কাজল

লেখক : বিজুরিকা চক্রবর্তী

কাজলের নামটা যেন এক অশুভ পূর্বাভাসের মতই তার জীবনের সঙ্গে জুড়ে গিয়েছিল। জন্মের আগেই ঠাকুমা রায় দিয়েছিলেন, “মেয়েটা কুচকুচে কালো হবে।” সেই নিকষ কালো রংটা শুধু তার ত্বকেই থাকেনি, মিশে গিয়েছিল তার নসিবের প্রতিটি ভাঁজে।

​শৈশবেই সাপের কামড়ে বাবার মৃত্যু হ’ল। তারপর মিথ্যা মামলায় জেলে থাকা অবস্থায় বড় আদরের দাদাও না-ফেরার দেশে পাড়ি দিলেন। পঙ্গু দিদি আর কাজলকে নিয়ে মা যখন অকুল পাথারে, তখন পরের বাড়িতে ঝি-গিরি আর ভিক্ষাই ছিল শেষ সম্বল। কিন্তু সেই মা-ও নেই। সামান্য তিন দিনের পেটখারাপের অবহেলায় মা যখন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন, কাজল বুঝল পৃথিবীটা বড় নিষ্ঠুর। দিদিকে নিয়ে তার ঠাঁই হ’ল এক দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের আশ্রয়ে। ​সে বাড়িতে ভাত জুটত ঠিকই, কিন্তু জুটত না কোন মর্যাদা। ক্লাস ফাইভেই পড়াশোনার পাট চুকিয়ে তাকে বসিয়ে দেওয়া হ’ল কাগজের ঠোঙা বানানোর কাজে। গালিগালাজ আর মার ছিল তার রোজকার পাওনা। দিনের শেষে যখন সে এক টুকরো ভাঙা আয়নার সামনে দাঁড়াত, নিজের কাজল-কালো চোখের দিকে তাকিয়ে সে ভাবত—কেমন হ’ত, যদি দুনিয়াটা তাকে একটু দেখত? কেউ কি কোনদিন তার দিকে মুগ্ধ চোখে তাকাবে না? সবার আকর্ষণের কেন্দ্রে থাকার এক সুপ্ত তৃষ্ণা তার ভিতরে সবসময়ই ছিল।

​বিয়ের পর জীবনে সামান্য থিতু হওয়ার সুযোগ এসেছিল। যমজ সন্তানের মা হওয়ার পর কাজল ভেবেছিল বুঝি তার আঁধার ঘুচল। কিন্তু এক বর্ষার প্রলয়ঙ্করী বন্যা তার সাজানো সংসার তছনছ করে দিয়ে গেল। চোখের সামনে রাক্ষুসে নদী কেড়ে নিল তার স্বামী আর কন্যাসন্তানকে। ঘরবাড়ি সব তলিয়ে গেল, সম্বল রইল কেবল তার ছোট ছেলেটি।

​বন্যার জল নামতেই গ্রামে ভিড় জমল সাংবাদিক, ত্রাণকর্মী আর আলোকচিত্রীদের। চারিদিকে ফ্ল্যাশের ঝলকানি। হঠাৎ কাজল দেখল, অসংখ্য ক্যামেরা আর উৎসুক চোখ আজ কেবল তার দিকেই নিবদ্ধ। শৈশবে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে যে ‘সবার নজরে আসার’ স্বপ্ন সে দেখেছিল, আজ এক বীভৎস বাস্তব হয়ে তা ফিরে এল। কিন্তু এ দৃষ্টিতে ভালবাসা নেই, আছে কেবল প্রদর্শনীর করুণা।

​কাজল কোন কথা বলল না। শুধু ছেলের হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে দাঁড়িয়ে রইল। যে মানুষগুলোকে সে হারিয়েছে, তারা আর ফিরবে না – এটা সে জানে। এখন এই উপহাসের মত ক্যামেরাগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে তাকে শুধু বেঁচে থাকতে হবে—নিজের জন্য নয়, তার শরীরের শেষ চিহ্নটুকু আগলে রাখার জন্য।


লেখক পরিচিতি : বিজুরিকা চক্রবর্তী
বিজুরিকা চক্রবর্তী, কলকাতা দমদমের, বাসিন্দা। সেন্ট জেভিয়ার'স কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পি.এইচ.ডি ডিগ্ৰী পাওয়ার পর বর্তমানে এন.আর.এস মেডিক্যাল কলেজের এম.আর.ইউ ডিপার্টমেন্টে রিসার্চ-সায়েন্টিস্ট হিসেবে কর্মরত। কবিতা লেখা হঠাৎ করে খুঁজে পাওয়া এক জেদী, একরোখা, অবিচ্ছেদ্য বন্ধু। এখনও যেই বন্ধু বেইমানি করেনি। 🙏

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।

মাসিক দীপায়ন প্রতিযোগিতা

মাসিক দীপায়ন পুরস্কার pop up