লেখক : শিবাশিস মুখার্জী
আজ আবার লিখতে বসি—একই টেবিল, একই জানালার আলো, একই শব্দের ভিতর ঢুকে পড়া এক টুকরো সময়। বাইরে ৩রা জানুয়ারির পূর্ণিমা ধীরে ধীরে নিজের উপস্থিতি জানাচ্ছে। ফ্ল্যাটের নিচে মন্দিরে ঘণ্টা আর কাঁসরের শব্দ ভেসে আসছে—ধাতব, অনড়, বহু পুরনো। এই শব্দগুলো যেন সময়ের মতই; প্রতিদিন আসে, প্রতিদিন যায়, কিন্তু কিছুই বদলায় না। অথবা হয়ত বদলায়—আমরা শুধু বুঝতে শিখিনি।
আমি নিজেকে জিজ্ঞেস করি—এই আচার, এই পুনরাবৃত্ত ধ্বনি, এই পূর্ণিমার আলো—এগুলো কি সত্যিই আমাদের ভিতরে কোন রূপান্তর ঘটায়? না কি আমরা বদলানোর ভান করি, অথচ ভিতরে ভিতরে একই থাকি? আমার মনে হয়, পরিবর্তন কোন উৎসবের মত হঠাৎ আসে না। সে আসে ক্ষয়ের মত—ধীরে, নীরবে, প্রায় অদৃশ্যভাবে। আর তাই আমরা বুঝতে পারি না কখন বদলে গিয়েছি, কখনও বা বুঝিই না যে বদলাইনি।
আজ ছুটি। ছুটির দিন মানেই বাইরের দায়িত্বগুলো কিছুক্ষণের জন্য সরে যায়। তখন সামনে আসে সেই মুখ—যেটা প্রতিদিন আয়নায় দেখা যায় না। আমি রোজকার মত আজও লিখতে বসেছি। লেখা আমার কাছে অভ্যাস নয়, একধরণের প্রয়োজন। যেমন কেউ কেউ সকালে উঠে হাঁটে, কেউ কেউ প্রার্থনা করে—আমি লিখি। কখনও কবিতা, কখনও ইতিহাস, কখনও বাইরের জগতের চলমান ভাঙাচোরা দৃশ্য। লেখা আমার কাছে খবরের কাগজ নয়; লেখা আমার কাছে সময়ের বিরূদ্ধে একটুখানি সাক্ষ্য।
ইতিহাস লিখতে লিখতে আমি বুঝেছি—মানুষের সবচেয়ে বড় ভ্রান্তি হ’ল, সে ভাবে সময় এগিয়ে যায়। আসলে সময় ঘোরে। একই প্রশ্ন, একই ভয়, একই লোভ, একই ভালবাসা—শুধু পোশাক পাল্টায়। আজকের পৃথিবী আর হাজার বছর আগের পৃথিবীর পার্থক্য কেবল প্রযুক্তিতে; হৃদয়ের মানচিত্রে নয়। তাই হয়ত আমি ইতিহাসের দিকে বারবার ফিরে যাই—কারণ সেখানে আমি নিজের প্রতিচ্ছবি দেখি।
কখনও নীরবতা এসে পাশে বসে। সে কোন অতিথির মত নয়—সে যেন চিরদিনের সঙ্গী। নীরবতা আসলে শূন্যতা নয়; সে পূর্ণতার এক অন্য রূপ। শব্দের আগে যে গভীর শ্বাস নেওয়া থাকে, নীরবতা সেই শ্বাস। আমি নীরবতাকে ভয় পাই না। বরং শব্দকে আমি একটু সন্দেহ করি—কারণ শব্দ প্রায়ই সত্যকে ঢেকে দেয়, আর নীরবতা তাকে উন্মুক্ত করে।
আমার লেখা থামবে না। যতদিন শ্বাস থাকবে, ততদিন শব্দ থাকবে। লেখা কোন পেশা নয়, কোন উত্তরাধিকারও নয়। লেখা হ’ল নিজের কাছে নিজের উপস্থিতির প্রমাণ। একদিন, অনেক পরে, যখন শরীর ক্লান্ত হবে, যখন নাম আর পরিচয়ের প্রয়োজন ফুরোবে—আমি চাই আমার লেখাগুলো নদীর জলে ভাসিয়ে দিতে। কোন গ্রন্থাগার নয়, কোন স্মৃতিস্তম্ভ নয়। জলই হোক শেষ পাঠক। নদীর জল জানে কীভাবে সবকিছুকে গ্রহণ করতে হয়—প্রশ্ন ছাড়া, বিচার ছাড়া। নদীর জলকে আমরা দেখি—কিন্তু ধরতে পারি না। মুঠো করলে সে ফাঁক গলে বেরিয়ে যায়, রেখে যায় শুধু ভেজা তালু আর একটুখানি শীতল স্মৃতি। নদীর জল শেখায়—যা সবচেয়ে কাছের, তাকেই সবচেয়ে কম ধরে রাখা যায়।
নদী কখনও তাড়াহুড়ো করে না। তার গতি আছে, কিন্তু তাড়না নেই। সে জানে—পৌঁছনোর জন্য দৌড়তে হয় না, পৌঁছনো নিজেই আসে। পাহাড় থেকে সমতল, গ্রাম থেকে শহর, আলো থেকে অন্ধকার—সব সে ছুঁয়ে যায়, কিন্তু কোথাও থামে না। নদীর জল জানে, থামা মানেই জমে যাওয়া; আর জমে যাওয়া মানেই পচন।
আমাদের জীবনও কি খুব আলাদা? আমরাও তো নদীর জল—সময়ের খাতে বয়ে চলা। নাম বদলায়, মুখ বদলায়, তীর বদলায়—কিন্তু ভিতরের প্রবাহ একই থাকে। কেউ আমাদের পূর্ণিমায় দেখে, কেউ খরায়। কেউ পবিত্র বলে, কেউ বা বিপজ্জনক। অথচ নদীর জল নিজের সম্পর্কে কোন মতামত রাখে না। সে কেবল বয়ে যায়।
নদীর জল সব মনে রাখে—কিন্তু কিছু আঁকড়ে ধরে না। তার ভিতরে আছে ডুবে যাওয়া নৌকার গল্প, ধোয়া কাপড়ের সাবান, শবদেহের নীরবতা, শিশুর হাসি, বৃদ্ধের শেষ স্নান। সবকিছু ছুঁয়ে যায়, সবকিছু বয়ে নিয়ে যায়। নদী বিচার করে না। সে ইতিহাস লেখে না—সে ইতিহাস বহন করে। যখন লিখতে বসি, আমি নদীর জল হতে চাই। শব্দগুলোকে নাম দিতে চাই না, গন্তব্য দিতে চাই না। তারা আসুক, থাকুক, চলে যাক। লেখা যদি সত্যি হয়, তবে সে নিজের পথ খুঁজে নেবে। যদি না হয়—তবে ভেসে যাক। নদীর জল জানে, সব ভাসানোর অধিকার আছে। নদীর জল কখনও জিজ্ঞেস করে না—কেন আমাকে দূষিত করলে, কেন আমার তীর ভাঙলে। সে ক্ষত বহন করে, প্রতিবাদ করে না। তবু তার প্রতিশোধ আছে—নীরব, অবধারিত। একদিন সে বাড়ে, একদিন সে গ্রাস করে। নদী শেখায়—নীরবতা দুর্বলতা নয়; নীরবতা ধৈর্যের নাম।
আমাদের জন্মদিন আসে, বছর বাড়ে—আমরা হিসেব কষি। নদী কোনদিন গণনা করে না। তার কাছে দিন আর রাত একই প্রবাহের দুই ছায়া। তবুও নদী বুড়ো হয় না। কারণ সে প্রতিদিন নতুন জলে নিজেকে অতিক্রম করে। পুরনো জল চলে যায়, নতুন জল আসে—নদী থাকে। ক্যালেণ্ডার বলবে—আরেকটা বছর পেরোল। মানুষ শুভেচ্ছা দেবে, কিছু কথা বলবে, কিছু স্মৃতি জাগবে। কিন্তু আমি জানি, জন্মদিন আসলে আনন্দের নয়—হিসেবের দিন। কতটা পথ পেরোলাম, কতটা রয়ে গেল অচেনা, কতটা বোঝা জমল বুকের ভিতর—এসবের হিসেব। বছর বাড়ে মানে সময় কমে। অথচ আশ্চর্য, লেখার ইচ্ছে ততটাই বেড়ে যায়। যেন সময় ফুরোতে থাকলে শব্দ আরও তাড়াতাড়ি জন্ম নিতে চায়।
আমি চাই, আমার লেখাগুলো নদীর জলে ভাসুক। কাগজ গলে যাক, অক্ষর মিশে যাক স্রোতে। কোন সংরক্ষণ নয়, কোন স্মারক নয়। জলই হোক শেষ পাঠক। সে পড়বে না—সে গ্রহণ করবে। আর গ্রহণ করাই তো শেষ আশ্বাস। নদীর জল আমাদের শেখায়—থাকা মানে ধরা নয়। থাকা মানে বয়ে যাওয়া। আর বয়ে যাওয়ার মধ্যেই আছে মুক্তি। প্রকৃতির কাছে শব্দ ফিরিয়ে দেওয়া। তখন আর লেখা আমার থাকবে না; লেখা হয়ে উঠবে পৃথিবীর। হয়ত কেউ পড়বে না, কেউ জানবেও না—কিন্তু তাতেই বা কী আসে যায়? লেখার চূড়ান্ত সার্থকতা পাঠকসংখ্যায় নয়, সততায়।
ঘণ্টা আবার বাজে। কাঁসর থেমে গিয়ে আবার ধ্বনি তোলে। পূর্ণিমার আলো জানালার কাচে এসে দাঁড়ায়—কিছু বলতে চায়, কিন্তু বলে না। আমিও লিখে যাই। পরিবর্তন যদি কিছু হয়, তবে এই একরোখা বসে থাকার ভিতরেই হয়। এই প্রতিদিনের লেখার ভিতরেই হয়। বাইরে সব একই থাকে—ভিতরে ধীরে ধীরে অন্য কেউ তৈরি হয়।
আর হয়ত এটাই যথেষ্ট।
লেখক পরিচিতি : শিবাশিস মুখার্জী
ড. শিবাশিস মুখার্জী একজন ভাষাতাত্ত্বিক, বর্তমানে তিনি একজন ফ্যাকাল্টি, কলকাতা ও সংস্কৃত বিশ্ববিদ্যালয়য়ের। বিভিন্ন ধরনের লেখা ওনার শখ যেমন প্রবন্ধ, গল্প, কবিতা ইত্যাদি। এছাড়াও উনি বিভিন্ন বিপন্ন ভাষার ওপর রিসার্চ করেছেন।

