লেখক : মধুমিতা ঘোষ
এখানে পাহাড়েরা নিজেদের সঙ্গে কথা বলে। রোজকার চেনা শব্দ ছকের বাইরে গাছের পাতাদের ফিসফিসানি, ঝর্ণার তিরতির করে বয়ে চলা শব্দ আর পাখির বিচিত্র কূজন ঘুম ভাঙাবে। গাছ মিছিল আর প্রকৃতির খামখেয়ালিপনাকে সঙ্গী করে এসেছি পালমাজুয়া। ঘন কালো মেঘ, তারপরই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি। চারিদিকে তাকিয়ে মনে হবে চেরাপুঞ্জির বৃষ্টি বুঝি আমাজনের জঙ্গলে এসে পড়ছে। আবার কিছুক্ষণ পরেই নীল আকাশ খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে। চিকন রোদ্দুর তখন গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে নক্সা কেটে দেয় সারা শরীরে।
সিংগালিলা জঙ্গল রেঞ্জ মানেই দেওদার-পাইন-ফার-বার্চ প্রভৃতি সুদীর্ঘ বৃক্ষের সারি। ঠিক যেন নৈশপ্রহরীর মত দাঁড়িয়ে আছে। নিউ জলপাইগুড়ি থেকে গাড়ি নিয়ে ঘুম, মানেভঞ্জন, ধোতরে পেরিয়ে চলেছি পালমাজুয়ার উদ্দেশ্যে। যে শহুরে শব্দমালায় আমরা অভ্যস্ত, তা এখানে নেই। রাস্তার ধারে অর্কিড, গোলাপ আর নাম-না-জানা রঙবাহারি ফুলের মেলা। মাঝে মাঝেই চোখে পড়ছে হোমস্টে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর জায়গাগুলো।
পালমাজুয়ায় পৌঁছলাম বিকেল নাগাদ। অস্তগামী সূর্যের আভা তখন চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। পাখিদের কলকাকলি জানান দিচ্ছে ঘরে ফেরার সময় হয়েছে।
এক দেখাতেই সিংগালিলা জঙ্গল লজটা দেখে ভালবেসে ফেললাম। পাহাড়ের ওপরে এক অপূর্ব প্রাকৃতিক পরিবেশে নিঃসঙ্গ এই জঙ্গল লজ। কটেজে ওঠার রাস্তায় নানা রঙের ফুল আপনাকে অভিবাদন জানাবে। ঝর্ণার কুলকুল আওয়াজ অনুসরণ করেও তার খোঁজ পাওয়া যাবে না। অথচ সারা দিন-রাত আবহ সঙ্গীতের মত সেই সুর কানে বাজবে।
ক্যালেণ্ডার দেখেই পূর্ণিমার দিনে জঙ্গলের রূপ দেখব বলে বেরিয়েছিলাম। হাতে মাত্র দু’রাত আর আড়াই দিন সময়। সন্ধ্যেবেলায় আকাশের মুখ ভার দেখে ভাবলাম বনজ্যোৎস্নার রূপ দেখা বুঝি কপালে নেই। মে মাসের শেষ সপ্তাহ। কিন্তু এখানে গরম নেই। কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়েই পড়লাম। মাঝরাতে নিশির ডাকের মত মায়াবী জ্যোৎস্নার হাতছানিতে ঘুম ভেঙে গেল। উঃ, সে কী দৃশ্য! গাছের জাফরি চুঁইয়ে চাঁদের ফ্লুইড গড়িয়ে আলোছায়া মাখা গাছগুলো ঝিরিঝিরি বাতাসে যেন আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। প্রতিদিনের চেনা রাত্রি কী এক অদ্ভুত জাদুকাঠির ছোঁয়ায় হয়ে গেল রহস্যময় যামিনী।
পরের দিন সকালে গাড়ি নিয়ে চললাম রিম্বিক। দূরত্ব বেশি নয়। পঞ্চাশ মিনিটের জার্নি। রিম্বিক একটা ছোট গ্রাম। ছোট অথচ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের বাজারও রয়েছে। এখান থেকে শ্রীখোলার দূরত্ব চার কিলোমিটার। অসম্ভব সুন্দর জায়গা। পাকা রাস্তা এখানেই শেষ।এরপর থেকে শুরু ট্রেকিং পথ। চারিদিক সবুজ পাহাড় দিয়ে ঘেরা, ওপরে কাঠের একটা বহু পুরনো ঝুলন্ত ব্রিজ। নীচ দিয়ে বয়ে চলেছে শ্রীখোলা নদী। ছোট বড় পাথরের ওপার থেকে মিছরির দানার মত জলবিন্দু পাথর ছুঁয়ে ছুঁয়ে এগিয়ে চলেছে। নদীর শব্দ ছাড়া আর কিছুই কানে আসে না।
সিংগালিলা জঙ্গল লজে ফেরার সময় কয়েকজন লেপচা বাচ্চা একগাল হাসিমুখ নিয়ে গাড়ি থামাল। সবুজ বনানীর মুগ্ধতা থেকে চোখ সরিয়ে ওদের দিকে তাকালাম। কী নিষ্পাপ সরল দৃষ্টি। স্কুলফেরত বাচ্চাগুলোকে ওদের নির্দেশিত জায়গায় নামিয়ে দিলাম। ব্যাগের মধ্যে থাকা চকোলেট দিলাম। থ্যাঙ্কুর বদলে অনাবিল হাসি দিয়েই ওদের খুশিটা জানান দিল।
এখানে দু’টো রাত কাটালাম। ঘুম ভেঙে দূষণে অভ্যস্ত চোখে ভোররাতের আকাশে লাখ লাখ তারা দেখে অবাক লাগবে।
পরের দিন পায়ে পায়ে হেঁটে সকালে ঝর্ণার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। বহুদূর পর্যন্ত জনমানবশূন্য রাস্তা। যারা নির্জনতা পছন্দ করেন, তাদের জন্য আদর্শ জায়গা হল পালমাজুয়া। গাছের শ্বাস-প্রশ্বাসও এখানে অনুভব করবেন। অন্তত একটা পূর্ণিমার রাত এখানে কাটিয়ে দেখুন, জীবনে অনেক কিছু না পাওয়ার বেদনা মুছে যাবে।
স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানলাম, এখানকার জঙ্গলে ব্লাক প্যান্থার, রেড পাণ্ডা, জংলী খরগো, হরিণ আছে। তবে কপাল খুব ভাল না হলে দেখা পাওয়া ভার। তবে বিচিত্র ও বিভিন্ন পাখি দেখতে পাবেন ।
প্রকৃতির আপন দেশে দিব্যি দু’দিন কাটিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। পিছনে পড়ে রইল প্রকৃতির অপরূপ রূপ লাবণ্যে ভরা অনাঘ্রাতা এক পাহাড়ি গ্রাম। আর আমরা ফিরে চললাম কংক্রিটের জঙ্গলে।
লেখক পরিচিতি : মধুমিতা ঘোষ
পেশায় স্কুল শিক্ষিকা। বই পড়তে,বাগান করতে,গান শুনতে খুব ভালবাসি। বেড়াতেও খুব ভালবাসি।জঙ্গল আমার প্রিয়।গল্প লিখি।অনেক গল্প বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।

