লেখক : শংকর বিশ্বাস
লতা আনমনে বাড়ির পাশ দিয়ে হেঁটে এল গাছ-গাছালির মধ্যে। সুনীল ঘরের পিছনে ফাঁকা দশ ফিট জায়গাটায় বানিয়েছে সবজি-ক্ষেত, বেগুন, লংকা আর ঢেঁড়সের বাগান। নিজের হাতে যত্ন করে বানান। অবশ্য লতা সাথে থেকেছে, রোজ তাদের গোড়ায় জল ঢালার কাজটা লতাই করে। কত বেগুন, ঢেঁড়স আর লঙ্কা হয়েছে গাছগুলোতে। আজকাল মাঝেমাঝে নিজের ক্ষেতের সবজিই রান্না করে লতা।
“কি সুন্দর স্বাদ হয়েছে রে লতা। টাটকা সবজি আর তোর হাতের রান্না – স্বাদ তো হবেই”, বলে সুনীল।
জলের ক্যানালের পাড় বরাবর জবরদখলের এই জমিতে সার বেঁধে ছোট ছোট ঘর, সকলের ভাগে পড়েছে ওই ফুট পনের চওড়া জমি। একটা ঘর, তার পিছনে রান্নাঘর আর বাথরুম। সবটাই টিনের করোগেটেড সিট দিয়ে ঢাকা, দেয়াল, ছাদ সবকিছু, মেঝেটা মাটির।
ঘরের পেছনে ফুট দশকের মত ফাঁকা জায়গাতে বাগান। চারিধারের বাউণ্ডারি ঘেরা বেড়া গাছ দিয়ে। তার এক ফুট দূরে ক্যানাল, যেখানে বয়ে চলেছে আশেপাশের এলাকার জল। হ্যাঁ, মশার উপদ্রবটা একটু বেশি। তবে জল এখানে বহতা, স্থির থাকে না, তাই মশা অত তৈরি হয় না। তাছাড়া মিউনিসিপ্যালিটির বাবুরা মাঝেমাঝে এসে কি সব কেমিক্যাল ছড়িয়ে যায়। লতা কখনও এসে দাঁড়ায় বেড়ার পাশে, তাকায় দূরে। বাগানের একটা কোণা দিয়ে দেখা যায় সূর্য ডোবা, শীতল হাওয়া ভেসে আসে দখিন কোণ থেকে, রোদের আলো নরম হতে হতে মিলিয়ে যায় একসময়, অন্ধকার নেমে আসে চুপিসাড়ে।
বিকেল শেষে সুনীল এই সময়টায় তার রিক্সা নিয়ে আসে একবার বউয়ের পাশে বসে সুখ-দুঃখের দু’-চার কথা বলতে, একটু বিশ্রাম নিতে। ক’দিনই বা বিয়ে হয়েছে, মাস ছয়েক হবে। দুজনে স্বপ্ন দেখে আরো উজ্জ্বল ভবিষ্যতের।
“পচাদার অটোটা চালানো শিখছি মাঝে মাঝে। একটু হাত পাকলেই পচাদা বলেছে লাইসেন্সের ব্যবস্থা করে দেবে। হাজার খানেক টাকা অবশ্য দিতে হবে, তাড়াতাড়ি ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে। আর মাস দুয়েকের মধ্যে জমে যাবে টাকাটা, তার মধ্যে গাড়ি চালানোটা আরেকটু ভাল করে শিখে ফেলতে হবে।”
লতা স্বপ্ন দেখে আরেকটু ভাল থাকার, মাটির মেঝেটা সিমেণ্টে বাঁধিয়ে নেবার। তারপর সংসারও বড় হবে।
এইসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে বেগুন তুলছিল লতা। সাধারণত অন্ধকার নামার আগে ও আসে বাগানে। আজ তরকারির ঝুড়িতে কিচ্ছুটি নেই, সুনীলকে বলেছিল কিছু সবজি কিনে আনতে, ভুলে গেছে ও। হঠাৎ পায়ে দাঁত ফোটার তীব্র ব্যথা, নিচে তাকিয়ে দেখল কালো সাপটাকে, এঁকেবেঁকে দ্রুত চলে গেল বেড়ার ফাঁক-ফোকর দিয়ে ক্যানালের জলের দিকে।
“সুনীঈঈঈল”, চিৎকার করে লতা দৌড়ে এল ঘরের দেয়ালের পাশে। দেয়াল ধরে আবার ডাকল মরণ ডাক। ঘর থেকে ত্রস্ত পায় বেরিয়ে এল সুনীল।
“সাপ”, বলে সুনীলের গায়ে লতার শরীরটা এলিয়ে গেল।
এক মুহূর্তের জন্য ভাবল সুনীল, তাদের দুজনের এত স্বপ্ন দেখা কি বিফলে যাবে?
“ভাবিস না বউ, তোকে আমি মরতে দেব না”, লতার দেহটা হাতে তুলে দৌড়ে বেরোল সুনীল। পচাদাকে ফোন করল অটো নিয়ে তাড়াতাড়ি আসতে। হাসপাতালে অটো করে যেতে বেশি সময় লাগবে না। “তোকে আমি বাঁচাবই,” উদ্বেগভরা স্বরে চেঁচিয়ে উঠল সুনীল।
আর অপেক্ষা করতে পারল না, লতার অজ্ঞান শরীরটাকে কাঁধে নিয়ে দৌড়ল মেইন রাস্তার দিকে।
লেখক পরিচিতি : শংকর বিশ্বাস
was an engineer earlier, nowadays - writing stories

