সখীচরণের বাঁশি

লেখক: সুবীর সরকার

দেওচড়াই হাটের গানের আসর থেকে হেঁটে হেঁটেই বাড়ি ফিরছিল সখীচরণ। হাতে ধরা ছিল সেই চিরপুরাতন বাঁশিটি। তরলা বাশের বাঁশি। ছয় ছিদ্রের। এই বাঁশির আওয়াজ শুনলে পাষানের বুকেও আবেগের উচ্ছাস জাগে। খুনীর চোখেও জল আসে। এমনই এই বাঁশির মহিমা। প্রায় তিন কুড়ির দু’চার বছরের কম সময় ধরে এই বাঁশি সখীচরণের সম্পদ। দেশ দুনিয়ায়, গা-গঞ্জের সকলেই সখীচরণের বাঁশির মহিমা জানে। হাটবারগুলিতে হাটের ভেতর এই কারণেই সখীচরণের অতিরিক্ত খাতিরদারী জোটে। শিঙ্গারা, জিলিপি, চা, সিগার সব মিলে যায়। খালি একটু বাঁশিতে ফুঁকে দেওয়া, আর কি। সখীচরণের বাবা ছিল এলাকার মস্ত গিদাল। তার ছিল গানের দল। পালাগানের দল। সবাই বলতো কালুচরণের দল। জোতদার জমিদার মাতব্বরের ঘর থেকে নিয়মিত বায়না আসতো। কালুচরণ ঘুরে বেড়াতেন গঞ্জের পর গঞ্জের পরিধী জুড়ে। মাঝে মাঝে সঙ্গে নিতেন ছোট্ট সখীচরণকে। তখন শুরু হয়েছে সখীর বাঁশি বাজানোর তালিমপর্ব। সেই সময় একবার সাহেবপোঁতার সুখেশ্বর দেউনিয়ার বাসায় গানের দল নিয়ে পালা গাইতে গিয়েছিলেন কালুচরণ তার দল নিয়ে। ছিল সখীও। বাচ্চা সখীচরণের বাঁশি শুনে দেউনিয়া সখীচরণকে উপহার দিয়েছিল এই বাঁশিটি। তারপর কত কত দিন পার হয়ে গেল। কালুচরণ মারা গেল। জোতদারী আইন পাশ হলে জোতদারীও চলে গেল। ভরভরন্ত নদীর বুকে জেওগে উঠলো বিরাট বিরাট সব চর। গানের দল ভেঙে গেলেও সখীচরণ নূতন করে আবার দল বানালেন। এদিক সেদিক বায়নাও জুটতে লাগলো। এখন আবার ভোটের আগে ভোটের লোকেরা তাকে দিয়ে গাওয়াতে শুরু করলো ‘ভোটের গান’। সখীচরণের বয়স বাড়লো। দিনদুনিয়ায় কত কত বদল এলো। কিন্তু সখীচরণের বাঁশিটি কিন্তু থেকেই গেল। বাঁশিটি ক্রমে মিথের মতো, দুঃখসুখের গানের মতো চিরকালীনতাই বুঝি বহন করতে থাকলো। তবে কি সখীচরণের এই বাঁশিটি ডাকাতিয়া বাঁশি!কিংবা ডাকাতি করতে এসে বাঁশি শুনেই পালিয়ে যেতে থাকা মোকাম্মেল ডাকাতের সেই কিসসাটি সখীচরণের বাঁশিবৃত্তান্তের চিরস্থায়ী অংশ হয়েই স্থির হয়ে বসে থাকে!এই প্রায় মধ্যরাতের চাঁদের আলোয় ভেসে যেতে থাকা গ্রামীন পথে বাড়ি ফিরবার এই সময়ে সব কিছুই তার প্রবীন চোখের সামনে স্পষ্ট দেখতে থাকেন সখীচরণ। তার ভ্রম ও বিভ্রমের ভেতর দিয়ে সবকিছুকে অথবা বাঁশিটিকে মান্যতা দিতে গিয়েই হয়তো সখীচরণ নিজের অজান্তেই বাঁশিটিতে ফুঁ দেন। আর সমস্ত চরাচরে ছড়িয়ে পড়ে গান —

“তরলা বাঁশের বাঁশি
ছিদ্র গোটা ছয়
ও বাঁশি কতই কথা কয়”

অলৌকিক চরাচরের ভিতর এভাবেই নূতন এক অলৌকিকতার জন্ম হয়।


লেখক পরিচিতি: সুবীর সরকার
সুবীর সরকার। উত্তরবঙ্গের কোচবিহারে তার জন্ম ও যাপন। নয়ের দশকে কবিতা লিখতে আসা এই কবি কবিতার পাশাপাশি নিয়মিত ভিন্নধর্মী গদ্য লিখে থাকেন। ইতিহাস ও লোকসংস্কৃতি অনুরাগী সুবীর সরকারের কবিতা ও গদ্যের কিছু বই রয়েছে। তার কবিতার বই নির্বাচিত কবিতা,বিবাহ বাজনা ও গান জংশন। পাশাপাশি গদ্যের বই উত্তর জনপদ বৃত্তান্ত এবং লোক পুরাণ। নিজের মতন করে নিজের রাস্তায় হেঁটে চলেছেন সুবীর।

শেয়ার করে বন্ধুদেরও পড়ার সুযোগ করে দিন

One Comment

  1. অর্ঘ্য দে

    এটি প্রবন্ধ নিবন্ধ নয় শুধু। আস্ত একটি রূপকথার গল্প। যার পরতে পরতে মাটির, হওয়ার গান গন্ধ লোগে আছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.