লেখক : সমাদৃত দাস
আজ বিকেলটা কেমন যেন লাগছে উৎপলের। জীবনের বার্ধক্য বয়সে এসে মহানগরীর এই বিকেল যেন তার মতই মনে হয়। কেমন যেন ধোঁয়া ধোঁয়া! সূর্য যেন সারাদিন সবটুকু উজাড় করে এবার গন্তব্যে ফিরতে চাইছে। আজকাল বিকেল এলেই উৎপল বড্ড স্মৃতিকাতর হয়ে যায়। সেই পুরনো দিনের কথাগুলো বড্ড মনে পড়ে যায়। আর তখন ঘরে থাকতে মন চায় না! বাইরের ফুরফুরে হাওয়া যদি তার একমুঠো তৃষ্ণা মেটাতে পারে, এই আশায় আজও বাজারের পথ ধরে হাঁটছিল। হাঁটার গতি বড্ড স্মিয়মান। নিভে যাওয়া জোনাকির আলোর মতই! সূর্যটা আস্তে ঢলে পড়ছে পশ্চিমে। গাড়িগুলো হুসহাস করে বেরিয়ে যাচ্ছে। সকলেই একটা গন্তব্য খুঁজছে! গন্তব্যের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু উৎপলের কোন গন্তব্য নেই। শুধু এগিয়ে চলেছে তো চলেছেই! এ পথ যদি শেষ না হত, তাহলে কত ভালই না হত! এসব ভাবতে ভাবতে মুখোমুখি হয়ে গেল সৌরভের সঙ্গে। ক্ষণিকের জন্য দু’জনই বিস্মিত হ’ল। সঙ্গে সঙ্গে মুখ ঘুরিয়ে নিল সৌরভ! অনেকটা না চেনার ভঙ্গিতেই। সৌরভ মুখ ঘুরিয়ে নেওয়ায় উৎপল সামান্য ইতস্তত বোধ করলেও কিঞ্চিৎ সংশয় জাগল ওর মনে। সৌরভ কি ইচ্ছে করেই এমন করছে? নাকি ভুল করছে? দীর্ঘ আটত্রিশ বছর পর সৌরভের চেহারাতেও যে বার্ধক্যের ছাপ পড়েছে, তা বুঝতে পারল উৎপল। আসলে বার্ধক্য আর মৃত্যু সমার্থক! মৃত্যু যেমন ধ্রুব সত্য, বার্ধক্যও তাই! তবে উৎপলের চিনতে ভুল হয়নি।
কাছাকাছি আসতেই সটান জিজ্ঞেস করল, “সৌরভ ভাল আছিস?”
আচমকা উৎপলের এ হেন প্রশ্নে ভ্যাবাচ্যাকা খেল সৌরভ। বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল। আবার জিজ্ঞেস করল, “ভাল আছিস? আমায় চিনতে পারছিস না? আমি উৎপল রে! উৎপল!”
এক প্রকার বাধ্য হয়েই মুখ খুলল সৌরভ। “হ্যাঁ, রে তোকে চিনতে পেরেছি। কতদিন পর দেখা। তুই ভাল আছিস?”
সৌরভের প্রশ্নের জবাবে স্মিত হাসল উৎপল। সেই খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি, কদমছাঁট চুল, কপালের মাঝে একটা শীর্ণকায় ছেদ! না, বার্ধক্য খানিকটা চেপে বসলেও উৎপলের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। “তুই মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছিলি কেন? কত বছর পর দেখা।” উৎপল বলল।
এই প্রশ্নের কোনো জবাব দিল না সৌরভ। চোয়াল শক্ত করল। সৌরভের মুখচোখ দেখে মনে হচ্ছে এখনও যেন সে চিনতে পারেনি!
“তুই বোধহয় খুশি হোস নি!” একপ্রকার বাধ্য হয়েই কথাটা বলল উৎপল।
এবার সৌরভ বলল, “আমি খুশি হই বা না হই, তাতে তোর কী? কিন্তু তোর হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে তুই যেন বেশিই খুশি হয়েছিস।”
উৎপল বলল, “তা খুশি হব না? এতদিন পর তোর সাথে দেখা! এক সময়ের গলায়-গলায় বন্ধুত্ব, আজ ভুলে গেলি?”
সৌরভ এবার বেশ গজগজ করে বলল, “তোর বন্ধুত্বকে গুলি মার! শালা, এত বছর পর বন্ধুত্ব দেখাচ্ছিস? দরকার নেই এমন বন্ধুত্বের।” বলে চার অক্ষরের একটা গালি দিয়ে উৎপলকে পেছনে ফেলে এগিয়ে গেল।
হঠাৎই উৎপল বলল, “কিন্তু, কাজরীর সঙ্গে বন্ধুত্বও কি দরকার হারাল?”
একটা তীব্র ভূমিকম্পের মত ঝাঁকুনি দিল সৌরভের শরীরে। হঠাৎ করে কাজরীর প্রসঙ্গটা একেবারেই ভাল লাগল না ওর। ঘুরে দাঁড়াল উৎপলের মুখের দিকে। বলল, “আবার কাজরীর প্রসঙ্গ এখন আসছে কেন? তুই তো খুব ভালো করে জানিস যে ওর সঙ্গে আমার কোন শারীরিক বা মানসিক সম্পর্ক নেই। শুধু কাজরীর সঙ্গে কেন, কোনো মেয়ের সঙ্গেই কোন সম্পর্ক নেই। এখন বার্ধক্য গিলছে আমায়!” কথাগুলো যেন প্রতিধ্বনিত হলো কলকাতার আকাশে-বাতাসে। আকাশটা বর্ষার মত গোমড়া হ’ল যেন!
“আমি জানি তোর সঙ্গে ওর কোন সম্পর্ক নেই। কাজরী এখন আমার স্ত্রী। কিন্তু কোন একদিন তো সম্পর্ক ছিল!”
সৌরভ সত্যিই বেশ ক্ষুব্ধ হ’ল উৎপলের কথায়। বৈশাখ মাসের প্রখর গরম যেন বসেছে ওর শরীরে। “আজ কাজরীর প্রসঙ্গ আসছে কেন? তোর সঠিক উদ্দেশ্যটা ঠিক কী বলত? আমি চললাম।”
দু-পা ফেলতেই উৎপল বলে উঠল, “আসলে একটা কথা বলার ছিল। কাজরী খুব অসুস্থ রে! যখন তখন যা কিছু হয়ে যেতে পারে।”
এবার সত্যিই সৌরভ থমকাল! বর্ষার ঘন-কালো মেঘে ছেয়ে গেল সৌরভের মুখমণ্ডল। এ যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত! “কী হয়েছে ওর?” কপালে চিন্তার ভাঁজ সৌরভের।
“আসলে কাজু শরীরের থেকেও মানসিক কষ্টে ভুগছে। থেকে থেকেই কেমন যেন আনমনা হয়ে যায়! সারাদিন আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। তুই একবার দেখা করতে আসবি কাজুর সঙ্গে? সময় করে একদিন আয় না বাড়িতে। যে কোনদিন, যে কোন সময়ে।”
উৎপলের কথা শুনে হকচকিয়ে গেল সৌরভ। “কেন? আমি কি ডাক্তার? তুই ভালো সাইক্রিয়াটিস্ট দেখা। আমি তো সাইক্রিয়াটিস্ট বা মনোবিদ নই। দেখবি সঠিক চিকিৎসা হলেই সুস্থ হয়ে যাবে।”
“তবুও পারলে আয় না! আমারও শরীর খুব একটা ভাল নেই। হার্টে মেজর অপারেশন হয়েছে, পেসমেকার বসাতে হয়েছে। কবে চলে যাব, পারলে একবার আয়।”
আর থাকতে পারল না সৌরভ। দ্রুত গতিতে এগোতে লাগল। আস্তে আস্তে ব্যস্ত রাস্তায় মিশে যেতে লাগল ওর শরীর।
পূর্ণিমার চাঁদের আড়ালে হারিয়ে গেল সৌরভ।
পরদিন সকালে উৎপলের বাসভবনের সামনে এসে দাঁড়াল সৌরভ। সবার আগে বাড়িটার দিকে চোখ গেল ওর। সেই বাড়িটা! কত স্মৃতি মিশে আছে ওর জীবনের সঙ্গে। এক সময় প্রতিদিন দু’বেলা না এলে মনটা কেমন শুকিয়ে যেত। না, বাড়িটা একটু বদলায়নি। একইভাবে ইমারতের মতো দাঁড়িয়ে আজও। যেন হাত নাড়ছে ওর দিকে! বাড়িটা যেন আজও উজ্জ্বল!
সৌরভ সরাসরি এসে দাঁড়াল দোতলায়। সেই সিঁড়ি! সেই ব্যালকনি। একবার করে স্মৃতি রোমন্থন করল সৌরভ। গাড়িবারান্দায় উঠে কাউকে দেখতে না পেয়ে থমকাল। একটু এগিয়ে যেতে, একটা মেয়ে। বয়স মেরেকেটে দশ বছর হবে! রঙচঙে জামা পড়ে মোবাইল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে হাসছে। মেয়েটার প্রাণবন্ত হাসিটা সৌরভের মন কেড়ে নিল। এইভাবে এখন কেউ হাসে না। সবাই মুখোশের আড়ালে হাসে। মেয়েটা চোখ তুলে তাকাল সৌরভের দিকে। প্রথমটা ঠিক কী বলবে, বুঝতে না পারলেও একগাল হেসে বলল,”আঙ্কেল, কার সঙ্গে দেখা করবেন?”
সৌরভ বলল, “তোমার মায়ের সঙ্গে। বাবা এখন আছেন?”
মেয়েটা ভ্রু কুঁচকে বলল, “না, বাবা তো নেই। দাঁড়ান, মাকে ডেকে দিচ্ছি।”
কথাটা পুরো শেষ করতে না করতেই মেয়েটা ছুট্টে এগিয়ে গেল। বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হ’ল না। কাজরীকে হুইল চেয়ারে টানতে টানতে নিয়ে এলো মেয়েটা। মায়ের থেকেও মেয়ের মুখে ঝিলিক হাসি খেলছে।
কাজরীর সঙ্গে অনেকক্ষণ চোখ চাওয়া-চাওয়ি হ’ল সৌরভের। মৌনতা ভাঙল কাজরী। “আমি জানতাম তুমি আসবেই! তোমাকে আসতে হতই। জীবনের শেষ বয়সে এটাই হয়ত শেষ দেখা হয়ে থাকবে আজীবন!”
“এরকম বলো না কাজরী, খুব কষ্ট হয়। আমি চাই না আমাকে ঘিরে নতুন করে অশান্তি হোক, সেইজন্যই আসিনি আমি। তা ছাড়া তোমার ফুটফুটে একটা কন্যা সন্তান আছে। আমি চাই না যে তারও কোন অসুবিধা হোক।”
কাজরী এক চিলতে হাসি হাসল। সে হাসিটা নকল! জোর করে আনতে হয়। পরিস্থিতি ঠেকাবার জন্য সৌরভ জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে তোমার? মন খারাপ কেন? ডাক্তার দেখাওনি?”
আবারও হেসে উঠল কাজরী। “সব অসুখ কি ডাক্তারে সারাতে পারে? কয়েকটা পথ্য কি মনের খোরাক মেটাতে পারে?”
“তা উৎপল কোথায়? ও নেই?”
“না! ও নেই। আমাকে ছেড়ে বহুদূরে চলে গেছে।”
“কেন?”
“আমাকে তার আর ভাল লাগে না। আমিই তাকে সঠিকভাবে ভালবাসতে পারিনি। এই অভিপ্রায়ে অন্য সংসার বেঁধেছে।”
“অ্যাঁ! কী বলছ তুমি? কিন্তু কালকেই তো উৎপলের সঙ্গে দেখা হ’ল।”
“আসলে আমিই বলেছিলাম সৌরভের সঙ্গে দেখা হলে, ওকে পাঠিও। যতই হোক, এক সময়ের মনের সঙ্গী ছিল কিনা!”
“তা উৎপল কিছু বলেনি?”
“উৎপল, সে কী বলবে? সে অনুপমার কাছে চলে গেছে।”
“কিন্তু ডিভোর্স!”
“কী দরকার ঝামেলার? শেষ বয়সে ও ভাল থাকুক, আমিও। এটাই তো চাই। সংসারের দেখভালটুকু করুক। নাই বা আমার কাছে থাকল!”
“তুমিই তো বেছে নিয়েছিলে উৎপলকে!”
“হ্যাঁ, বড় ভুল করেছিলাম। আসলে বয়স বাড়ার সাথে সাথে মুখোশগুলো খসে পড়ে। আমি মানুষ চিনতে পারিনি। তাই তো ওকেই জীবনসঙ্গী করেছিলাম। তবে আমার অনুরোধ, তুমি এস। শেষ বয়সে আমার পাশে থেকো। মেয়েটাকে দেখো।”
“কিন্তু, মেয়েটা তো উৎপলের!”
“হয়ত। ও তো অনুপমার ছেলেকেই নিজের ছেলে হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ওই সমাজকে সামনে রেখে দায়বদ্ধতা পালন করে।”
আর বলতে পারল না, চোখ দিয়ে জলের ধরা বইতে শুরু করল। মায়ের কান্না দেখে মেয়েটাও হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করল। “কাঁদিস না! এটাই জানবি সত্যি। আমি হয়ত খুব বেশিদিন বাঁচব না। কিন্তু জানবি মাথার ওপর সৌরভ আছে। খাতায় কলমে উৎপল থাকলেও তোর আগামীর বাবা ইনিই!”
সৌরভ কাজরীর পিছনে ওর পিঠে আলতো করে হাত দিল। সৌরভের বুকে মাথা রাখল কাজরী। কিছুক্ষণ এইভাবে থাকার পর আস্তে আস্তে হুইল চেয়ারটা ঠেলতে ঠেলতে ঘরে নিয়ে গেল মেয়েটা।
অদূরে শোনা গেল “ও জীবন তোমার সাথে কাটাব রূপকথাতে”।
লেখক পরিচিতি : সমাদৃত দাস
লেখক, ছড়াকার, কবি এবং সম্পাদক সমাদৃত দাস এর জন্ম ২০১০ সালের ২৬ শে আগস্ট মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুর শহরে। ছোট্ট থেকেই বই পড়ার উদ্দীপনা তাঁর মনে জাগে। বই পড়তে পড়তেই লেখালেখির দিকে আগ্রহের বহিঃপ্রকাশ। তাঁর প্রথম প্রকাশিত ছোটগল্প শারদীয় উড়োজাহাজ ১৪৩০ এ প্রকাশ পায়, নাম "দাদার গুপ্তধন"। এছাড়া আরও বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য গল্পের নাম হল, "দীপর বিলের সন্নিকটে","স্বপ্নের থিওপানি জয়", "তনুর জীবনের লক্ষ্য", "জন্মদিনের উপহার" "সুজয়ের নতুন স্কুল" ইত্যাদি। তাঁর প্রথম সম্পাদিত সংকলন "শৈলজা"। তাঁর লেখা প্রথম একক বই "অর্ধেক আকাশ" প্রকাশিত হয়েছে এই কলকাতা বইমেলায় সকল গুণীজনের হাত ধরে। লেখক বর্তমানে স্কুল পড়ুয়া ছাত্র।

