মৃণাল সেনকে শ্রদ্ধা জানানোর যোগ্য কি আমরা?

লেখক : অলভ্য ঘোষ

মৃণাল সেনকে নিয়ে দেখছি সোশ্যাল মিডিয়ায় খুব লেখালেখি হচ্ছে, সিনেমা হচ্ছে। মৃণাল সেন শতবর্ষ, সত্যজিৎ শতবর্ষ, তাঁদের নিয়ে সিনেমা। বাঙালি কবে ঘি দিয়ে ভাত খেয়েছিল, সেই হাতের গন্ধ এখনও শুঁকছে। নস্টালজিক হয়ে পড়ুন, খুব ভাল। মৃণাল সেনের জীবন দিয়ে, মৃণাল সেনের সিনেমা দিয়ে আমরা কি কিছু শিখতে পেরেছি?

ইউরোপের নিউ-ওয়েভ সিনেমা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ভারতের যে চলচ্চিত্র নির্মাতা হাতে ক্যামেরা নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়েছিলেন, তিনি মৃণাল সেন। তাঁর শুরুর দু’টি সিনেমা প্রথাগত বাংলা সিনেমার মতই ছিল। ১৯৫৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত মৃণাল সেন পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র ছিল ”রাত-ভোর”। অভিনয় করেছিলেন উত্তম কুমার, সাবিত্রী চ্যাটার্জী, ছবি বিশ্বাস, জহর রায় প্রমুখ। তিন বছর পরে ১৯৫৮ সালে মুক্তি পায় তার ”নীল আকাশের নীচে”। স্টার কাস্টিং থেকে সরে এলেন। এই সিনেমার হিরো কালী বন্দ্যোপাধ্যায়। কলকাতায় অধিষ্ঠিত এক চীনা ফেরিওয়ালাকে নিয়ে গল্প। দেশ-কাল-সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে সার্বজনীন হতে চাওয়া শুরু করলেন। এই ছবির প্রযোজক এবং সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। যদিও ছবিতে গানের ব্যবহার মৃণাল সেন চাননি বলেই শোনা যায়, এটা একান্ত হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের ইচ্ছেতেই হয়েছিল। তবু এই ছবির একটি কালজয়ী গান আজও সমাদৃত হয়।

”নীল আকাশের নীচে এই পৃথিবী, আর পৃথিবীর ‘পরে ওই নীল আকাশ। তুমি দেখেছ কি?”

এই গানের ভিতরেই বোঝা যাচ্ছে একটা সার্বজনীনতা, একটা ইউনিভার্সাল হয়ে ওঠার কি প্রবণতা, আর্তি রয়েছে ছবির মধ্যে। দ্বিতীয় ছবি থেকেই মৃণাল সেন আন্তর্জাতিক হয়ে ওঠার চেষ্টায় লেগে পড়লেন, জঁ-লুক গদার, ফ্রঁসোয়া রোলঁ ত্রুফোদের মতো। মৃণাল সেন অগ্রসর হতে শুরু করলেন ভারতবর্ষে এক নতুন ধারার সিনেমার দিকে। ভারতবর্ষের রন্ধ্রে রন্ধ্রে একটা গালগপ্পো শোনার মহাভারতীয়-রামায়ণী প্রচলন চিরকাল। সেখানে জঁ-লুক গদারের মত সিনেমায় প্রাবন্ধিকতা করা অত্যন্ত কঠিন। তবুও প্রথাগত অনেক কিছুই ভেঙে দুমড়ে মুচড়ে ফেলে দিয়ে মৃণাল সেন তাঁর দেশজ চোখ দিয়ে সারা পৃথিবীর নিরিখে পরীক্ষামূলক ভারতীয় সিনেমা নির্মাণের নতুন ধারার সৃষ্টি করেন এবং তার মাধ্যমেই তিনি দেশের বিদেশের চলচ্চিত্রশিল্পে বিশেষ স্থান করে নেন।

চিদানন্দ দাশগুপ্তর কাহিনী অবলম্বনে ১৯৬০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত মৃণাল সেনের তৃতীয় ছবি ”বাইশে শ্রাবণ” দেখলেই বোঝা যায়, মৃণাল সেন কতটা প্রথাবিরোধী হয়ে ওঠার চেষ্টায় মেতে পড়লেন। বাঙালির রোমান্টিসিজমের গোড়ায় কুঠারাঘাত করতে চাইলেন। ছবির নাম তেইশে শ্রাবণ; চব্বিশে শ্রাবণও হতে পারত। বাইশে শ্রাবণ কেন? বাইশে শ্রাবণ তো বাঙালির একটি বিশেষ দিন, বাঙালির বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রয়াণ দিবস। এই ছবি কি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রয়াণ নিয়ে ছবি?মোটেই নয়।

”অদ্য আমাদের বিবাহের এক বৎসর পূর্ণ হইল।”

বাইশে শ্রাবণ কারও বিবাহবার্ষিকী হতে পারে, এ কথা তোমরা ভাবছ না। কবি, শিল্পী, চলচ্চিত্রনির্মাতার কাজই তো হল ভাবানো – সুড়সুড়ি দেওয়া নয়, আরাম দেওয়া নয়।

”দেশের মানুষগুলোকে না খেতে দিয়ে তিল তিল করে মেরে ফেলা। এগুলো কোন আইনে লেখা আছে?”

রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু নিয়ে যেদিন কুম্ভীরাশ্রু বিসর্জন করছে আম বাঙালি, মাধবী মুখোপাধ্যায়-জ্ঞানেশ মুখোপাধ্যায় অভিনীত “বাইশে শ্রাবণ” মৃণাল সেনের পরিচালিত যুদ্ধের‌ পটভূমিকায় একটি বাস্তবধর্মী চলচ্চিত্র। আম মানুষের গল্প বলেছেন মৃণাল সেন সেই বাইশে শ্রাবণে। দুঃখে, দুর্দশায়, দারিদ্রে ভেঙে যাচ্ছে কত সংসার। মানুষের জীবনের হাহাকার-আর্তনাদ ফুটে উঠেছে তাঁর ছবি জুড়ে। রবীন্দ্রঅশ্রুমাখা চোখগুলো সে সব কি দেখতে পাচ্ছে না? এ কি রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর চাইতেও বাঙালির কম বড় শোক? কম বড় বেদনার? বাইশে শ্রাবণের প্রিয়নাথের বউয়ের মত বাঙালিও কি আত্মঘাতী নয়? এই ছবিতে কি মৃণাল সেন এই ইঙ্গিত করেননি? জানি না, বাইশে শ্রাবণ ছবিটি দেখে ক’জন এই বার্তা বুঝতে পেরেছেন।

আজও আমরা মৃণাল সেনকে বুঝতে পারিনি, বুঝতে পারবও না। শিল্পের সাথে আপসহীন এই শিল্পীকে তাঁর শতবর্ষে আমরা যে সম্মান দিচ্ছি, সেসব সম্মান অতি তুচ্ছ, ছেঁদো। তিনি রাজেশ খান্নাকে নিয়ে সিনেমা বানাননি। একটার পর একটা স্টারের জন্ম দিয়েছেন মৃণাল সেন। দারিদ্রের সাথে লড়াই করেছেন। অঞ্জন দত্তকে বাড়িতেই গাঁজা খেতে বলেছেন। এই সব মোটা দাগের কথা দিয়ে লোকটাকে অপমান করা ছাড়া আমরা কিছুই করিনি। আসলে লোকটাকে নয়, লোকটার আদর্শকে, দর্শনকে যতক্ষণ না আমরা মেনে নিতে পারছি, ধরতে পারছি, ততক্ষণ তো মৃণাল সেনের শতবর্ষে তাঁর যথার্থ সম্মানজ্ঞাপন হচ্ছে না। যা হচ্ছে, তা উপর উপর লোকটাকে ছুঁয়ে যাওয়া। কেউ ভিতরে ঢুকে লোকটার এই বৃহৎ হৃদয় ছুঁয়ে দেখছে না, আত্মাকে স্পর্শ করছে না।

তাঁর জীবিত কালেই অঞ্জন দত্ত যখন ব্যোমকেশ বানাচ্ছেন, বং কানেকশন বানাচ্ছেন, সেইসব সিনেমা দেখে মৃণাল সেন কি তাঁর শিষ্যকে নিয়ে ভাবাবেগে আপ্লুত হয়ে পড়তেন? কখনই না। তিনি কষ্ট পেতেন। অঞ্জন দত্ত গান গেয়ে যা পয়সা পান, তাতে তাঁর পেটের ভাত হয়ে যায়। বাড়ি-গাড়ি-ছেলের ভবিষ্যৎ এবং আরও কিছুর জন্যই সিনেমাটা করেন। এটা কি আপনি অস্বীকার করবেন অঞ্জন বাবু? আর এখানেই মৃণাল সেন আপনাদের থেকে আলাদা। তিনি সিনেমা করেছেন এক আত্মিক টানে। তিনি আপস করেননি। ভাতৃপ্রতিম অনুজ ফিল্মমেকাররা তাঁর বাড়িতে গেলে তিনি একটাই কথা জিজ্ঞেস করতেন।

“(গৌতম ঘোষ, অপর্ণা সেনদের) Compromise করোনি তো?”

সোশ্যাল মিডিয়া মৃণালময়। খুবই ভাল। কাউকে শ্রদ্ধা জানানোর অধিকার যে কারুরই থাকতে পারে। কিন্তু সে শ্রদ্ধা যথার্থ শ্রদ্ধা হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্ন করার অধিকারও তো থাকবে আমার মতো গুটিকয় অর্বাচীনদের। না না, আপনাকে মৃণাল সেনের মত কমিউনিস্ট হতে হবে, এমন কোনও কথা নয় অঞ্জনবাবু। ”হরিপদ একজন সাদামাটা ছোটখাটো লোক” বেশ ভাল তো। হরিপদ কেরানিদের মৃণাল সেন সিনেমায় যে উত্তরণ ঘটালেন, আপনার সিনেমায় কোথায় তারা? এখান থেকে দু’লাইন, ওখান থেকে চার লাইন টুকেটাকে ছবি বানিয়ে চলেছেন সৃজিত মুখোপাধ্যায়। মৃণাল সেন কি কষ্ট পাননি সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের (২০১২-এর চলচ্চিত্র) মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলারমূলক চলচ্চিত্র বাইশে শ্রাবণ দেখে?

আমরা কি মৃণাল সেনকে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য যথেষ্ট যোগ্য হয়ে উঠতে পেরেছি? নাকি একটা হিড়িক – বাঙালির নস্টালজিয়াকে জাগিয়ে তুলে কিছু বাণিজ্য করে নেওয়া, যেখানে মৃণাল সেন পদাতিক, কোরাস, মৃগয়া, ইন্টার্ভিউ, কলকাতা ৭১ – একটার পর একটা রাজনৈতিক সিনেমা বানিয়ে গিয়েছেন জীবনভর? কৌশিক গাঙ্গুলী এক সাক্ষাৎকারে বলছেন, ”জেলে কমোড নেই। তাই রাজনৈতিক ছবি করি না।” তার মানে আপনারা সেফ জোনে খেলবেন, থেবড়ে বসে জনগণের মাথায় হেগে দেবেন, সম্পর্কের গল্প, সম্পর্কে তৃতীয় ব্যক্তি, বুদ্ধদেব গুহ, খুব বেশি হলে সমকামিতা নিয়ে বৈপ্লবিক সিনেমা করবেন। কোনও ভাবেই আপনারা ঝুঁকি নেবেন না। পরীক্ষামূলক কিছু করবেন না। মৃণাল সেনের মত বাংলা সিনেমাকে আন্তর্জাতিক করে যেতে পারবেন না কান কিংবা বার্লিনের মতো চলচ্চিত্র উৎসবে।আপনারা সব শিওর শট খেলবেন। একটু বলবেন, মৃণাল সেন থেকে কীভাবে আপনারা প্রভাবিত হয়েছেন? নাকি হাসি, ভূত আর গোয়েন্দার একঘেয়েমি কাটিয়ে অনীক দত্তের ”অপরাজিত” সত্যজিতের বায়োপিকের সফলতার পর মৃণাল, ঋত্বিকদের মত চলচ্চিত্র নির্মাতাদের বায়োপিক বানানোর একটা হিড়িক লেগে গিয়েছে।

আমার সমস্যাটা হ’ল, আমি চুপ থাকতে পারি না। লিখব না লিখব না করেও কতগুলি কথা লিখে ফেললাম। ক্ষমা করে দেবেন।


লেখক পরিচিতি : অলভ্য ঘোষ
শ্রী রবি ঘোষ ও কমলা ঘোষের তিন পুত্রের মধ্যে মধ্যম পুত্র অলভ্য ঘোষ ১৯৭৬ সালের ১০ জুন কলকাতার টালিগঞ্জে জন্ম গ্রহণ করেন; ছোট থেকেই একরোখা অলভ্য প্রথাগত শিক্ষা সমাজ ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থাশীল-প্রতিবাদী। শিল্প কলা তার উপজীব্য হলেও ব্যতিক্রমী এই মানুষটি নিজেকে একজন সৈনিক বলে মনে করেন যার অস্ত্র কালি মাটি কলম। দেশে বিদেশের পত্র পত্রিকায় তার কাব্য, ছোটগল্প, প্রবন্ধ সসম্মানে প্রকাশিত হবার পর তিনি স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাণে আত্মমগ্ন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।