লেখক : মুহাম্মদ আস্রাফুল আলম সোহেল
এই অপার বিশ্বব্রহ্মাণ্ড এক মহাবিস্ময়, রহস্যময় এবং অনাবিল সৌন্দর্যের অধিকারী যা আজো আমাদেরকে হাতছানি দেয়। সীমানাহীন মহাবিশ্বে অসংখ্য নক্ষত্র, নাক্ষত্রিক অবশেষ, গ্রহাণু, উল্কা, ধূমকেতু, আন্তঃগ্রহীয় ধূলি মেঘ, আন্তঃনাক্ষত্রিক গ্যাস, ধূলিকণা, নীহারিকা, সৌরজগৎ, কৃষ্ণগহ্বর এবং অদৃশ্য পদার্থসহ মহাজাগতিক বিভিন্ন বস্তুর সমন্বয়ে গঠিত হয় এক একটি ছায়াপথ। একটি ছায়াপথে গড়ে প্রায় ১০০ থেকে ৫০০ বিলিয়ন নক্ষত্র থাকে। ছায়াপথের উচ্চ ঘনত্বসহ বর্ধিত অঞ্চলগুলোকে মহাস্তবক (সুপারক্লাস্টার) বলে। তবে সুনির্দিষ্টভাবে একটি মহাস্তবক হচ্ছে ছোট ছোট ছায়াপথ গুচ্ছ বা ছায়াপথ দলের একটি বড় দল বা গোষ্ঠী। এরা মহাবিশ্বের বৃহত্তম পরিচিত কাঠামোগুলোর মধ্যে একটি। অনুমান করা হয়, পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্বে মহাস্তবকের সংখ্যা প্রায় ১০ মিলিয়ন। এর মধ্যে ল্যানিয়াকিয়া ছায়পথ মহাস্তবক (দ্য ল্যানিয়াকিয়া গ্যালাক্সি সুপারক্লাস্টার) হচ্ছে একটি। এটিকে ছায়াপথ মহাস্তবক বা স্থানীয় ছায়াপথ মহাস্তবক (লোকাল সুপারক্লাস্টার, এলএসসি, এলএস) বা হাওয়াইয়ান উন্মুক্ত আকাশ বা হাওয়াইয়ান অমোঘ স্বর্গ বলা হয়। এই বিশাল মহাস্তবকটি ৫২১,৬০০,০০০ আলোকবর্ষেরও (১৬০ মেঘাপারসেক) বেশি এলাকা নিয়ে বিস্তৃত, যেখানে আমাদের নিজস্ব বাসস্থান আকাশগঙ্গা ছায়াপথসহ আশেপাশে আরও প্রায় ১০০,০০০ অন্যান্য ছায়াপথের আবাসস্থল। আর ঐ আকাশগঙ্গা ছায়াপথের ছোট সর্পিল বাহুতে জলন্ত অগ্নিপিণ্ড সূর্য নামক নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে গঠিত হয়েছে আমাদের সৌরজগৎ যেটি সবুজ গ্রহ পৃথিবীকে ধারণ করে। হ্যাঁ, সেখানেই আমাদের অবস্থান (আওয়ার প্লেস ইন দ্য কসমস)। হাওয়াইয়ান ভাষায় Laniakea নামের অর্থ হচ্ছে অমোঘ স্বর্গ। Lani হচ্ছে স্বর্গ এবং Akea হচ্ছে প্রশস্ত বা অপরিমেয়। হাওয়াই কাপিওলানি কমিউনিটি কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের হাওয়াইয়ান ভাষার সহযোগী অধ্যাপক নাওয়া নেপোলিয়ন সমুদ্রপথ সন্ধানকারী বা পলিনেশিয়ান নাবিকদের সম্মানার্থে ল্যানিয়াকিয়া নামটি প্রস্তাব করেন, যারা আকাশের জ্ঞান ব্যবহার করে প্রশান্ত মহাসাগরের যাত্রাপথ বা অবস্থান নির্ণয় করতেন। এই দানব ল্যানিয়াকিয়া ছায়াপথ মহাস্তবকের আনুমানিক ভর ১০১৭ সৌর ভরের সমান (১০০ কোয়াড্রিলিয়নেরও বেশি)। এটি আকাশগঙ্গা ছায়াপথের চেয়েও ১০০,০০০ গুণ বড়, যা প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন আলোকবর্ষ জুড়ে বিস্তৃত আরেকটি বৃহৎ হোরোলজিয়াম রেটিকুলাম ছায়াপথ মহাস্তবকের সমতুল্য। সত্যিই, বিস্ময়কর আকার! তাই, আমাদের স্থানীয় ছায়াপথ গোষ্ঠীটি ল্যানিয়াকিয়ার হৃদয়ের দিকে টানছে।
এই আশ্চর্যজনক ল্যানিয়াকিয়া ছায়াপথ মহাস্তবকটি চারটি উপভাগ নিয়ে গঠিত, যা পূর্বে আলাদা মহাস্তবক হিসেবে পরিচিত ছিল যেমন (ক) ভার্গো সুপারক্লাস্টার: যে অংশে আকাশগঙ্গা ছায়াপথ থাকে (খ) হাইড্রা সেন্টাউরাস সুপারক্লাস্টার: [১] মহা আকর্ষক যেটি নরমা এর কাছে ল্যানিয়াকিয়া ছায়াপথ মহাস্তবকের কেন্দ্রীয় মহাকর্ষ বিন্দু [২] অ্যান্টলিয়া ওয়াল যেটি হাইড্রা সুপারক্লাস্টার নামে পরিচিত [৩] সেন্টাউরাস সুপারক্লাস্টার (গ) প্যাভো ইনদাস সুপারক্লাস্টার (ঘ) সাউদার্ন সুপারক্লাস্টার: [১] ফরন্যাক্স ক্লাস্টার (এস৩৭৩) [২] ডোরাডো এবং ইরিডেনাস ক্লাউড। মহাজাগতিক অনুপম সৌন্দর্যের অধিকারী ল্যানিয়াকিয়া ছায়পথ মহাস্তবকের আবিষ্কার, গ্যালাকটিক অবস্থান এবং বেগের পরিমাপ থেকে উদ্ভূত হয়েছে যে কিভাবে ছায়াপথগুলো কাছাকাছি বস্তুর ঘনত্ব ও মহাজগতের সামগ্রিক প্রসারণের সাথে সম্পর্কিত। অসীম মহাবিশ্বের এক ক্ষুদ্রতম অংশে অবস্থিত ল্যানিয়াকিয়া ছায়াপথ মহাস্তবকই হচ্ছে আমাদের হোম সুপারক্লাস্টার। পরম বিস্ময়কর এই ছায়াপথ মহাস্তবকটির আশপাশে সবচেয়ে বড় ছায়াপথ স্তবকগুলো হচ্ছে: ভার্গো, হাইড্রা (অ্যাবেল ১০৬০), সেন্টাউরাস (এ ৩৫২৬), অ্যাবেল ৩৫৬৫, অ্যাবেল ৩৫৭৪, অ্যাবেল ৩৫২১, সাউদার্ন, প্যাভো ইনদাস, ফরন্যাক্স, নরমা (এসিও ৩৬২৭ বা অ্যাবেল ৩৬২৭), এনডোরাস, প্যাগাসাস, পাপিস, কমা, অ্যান্টলিয়া, ক্যানসার, উরসা মেজর এবং ইরিডেনাস। ধারণা করা হয়, সম্পূর্ণ ল্যানিয়াকিয়া ছায়াপথ মহাস্তবকে প্রায় ৩০০ থেকে ৫০০টি পরিচিত ছায়পথ স্তবক বা গুচ্ছ এবং দল বা গোষ্ঠী রয়েছে। তবে প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে, কারণ এর মধ্যে কিছু এড়িয়ে চলা অঞ্চল অতিক্রম করছে। এটি মহাকাশের এমন একটি এলাকা যা আংশিকভাবে আকাশগঙ্গা ছায়াপথের গ্যাস ও ধূলিকণা দ্বারা অস্পষ্ট থাকার কারণে সেই অঞ্চলকে মূলত সনাক্ত করা যায় না। রহস্যেঘেরা প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যময় এই ল্যানিয়াকিয়া ছায়াপথ মহাস্তবকটি মহাবিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ কিছু কাঠামোর মধ্যে একটি এবং এটির যে সীমানা রয়েছে তা নির্দিষ্ট করা খুবই কঠিন, বিশেষ করে ভেতর থেকে।
অনন্য বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ল্যানিয়াকিয়া ছায়াপথ মহাস্তবক নিজেই মীন-সেটাস মহাস্তবকের এক জটিল উপাদানের অংশ (পিসসেস-সেটাস সুপারক্লাস্টার কমপ্লেক্স)। গভীর মহাকাশে আধিপত্য বিস্তারকারী এই দুর্দান্ত ল্যানিয়াকিয়া মহাস্তবকটি একটি ছায়াপথ অংশু বা সূক্ষ্ম-সূত্র, যেটি অনেক বড় মহাকর্ষীয় কাঠামো তৈরি করে থাকে। একটি ছায়াপথ মহাস্তবকের মধ্যে বেশিরভাগ ছায়পথের গতি এবং ভর কেন্দ্রের দিকে আকৃষ্ট করে অভ্যন্তরীণভাবে পরিচালিত হয়। তাই, ল্যানিয়াকিয়া ছায়াপথ মহাস্তবকের ক্ষেত্রে এই মহাকর্ষীয় কেন্দ্রবিন্দুকে মহা আকর্ষক বলা হয়, যেটি ল্যানিয়াকিয়া মহাস্তবকের স্থানীয় গোষ্ঠীর গতিকে প্রভাবিত করে যেখানে আকাশগঙ্গা ছায়াপথ রয়েছে এবং ল্যানিয়াকিয়া ছায়াপথ মহাস্তবক জুড়ে বিদ্যমান অন্যান্য সকল ছায়াপথকেও। ল্যানিয়াকিয়া ছায়াপথ মহাস্তবকের উপাদান বা গঠক বা নির্বাচন-কর্তা (কনস্টিটুয়েন্ট) ছায়াপথ স্তবকগুলো থেকে ভিন্ন। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বলেন যে, অদ্ভুত ল্যানিয়াকিয়া ছায়াপথ মহাস্তবকটি মহাকর্ষীয়ভাবে একে অপরের থেকে আবদ্ধ নয়। আপাত কাঠামোগুলো ক্ষণস্থায়ী। অনুমান করা হয় যে, ল্যানিয়াকিয়া আশেপাশের অঞ্চলের তুলনায় অতিরিক্ত ঘনত্বের ছায়াপথ মহাস্তবক হিসেবে নিজেকে বজায় রাখার পরিবর্তে অন্ধকার শক্তি (ডার্ক এনার্জি) দ্বারা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। তবে গবেষণায় প্রস্তাব করা হয়, লাল স্থানান্তর (রেডশিফ্ট) অনুযায়ী পরিচিত কয়েকটি মহাস্তবক যেমন: ভার্গো সুপারক্লাস্টার এবং হাইড্রা সেন্টাউরাস সুপারক্লাস্টার উভয়ই সংযুক্ত হয়ে যেতে পারে। এই বিশাল মহাকাশে ল্যানিয়াকিয়া ছায়াপথ মহাস্তবকের প্রতিবেশী অন্যান্য মহাস্তবকগুলো হচ্ছে: শেপলে সুপারক্লাস্টার (এসসিআই ১২৪), সাউদার্ন সুপারক্লাস্টার, ভার্গো সুপারক্লাস্টার (এলএসসি বা এলএস), প্যাভো ইনদাস সুপারক্লাস্টার, সেন্টাউরাস সুপারক্লাস্টার (মহাস্তবকটি একই নামের নক্ষত্রমণ্ডলে রয়েছে), পারসিয়াস-পিসসেস সুপারক্লাস্টার (এসসিআই ৪০), হারকিউলেস সুপারক্লাস্টার (এসসিআই ১৬০) (মহাস্তবকটি একই নামের নক্ষত্রমণ্ডলে রয়েছে), কোমা সুপারক্লাস্টার (এসসিআই ১১৭), উরসা মেজর সুপারক্লাস্টার (মহাস্তবকটি একই নামের নক্ষত্রমণ্ডলে রয়েছে), কোলাম্বা সুপারক্লাস্টার (মহাস্তবকটি একই নামের নক্ষত্রমণ্ডলে রয়েছে), পিসসেস-সেটাস সুপারক্লাস্টার কমপ্লেক্স (গ্যালাক্সি ফিলামেন্ট), হোরোলোগিয়াম সুপারক্লাস্টার (মহাস্তবকটি একই নামের নক্ষত্রমণ্ডলে রয়েছে), হাইড্রা সুপারক্লাস্টার (মহাস্তবকটি একই নামের নক্ষত্রমণ্ডলে রয়েছে), লিও সুপারক্লাস্টার (মহাস্তবকটি একই নামের নক্ষত্রমণ্ডলে রয়েছে), সেক্সট্যান্স সুপারক্লাস্টার (মহাস্তবকটি একই নামের নক্ষত্রমণ্ডলে রয়েছে), ক্যাপরিকরনাস সুপারক্লাস্টার (মহাস্তবকটি একই নামের নক্ষত্রমণ্ডলে রয়েছে), বুটেস সুপারক্লাস্টার (মহাস্তবকটি একই নামের নক্ষত্রমণ্ডলে রয়েছে), স্ক্লাপ্টর সুপারক্লাস্টার এবং করোনা বোরেয়ালিস সুপারক্লাস্টার (মহাস্তবকটি একই নামের নক্ষত্রমণ্ডলে রয়েছে)।
আমরা জানি, প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর পূর্বে একটি বৃহৎ পরমাণুর মহাশক্তিশালী মহাবিস্ফোরণের মাধ্যমে মহাবিশ্বের উৎপত্তি হয়। সেই সময় পদার্থ, প্রতিপদার্থ, বিকিরণ এবং শক্তি ইত্যাদি দ্বারা এই মহাবিশ্ব পরিপূর্ণ ছিল; সমস্ত কণা ও ক্ষেত্র যা আমরা আজ জানি এবং সম্ভবত আরও বেশি। সেই মহাবিস্ফোরণের পর থেকে অদ্যাবধি মহাবিশ্ব বিবর্তনের মধ্য দিয়ে লক্ষ লক্ষ বছর থেকে বিলিয়ন বছর অতিবাহিত হয়েছে। তবুও, মহাবিশ্ব নিয়ে মানবজাতির কৌতূহলের অন্ত নেই। তাই, এটি মানুষকে এখনও কাছে টানে। গত ২০১৪ খ্রীষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের একটি দল ছায়াপথের আপেক্ষিক বেগ অনুযায়ী ল্যানিয়াকিয়া ছায়াপথ মহাস্তবককে সংজ্ঞায়িত করার সময় এর প্রতিবেশী কয়েকটি ছায়পথ মহাস্তবক এবং ল্যানিয়াকিয়া ছায়াপথ মহাস্তবকের প্রান্ত সম্পর্কে স্পষ্টভাবে জানতে পারেননি, যদিও বর্তমানে এদের প্রান্ত এবং বাইরের কাঠামোর অধ্যয়ন উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে। ফলে, মহাবিশ্বজুড়ে পর্যবেক্ষণযোগ্য এই ছায়াপথ মহাস্তবকগুলো খুঁজে পাওয়া গেছে এবং এদের নকশা বা তালিকা করা হয়েছে, যেখানে তারা বৃহত্তম পরিচিত ছায়পথ স্তবকের চেয়ে দশগুণ বেশি সমৃদ্ধ। দুর্ভাগ্যবশত, মহাবিশ্বে অন্ধকার শক্তির উপস্থিতির কারণে এই মহাস্তবকগুলো এবং আমাদের নিজস্বটিসহ শুধুমাত্র দৃশ্যমান কাঠামো। বাস্তবে, তারা আমাদের চোখের সামনে দ্রবীভূত হওয়ার প্রক্রিয়াতে নিছক কল্পনা।
উৎস:
উইকিপিডিয়া
সায়েন্টিফিকআমেরিকান.কম
লেখক পরিচিতি : মুহাম্মদ আস্রাফুল আলম সোহেল
ফার্মাসিস্ট

