লেখক : অর্হণ জানা
১৫ ফেব্রুয়ারি, ১৮৯৭ সাল। মাদ্রাজ থেকে এস.এস.মোম্বাসা জাহাজ যখন যাত্রা শুরু করল, তখনও জাহাজঘাটায় থিকথিকে ভিড়। প্রথমে তো ক্যাপ্টেন বুঝতেই পারছিলেন না আদৌ জাহাজ ছাড়তে পারবেন কি না। ভয় হচ্ছিল, কেউ যদি অতি উত্তেজনায় জলে ঝাঁপ দেয়। জাহাজের সেই বিশেষ যাত্রীটিকে ক্যাপ্টেন আর্থার চেনেন না ঠিকই, কিন্তু মেটদের মুখ থেকে নানা কথা তাঁর কানে এসেছে।
প্রায় সাত বছর বাদে নাকি সারা বিশ্বজয় করে ইনি দেশে ফিরেছেন। আমেরিকা, লণ্ডন হয়ে প্রথমে কলম্বো, সেখান থেকে ক্যাণ্ডি, জাফনায় এসেছিলেন। তার পর রামনাদের ভারত ভূখণ্ডে। অবশেষে মাদুরাই, ত্রিচিনাপল্লি হয়ে ট্রেনে করে মাদ্রাজ। আরও শুনলেন, বিলেত থেকে ফেরার পথে জায়গায় জায়গায় তাঁকে দেখতে দারুণ ভিড় হয়েছে। ত্রিচিনাপল্লিতে রাত চারটেতে তাঁর ট্রেন থামার কথা। তখনও ফুল, মালা নিয়ে স্টেশনে কয়েক হাজার মানুষ। মাদ্রাজের আগে এক ছোট্ট স্টেশন, সেখানে ট্রেন থামার কথা নয়। কিন্তু তিনি আসছেন জেনে লাইনের ওপর শুয়ে পড়েছে কয়েকশো মানুষ। অনিচ্ছাসত্ত্বেও ক্লান্ত শরীরে জায়গায় জায়গায় বক্তৃতা দিতে হয়েছে। কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে নিজের শহরে ফিরবেন বলে ট্রেনে আর ওঠেননি তিনি। ১৫ ফেব্রুয়ারি সওয়ার হলেন কলকাতাগামী মোম্বাসা জাহাজে। তাঁর বিদেশী বন্ধু গুডউইন, ক্যাপ্টেন সেভিয়ার ও তাঁর স্ত্রী, আরও অনেককে নিয়ে তিনি চেপেছেন এই জাহাজে।
শোনা কথার সবটা বিশ্বাস করেননি ক্যাপ্টেন। এক নেটিভ, তাও কোনও রাজনৈতিক দলের নেতা নন, তাঁকে নিয়ে এমন উন্মাদনা তাঁর কল্পনার বাইরে। এদেশের মানুষদের স্বভাবই হল সব কিছুতে রং চড়িয়ে বলা। ভুল ভাঙল যখন মানুষটি এলেন। মাদ্রাজের বন্দরটি নেহাত ছোট নয়। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে জনস্রোতে ফেটে পড়বে। মজবুত কাঠের জেটি মচমচ করে উঠছে। সবাই একবারটি ছুঁতে চাইছে গেরুয়া পরিহিত মাঝারি চেহারার এই মানুষটিকে। লোকটির কোনও বিরক্তি নেই। যেমন করে জলস্রোতে মাছ সাঁতরে চলে, তেমনি অবলীলায় এই ভিড়ের মাঝেও এগিয়ে চলছেন তিনি। দৃপ্ত, প্রদীপ্ত।
জাহাজেরই আর-এক বাঙালি যাত্রী, রায়সাহেব অভয়চরণ মুখুজ্যে এক ফাঁকে গিয়ে এঁকে প্রণাম ঠুকে এলেন। তিনিই নানা কথায় ক্যাপ্টেনকে আরও কিছু খবর দিলেন। এই গেরুয়াধারী সন্ন্যাসীর আগের নাম ছিল সন্ন্যাসী বিবিদিষানন্দ। ইনি প্রায় সারা ভারত ঘুরে তার পর চলে গিয়েছিলেন খোদ আমেরিকার ধর্ম মহাসম্মেলনে। আজ সাত বছর বাদে আবার তাঁর নিজের শহরে ফিরছেন। নামও বদলে গেছে তাঁর। সারা বিশ্বে এখন তিনি স্বামী বিবেকানন্দ নামে এক ডাকে পরিচিত।
মাদ্রাজে বিশ্রাম সেরে তিনি আবার জাহাজে উঠলেন। ফেরার পথে হুগলি নদীর চড়ায় অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হল। ১৮ তারিখ সন্ধ্যায় বজবজে নোঙর ফেলল জাহাজ। কিন্তু তখনকার আইন অনুযায়ী, সূর্যাস্তের পরে জাহাজ থেকে নামা নিষেধ। বিবেকানন্দ ও তাঁর সঙ্গীরা তাই নামলেন ১৯ তারিখ সকালে, সেখান থেকে বজবজ স্টেশন। মাদ্রাজে তাঁকে দেখতে ভিড় করেছিল হাজার হাজার মানুষ। কিন্তু বজবজ স্টেশন আজ নির্জন, নীরব।
ভোরবেলা স্টেশনে পৌঁছেও অপেক্ষা করতে হল বেশ কিছুক্ষণ। এই নেটিভ সন্ন্যাসীর জন্য নেই কোনও স্পেশাল ট্রেন। স্টেশনমাস্টার অবশ্য তাঁর ঘরের একটি চেয়ারে সন্ন্যাসীকে বসতে দিলেন, সেই চেয়ার এখন ফেয়ারলি প্লেসের রেল মিউজিয়ামে। ভোরের লোকাল ট্রেন সাড়ে সাতটায় শিয়ালদহে থেমেছে, স্টেশনে তখন থিকথিকে ভিড় সন্ন্যাসীকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য। কসমোপলিটান রাজধানী সে দিন হিন্দি ভাষাতেই জয়ধ্বনি তুলেছিল, ‘জয় পরমহংস রামকৃষ্ণ কি জয়’, ‘জয় স্বামী বিবেকানন্দ কি জয়’। ভিড় ঠেলে অভ্যর্থনা কমিটির সেক্রেটারি, ‘ইণ্ডিয়ান মিরর’ পত্রিকার সম্পাদক নরেন্দ্রনাথ সেন কোনও ক্রমে এগিয়ে গেলেন, তাঁকে বসিয়ে দিলেন স্টেশনের বাইরে অপেক্ষারত ল্যাণ্ডো গাড়িতে।
বিবেকানন্দ সেভিয়ার দম্পতিকে নিয়ে সেই গাড়িতে বসতেই একদল ছাত্র এগিয়ে এসে ঘোড়া দু’টোকে লাগাম থেকে খুলে নিজেরাই গাড়ি টানতে শুরু করল। সামনে ব্যাণ্ডপার্টি, মাঝে গাড়ি, আর পিছনে খোল-করতাল সহ কীর্তনের দল। সেলেব্রিটি বরণের এই রকম ইভেণ্ট আগে কখনও দেখেনি কলকাতা। তাঁকে বরণ করার জন্য রাস্তার দু’ধারে ফুল নিয়ে তখন কাতারে কাতারে মানুষ জড়ো হয়েছে। সার্কুলার রোডে ‘জয় স্বামীজি’ লেখা তোরণ, ওপরে নহবতখানা। হ্যারিসন রোডের মোড়ে আর একটা, রিপন কলেজের গেটে লেখা ‘স্বাগত’। কলকাতায় এদিন একটা ব্যবস্থা করা হয়েছিল। রাস্তায় কোনও সভা নয়, শুধু শোভাযাত্রা। ঠিক হয়েছিল, তাঁকে অভিনন্দন জানিয়ে সভা হবে ৯ দিন পরে, অর্থাৎ ২৮ ফেব্রুয়ারি। শোভাবাজার রাজবাড়িতে। বিস্তৃত প্রাঙ্গণ, অনেকেই সন্ন্যাসীর বক্তৃতা শুনতে পারবে।
বিবেকানন্দের গাড়ি দুপুরবেলায় পৌঁছল বাগবাজারে পশুপতিনাথ বসুর বাড়িতে। সেদিন সেখানেই তাঁদের দুপুরের খাওয়ার বন্দোবস্ত করা হয়েছে। অতঃপর বরাহনগরে গোপাললাল শীলের বাগানবাড়ি। বিদেশি শিষ্যদের সেখানে রেখে তিনি চললেন আলমবাজার।
সাত বছর আগে যে দিন তিনি বেরিয়েছিলেন, মঠ ছিল বরাহনগরের এক পোড়ো বাড়িতে। পরে ১৮৯২ সালে তরুণ সন্ন্যাসীরা চলে আসেন আলমবাজারের এই বাড়িতে। বিবেকানন্দ তখন খেতড়িতে। খবরটা পান চিঠিতে। এই ১৯ ফেব্রুয়ারি আলমবাজার মঠে তাঁর প্রথম পদার্পণ। প্রবেশদ্বারে কলাগাছ, আম্রপল্লব সহ জলভরা কলসি সাজিয়ে রেখেছেন সতীর্থ অখণ্ডানন্দ ও রামকৃষ্ণানন্দ। অন্যরা কলকাতা গেলেও এই দুই গুরুভাই সারা দিন থেকে গিয়েছেন মঠে, তৈরি হয়েছে ছোটখাটো এক তোরণও। তাঁকে দেখতে ভিড় জমিয়েছেন অগণিত মানুষ। কলকাতায় ফিরে তিনি দিনের বেলায় বিদেশি শিষ্যদের কাছে, গোপাল লাল শীলের বাগানবাড়িতে থাকেন। রাতে আলমবাজার। কখনও শাস্ত্রচর্চা, কখনও বা জানলায় হ্যামক টাঙিয়ে বই পড়েন। মাঝে মাঝে গুনগুন করেন গীতগোবিন্দের গান।
ফেরার তিন-চার দিন পর বাগবাজারে প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতে মধ্যাহ্নভোজের নিমন্ত্রণ এল। সেখানেই চাঁদা নিতে হাজির গোরক্ষিণী সভার এক প্রচারক। ঘটনাটা আজও বিখ্যাত। বিবেকানন্দ জিগ্যেস করেছিলেন, ‘মধ্যভারতে দুর্ভিক্ষে প্রায় আট লাখ লোক মারা গিয়েছে। আপনারা তাঁদের জন্য কিছু করছেন না?’ ভদ্রলোকের উত্তর, ‘না, ওটা ওঁদের কর্মফল।’ বিবেকানন্দের তৎক্ষণাৎ জবাব, ‘তা হলে গরুরাও নিজেদের কর্মফলে কসাইখানায় যাচ্ছে। আমাদের কিছু করার নেই।’ নাছোড়বান্দা ভদ্রলোক বললেন, ‘কিন্তু শাস্ত্র তো বলে, গরু আমাদের মা।’ বিবেকানন্দের উত্তর, ‘দেখেই বুঝেছি। তা না হলে এমন কৃতী সন্তান আর কে প্রসব করবেন?’
২৮ ফেব্রুয়ারি বিকেল চারটেয় শোভাবাজার রাজবাড়ির সভা। দালান উপচে পড়ছে মানুষের ভিড়ে। সেখানেই তিনি বললেন, ‘আজ সন্ন্যাসী ভাবে আসিনি, ধর্মপ্রচারক হিসেবেও নয়। এসেছি সেই কলকাতাবাসী বালক রূপে।…’ একটার পর একটা বক্তৃতা দিয়ে চলেছেন তিনি। কোনও বিরাম নেই। শোভাবাজার, স্টার থিয়েটার। ৭ মার্চ শ্রীরামকৃষ্ণের জন্মতিথি, এত বছর বাদে বিবেকানন্দ এলেন দক্ষিণেশ্বর। সেখানেও তাঁকে দেখতে মানুষের ঢল নেমেছে। শরীর দিচ্ছে না, কিন্তু মাথায় অনেক পরিকল্পনা। তৈরি করতে হবে শ্রীরামকৃষ্ণের নামে মঠ ও মিশন। কলকাতা আর মাদ্রাজে দু’টো সেবাকেন্দ্রও তৈরি করার কথা ভেবেছেন। জন্মতিথির পর দিনই শরীর সারাতে দার্জিলিঙের উদ্দেশে রওনা হলেন তিনি। সাত বছর পর কলকাতায় এসে বিবেকানন্দ থাকলেন মাত্র ১৬ দিন। ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে ৭ মার্চ।
কিন্তু শরীর-স্বাস্থ্যের কথা কবেই বা ভেবেছেন তিনি? শোভাবাজারে সভার তিন দিন আগেও মার্কিন শিষ্যা ওলি বুলকে একটি চিঠিতে লিখছেন, ‘এত ক্লান্ত, জানি না আর ছ’মাসও নিজেকে টানতে পারব কি না। তবে, কলকাতা আর মাদ্রাজে দু’টো সেবাকেন্দ্র তৈরি করতে হবে। মাদ্রাজের লোকেরা বেশ আন্তরিক। কলকাতার বড়লোকেরা স্রেফ দেশপ্রেমের কারণে এ বিষয়ে উৎসাহী, উৎসাহ কাজে পরিণত হবে বলে মনে হয় না।’ বিবেকানন্দ জানতেন, শুধু দেশপ্রেমের বুকনিতে কখনও চিঁড়ে ভেজে না।
এই কথাগুলি মনে রাখতেই আজ থেকে ১৩০ বছর আগের এই দিনটির সার্থকতা। তাঁর এই ত্যাগ-তিতিক্ষা এবং আত্মোৎসর্গই তাঁকে ভারতের ইতিহাসে এক চিরস্মরণীয় মহাপুরুষ এবং নবজাগরণের প্রতীক করে তুলেছে।
(তথ্যঋণ: মৃগতৃষ্ণা, কৌশিক মজুমদার; ফিরে এলেন বিবিদিষানন্দ, শুভাশিস ঘটক, আনন্দবাজার পত্রিকা)
লেখক পরিচিতি : অর্হণ জানা
অর্হণ জানা। জন্ম ৩১ ডিসেম্বর, ২০০৬। বর্তমান নিবাদ বড়জাগুলি, নদিয়া। ছোট থেকেই লিখতে ভালবাসি--- গান, গল্প, কবিতা, ছড়া, প্রবন্ধ। সুকুমার রায় আমার গুরু। আমার পথপ্রদর্শক। এযাবৎ কয়েকটি পত্রপত্রিকা ও সংকলন গ্রন্থে আমার লেখা কবিতা, প্রবন্ধ, গল্প ও ছড়া প্রকাশিত হয়েছে।

