লেখক : সৈকত প্রসাদ রায়
১৯২৬ সালের ৩রা সেপ্টেম্বর ভবানীপুরের ৫১ আহিরিটোলা স্ট্রিটে মামার বাড়িতে জন্ম নেন অরুণকুমার চট্টোপাধ্যায়। বাবা সাতকরি চট্টোপাধ্যায় ও মা চপলা দেবী। দুই ভাই, এক দিদি—এই পরিবারেই তাঁর বেড়ে ওঠা। বাবা ছিলেন কলকাতার মেট্রো সিনেমার ফিল্ম অপারেটর। নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারে তাঁর শৈশব কেটেছিল। অভিনয় জীবনের সূচনা ও পরবর্তীকালের খ্যাতি, যা তাঁকে “মহানায়ক উত্তমকুমার”-এ পরিণত করেছিল, সে কথা সকলে জানেন। কিন্তু এখানে উত্তমকুমারের কিছু বিষয়ে আলোকপাত করব, যেগুলি সম্পর্কে অনেকেই তেমনভাবে জানেন না।
তাঁর অভিনয়ের গুণ এতটাই সমৃদ্ধ যে অন্যান্য গুণগুলো চাপা পড়ে গেছে। তিনি ভালো গান গাইতেন—এই কথা অনেকের জানা থাকলেও তাঁর সংগীত জীবন অনেকেরই অগোচরে থেকে গেছে। ভবানীপুরের বাড়িতে নিয়মিত গানের আসর বসত। চলচ্চিত্র পরিচালক ঋষিকেশ মুখোপাধ্যায়ের বাবা শীতল মুখোপাধ্যায় সেখানে টপ্পা গাইতেন। সেখান থেকেই গানের প্রতি তাঁর ভালোবাসার জন্ম।
পোর্ট কমিশনের চাকরির পাশাপাশি উত্তমকুমার গান শিখেছিলেন ধ্রুপদ, ধামার, খেয়াল, ঠুমরি প্রভৃতি সংগীতের শিক্ষা নেন দক্ষ সংগীতশিল্পী ও শিক্ষক নীদানবন্ধু বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে। প্রথম জীবনে উত্তমকুমার চকরাবেরিয়া স্কুলে গানের শিক্ষকতাও করেছিলেন।
উত্তমকুমারের সঙ্গে গৌরীদেবীর প্রেম এই গানের সূত্র ধরেই। উত্তমকুমারের বোন অন্নপূর্ণা দেবীর গানের স্কুলের বান্ধবী ছিলেন গৌরীদেবী। উত্তমকুমারের গানের গলার প্রশংসা বান্ধবীর কাছে করেছিলেন গৌরীদেবী, তাঁদের প্রেমের সূত্ৰপাত এখান থেকেই। তাঁর পাড়ার এক বন্ধু ডাক্তার লালমোহন মুখোপাধ্যায়ের লেখার থেকে জানা যায়, ১৯৪৬-৪৭ সালের উত্তাল সময়ে তিনি নিজে লেখা ও সুর করা গান রাস্তায় ঘুরে ঘুরে গাইতেন।
এক সময় উত্তমকুমার তাঁর সিনেমা না চলার কারণে “ফ্লপ মাস্টার” উপাধি পেয়েছিলেন। সেই সময় পরিচালক নির্মল দে তাঁর বসু পরিবার ছবিতে উত্তমকুমারকে সুযোগ দেন তাঁর গানের কারণেই। স্টুডিওতে বসে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া “চাঁদের বেণু বাজবে এবার” গানটি এতটাই অভিব্যক্তি দিয়ে, এত মর্মস্পর্শীভাবে গেয়েছিলেন উত্তমকুমার, যে দক্ষ পরিচালকটির নজরে তা পড়ে যায়।
চলচ্চিত্রে উত্তমকুমারের সংগীতপ্রতিভার বিকাশ খুব সামান্যই চোখে পড়ে। দেবকীকুমার বসু পরিচালিত “নবজন্ম” চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিচালক নচিকেতা ঘোষ সত্যি বৈষ্ণব পদাবলির পদ গাওয়ান উত্তমকুমারকে দিয়ে। কীর্তন গাইতে উৎসাহী মহানায়ক এত দরদ দিয়ে গানটি গেয়েছিলেন যে নচিকেতা ঘোষ সঙ্গে সঙ্গেই আরও সাতটি কীর্তনী উত্তমকুমারকে দিয়েই গাওয়ান। এই একটিমাত্র ছবিতেই গায়ক উত্তমকুমারকে পাওয়া যায়।
“আমার সোনার হরিণ চাই”, “তুমি কেমন করে গান করো হে গুণী”—এরকম বেশ কয়েকটি রবীন্দ্রসংগীত মেগাফোন কোম্পানির তত্ত্বাবধানে রেকর্ড করেছিলেন মহানায়ক। সিনেমার গানে ঠোঁট মেলানোয় তিনি এতটাই দক্ষ ছিলেন যে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, কিশোর কুমার, মান্না দে, শ্যামল মিত্রদের মত স্বনামধন্য শিল্পীদের গানও উত্তমকুমারের গান হয়ে যেত।
নিজের অভিনীত “কাল তুমি আলেয়া” সিনেমায় আমরা পাই সঙ্গীত পরিচালক উত্তমকুমারকে। গীতিকার ছিলেন স্বনামধন্য পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া “আমি চলে যাই” গানটি এক অভিনব সুরের মূর্ছনায় ভাসিয়ে নিয়ে যায়। এই গান গেয়ে গায়ক স্বয়ং হেমন্তবাবুও প্রশংসা করেছিলেন সঙ্গীত পরিচালক উত্তমকুমারের। “সব্যসাচী” ছবিতে তিনি দেশাত্মবোধক একটি গান গাইয়েছিলেন গায়িকা শিপ্রা বসুকে দিয়ে।
সংগীত জগতের পাশাপাশি আধ্যাত্মিক জীবনও মহানায়কের জীবনের এক উজ্জ্বলতম দিক। ছোটবেলা থেকেই তিনি ভগবানের নিয়মিত উপাসক ছিলেন ও পূজার্চনায় অংশ নিতেন। পরবর্তীকালে অভিনয় জীবনের ব্যস্ততা বাড়লেও আধ্যাত্মিক জীবনের আগ্রহ বিন্দুমাত্র কমেনি।
নিজের জীবনের দুঃখ, হতাশা ও বিতর্ক সামলে রাখার মূল ভিত্তি ছিল তাঁর আধ্যাত্মিক চর্চা। এর ফলেই চরম সাফল্যও তাঁকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারেনি। “অনিত্যতার দর্শন” তাঁকে মানুষ হিসেবে আরও পরিণত ও মহান হতে বিশেষ সাহায্য করেছে।
শিল্পীর শিল্পের বিকাশের ক্ষেত্রে আধ্যাত্মিক বিকাশ অপরিহার্য—এই কথায় তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন। জানা যায়, দক্ষিণেশ্বর ও বেলুড় মঠের বেশ কিছু অধ্যক্ষের সঙ্গে তাঁর নিবিড় যোগাযোগ ছিল। তিনি প্রায়শই বেলুড় মঠে গিয়ে একা সময় কাটাতেন এবং মহারাজদের সঙ্গে আধ্যাত্মিক আলোচনায় যুক্ত হতেন।
ধর্মগ্রন্থ ছাড়াও বিভিন্ন দার্শনিক লেখাপড়ার প্রতি তাঁর টান ছিল চোখে পড়ার মত। হাজার ব্যস্ততার মধ্যেও ধূপ-ধুনো জ্বালিয়ে পূজাপাঠ করায় তাঁর কোন খামতি ছিল না। তিনি অভিনয়ের বাইরে গিয়েও মাঝেমাঝেই আধ্যাত্মিক চিন্তায় নিজেকে নিমগ্ন রাখতেন। মহানায়ক উত্তমকুমারের জীবনে ক্যামেরা প্রধান হ’লেও, মানুষ উত্তমকুমারের জীবনের প্রধান বিষয় ছিল আধ্যাত্মিকতা। ঈশ্বরচিন্তাই ছিল তাঁর জীবনের মূল চালিকা শক্তি। তাঁর এই আধ্যাত্মিক চেতনা আজও আমাদের সকলকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে।
মহানায়ক উত্তমকুমার কেবল পর্দার একজন রোমাণ্টিক নায়ক ছিলেন না, বরং ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি ছিলেন একটি অসাধারণ মানবিক ব্যক্তিত্ব। চলচ্চিত্র জগতে তাঁর চিত্রায়ন করা রোমান্সের পাশাপাশি, বাস্তব জীবনে তিনি সবসময় মানুষকে ভালোবাসতেন, সহানুভূতিশীল ছিলেন এবং সামাজিকভাবে দায়বদ্ধ ছিলেন। এই দিকগুলো তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে শুধু একজন তারকা নয়, বরং প্রিয় ও প্রেরণাদায়ী মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
উত্তমকুমারের মানবিকতার একটি বড় দিক প্রকাশ পায় তাঁর সহকর্মী ও শিল্পীদের প্রতি সমর্থনে। তিনি নিজের স্টারডমকে ব্যবহার করে ইণ্ডাস্ট্রির সদস্যদের সহায়তায় কাজ করেছেন। তিনি ‘শিল্পী সংসদ’ নামক একটি সংগঠন গঠন করেছিলেন, যা বিশেষভাবে অবসরপ্রাপ্ত শিল্পীদের পেনশন ও আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করত। শিল্পীদের জন্য এই ধরনের কাজ প্রমাণ করে যে, উত্তমকুমার শুধুমাত্র নিজের জন্য নয়, পুরো শিল্পী সম্প্রদায়ের জন্যই চিন্তাশীল ছিলেন।
নতুন ও সংগ্রামী অভিনেতাদের প্রতি তার সহানুভূতি ছিল অন্য মাত্রার। নিজের শুরু জীবনের কঠিন দিনগুলোকে কখনও ভুলে না যাওয়ায় তিনি সব সময় নতুনদের উৎসাহিত করতেন। বহু প্রয়োজনে ব্যক্তিগতভাবে পরামর্শ দিতেন, তাদের মানসিক সাহস জুগাতেন এবং সুযোগের ক্ষেত্রে সহযোগিতা করতেন।
পরিচালক মাধবী মুখোপাধ্যায় উল্লেখ করেছিলেন, উত্তমকুমার ছিলেন এক সম্পূর্ণ অভিনেতা এবং উদার মনের মানুষ। তিনি বিশ্বাস করতেন, “প্রথমে আমাকে মানুষকে ভালোবাসতে হবে।” এই নীতি তাঁর জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিফলিত হয়েছে। মাধবী আরও জানান, তিনি নীরবে প্রোডাকশন টিমের সদস্যদের বিপদের সময় সাহায্য করতেন, কখনও তা প্রকাশ্যে আসতো না, বরং একটি মানবিক সহানুভূতির নিদর্শন হিসেবে।
উত্তমকুমারের মানবিকতার আরেকটি দিক ছিল সামাজিক কাজ ও দায়বদ্ধতা। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য তহবিল সংগ্রহের উদ্যোগে তিনি সবসময় সক্রিয় ছিলেন। কোন চলচ্চিত্র সংক্রান্ত অনুষ্ঠানে বা ত্রাণ তহবিল সংগ্রহের প্রচেষ্টায় তিনি নিজে কলকাতার রাস্তায় নেমে সাধারণ মানুষের কাছে অনুদান চাইতেন। তাঁর এই দৃষ্টান্ত প্রমাণ করে যে, তিনি নিজের জনপ্রিয়তা ও প্রভাবকে কেবল ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য ব্যবহার করতেন না, বরং সমাজের জন্যও অবদান রাখতেন।
নারী অধিকারের প্রতি তাঁর সমর্থনও উল্লেখযোগ্য। তিনি একজন প্রগতিশীল চিন্তাধারার মানুষ ছিলেন। তার অভিনীত অনেক চলচ্চিত্রে দেখা যায় শক্তিশালী, স্বাধীন নারী চরিত্র, যা তার বিশ্বাস ও নারী ক্ষমতায়নের প্রতি সমর্থনের প্রকাশ। তিনি চাইতেন নারীরা সমাজে স্বনির্ভর ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে থাকুক। তিনি ধর্মীয় সম্প্রীতির বিষয়েও প্রতিশ্রুতিশীল ছিলেন। তিনি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনে বিশ্বাস করতেন এবং বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষদের মধ্যে সংহতি বজায় রাখতে চেষ্টা করতেন। ১৯৪৬ সালের কলকাতার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময়ও তিনি শান্তি প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিলেন।
উত্তমকুমারের মানবিকতার অন্য একটি দিক প্রকাশ পায় তাঁর দেশপ্রেমে। তিনি ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। ১৯৪৫ সালে সুভাষ চন্দ্র বসুর আজাদ হিন্দ ফৌজের ত্রাণ তহবিলের জন্য তিনি একটি নাটক মঞ্চস্থ করেছিলেন। এই নাটক থেকে অর্জিত অর্থ তিনি দান করেছিলেন, যা প্রমাণ করে যে, তিনি নিজের কেরিয়ার ও সুবিধার চেয়ে দেশের প্রতি দায়বদ্ধতাকে বেশি গুরুত্ব দিতেন।
উত্তমকুমারের এই মানবিক ও সামাজিক দিকগুলো তাঁকে শুধুমাত্র একজন সফল অভিনেতা হিসেবে নয়, বরং একজন মহান মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। সহকর্মী ও শিল্পীদের প্রতি সহানুভূতি, সামাজিক দায়বদ্ধতা, নারী ও মানবাধিকারের প্রতি সমর্থন, এবং দেশের প্রতি প্রগাঢ় ভালবাসা—এই সমস্ত গুণই তাঁকে আজও কোটি মানুষের কাছে প্রেরণার উৎস করে রেখেছে। তাঁর জীবন ও কাজ আমাদের শেখায়, সত্যিকারের সাফল্য কেবল খ্যাতি ও অর্থে নয়, মানুষের প্রতি সহানুভূতি ও ভালবাসার মধ্যেও নিহিত।
জন্মশতবর্ষে মহানায়ককে জানাই আমার ভক্তিপূর্ণ প্রণাম। তাঁর আদর্শেই পরবর্তী প্রজন্ম এগিয়ে চলুক—এইটুকুই প্রার্থনা।
(তথ্যসূত্র: অরুণ আলোর অঞ্জলি – কান্তিরঞ্জন দে)
লেখক পরিচিতি : সৈকত প্রসাদ রায়
নদীয়া জেলার রানাঘাট নিবাসী সৈকত প্রসাদ রায় আধ্যাত্মিক ও সামাজিক বিষয় নিয়ে লেখেন। তিনি সারদা মা-কে নিয়ে লিখেছেন বই “Teachings of The Holy Mother”, ও "মমতাময়ী মা" যেখানে সারদা মার জীবন, আদর্শ ও শিক্ষা নিয়ে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এছাড়া তিনি মাদার টেরেসা-কে নিয়ে লিখেছেন বই “The Universal Love of Mother Teresa”, যেখানে মানবতার প্রতি মাদার টেরেসার অমোঘ প্রেম এবং দয়ালু কর্মকাণ্ড তুলে ধরা হয়েছে।এছাড়া তিনি বিভিন্ন জনপ্রিয় সাহিত্যিক গল্পগ্রন্থ রচনা করেছেন, যার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হ'ল “সাতরঙা প্রেম”, যা পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করেছে। এছাড়া "নিয়তির খেলা" , "মাতৃরূপেণ" তার লেখা বইগুলোর মধ্যে অন্যতম। সৈকত প্রসাদ রায় বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নিয়মিত লেখালিখি করেন। এছাড়া তাঁর লেখা আনন্দবাজার পত্রিকা, বর্তমান পত্রিকা এবং অন্যান্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

