সময়ের জাদুকর, ঘড়ির রাজপুত্র : হান্স উইলসডর্ফ

লেখক : মনোজিৎ সাহা

বারো বছরের অনাথ ছেলেটার ওপর অনেক দায়িত্ব, বোন, দাদা আর সে যে হয়েছে অনাথ। সময় খারাপ হলে যা হয়! নিজের সঙ্গে সঙ্গে বাকি দুজনকে নিয়েও চিন্তা। তিনজনের ভাগ্য এসে পড়লো তার কাকার হাতে। পৈতৃক ব্যবসাও কাকার দখলে চলে গেল। সেটা বিক্রিও হয়ে গেল তার তত্বাবধানে। আর তারা পড়াশোনার জন্য চলে গেল বোর্ডিং স্কুলে। আসলে সময় খারাপ হলে যা হয়। সময় যেন বিপরীত দিকে হাঁটছিল।

তবে বারো বছরের ছেলেটি ছিল জেদি ও একগুঁয়ে। অঙ্ক ও ভাষা ছিল ছেলেটির শক্তির জায়গা। এই শক্তিকে সঙ্গী করে বিদেশে কাজ করা ও ভ্রমণের জন্য নিজেকে তৈরি করে তুলল সে। তখন কি আর সে জানতো তাকে পৃথিবী মনে রাখবে ঘড়ি নির্মাণবিদ্যার নেতা হিসাবে! ছেলেটির নাম হান্স উইলসডর্ফ। জন্ম ১৮৮১ সালের ২২শে মার্চ, জার্মানির কুল্মবাচে।


ওয়েবজিনের জন্য লেখা আহ্বান – শেষ দিন ২৫ মে

সববাংলায় লেখালিখি সাইটের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে বিশেষ ওয়েবজিনের জন্য অপ্রকাশিত লেখা ইমেল করুন। বিস্তারিত জানতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন ও নিয়ম মেনে লেখা পাঠান।


তিনি কর্মজগৎ শুরু করেন একটি মুক্তো রপ্তানি সংস্থায় শিক্ষানবীশ হিসাবে। উইলসডর্ফ ১৯০০ সালে ইংল্যান্ডে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, এবং সেখানে সাংবাদিকতা ও এক তৎকালীন প্রসিদ্ধ সুইস ঘড়ি কোম্পানিতে কেরানির কাজ শুরু করেন। সেই সময় পকেট ঘড়ির চল ছিল। উইলসডর্ফ ঘড়ি তৈরির কাজ পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে শিখে ফেলেন। ১৯০৩ সালে তিনি লন্ডনে আসেন আর এক প্রসিদ্ধ ঘড়ি কোম্পানিতে কাজের সূত্রে, এবং ১৯০৫ সালে অ্যালফ্রেড ডেভিসের সাথে এক নতুন ঘড়ি নির্মাতা কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন, যার নাম রাখেন “উইলসডর্ফ অ্যান্ড ডেভিস”। তাদের লক্ষ্য ছিল ভালো মানের ঘড়ি মানুষের সাধ্যের মধ্যে তৈরি করা। উইলসডর্ফ ব্যক্তিগত ভাবে তার কোম্পানির নতুন নাম নিয়ে অনেক ভাবনা চিন্তা করেন। বর্ণমালার অক্ষর গুলি সাজিয়ে তিনি কোম্পানির এমন একটি নাম খুঁজতে থাকেন, যে নাম পৃথিবীর সকল মানুষের উচ্চারণে সুগম হওয়ার সাথে সাথে নামের মধ্যেই যেন আভিজাত্য থাকে। কোম্পানি প্রতিষ্ঠার ৩ বছর পর একদিন উইলসডর্ফ দ্বিতল বিশিষ্ট ঘোড়া গাড়িতে লন্ডনের রাস্তায় ভ্রমণ করছিলেন। হঠাৎ তিনি অনুভব করেন তার কানের কাছে এসে কোনো জিন যেন “রোলেক্স” শব্দটি উচ্চারণ করে যায়। অতঃপর তিনি কোম্পানির নাম পরিবর্তন করে “রোলেক্স” রাখেন। এই ঘটনাটি তিনি প্রকাশ্যে আনেন কোম্পানির ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে।

সেই সময় পকেট ঘড়ির চল ছিল এবং বাজারে হাত ঘড়ি ছিল না বললেই চলে, আর থাকলেও তার গুণগত মান খুবই নিম্নমানের ছিল। বিষয়টি উইলসডর্ফকে ভাবিয়ে তোলে, এবং তিনি এমন হাতঘড়ি তৈরির চেষ্টা করতে থাকেন যা টেকসই হওয়ার সাথে সাথে মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে যেন থাকে। সুইজারল্যান্ডের এক ঘড়ি কোম্পানি থেকে তিনি ঘড়ির যন্ত্রাংশ গুলি আনিয়ে নিজে ঘড়ি তৈরি করতে থাকেন। ১৯১৪ সালে রোলেক্স প্রথম বারের মতো হাতঘড়ি বাজারে আনে এবং তাদের এই কাজ কোম্পানিকে গোটা বিশ্বের দরবারে এক নতুন পরিচয় দিতে বিশেষ ভাবে সাহায্য করে। সব থেকে বিশেষত্ব হল “রোলেক্স” কোম্পানির সব ঘড়িই হাতে তৈরি। বাজারে থাকা বাকি হাতঘড়ির তুলনায় তার ঘড়ির মান বেশ ভালো হওয়ায় তার ব্যবসা বেশ ভালো ভাবেই চলতে শুরু করে।

১৯১১ সালে তিনি ফ্লোরেন্স ফ্রান্সেস মে ক্রোটির সাথে বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ইংল্যান্ডে করের পরিমাণ অনেক বাড়িয়ে দেওয়ার কারণে উইলসডর্ফ তার রোলেক্স কোম্পানি সুইজারল্যান্ডে স্থানান্তরিত করেন। ১৯২৭ সালে রোলেক্স কোম্পানি বিশ্ব দরবারে আর এক চমক নিয়ে আসে “দ্য রোলেক্স ওয়স্টের” নামে। এটি ছিল তৎকালীন তথা বিশ্বের প্রথম জলরোধী হাতঘড়ি। তার প্রথম রোলেক্স ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর ছিলেন মার্সিডিজ গ্লিটজি, একজন মহিলা সাঁতারু। মার্সিডিজ এই জলরোধী ঘড়ি নিয়ে টানা ১০ ঘন্টা সাঁতার কেটে ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রম করেন, এবং এই ঘড়ি জলের মধ্যেও সঠিক সময় দেখিয়ে গোটা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। এর পর থেকে রোলেক্স এর শিখরে ওঠার অভিযান শুরু হয় সেই সময়ের অন্যতম তারকাদের হাত ধরে। সেই সময় সব ঘড়িতে দম দিয়ে চালাতে হতো। এই অসুবিধার কথা মাথায় রেখে ১৯৩১ সালে “দ্য রোলাক্স পেরেচুয়াল”, প্রথম স্বয়ংক্রিয় ঘড়ি হিসেবে, রোলেক্স এর নামে আরও এক চমক যুক্ত করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সকল যুদ্ধ বিমান চালকেরা ও রোলেক্স এর ঘড়ি ব্যবহার করতেন, কারণ সেই সময় রোলেক্স এর মতো উচ্চ মানের এমন কোনো ঘড়ি ছিল না, যা তাদের বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও সঠিক সময় দেখাতে পারবে। ১৯৪৪ সালে উইলসডর্ফ তার স্ত্রী কে হারিয়ে ফেলে মানসিক ভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন। তার কোনো সন্তান ছিল না। তিনি এই অবস্থায় আবার বৈবাহিক সম্পর্ক তৈরি করেন। এবার বেটি উইলসডর্ফ মেটলার-এর সঙ্গে। ১৯৪৫ সালে তিনি নিজের নামে “হান্স উইলসডর্ফ ফাউন্ডেশন” প্রতিষ্ঠা করেন, যা ১৯৬০ এর পরবর্তীতে রোলেক্স কোম্পানির সমগ্র লাভ্যাংশ জনকল্যানমূলক কাজের জন্য দিয়ে থাকে। এটি সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অবস্থিত। ঘড়ির দুনিয়ায় আরও এক আমুল চমক নিয়ে আসেন উইলসডর্ফ ১৯৪৫ সালে “দ্য রোলেক্স ডেটযাস্ট” রূপে। এবার থেকে ঘড়িতে সময়ের সাথে সাথে তারিখও দেখা সম্ভব হয়। এই রকম বহু কতৃত্ব নিয়েও রোলেক্স কোম্পানি ঘড়ি দুনিয়ায় এক নতুন যুগের সূচনা করে। “টুডর” নামে আরও একটি ঘড়ি তৈরির কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন উইলসডর্ফ। এটি ১৯২৬ সালে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় প্রতিষ্ঠা করেন।

সাফল্য যেন হান্সের জীবনের প্রতি পদক্ষেপে সঙ্গ দিয়েছে। যে খারাপ সময় দিয়ে তার জীবনে চলার শুরু হয় সেই সময়কেই সঙ্গী করে তিনি সফলতার চূড়ায় পৌঁছেছিলেন। চারিত্রিকভাবে তিনি এতটাই দৃঢ় ছিলেন যে অন্যকে দোষারোপ করার কথা ভাবতেও পারতেন না। যে কাকা তাদের পারিবারিক ব্যবসাকে বিক্রি করে দিয়েছিলেন তার সম্পর্কে বলতে গিয়ে তার আত্মজীবনীতে বলছেন ‘আমাদের কাকা আমাদের ভাগ্য সম্পর্কে উদাসীন ছিল না; তবুও জীবনের প্রথম দিকে তারা যেভাবে আমাকে স্বাবলম্বী করে তুলেছিল তা আমার সম্পদ দেখাশোনা করার অভ্যাস অর্জন করতে সাহায্য করেছে। আজ ফিরে তাকালে বুঝতে পারি এটিই আমার সফলতার মূল চাবিকাঠি।’

৬ই জুলাই ১৯৬০ সালে বিশ্ব এই ঘড়ি দুনিয়ার রাজপুত্রকে হারিয়ে ফেলে। জেনেভার কিংস সেমেট্রিতে তার দুই স্ত্রীর পাশেই তাকে সমাহিত করা হয়। নিজের খারাপ সময় থেকে উঠে এসে শুধুই গোটা বিশ্বের কাছে এখনও পর্যন্ত সব থেকে নামি ঘড়ি-কোম্পানির মালিকই হয়ে ওঠেননি উইলসডর্ফ, তাঁর এই “রোলেক্স” আজও বিশ্বের অন্যতম সেরা হাতঘড়ির কোম্পানি। এক শতক ধরে নিজের শ্রেষ্ঠত্বের আসন ধরে রেখে আজও যা শ্রেষ্ঠত্বের সমান দাবীদার। হান্সের জীবন যেন ঘড়ি নির্মাণ শিল্পে এক রূপকথার গল্প।


লিঙ্ক:
https://www.rolex.org/perpetual/making-history-with-rolex
https://en.wikipedia.org/wiki/Hans_Wilsdorf
https://www.tudorwatch.com/en/inside-tudor/history/tudor-history-origins-1926-to-1949


লেখক পরিচিতি : মনোজিৎ সাহা
এই পেজে এটি আমার প্রথম লেখা

শেয়ার করে বন্ধুদেরও পড়ার সুযোগ করে দিন
  •  
  •  
  •  
  •  

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

Back to Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।

বিভিন্ন লেখকের কবিতা গল্প পাঠ শুনতে এখানে ক্লিক করুন

লেখালিখি লোগো