এবারের জলবায়ু সম্মেলন ও তার পর্যালোচনা

লেখক : শামীম হক মণ্ডল

সম্প্রতি, ২২শে নভেম্বর ব্রাজিলের বেলেম শহরে শেষ হ’ল কনফারেন্স অফ দ্য পার্টিজ (COP 30)। কথা ছিল ২১শে নভেম্বরে শেষ হবে, কিন্তু শেষ দিন ভয়াবহ এক অগ্নিকাণ্ডের কারণে আলোচনার জন্য একদিন সময় আরও বাড়ানো হয়। এই সম্মেলনে রাজনীতিবিদ, জলবায়ু বিজ্ঞানী, পরিবেশ কর্মী, সাংবাদিক এবং আদিবাসী নেতা সহ যোগ দিয়েছিলেন ১৯৫টি দেশের প্রতিনিধিরা। এবারের মূল উদ্দেশ্য ছিল বিশ্ব উষ্ণায়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার কৌশল নিয়ে আলোচনা করা। জাতিসংঘের ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন (ইউএনএফসিসিসি) প্রতি বছরই এই বিষয়ক সেমিনারের আয়োজন করে। মূলত কী কী বিষয়ে আলোচনা হ’ল এবারের সম্মেলনে?

ব্রাজিলের বেলেম শহরটির চারপাশে অরণ্যঘেরা। এমন এক পরিবেশে বিশ্বের নেতৃবৃন্দ, বিজ্ঞানী, পরিবেশকর্মী ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রতিনিধিরা একত্র হয়েছিলেন একঝাঁক সঙ্কটের বোঝা মাথায় নিয়ে। বিশ্ব যে ক্রমেই উত্তপ্ত হচ্ছে, সে কথা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। আগুনের মত তাপদাহ, ভয়ঙ্কর খরা, সমুদ্রের জলরাশির উত্থান, বনাঞ্চলে দাবানলের সংখ্যার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, পশু-পাখি-মানুষ সহ বিভিন্ন প্রাণীর অভিবাসন—এসব যেন প্রতিনিয়ত জানান দিচ্ছে যে আমাদের নীলগ্রহ আর তথাকথিত উন্নতির যন্ত্রণা সইতে পারছে না। আগেকার দিনে, যেসব বিষয় নিয়ে কথা উঠলে মানুষজন ‘ভবিষ্যৎ’ বলে পাশ কাটিয়ে যেত, এখন সেইগুলোই রোজকারের প্রতিবেদন। সেই সমস্যাগুলিকে কীভাবে মোকাবিলা করা যায়, সেটাই ছিল এবারের কপ-৩০ এর কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। 

এবারের সম্মেলনের মূল আকর্ষণ ছিল কীভাবে কার্বন নিঃসরণ কমানো যায় এবং পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির উৎপাদন বৃদ্ধি করা যায়। সেই সাথে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর ক্ষতিপূরণ, আমাদের বাস্তুতন্ত্রের সংরক্ষণ, এবং অভিযোজনজনিত সমস্যা কিভাবে মোকাবিলা করা যায়, সে বিষয়েও আলোকপাত করা হয়। তবে শুধু কার্যক্রম তৈরি করলেই চলবে না, সেগুলোকে বাস্তবে কী করে রূপ দেওয়া যায়, সে ব্যাপারে বিশ্বের বৃহৎ দেশগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। 

এক দশক আগে, প্যারিস সম্মেলনে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল যে একবিংশ শতাব্দীতে, পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ১.৫° সেলসিয়াসের বেশি বাড়বে না, অন্যথায় বিপর্যয় ঘটবে। তবে, সদস্য রাষ্ট্রগুলি তাদের সেই প্রতিশ্রুতি রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের বারংবার সতর্কবার্তা সত্ত্বেও, ধনী দেশগুলির পর্যাপ্ত সহযোগিতার অভাবে সে বিষয়ে কোনও অগ্রগতি হয়নি। অনেকেই সেজন্য কপ-৩০কে বলেছেন, ‘বাস্তবায়নের কপ’। প্রতিশ্রুতির সংখ্যা যত বেড়েছে, কাজের অগ্রগতি ততই কমেছে। উন্নত দেশগুলোর প্রতিশ্রুত অর্থায়ন বহু ক্ষেত্রেই ছিল অসম্পূর্ণ, কালচক্রে বিলম্বিত অথবা নিজস্ব স্বার্থে সংকুচিত। বিশেষত ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো, অর্থাৎ তৃতীয় বিশ্বের গরীব দেশগুলো, যারা উন্নত দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম কার্বন ডাইঅক্সাইড নির্গমন করে, কিন্তু দুর্ভোগ পোহায় সবচেয়ে বেশি, তাঁরা এই সম্মেলন থেকে বারবার ফিরে গেছে খালি হাতেঅন্তত পিছনের অভিজ্ঞতা সেটাই বলে।

সেই কারণেই এবারের আয়োজক দেশ হিসেবে ব্রাজিলের কাছে প্রত‍্যাশা ছিল আকাশছোঁয়া। তিন বছর আগেও তারাই আয়োজক ছিল, সেই সময় থেকেই এই প্রত‍্যাশার জন্ম। এবারের আয়োজক দেশ হিসাবে ব্রাজিল বলেছে যে এই সম্মেলনে কোনও নতুন প্রতিশ্রুতি দেওয়া উচিত নয়। দুই বছর আগে, ২৮ তম COP সম্মেলনে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে দূরে সরে যাওয়ার জন্য দেশগুলি যে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছিল, সেটারই বাস্তবায়ন এখনও হয়নি।

এবারের সম্মেলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল সেই ব্যর্থতার দায়স্বীকার করা। দু’সপ্তাহ ধরে বিভিন্ন আলোচনার পর প্রতিনিধিরা একটা গ্রহণযোগ্য এবং কার্যকরী সমাধানসূত্র দিতে ব্যর্থ হ’লেন। ফসিল ফুয়েল বা জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার ক্রমশ কমিয়ে কমিয়ে শূন্যে নামানোর কোনও ব্যবহারিক কর্মসূচি এবং সময়সীমা নির্দিষ্ট করতে ব্যর্থ হ’লেও আশার কথা হ’ল, জীবাশ্ম জ্বালানির যুগ সমাপ্তির বিষয়টি এবার আলোচনার মূলধারায় এসেছে।

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ১০০ বিলিয়ন ডলার বার্ষিক সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল উন্নত দেশগুলি, কিন্তু তার বিকেন্দ্রীকরণ ও স্বচ্ছ প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বাস্তবে, সেই অর্থপ্রবাহে বিবিধ শর্ত আরোপিত হওয়ায় প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হচ্ছে। তহবিলের বড় অংশই থাকে ঋণ হিসেবে, যা নতুন করে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর ওপর আর্থিক বোঝা বাড়িয়ে দিচ্ছে। কিন্তু এই দায় কি ন্যায়সংগত? তাদের অপরাধ তো ন্যূনতম, অথচ শাস্তি সর্বোচ্চ! আজ উন্নত বিশ্বের ভোগব্যবস্থা যে হারে পরিবেশ ধ্বংস করেছে, সেই ক্ষতের দায় বহন করছে এশিয়া এবং আফ্রিকার গরীব দেশগুলি।

পরিবেশ নিয়ে বিশ্বনেতৃত্ব দ্বিধাবিভক্ত: একদল মনে করেন, ভবিষ্যতের পরিবেশরক্ষায় আমাদের নতুন প্রযুক্তিনির্ভর কার্বন অপসারণ পদ্ধতি দরকার, আবার অন্যদল মনে করেন, মানুষের আচরণ ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা না বদলালে শুধুমাত্র প্রযুক্তির কল্যাণে সমাধান মেলা শক্ত। সোজাকথায় উন্নয়ন ও স্থায়িত্বকে মধ্যে লড়াই চলছে প্রতিনিয়ত। একদিকে মানুষ উন্নয়ন চাইছে, প্রযুক্তির অগ্রগতি চাইছে, অর্থাৎ আরামদায়ক জীবনযাপনের জন্য যা দরকার সবই তার চাই। কিন্তু প্রকৃতির তো একটা সহ‍্যের সীমা আছে! এবারের কপ-৩০কে আমাজনের বনকে প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, শুধু এজন্যই নয় যে এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় কার্বন সিঙ্ক, বরং এই বন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, পৃথিবীর ভারসাম্য প্রকৃতির হাতেই।

তবে শুধু হতাশার হাতছানিই নয়, কিছু আশার আলোর দেখাও মিলেছে এবারে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্যে বেশ কিছু দেশ নতুন করে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছে। সেই সাথে নবায়নযোগ্য শক্তির উৎপাদন তিনগুণ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে বহু রাষ্ট্র সম্মিলিতভাবে। কিছু দেশ তো জীবাশ্ম জ্বালানি-নির্ভরতা কমাতে নির্দিষ্ট সময়সূচি প্রকাশ করেছে, যা অতীতের তুলনায় নিঃসন্দেহে অগ্রগতি। বিশেষত, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলি জানিয়েছে, নতুন শক্তিভিত্তিক রূপান্তরে তারা প্রস্তুত; তাদের অর্থনীতিতে নবায়নযোগ্য শক্তির সম্প্রসারণ ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানির অন্তর্ভুক্তি করণের যে নীতি তারা গ্রহণ করতে চলেছে, তা বৈশ্বিক পরিবর্তনের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু এই রূপান্তর একা একা অসম্ভব নয়—উন্নত প্রযুক্তির বাস্তবায়ন, স্থানান্তর, স্বল্প সুদে নিশ্চিত অর্থের যোগান এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছাড়া উন্নয়নশীল দেশগুলির পক্ষে শক্তি বিপ্লব ঘটানো, অনেকটা সোনার পাথরবাটির মত। কারণ, গত কয়েক দশকের পরিবেশ সম্মেলন, বিশেষ করে কপ-১৫ থেকে কপ-২১ এবং পরবর্তী সময়ে কপ-২৬ ও কপ-২৮ এক কার্যক্রমের দিকে তাকালে আমরা দেখি সিদ্ধান্তগুলো যতই আকর্ষণীয় হোক না কেন, কখনই বাস্তবায়িত করা যায় নি।

এখন বড় কথা হচ্ছে, আগামী দিনের বিশ্বের পরিবেশ কোনদিকে যাবে? 

অনুমান করা হচ্ছে, যদি পূর্বের প্রতিশ্রুতিগুলোর বাস্তবায়ন সম্ভব হয়, তবে সামনের কয়েক বছরের মধ্যে শক্তির চিত্র বদলে যাবে। পরিবেশের উপযোগী কৃষিকাজ, ন্যূনতম কার্বন অপসারণ আগামীর পৃথিবীকে নতুন দিশা দেখাতে পারে। তবে পূর্বের সম্মেলনগুলির মত যদি পারস্পরিক রেষারেষি ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনে যদি বৃহৎ শক্তিগুলো ব‍্যস্ত হয়ে পড়ে, তাহলে ঘোর বিপদ আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। মনে রাখা দরকার, পরিবেশের ভারসাম্য আজ বিপন্ন, যে কোন সময় ক্রমাগত বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে পারি আমরা। এর থেকে মুক্তি পেতে হ’লে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে যেতে হবে, মূল‍্যায়ন ও পর্যালোচনার জন্য পরে অনেক সময় পাওয়া যাবে।


লেখক পরিচিতি : শামীম হক মণ্ডল
নিবন্ধকার পশ্চিমবঙ্গ বিচার সহায়ক পরীক্ষাগারের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে কর্মরত এবং আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার অ্যাস্ট্রোফিজিক্সের ভূতপূর্ব গবেষক।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।

মাসিক দীপায়ন প্রতিযোগিতা

মাসিক দীপায়ন পুরস্কার pop up