দাম্পত্য কলহের শিকার – সন্তান

লেখক : মানস রঞ্জন ঘোষ

দাম্পত্য মানেই সংসার—এই ধারণা আমাদের সমাজে গভীরভাবে প্রোথিত। ভালবাসা, বিশ্বাস, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও দায়িত্ববোধের ভিত্তিতেই একটি পরিবার গড়ে ওঠে—এ কথা আমরা সবাই জানি। কিন্তু বাস্তব জীবনে প্রায়ই দেখা যায়, সংসার টিকে থাকলেও দাম্পত্য সম্পর্কে জমে ওঠে নীরব অভিমান, ক্ষমতার টানাপোড়েন ও মানসিক দূরত্ব। এই অদৃশ্য অস্থিরতার সবচেয়ে বড় এবং নীরব শিকার হয় সন্তান।

শিশুর সুস্থ মানসিক বিকাশের জন্য দুটি বিষয় অত্যন্ত জরুরি—নিরাপত্তাবোধ ও স্থিতিশীল পরিবেশ। পরিবারই তার প্রথম আশ্রয়, প্রথম বিদ্যালয়, প্রথম সম্পর্কের পাঠশালা। কিন্তু যখন সেই পরিবারেই নিয়মিত ঝগড়া, তর্ক-বিতর্ক, নীরব শত্রুতা কিংবা পারস্পরিক অসম্মান উপস্থিত থাকে, তখন নিরাপত্তার ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে যায়। শিশুমনে জন্ম নেয় অজানা ভয় ও অনিশ্চয়তা। অনেক সময় সে নিজেকেই পারিবারিক অশান্তির কারণ বলে মনে করতে শুরু করে, যা তার আত্মবিশ্বাস ও আত্মমূল্যবোধকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সন্তান প্রতিপালনে বাবা-মায়ের যথাযথ ও সমন্বিত ভূমিকা থাকা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

আমাদের সামাজিক বাস্তবতায় প্রায়শই দেখা যায় এক অসম সমীকরণ—একদিকে মাতৃত্বের অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ ও সিদ্ধান্তগ্রহণের একচ্ছত্রতা, অন্যদিকে পিতৃত্বের ধীরে ধীরে প্রান্তিক হয়ে পড়া। বাবা যখন নিজেকে অপ্রয়োজনীয় বা অসহায় মনে করে নীরব থাকেন, তখন সন্তান দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। সে বুঝতে পারে না, কোন মূল্যবোধ অনুসরণ করবে, কার অবস্থানকে গ্রহণ করবে। এই বিভ্রান্তি ভবিষ্যতে তার সম্পর্কবোধ, সিদ্ধান্তগ্রহণ ক্ষমতা এবং মানসিক স্থিতি—সবকিছুর উপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে।

মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিতে সন্তান কখনই পিতামাতার দ্বন্দ্বের মধ্যস্থতাকারী হতে পারে না। অথচ বাস্তবে অনেক সময় তাকে সেই ভূমিকায় ঠেলে দেওয়া হয়—কখনও এক পক্ষের সমর্থন চেয়ে, কখনও ব্যক্তিগত হতাশার ভার তার উপর চাপিয়ে। এটি এক ধরনের নীরব মানসিক চাপ, যা শিশুকে অকালেই মানসিকভাবে ভারাক্রান্ত করে তোলে।

এ কথা স্বীকার করা জরুরি যে, সুস্থ দাম্পত্য মানে মতভেদহীন সম্পর্ক নয়। মতভেদ থাকবেই। কিন্তু সেই মতভেদ কীভাবে প্রকাশিত হচ্ছে এবং কীভাবে সমাধান করা হচ্ছে, সেটিই আসল বিষয়। সন্তানের সামনে পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখা, ব্যক্তিগত বিরোধকে ব্যক্তিগত পরিসরেই সীমাবদ্ধ রাখা এবং প্রয়োজনে পারিবারিক কাউন্সেলিং গ্রহণ করা—এসবই দায়িত্বশীল অভিভাবকত্বের অংশ।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি কেবল সংসার টিকিয়ে রাখার নয়; বরং সেই সংসারে বেড়ে ওঠা শিশুর মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করার। দাম্পত্য যদি অহং ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব অতিক্রম করে মানবিক সংলাপ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার জায়গায় পৌঁছাতে পারে, তবেই পরিবার সত্যিকার অর্থে সন্তানের জন্য নিরাপদ আশ্রয় হয়ে উঠবে। সর্বোপরি, ধৈর্যশীল ও সংলাপনির্ভর পারস্পরিক সম্পর্কে সহমর্মিতার উপস্থিতিই একটি সুস্থ পরিবারের প্রধান ভিত্তি।


লেখক পরিচিতি : মানস রঞ্জন ঘোষ
পলিটেকনিক কলেজে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার বিভাগীয় লেকচারার। শিক্ষকতা ও প্রযুক্তির পাশাপাশি সমাজ পরিবার ও মনস্তত্ত্বিক বিষয়ে আগ্রহ আছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।

মাসিক দীপায়ন প্রতিযোগিতা

মাসিক দীপায়ন পুরস্কার pop up