সিনেমা রিভিউ : এক যে ছিল রাজা

লেখক: রুবাই শুভজিৎ ঘোষ

  • সিনেমার নাম: এক যে ছিল রাজা
  • পরিচালনা: সৃজিত মুখোপাধ্যায়
  • প্রযোজনা: এসভিএফ এন্টারটেনমেন্ট
  • অভিনয়: যীশু সেনগুপ্ত এবং অন্যান্য সাবলীল শিল্পীরা।
  • সময়: ২ ঘণ্টা ২৭ মিনিট

২০১৮ সালের দুর্গাপুজোতে মুক্তি পেয়েছিল সৃজিত মুখার্জি পরিচালিত “এক যে ছিল রাজা”। সিনেমার বিষয় বিখ্যাত ভাওয়াল সন্ন্যাসী মামলা। সিনেমার শুরুতেই বলা হয় এর কাহিনী সত্য ঘটনার ওপরে নির্মিত এবং শুধুমাত্র দুই উকিলের চরিত্রকেই এখানে সিনেমার প্রয়োজনে পরিবর্তন করা হয়েছে। এর আগে একই বিষয়ের ওপর উত্তম কুমার অভিনীত সিনেমা “সন্ন্যাসী রাজা”-তে এই সত্যতার দায় ছিল না। এখানে তাই পরিচালকের দায় অনেকটা বেড়ে গেছিল। সঙ্গে বেড়েছিল অভিনেতাদেরও দায়। বিশেষ করে উত্তম কুমারের জায়গায় এবার যীশু সেনগুপ্ত। কিন্তু অভিনয়ের দিক থেকে দুজনের মধ্যে কোন তুলনা না করেই বলব এই সিনেমার মেরুদণ্ড যীশু সেনগুপ্তের অভিনয় এবং তার মেকআপ। তাকে যেভাবে ভাওয়াল সন্ন্যাসীর মেকআপ করা হয়েছে, তাতে মেকআপ আর্টিস্টকে সাধুবাদ জানাতেই হয়। সঙ্গে সেই মেকআপে তার অভিনয়। যীশুর অভিনয় জীবনের বোধহয় শ্রেষ্ঠ অভিনয় এটা। শারীরিকভাবে নিজেকে গড়েছে, নিয়েছে মানসিক প্রস্তুতি। এই সিনেমাটা বোধয় ওর নামেই চালিয়ে দেওয়া যায়। জয়া আহসান রাজার বোনের চরিত্রে খুব ভালো অভিনয় করেছে। বিশেষ করে সেই চরিত্রের জন্য তার উচ্চারণ সবচেয়ে সাবলীল। যীশু আর জয়া দুজনেই এই সিনেমার মেরুদণ্ড।

সিনেমাটোগ্রাফি খুব সুন্দর। কিন্তু চিত্রনাট্যের মতই এখানেও অনেক বেশি দেখানোর জায়গা ছিল। দার্জিলিং হাতে পেয়েও কিছু করা হল না কেন, জানা নেই। বোধয় সময়ের অভাব আর তাড়াহুড়ো। কিন্তু যেটুকু দেখানো হয় তা সত্যি বেশ ভালো লেগেছে।

এবার আসি চিত্রনাট্যের কথায়। রাজকাহিনীর পর সৃজিতের চিত্রনাট্য দিনকেদিন দুর্বল হয়ে আসছে। বিশেষ করে জুলফিকরের সময় থেকেই চিত্রনাট্যে একটা অদ্ভুত তাড়াহুড়ো খেয়াল করা যায়। এখানেও সেটাই বর্তমান। অনেক কম সময় অনেককিছু দেখিয়ে দেওয়ার প্রবণতা সেই জুলফিকরের সময় থেকেই চালু। রাজার জীবনের পুরো অধ্যায়ে না গিয়ে যদি একটা বিশেষ সময়ের ওপর জোর দিয়ে চিত্রনাট্য লেখা হত, আমার মনে হয় সেটা বেশি ভালো হত। যদি রাজার ফিরে আসারা গল্পের মধ্যে ফ্ল্যাশব্যাকে রাজার পুরনো কাহিনী, কিভাবে তাঁর শরীর খারাপ হল সমস্ত কিছু দেখানো যেত সেটা বেশি ভাল হত। যেখানে এত সাসপেন্স তৈরি করার জায়গা, সেখানে সাসপেন্স কই? পরপর তো বলেই দেওয়া হচ্ছে কে খুনি, কিভাবে খুন হয়েছে। কোর্টের কথোপকথনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে ব্যাপারগুলোকে রিভিল করলে বেশি ভালো লাগত। কিন্তু এখানে সব আগে থেকেই বলা হচ্ছে, কোর্ট ড্রামা নেই। কোর্টে দু চারটে কথাবার্তা শুধুমাত্র রিনাদির চরিত্রটাকে প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া আর কোন কারণ তো দেখা গেল না। সবকিছু আড়াই ঘণ্টায় দেখাতে গিয়েই যেন যত গণ্ডগোল।

তাড়াহুড়োর আরেকটা উদাহরণ হল গান। হঠাৎ করে যেন গান চালু হয়ে যাচ্ছে। গানগুলো অবশ্যই সুন্দর। কিন্তু চিত্রনাট্যের প্রয়োজনে না, গান রাখবার জন্যই যেন রাখা হয়েছে। কিরকম? একটা উদাহরণ নেওয়া যাক। কোর্টে বলা হল একটি মৃতদেহকে ডাকা হচ্ছে এবং কে সেই মৃতদেহ? চালু হয়ে গেল গান। যখন জয়া আহসানকে জিজ্ঞেস করা হল তিনি ভাওয়াল সন্ন্যাসীকে কবে দেখছেন, চালু হয়ে গেল গান। তবে আবারও বলি গানগুলো অবশ্যই সুন্দর। যখন সিনেমাটা দেখে হল থেকে বেরিয়ে আসছিলাম, তখন গুনগুন করে সেই গানটাই গাইছিলাম, সেই হিসাবে গানগুলো তাদের কাজ করে দিয়েছে। কিন্তু সব মিলিয়ে ব্যাপারটা সেই শুরুর দিকের সৃজিতের ছবির মত লাগল না।

লেখকের কথা: রুবাই শুভজিৎ ঘোষ
লেখকের জন্ম পশ্চিমবাংলায়। পেশায় একটি বহুজাতিক সংস্থার তথ্যপ্রযুক্তিবিদ। নেশায় লেখক এবং পরিচালক। বাঙালির জনপ্রিয় ওয়েবসাইট সববাংলায় এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা তিনি। কবিতা থেকে শুরু করে গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস, চিত্রনাট্য সবকিছুই লিখতে ভালবাসেন। লিটিল ম্যাগাজিন থেকে শুরু করে বাণিজ্যিক বিভিন্ন ম্যাগাজিনে নিয়মিত লিখেছেন। স্রোত থেকে প্রকাশিত তাঁর কবিতার সংকলন দৃষ্টি এবং বালিঘড়ি। এছাড়া তথ্যচিত্র, শর্ট ফিল্ম বা অন্যান্য বিভিন্ন ধরনের ভিডিও পরিচালনা করেন। ধর্ম এবং বিজ্ঞান তাঁর প্রিয় বিষয়। ভ্রমণ তাঁর অন্যতম শখ। অন্যান্য শখের মধ্যে রয়েছে স্কেচ, ফটোগ্রাফি, ছবি ডিজাইন করা।

শেয়ার করে বন্ধুদেরও পড়ার সুযোগ করে দিন
  •  
  •  
  •  
  •  

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।