প্রাচীন কলকাতার দোল উৎসব

লেখক : মিত্রা হাজরা

।।প্রথম ভাগ।।

হোরি খেলিছে শ্রীহরি, সহ রাধা প্যারী কুঙ্কুম ধূম, শ্যাম অঙ্গ ভরি
পুষ্পমালা হিন্দোল সাজায়ে ব্রজনারী রাই-শ্যাম অনুপম, দোলে তদুপরি।

বলেছেন রূপচাঁদ পক্ষী। ফাগুনের আগুন রঙে যখন প্রকৃতি রঙিন হয়ে ওঠে, ঠিক তখন মনে ও লাগে রঙের ছোঁয়া। সে রঙের উৎসবে, আবেগে, আনন্দে মেতে ওঠার দিন এই দোল। বৈষ্ণব বিশ্বাস অনুযায়ী ফাল্গুনী পূর্ণিমায় বা দোল পূর্ণিমার দিনে বৃন্দাবনে শ্রীকৃষ্ণ আবির ও গুলাল নিয়ে রাধিকা ও অন্যান্য গোপীগণের সঙ্গে রঙ খেলায় মেতেছিলেন। দোলযাত্রার দিন সকালে শ্রীকৃষ্ণ ও রাধারানির মূর্তিতে আবির ও গুলালে স্নান করিয়ে দোলনায় চড়িয়ে কীর্তন গান সহযোগে শোভাযাত্রা বের করা হয়। এরপর ভক্তরা আবির ও গুলাল নিয়ে পরস্পরকে সাথে নিয়ে রঙ খেলেন। আবার এই দিন শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্ম হয়েছিল। তাই এই পূর্ণিমাকে গৌর পূর্ণিমা ও বলা হয়।

জোব চার্ণক ১৬৮৬-তে প্রথম কলকাতায় এসেছিলেন। কিন্তু থাকতে পারেন নি। ১৬৯০-তে ঘোর বর্ষায় আবার এলেন এখানে। তখন কলকাতা এক গন্ডগ্রাম। না ছিল বাবুরা, না অভিজাত সমাজ। তখন নবাগত ইংরেজ দের ঠাঁই ছিল কোনো তাঁবু বা নৌকায়। বেশ কিছু দিন থাকার পর ইংরেজ রা চাইল স্থানীয় মানুষদের সাথে মেলামেশা করতে। এ রকম এক বসন্তে কয়েকজন ইংরেজ গ্রামের ভিতর ঘুরতে ঘুরতে শুনলো কিছু অদ্ভুত সুরে গান হচ্ছে, সেই সুর অনুসরণ করে তারা পৌঁছে গেল এক বিশাল দীঘির পাড়ে। তারা দেখলো দীঘির উত্তরে ও দক্ষিণে দুটো উঁচু মঞ্চ বাঁধা। তার মধ্যে একটিতে গোবিন্দজী ও আর একটি তে রাধারানিকে সাজানো হয়েছে, ফুলে মালায়, বসনে, ভূষণে। আবির গুলালে জায়গাটা লাল হয়ে গেছে। মানুষ একে অপরের গায়ে রঙ দিচ্ছে, বসেছে মেলা, সাথে নাচ গান চলছে। ইংরেজ দের খুব ভালো লাগলো। তারা প্রাচীন গ্রিসের ‘স্যাটারনালিয়ার’-এর সাথে এই উৎসবের মিল খুঁজে পেল। তবে সেই সময় স্থানীয়রা এদের উৎসবে সামিল করলো না। ইংরেজরা সে সময় ব্যর্থ হয়ে ফিরে গেল।

পরে ইংরেজরা এ দেশে আসার পর ঔপনিবেশিকতার প্রভাবে যে নব্য বাবু সমাজ গড়ে উঠেছিল, তাতে দোল উৎসব প্রাধান্য পেল। যে বাবুরা দিনে ঘুমিয়ে, ঘুড়ি উড়িয়ে, বুলবুলির লড়াই দেখে রাত্রে বারাঙ্গনা নিয়ে নৃত্যগীতে আমোদ করে কাল কাটাতো, তাদের এই দোল উৎসবে যে জাঁকজমক হবে তা বলাই বাহুল্য। বাবু কালচারে দোলের বিবরণ দিতে গিয়ে ঈশ্বর গুপ্ত লিখছেন, ‘ক্রমে তে হোলির খেলা/নবীনা নাগরী মেলা ছুটে মুটে যায় এক ঠাঁই। যার ইচ্ছা হয় যারে/আবির কুঙ্কুম ও মারে পিচকারি কেহ দেয় গায়ে।’

লখনৌ এর নির্বাসিত নবাব ওয়াজেদ আলি শাহ যখন মেটিয়া বুরুজ এ এলেন, তিনি পাত্র মিত্র নিয়ে হোলি খেলতেন সাড়ম্বরে। নতুন নতুন গান রচনা করতেন। কলকাতার বিভিন্ন রাজবাড়িতে বসতো বাইজীর আসর। এমন এক আসরে ছিলেন বিখ্যাত বাইজী গহরজান। মেঝেতে পুরো আবির ঢেলে তার উপর জাজিম বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেখানে চলেছে নাচ, আসর শেষে জাজিম তুলে দেখা গেল সেখানে ফুটে উঠেছে রক্তলাল পদ্ম। পাথুরিয়াঘাটার রাজবাড়িতে বসতো ধ্রুপদী সংগীতের আসর। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ওস্তাদ ও পন্ডিতেরা এসে এই আসরে গান বাজনা করতেন।

।। দ্বিতীয় ভাগ।।

সন্ত কি শুধু কেবল ফোটা ফুলের মেলা রে
দেখিস নে কি শুকনো পাতা ঝরা ফুলের খেলা রে।

বলেছেন রবি কবি। বিলাসিতা আমোদ প্রমোদ যাই হোক না কেন, হিন্দু ধর্মে বিশ্বাসী এই সব নব্য বাবু ও অভিজাত সম্প্রদায় পুজো আচ্চা করতো ধুমধাম করে। বাংলার মন্দিরে মন্দিরে চলতো রাধাকৃষ্ণ আরাধনা। নানা রকমের মিষ্টান্ন তৈরি হতো ভিয়ান বসিয়ে, আর নানারকম সরবতে চলতো অতিথি আপ্যায়ন। সুতানুটি, গোবিন্দ পুর ও কলকাতা নিয়ে গড়ে উঠেছিল নগর কলকাতা। সুতানুটি অর্থাৎ তুলো থেকে সুতো তথা বস্ত্র নিয়ে কাজকারবার ও তার ব্যবসা প্রধান। গোবিন্দ পুর ছিল বর্তমান ফোর্ট উইলিয়াম ও সন্নিহিত গড়ের মাঠ অঞ্চল। আর কলকাতা ছিল কালিঘাট ভবানীপুর থেকে বড়িশা বেহালা অঞ্চল। এই অংশের মালিক ছিলেন সাবর্ণ রায় চৌধুরীরা। কলকাতা ফোর্ট যখন গড়ে উঠলো তখন গোবিন্দ পুর এর ব্যবসায়ী সম্প্রদায় উঠে গেলেন পাথুরিয়াঘাটা জোড়াসাঁকো অঞ্চলে। আর সুতানুটি অঞ্চলে রাজা, জমিদার, ইজারাদার প্রমুখেরা অট্টালিকা নির্মান, মন্দির নির্মাণ, রাধাকৃষ্ণ আরাধনা ,দোল দুর্গোৎসব করে আমোদ প্রমোদে মাততেন। বড় বড় বাগান বাড়িতে নাচ গান হুল্লোড়ের ব্যবস্থা থাকতো, ইংরেজরা এই সব সভাতে মজা লুটতো, খানা পিনাতে মেতে যেত। নব্য বাবু জমিদার শ্রেণীরা ইংরেজ দের নেমন্তন্ন করে আনতো, শুধু নিজেদের প্রতিপত্তি বাড়াতে। এর সাথে সাধারণের কোনো সম্বন্ধ থাকতো না। সাধারণ মানুষ তাদের নিজ এলাকায় নিজেদের মত করে উৎসব পালন করতো। দোলের আগের দিন সংশ্লিষ্ট বাগান বাড়িতে চাঁচর অর্থাৎ শীত হেমন্তের ঝরাপাতা, ভেঙে পড়া গাছের ডালপালা অগ্নিসংযোগ করে পরিস্কার করতো। এটাকেই নেড়াপোড়া বা চাঁচর বলা হয়। এটি রূপক অনুষ্ঠান, পৌরানিক ব্যাখ্যায় দৈত্যরাজ হিরণ্যকশিপু কৃষ্ণগত প্রাণ নিজ সন্তান ভক্ত প্রহ্লাদ কে আগুনে পুড়িয়ে মারতে চেয়েছিল। বোন হোলিকাকে এই ভার দিয়েছিল, কিন্তু দেখা গেল আগুনে হোলিকা পুড়ে মারা যায়, প্রহ্লাদ এর কিছু হয় না। সেই থেকে এই চাঁচর উৎসব পালন করা হয় দোলের আগের দিন।

আমরা ছোটবেলায় গ্রামে দেখেছি এই নেড়াপোড়া নিয়ে বাচ্চা বড় সকলের কি উৎসাহ !কাঁচা বেল, নারকেল, আম এ সব দিয়ে দেওয়া হতো, আর সেই বেলগুলো নারকেল গুলো ফাটতো দুমদাম। ছোটদের মজা দেখে কে! আসলে অশুভ শক্তি র বিনাশ বোঝাতে এটা পালন করা হয়। আর আগে চাইবাসায় দেখেছি সব কাঠ চাইতে আসতো এই নেড়াপোড়া উপলক্ষে আগের সপ্তাহ থেকে, যদি দেওয়া হলো ভালো, না দিলে কাঠের বেড়া, গেট, পুরানো কাঠের জিনিস সব রাতে চুরি করে নিয়ে চলে যেত। সে ভারি মজার জিনিস, সকালে উঠে দেখা গেল বাগানের গেট হাওয়া! আজকাল আর এসব হয় না, তবে একটা জিনিস এখানে এখনো আছে, ছোট ছোট ঘুঁটের মালা, প্রথম দেখে আমি তো অবাক, পরে দেখি কলকাতা তেও ঘুঁটের মালা বিক্রি হচ্ছে, এগুলো বেশ মজা লাগে আমার! এবার আসি পুরানো কলকাতার কথায়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দোল উপলক্ষে পাঁচ দিনের ছুটি ঘোষনা করতো সে সময়ে। দোল খেলার পর রাস্তাঘাট লালে লাল হয়ে যেত। ছোটরা বড়দের পায়ে আবির দিয়ে রঙ খেলায় মেতে যায়। দুপুরে এলাহি খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা,সন্ধ্যায় বসতো ঘরোয়া গানের আসর। নিধুবাবুর টপ্পা, যদু ভট্টের গান, বাইজী নাচ এই সব আমোদ প্রমোদে সন্ধ্যা কেটে রাত গড়াতো। এছাড়া কবিগান, তরজা, আখড়াই, হাফ আখড়াই, গানের ব্যবস্থা থাকতো, বেরতো জেলে পাড়ার সঙ। নাটক অভিনীত হতো—বসন্তলীলা, কংসবধ, হিরণ্যকশিপু বধ, প্রহ্লাদ চরিত, নাট্যমোদী সমাজ নাটক দেখতো। বৈষ্ণব রা কীর্তন গানে মেতে যেত, রাধাকৃষ্ণ বিগ্রহে ফুলসাজ ও বিশেষ ভোগ রাগের ব্যবস্থা হতো। সাদা গোলাপী, হলুদ রঙের বড় বড় বাতাসা তৈরি হতো, নানা রকমের নাড়ু, মুড়কি, কদমা, ছোলাকে চিনির রসে মাখিয়ে ফুটকড়াই বলা হয়, এটাও পুজোর প্রসাদ হিসাবে দেওয়া হয়, আর মাছ প্রজাপতি, ফুলের আকৃতির সব চিনির মন্ডা যাকে মঠ বলা হয় আজ ও পাওয়া যায় দোকানে, বাচ্চাদের হাতে দিলে বাচ্চারা আজ ও খুশিতে খায়। প্রসাদী হরির লুটের বাতাসা কুড়ানোর কাড়াকাড়ি, আর তার পরেই রঙে ডোবানো সব, রঙ মেখে ভূত!

তৎকালীন কলকাতার যে সব ধনী বাড়িতে দোল উৎসবে জাঁকজমক হতো সেটা বলি এবার। প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর, প্রসন্নকুমার ঠাকুর, রাজেন্দ্র লাল মিত্র, দিগম্বর মিত্র, বলরাম বসু, পশুপতি বসু, আশুতোষ দেব, নবীনচন্দ্র বসু, পীতরাম মাড়, বৈষ্ণব চরণ শেঠ, রাধাকান্ত দেব প্রমুখ। উপহার হিসাবে সুদৃশ্য বারকোষ, বা বড় বড় পিতলের পরাতে নানা রকমের মিষ্টান্ন, বিলাতী প্রসাধনী সামগ্রী, পুতুল, ঘর সাজানোর নানা জিনিস দেওয়া হতো স্মারক হিসাবে। আজ ও ফাল্গুনী পূর্ণিমায় রঙের উৎসব দোল পালন হয় তবে দিনকাল পালটে গেছে, এখন অন্য রকম দোল। আকাশ আমার ভরল আলোয়/ আকাশ আমি ভরব গানে সুরের আবির হানব হাওয়ায়/নাচের আবির হাওয়ায় হানে–রবি কবি। এই প্রজন্ম বসন্তের জন্য দিন গোণে না আজ,বসন্তের মন কেমন করা ঝরা পাতার শব্দ ঢেকে দেয় মোবাইল এর রিঙটোনে। কলেজের উঠতি কবি আজ তার কবিতার খাতা লুকিয়ে রাখে না, শুধু তার প্রেমিকার জন্য ।তবু বসন্ত আসে, আবির রঙে প্রকৃতি রাঙে, মন ও রাঙা হয়— স্মৃতি আল্পনা দেয় ফেলে আসা শৈশব কৈশোরের দিন গুলোর। এস এম এস থেকে ফেসবুক, হোয়াটস আ্যপ থেকে স্কাইপে রঙ না মেখেই দিব্যি’ হ্যাপি হোলি’! এখন রঙ ছড়ায় নেট দুনিয়া ।সম্প্রীতি বাহী, সংহতি সূচক এই উৎসব মানুষে মানুষে মিলন উৎসব, তাই ঋতু পরিবর্তন কে উপভোগ করে- ওরে গৃহবাসী খোল দ্বার খোল – বলে শুধু ঘরের দ্বার নয় মনের দুয়ার খোলার ও দিন এই দোল ও হোলি

লেখকের কথা: মিত্রা হাজরা
আমি মিত্রা, লেখালেখি করতে ভালোবাসি, কবিতা, ছোটগল্প লিখি মাঝে মাঝে। বই পড়তে ও গান শুনতে ভালোবাসি। পড়ি শংকর এর লেখা, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর লেখা, আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটগল্প আমার খুব প্রিয়। জীবনানন্দ দাশ, রুদ্রমুহম্মদ শহিদুল্লা, সুনীল, বিষ্ণু দে এর কবিতা পড়তে ভালোবসি । আমার লেখা পড়ে আপনাদের ভালো লাগলে বা খারাপ লাগলে অবশ্যই জানাবেন।

শেয়ার করে বন্ধুদেরও পড়ার সুযোগ করে দিন
  •  
  •  
  •  
  •  

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।