তুমি আমার শীতের সকাল

লেখক : আবুল হাসান তুহিন

নারী : (ঘুম ভাঙাতে) এই আর কত ঘুমোবে! কি হ’ল, ওঠো। কত বেলা হয়েছে!
পুরুষ : (শীতে কাতর) আহা ঠাণ্ডা লাগছে তো। রোদ কি উঠেছে?
নারী : (ব্যঙ্গ করে) তোমার ঘুম না ভাঙ্গলে কী সূর্য মামার ঘুম ভাঙবে না? সে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় ওঠে, নির্দিষ্ট সময় অস্ত যায়।
পুরুষ : (গম্ভীর হয়ে) তুমি বলছ আমার সময়জ্ঞান নেই?
নারী : (উপহাসের করে) না, তুমি অত্যন্ত দায়িত্ববান। নিদিষ্ট সময় অফিসে যাও, দেরিতে বাড়িতে আসো। অফিসে যাওয়ার আগে ঘুম ভাঙাতে হয়, নাহলে অফিসে লেট!
পুরুষ : (রাগ করে) এই, ভাল হবে না কিন্তু। তুমি আমার রোজনামচা বর্ণনা করছ!
নারী : মশাই, মনে আছে আজ কোথায় যাওয়ার কথা?
পুরুষ : কোথায়! আ কোথায়? ও হো, গ্রামে। আগে বলবে তো। (ব্যস্ত হয়ে) জলদি নাস্তা রেডি করো। আমি ফ্রেশ হয়ে আসি। (বিছানা থেকে উঠে)
নারী : ভুলো কোথাকার। (হাসি)
পুরুষ : (কাছে এসে) কী যেন বলে হাসলে?
নারী : না, কিছু না। বলছি ব্যস্ত শহর ছেড়ে দু’জন চলো ঘুরে আসি, সবুজ শ্যামল বাংলা মাকে আমরা ভালবাসি।

গান ৷৷ ০১ ৷৷ আধুনিক ৷ নারী, পুরুষ দ্বৈত

নারী : ব্যস্ত শহর ছেড়ে দু’জন
চলো ঘুরে আসি,
পুরুষ : সবুজ শ্যামল বাংলা মাকে
আমরা ভালবাসি।।
মেঠোপথে হাঁটব দু’জন
গল্প কথা কয়ে,
নারী :মনের মাঝে স্বপ্নগুলো
যাবে সত্যি হয়ে,
পুরুষ এবং নারী : মিষ্টি রোদে মন ভিজিয়ে
থাকব পাশাপাশি,
ব্যস্ত শহর ছেড়ে দু’জন
চলো ঘুরে আসি।।

পুরুষ : মেখে নিও হিমেল হাওয়া
মুক্ত মনের মাঝে,
নারী : মেঠো পথে সবুজ পরশ
সুখের বীণায় বাজে।
পুরুষ এবং নারী : খেজুর রসের গন্ধে বিভোর
ফুটবে মুখে হাসি,
ব্যস্ত শহর ছেড়ে দু’জন
চলো ঘুরে আসি।।

গ্রন্থনা-পুরুষঃ

পুরুষ : অন্য ঋতুর তুলনায় শীত একটি বৈচিত্রপূর্ণ ঋতু।
নারী : প্রকৃতির পালাবদলের হাওয়ায় শীত আসে রিক্ততা আর শূন্যতার ডালি নিয়ে।
পুরুষ : ফসলহীন মাঠ, ঝরাপাতা, শূন্য গাছ, দেখে মনে হয় প্রকৃতি বৈরাগ্যবসন পরে আছে।
নারী : সূর্যের দেখা পাওয়া যায় না। কুয়াশার চাদরে ঢাকা পরিবেশ মন বিষণ্ণ করে তোলে।
পুরুষ‌ : তবুও শীত মধুময়। ঝরাপাতার কান্না মেশে শীত কুয়াশার গায়, শূন্য মাঠে নেই ফসল কিইবা আসে যায়।

গান ০২ আধুনিক ॥ পুরুষ একক

ঝরা পাতার কান্না মেশে
শীত কুয়াশার গায়,
শূন্য মাঠে নেই তো ফসল
কিইবা আসে যায়।।

শিশির ভেজা দুর্বাঘাসে
সূর্য কিরণ হাসে,
মুক্তা হয়ে শিশির কণা
কত কাছে আসে,
মিষ্টি রোদের পরশ নিতে
কার না মন চায়।।

হিমেল হাওয়া কাঁপন ধরায়
কনকনে ঐ শীতে,
শুকনো পাতায় আগুন জ্বালায়
উষ্ণ পরশ নিতে।
উঠবে কখন সূর্য মামা
ঝলমলে রোদ গায়।।

গ্রন্থনা-নারীঃ

নারী‌ : শীতের সকালে বিছানা থেকে উঠতে মন চায় না, অলসতা মানুষকে শয্যায় ধরে রাখে।
পুরুষ : কনকনে শীতে মানুষ কম্বল-কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকে। অপেক্ষায় থাকে কুয়াশার চাদর ভেদ করে কখন সূর্য উঁকি দেয়।
নারী : নিরুপায় হয়ে শুকনো পাতা কুড়িয়ে আগুন জ্বালিয়ে উষ্ণতা খোঁজে।
পুরুষ : বনের পাখিরা ওড়াউড়ি করে। লেপের নিচে থাকা মানুষ বুঝতে পারে না সকালের বার্তা।
নারী : আস্তে আস্তে কুয়াশার আস্তরণ ভেদ করে মিষ্টি আলো ছড়িয়ে সূর্য মামা উঁকি মেরে উঠে।
পুরুষ : উত্তরের হিমেল হাওয়া বইতে থাকে, টিনের চালে টুপ টুপ করে ঝরে শিশির।
নারী : রোদে ডানা মেলে পাখিরা গানের জলসা বসায়।
পুরুষ : সর্ষেফুল প্রজাপতি রঙের বাহার ছড়ায়। গাঁদা, ডালিয়া, সূর্যমুখী, চন্দ্রমল্লিকার রঙবাহারে উদাসী সকালের মুখে হাসি ফোটে।
নারী‌ : সূর্যের আলোতে প্রকৃতি পায় নতুন রূপ। লেপ কাঁথা ছেড়ে বেরিয়ে আসে মানুষ। কর্মব্যস্ত হয়ে উঠে শীতের সকাল। মন গেয়ে ওঠে। খোঁপায় দিয়ে দোপাটি ফুল, গাঁদা ফুলের মালা, সূর্যমূখীর হাসি দিয়ে সাজাই বরণডালা।

গান ০৩ আধুনিক ॥ নারী একক

খোঁপায় দেব দোপাটি ফুল
গাঁদা ফুলের মালা,
সূর্যমুখীর হাসি দিয়ে
সাজাই বরণডালা।

শীতকাতুরে বন্ধু তুমি
থেকো না গো দূরে,
বুকের মাঝে প্রেমবাসনা
বাজে করুণ সুরে,
উষ্ণ পরশ দেব তোমায়
ভুলব প্রেমের জ্বালা,
সূর্যমুখীর হাসি দিয়ে
সাজাই বরণডালা।

শীত-কুয়াশা যতই থাকুক
বলো কিসের ভয়,
মনের সাথে মন মিলিয়ে
হবে প্রেমের জয়,
স্বপ্নবাসর সাজিয়ে দিলাম
আমি, ফুল ও বালা,
সূর্যমুখীর হাসি দিয়ে
সাজাই বরণডালা।।

গ্রন্থনা-পুরুষঃ

পুরুষ : গ্রামীণ জীবনে শীতের বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায়। গ্রামের অধিকাংশ মানুষ কৃষক। শীতের সকালে তাদের বেরোতে হয় জীবনের তাগিদে। তাই শীতের কষ্ট তুচ্ছ করে কুয়াশার মধ্যেই মাঠে রওনা দেয়।
নারী : কেউ কেউ সূর্য উঠার প্রতিক্ষায় থাকে। কৃষাণীরা সাংসারিক কাজে মনোনিবেশ করে।
পুরষ : রোদের উষ্ণতা গায়ে মেখে কৃষক মাঠের দিকে হেঁটে যায়। শীতকালে আমাদের দেশে ইরি ধানের চারারোপণের সময় তাদের ব্যস্ততায় দিন কাটে।
নারী : কৃষাণী বলে, “আলু তুলতি মাঠে চলো ওগো টুনির বাপ, ইরি ধানের পাতো দেব মারো কেন লাফ।”

গান ৷৷ ০৪ ৷৷ পল্লীগীতি ৷৷ নারী॥ একক॥

আলু তুলতি মাঠে চলো
ওগো টুনির বাপ,
ইরি ধানের পাতো দেব
মারো কেন লাফ।।

নাঙ্গল জোয়াল কাঁধে তোল
চাষ দিতি হবে,
নাবি কইরে ধান রুলি
ফসল তুলবা কবে।
সময় থাকতি কাজ না করলি
বাইড়ে যাবে চাপ,
আলু তুলতি মাঠে চলো
ওগো টুনির বাপ।

পেঁয়াজ ক্ষেতে সার লাগবে
কহন তুমি দিবা,
আলু তুইলে গঞ্জের হাটে
কবে তুমি নিবা,
কপি ক্ষেতের আগাছা তাই
করতি হবে সাফ,
আলু তুলতি মাঠে চলো
ওগো টুনির বাপ।।

গ্রন্থনা-নারীঃ

নারী : কৃষাণ-কৃষাণী তাদের মৌসুমি শস্য ঘরে তোলার স্বপ্নে বিভোর থাকে। ভোর হলেই তারা শাকসবজির বাগান পরিদর্শন করে।
পুরুষ : গ্রামের বধূরা এসময় নানা রকম পিঠা তৈরি করে। বাতাসে ভেসে বেড়ায় পিঠা-পায়েসের মিষ্টি ঘ্রাণ।
নারী : শীত মানে পিঠা-পুলি, খেজুরের কাঁচা রস – আহা,পরাণ ভরে যায়। শীতের সকালে গাছ থেকে খেজুরের রস নামানোর আবেদন একেবারে আলাদা আমেজ । ওরে কনে গেলি খেদির মা, বাগ গোছায়ে দে, রস পাড়তি যাতি হবে জলদি খাইয়ে নে।

গান ॥ ০৫ ৷৷ পল্লীগীতি ॥ পুরুষ ॥ একক ॥

ওরে কনে গেলি খেদির মা
বাগ গোছায়ে দে,
রস পাড়তি যাতি হবে
জলদি খাইয়ে নে।।

বেলা হয়ে গেলি পারে
রস ঘুলাইয়ে যাবে,
উলা রসের গুড় বানালি
কেউ না কিনে খাবে,
জিড়েন রসে যত্ন কইরে
মুড়ি ভিজোয়ে দে,
ওরে কনে গেলি খেদির মা
বাগ গোছায়ে দে।।

গুড় পাটালি বেহচে তোরে
মোবাইল কিনে দেব,
মাঠে বইসে তোর খবর
মাঝে মাঝে নেব।
ইচ্ছে হোলি সেলফি তুলে
মন ভুলোইয়ে দে,
ওরে কনে গেলি খেদির মা
বাগ গোছায়ে দে।।

গ্রন্থনা-পুরুষঃ

পুরুষ‌ : গ্রামের অধিকাংশ মানুষই দরিদ্র। এই দারিদ্রতার সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণীর লোভী মানুষ চড়া সুদে তাদের ঋণ দেয়।
নারী : তাদের ফসল বিক্রি করেও ঋণ শোধ হয় না অনেক ক্ষেত্রেই। এইজন্য সরকার বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে তাদের অর্থনৈতিক সাহায্য ও সহযোগিতা করে থাকে, স্বল্প সুদে ঋণ প্রদান করে থাকে।
পুরুষ : তাইতো কৃষাণী বলছে, মোটা কাপড় মোটা ভাতে যাচ্ছে চলে দিন। সবজি বেইচে শোধ করব যত ক্ষুদ্র ঋণ।

গান ॥ ০৬ ৷৷ পল্লীগীতি ॥ নারী ॥ একক ॥

মোটা কাপড় মোটা ভাতে
যাচ্ছে চলে দিন,
সবজি বেইচে শোধ করব
যত ক্ষুদ্র ঋণ॥

গয়না শাড়ী চাইনা এখন
জমায় রাখো পুঁজি,
নিজের টাকায় চাষ করিলে
বাড়ে বন্ধু রুজি।
সুখে বইসে খাব আমরা
বাজে মনের বীণ,
সবজি বেইচে শোধ করব
যত ক্ষুদ্র ঋণ॥

বাড়ির মদ্দি ক্ষেত খামার
করব দুজন মিলে,
হাঁস-মুরগী-সবজি হবে
মাছ থাকবে ঝিলে,
দুঃখ কষ্ট দূরে যাবে
আসবে সুখের দিন,
সবজি বেইচে শোধ করব
যত ক্ষুদ্র ঋণ॥

গ্রন্থনা-নারীঃ

নারী : আকাশের ক্যানভাসে অতিথি পাখিদের আলপনা। বিলের পানিতে তাদের কলকাকলি, মন রাঙিয়ে দেয়।
পুরুষ : শীত অনেকের কাছে প্রিয় ঋতু। ভালমন্দ খাওয়ার জন্য এই ঋতুর তুলনা হয়না।
নারী : তোমার মত পেটুকরা তো বলবেই।
পুরুষ : আবার রোজনামচা শুরু করলে। জানো না, শরীর চাঙ্গা রাখার জন্য চাই ভালো খাবার, মুক্ত বাতাস। এইজন্যই তো গ্রামে আসা।
নারী : সত্যি বলেছ। শহরে বসে শীতের সৌন্দর্য্য উপভোগ করা যায় না। গ্রামের প্রকৃতিতে শীতের আপন বৈশিষ্ট্য সমুজ্জ্বল।
পুরুষ : ঠিক যেন তোমার মত। এই যে গ্রাম্য মেঠো পথ, খোলা আকাশ, হিম শীতল বাতাস। শহরের পরিবেশ থেকে তোমাকে ভিন্ন লাগছে। মনে হচ্ছে গ্রাম্য বধূ।
নারী : ঠাট্টা হচ্ছে। আর কত দূর হাঁটতে হবে শুনি? শীত তো জেঁকে বসেছে! ঠাণ্ডা বাতাস কানে লাগছে। সূর্যটা হঠাৎ মিলিয়ে গেল। আমি আর পারছি না!
পুরুষ : এই তো, এসে গিয়েছি। ঐ যে দূরে একটা বাড়ি দেখছ, আমরা ওখানে যাব।
নারী : যাক, কষ্ট হ’লেও একটা জিনিস পরিষ্কার। শীতের সৌন্দর্য্য ও মাধুর্য পেতে হলে শহর ছেড়ে গ্রামে আসতে হবে। কারণ গ্রামীণ পরিবেশ হ’ল প্রকৃত শীতের লীলাভূমি ।
পুরুষ : আঃ হাঃ হাঃ (হাসি) এইজন্য তুমি আমার —
নারী : কী? এই বলো না কী?
পুরুষ : বলব, তুমি আমার শীতের সকাল, মিষ্টি রোদের হাসি, উষ্ণ পরশ খুঁজি বলেই এত ভালবাসি।

কবিতা ॥ আবৃত্তি ॥ পুরুষ ॥ একক ॥

তুমি আমার শীতের সকাল
মিষ্টি রোদের হাসি,
উষ্ণ পরশ খুঁজি বলেই
এত ভালবাসি।

শিশিরভেজা দুর্বা ঘাসে
তোমার মাখামাখি,
শীত কুয়াশার চাদর গায়ে
মেলো দুটি আঁখি।
রঙবাহারী ফুলের সুবাস
চলো নিয়ে আসি,
উষ্ণ পরশ স্মৃতি বলেই
এত ভালবাসি।

কৃষাণ বধূ স্বপ্ন সাজায়
সবজি ক্ষেতের বাঁকে।
পিঠা পায়েস খেজুর রসে
মধুর করে রাখে।
অন্ন তুলে দেয় যে মুখে
হাল ধরে যে চাষী,
উষ্ণ পরশ খুঁজি বলেই
এত ভালবাসি।

প্রাণে দোলা দাও গো তুমি
জাগাও শিহরণ,
ছন্দ খুঁজি চলার পথে
ভরাও সুখের ভুবন।
বক্ষ জুড়ে তোমার আবেশ
স্বপ্ন রাশি রাশি,
উষ্ণ পরশ খুঁজি বলেই
এত ভালবাসি।

লতাপাতার সবুজ বনে
হরেক পাখি ডাকে,
সর্ষেফুলে প্রজাপতি
রঙের ছবি আঁকে।
প্রেমের ভুবন দাও ভরিয়ে
থাকব পাশাপাশি,
উষ্ণ পরশ খুঁজি বলেই
এত ভালবাসি।

সমাপ্ত


লেখক পরিচিতি : আবুল হাসান তুহিন
গীতিকার ও নাট্যকার, বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।

মাসিক দীপায়ন প্রতিযোগিতা

মাসিক দীপায়ন পুরস্কার pop up