। কিন্তু ইংরেজরা এই নৃত্যকলার মাঝেই শিল্পীর গায়ে হাত দিতে থাকে। যৌন সঙ্গমে বাধ্য করতে থাকে। কিন্তু এই অবক্ষয়ের মাঝেও একজন ছিলেন তিনি ছিলেন আজিজুন বাই। সিপাহী বিদ্রোহের সময় তিনি দেশের জন্য যা করেছিলেন তা ইতিহাসে তেমনভাবে লিপিবদ্ধ হয়নি। মূলত কিছু লোককাহিনী ও কিছু রিসার্চ পেপার থেকে জানা যায়, খুব অল্পবয়সে আজিজুন বাই তাওয়াইফখানাতে এসেছিলেন। দেশ থেকে ইংরেজদের তাড়াতে তিনি নিজের শরীরটাকে হাতিয়ার করলেন। আজিজুন নিজের মত আরো কিছু তাওয়াইফ জোগাড় করে কোঠিগুলোকে বিপ্লবের আস্তানা গড়ে তোলেন ও গোয়েন্দার মত খবর সংগ্রহ করতে লাগলেন। গুপ্ত মিটিং চালিয়ে অস্ত্র সরবরাহও করেন। কানপুরে নানাসাহেবের জয় হলে বিজয় মিছিলে পুরুষের পোশাক পরে আজিজুন বাই অংশগ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যু রহস্যের আড়ালে থেকে গিয়েছে।
স্বাধীনতা আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য ছিল শুধু উচ্চবর্ণ নয়, শুধু পুরুষ নয়, দলিত, অবহেলিত, অবদমিত শ্রেণীর নারীদের স্বতঃস্ফুর্ত অংশগ্রহণ। কিন্তু দুঃখের বিষয় উচ্চবর্ণের নারীদের কথা ইতিহাস লিখে রাখলেও রাখেনি দলিত, আদিবাসী অচ্ছ্যুত নারীদের কথা। তাই দলিত নারী সবিত্রিবাই ফুলের কথা এখনো সকলের অজানা।
১৮৩১ সালের ৩ রা জানুয়ারী পুণে থেকে প্রায় পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরে মহারাষ্ট্রের সাতারা জেলার নয়গাঁও গ্রামে সাবিত্রীবাই ফুলের জন্ম হয়। তাঁর মায়ের নাম ছিল লক্ষ্মী ও বাবা ছিলেন খান্দোজি নেভেশে পাটেল। তাঁরা মালি সম্প্রদায়ভুক্ত (বর্তমানে ও বি সি) ছিলেন। সাবিত্রী মাত্র নয় বছর বয়সে ১৩ বছরের জ্যোতিরাও ফুলেকে বিয়ে করেন। ওঁরা ছিলেন নিঃসন্তান দম্পতি। পরবর্তীকালে ফুলে দম্পতি যশবন্ত রাও নাম এক ব্রাহ্মণ সন্তানকে দত্তক নেন।
সাবিত্রীর যখন বিয়ে হয় তখন অক্ষর জ্ঞান ছিলনা। সেইসময় নিম্নবর্গীয়দের পড়াশোনা করার অধিকার ছিলনা। কিন্তু জ্যোতিরাও বাড়িতেই স্ত্রীকে পড়াশোনা শেখানোর ব্যবস্থা করলেন। জ্যোতিরাও বিশ্বাস করতেন, তাঁর স্ত্রী পারিপার্শ্বিক অন্য মহিলাদের শিক্ষিত করে তুলতে পারবেন। এর মাধ্যমেই ভারতের বুকে নবজাগরণ গড়ে উঠবে। জ্যোতিরাও ফুলের স্বপ্ন সত্যি হয়েছিল। প্রথম নারী স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা হলেন সাবিত্রীবাই ফুলে। ১৯২০ র দশকে দলিত নারীরা স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে সঙ্গে বর্ণ বিরোধী এবং অস্পৃশ্যতা বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। সাবিত্রীবাই পুরুষদের বোঝাতে চেয়েছিলেন দলিত, আদিবাসী, অন্ত্যজ সব শ্রেণীর নারীদের শিক্ষিত করে তুলতে হবে। তবে সমগ্র সমাজের উন্নতি হবে, যা স্বাধীনতা আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করবে। তিনি পুনে শহরে একটি ক্লিনিক চালু করেছিলেন। সেখানে বিউবিনিক প্লেগে আক্রান্ত হয়ে ১৮৯৭ সালের ১০ ই মার্চ তাঁর মৃত্যু হয়।
ড. জয়শ্রী সিং ও গার্গী বশিষ্ঠ তাঁদের গবেষণাপত্র A Critical Insight On Status of Dalit Women in India (2018)-তে লিখেছেন, ‘ভারতে দলিত নারীরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নীরবে বসবাস করছেন। তাদের নিজের শরীর, উপার্জন এবং জীবনের উপর নিয়ন্ত্রণ নেই। তারা দরিদ্র, নিরক্ষর। যৌন হয়রানি, বর্ণগত হিংসার শিকার এবং শোষিত’। একই কারণে স্বাধীনতা সংগ্রামেই হোক বা নারীবাদী সংগ্রামে এই দলিত, আদিবাসী নারীদের কথা মনে রাখা হয়নি। মনে রাখা হয়নি ভগবতী দেবী, মহাবিরি দেবী, মানকুমারী, রোহিমা, আশা দেবী প্রমুখ নারীর নাম। স্বাধীনতা আন্দোলনে এঁদের ভুমিকা অনস্বীকার্য। এঁদের মধ্যে কাউকে সরাসরি মৃত্যুদন্ড দিয়েছিল ব্রিটিশরা, আবার কাউকে জীবন্ত জ্বালিয়ে দিয়েছিল।
ইংরেজ শাসন থেকে দেশকে মুক্ত করতে যাঁরা রক্ত-ঘাম ঝরিয়েছিলেন, মৃত্যু বরণ করেছিলেন তাঁদের স্মরণ করা হবে বিশেষ দিনে। কিন্তু প্রচলিত মূলধারার ইতিহাস থেকে বরাবরের মত বাদ থেকে যাবেন স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নেওয়া অসংখ্য দলিত, উপজাতি বিপ্লবী নারী। লিঙ্গগত প্রান্তিকতার সঙ্গে জাতি-বর্ণগত বা শ্রেণীগত প্রান্তিকতাও এঁদের রেখেছে অন্ধকারে। সেই অন্ধকার ছিন্ন করে স্বাধীনতা আন্দোলনে শহীদ হওয়া দলিত, আদিবাসী, সমাজের চোখে অচ্ছ্যুত নারীদের আলোয় আনার দায়িত্ব নিতে হবে। আজাদী কি অমৃত মহোত্সব হবে সেই সময়, যখন তেরঙ্গা পতাকার রঙে উজ্জ্বল হবে ফুলো আর ঝানো মুর্মুর কুঠার ধরা কঠিন মুখ।
ঝাড়খন্ডের ছোটনাগপুরের গবেষক বাসবী কিরো তাঁর বই ‘উলগুলান কি আওরতেঁ’ (বিপ্লবের নারী) বইতে আদিবাসী নারীদের কথা বলেছেন। সাঁওতাল বিদ্রোহে যেমন ছিলেন ফুলো আর ঝানো মুর্মু, ১৮৯০-১৯০০ সালের বীরসা মুন্ডার নেতৃত্বে তেমন ছিলেন মাকি, থিগি, নাগি, লেম্বু, সালি এবং চিম্পু। ছিলেন বীরকান মুন্ডা, মান্জিয়া মুন্ডা, দান্দাং মুন্ডাদের স্ত্রীরা। টানা আন্দোলনে (১৯৪১) ছিলেন দেবমনি ওরফে বন্দানি। এরা সকলেই পুরুষের পোশাক পরে শত্রুর আক্রমণের বিরুদ্ধে সাহসিকতার সঙ্গে লড়াই করেছিলেন। এই সব নারীদের কথা বলার জন্য এগিয়ে আসতে হবে জনজাতির তরুণ প্রজন্মকে। নাহলে রোহতাসগড়ের সিঙ্গি দাই, কাইলি দাইদের মত বিপ্লবী নারীরা থেকে যাবেন অন্তরালেই। যেমন এই লেখার বাইরে থেকে গেলেন অজানা অনেক বিপ্লবী নারী। যাঁদের অবদান ছাড়া স্বাধীনতা আন্দোলনে জয় আসত না।
স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশ নেওয়া সেইসব দলিত, উপজাতি মহিয়সী বিপ্লবী নারীদের জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা ও প্রণাম।
১) স্বাধীনতার যুদ্ধে দলিত ও আদিবাসী নারী – শতাব্দী দাশ
২) ১৮৫৭-এর দলিত বীরাঙ্গনারা – ফজল হাসান
৩) অবন্তী বাঈ – উইকিপিডিয়া তথ্যসূত্র
৪) ফুলো আর ঝানো – Santali History Blogger
৫) রানি গাইদিনলিউ – ইতিহাস কর্ণার
৬) আজিজুন বাই – বিক্রম পাঠক
৭) কিট্টুর চেন্নাম্মা – উইকিপিডিয়া
৮) উড়া দেবী (উদা দেবী) – সব বাংলায়
৯) কুইলি – উইকিপিডিয়া
১০) ইন্টারনেট
লেখক পরিচিতি : সবিতা রায় বিশ্বাস
শুকতারা, কিশোর ভারতী, কফি হাউস সহ দেশ ও বিদেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় এবং ওয়েবজিনে লিখে থাকি| প্রকাশি ও সম্পাদিত বই নিয়ে মোট সংখ্যা কুড়ি|বিভিন্ন পুরস্কারে পুরস্কৃত|