লেখক : লোপামুদ্রা সিংহ দেব
“নিজের কোন ছিরিছাঁদ নেই, তুমি করবে ছেলে মানুষ? আজ থেকে সুমন আমার ঘরে থাকবে।”
“কিন্তু মা, ওর তো একমাসও হয়নি, এখন কি করে?”
“আমি যা বলেছি বৌমা, তাই হবে। আমার ঘরে গিয়ে ওকে খাইয়ে আসবে। আর তোমার কোন দরকার নেই।”
বিধান শুনিয়ে দিয়ে নাতিকে নিয়ে চলে গেলেন সুরমাদেবী।
দোষের মধ্যে আজ দুপুরে একটু ঘুমিয়ে পড়েছিল শান্তা। ঘুমের আর কী দোষ, সারারাত ছেলেকে কোলে নিয়ে বসে থাকতে হয়। সে কোলেই ঘুমোবে। রাতে সুজনকে বলতে গিয়ে ধমক খেল। “মা’র নামে কোন কথা শুনতে চাইনা।”
দিন কাটছিল এভাবেই।
বেশ বুঝতে পারছিল শান্তা, শাশুড়ির অত্যধিক প্রশ্রয়েই সুমন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কিছু বলার উপায় নেই। একদিন অবাধ্যতা করায় শাসন করেছিল বলে শাশুড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে বলেছিল।
ছেলেকে কাছে না পাওয়ার কষ্ট, প্রতি মুহূর্তে অপমান আর মানসিক অত্যাচারে বিধ্বস্ত শান্তা সেইদিনই এক কাপড়ে ঘর ছাড়ল। মা বললেন, “তোকে আর যেতে হবে না ওখানে।”
মা’র প্রাইমারি স্কুলের চাকরি আর তার টিউশনের টাকাতে চলেও যাচ্ছিল। সুজন দুবার এসেছিল বলেছিল, “তুমি বাড়িতে না থাকলে খুব অসুবিধা হচ্ছে। রান্নার লোক পাচ্ছিনা।”
“যেতে পারি এক শর্তে, আমার ছেলেকে আমার কাছে থাকতে দিতে হবে।”
“আমাদের বংশের প্রদীপকে তোমার হাতে ছেড়ে দিতে মা রাজি নন, সে তো তুমি জানই। এখনও ভেবে দেখো, এরপরে তোমার জন্য আমাদের বাড়ির দরজা কিন্তু বন্ধ হয়ে যাবে।”
“যে বাড়িতে আমার কোন মর্যাদা নেই, রাঁধুনী আর শয্যাসঙ্গিনী ছাড়া কোন অধিকার নেই, সে বাড়িতে আমিও ফিরতেও চাই না।”
“কি ভেবেছ তুমি? তোমার অহঙ্কার আমি ভাঙব। আমার পয়সায় খাবে, পরবে, আর আমাকেই মেজাজ দেখাবে?”
ক’দিন পরই ডিভোর্সের নোটিশ এল। সুজনের বিয়ের খবরও কানে এল।
বি.এডটা করে নেবার পর পরই মালদার একটা স্কুলে চাকরিটা পেয়ে গেল শান্তা। বেঁচে থাকার লড়াইটা কিছুটা সহজ হ’ল। এর মধ্যে মা’কে নিয়ে এসেছে মালদায়। বলেছে, “এবার তুমি বিশ্রাম নাও।”
দিন কেটে যাচ্ছে তার নিজের ছন্দে। মাঝে মাঝে অবাধ্য চোখের জল দুকুল ছাপায়। কতদিন ছেলেটাকে দেখেনি সে। ছোট্টবেলার একটা ফটোই তো সম্বল। সময় তো বহমান। নদীর স্রোতের মত সে বয়ে যায়। তেরটা বছর কিভাবে কেটে গেল ভেবে পায় না শান্তা। আজ সুমনের জন্মদিন। ১৬ বছর বয়স হ’ল ছেলেটার। খুব জানতে ইচ্ছে করে কি পড়ছে? কেমন দেখতে হয়েছে? মা’কে কি একটুও মনে পড়ে না তার?
অফ পিরিয়ডে খাতা দেখছিল, হঠাৎ দারোয়ান এসে জানাল বড়দি ডাকছেন। হেডমিস্ট্রেসের রুমে সুজনকে আবিষ্কার করল শান্তা। বেরিয়ে যেতে যেতে বড়দি বললেন, “তোমরা কথা বলো।”
সুজন বলল, “শান্তা, আমার অন্যায় হয়ে গেছে, ক্ষমা করো। তোমার ছেলের আজ তোমাকে বড় দরকার, ও বিপথে চলে গেছে। নেশা ধরেছে। একমাত্র তুমিই পারো ওকে বাঁচাতে। পয়সা না দিতে পারায় ড্রাগ দেয়নি। তাই তাকে মেরে মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে। পুলিশ কেস হয়ে গেছে―ও এখন জেলে।”
“কেন, তোমার বউ?”
“সে তো একবছরের মধ্যেই ডিভোর্স দিয়ে চলে গেছে। মা-র পক্ষাঘাত হয়েছে। তুমিই পারবে সংসারটাকে সামলাতে।”
হাসি পায় সুজনের কথা শুনে। তবু ভাবে, ছেলেটা তো তারই – তাকে সুস্থ করে তোলার দায়িত্বও তার। তাই বলে, “সুমনকে আমি আমার বাড়িতে, আমার সাথে রাখব, তাকে ভাল করার দায়িত্বও আমার। কিন্তু সেখানে তোমার আর সুরমাদেবীর ছায়া পড়তে দেব না। এই শর্তে রাজি থাকলে আমি নিজে ওকে জেল থেকে ছাড়িয়ে আনব। ওকে নষ্ট হয়ে যেতে দেব না।”
বড়দির কাছে ক’দিন ছুটির কথা বলতে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যায় শান্তা।
লেখক পরিচিতি : লোপামুদ্রা সিংহ দেব
প্রবাসি বাঙ্গালি। বিভিন্য পত্র পত্রিকায় গল্প, প্রবন্ধ , কবিতা প্রকাশিত হয় । আঁধার পেরিয়ে (ছোটো গল্পের) প্রকাশিত বই। প্রাপ্তি -'স্বর্ণ কলম' 'অনুরত্ন' ও মানব মুখার্জি স্মৃতি সম্মাননা (from KIMFF ) মধুসূদন দত্ত সম্মাননা (from Mukta Balaka)

