একটি সূর্য, সিগারেট ও চিরুনি

লেখক : হৃদয় হক

ঘুম থেকে উঠে গরম কাপড় পরে, নাস্তা সেরে, সোজা ছাদে চলে এলাম৷ এই শীতে রোদ না পোহালেই নয়। হ্যাঁ, অন্যান্য সকলের মতন আমিও রোদের প্রার্থী। সুকান্তের ভাষায় –

“হে সূর্য! শীতের সূর্য!
হিমশীতল সুদীর্ঘ রাত তোমার প্রতীক্ষায়
আমরা থাকি,”

সূর্যটা যে কালীনই হোক না কেনো, তার ভেতরকার ক্রিয়াকলাপ সব কালেই এক। তার তাপশক্তির প্রায় পুরোটাই উৎপন্ন হয় কেন্দ্রে। আমাদের পৃথিবীর যেমন আবহাওয়া মণ্ডলের নানান স্তর আছে, ঠিক তেমনি আছে সূর্যের নানান স্তর। কেন্দ্রের এই তাপশক্তি স্তরের পর স্তর পেরিয়ে, পরিশেষে ছড়িয়ে পড়ে মহাবিশ্বে, মহাকাশে।

ভাবি– কি ক্ষমতাধর শক্তিশালী এই গোলক। কতো দূর্বল ও অসহায় আমরা। একে ছাড়া প্রাণ বৃথা। আমরা জীব হয়েও অচল, ঐ জড় সূর্যের ভালোবাসা ছাড়া। সারা বছর আমরা যে পরিমাণ শক্তি ব্যয় করি, পৃথিবী মাত্র ৯০ মিনিটেই সে পরিমাণ শক্তি সূর্য থেকে পায়।

ছাদে বসে পিলারে পিঠ ঘেঁষে চারপাশের মানুষের আবহাওয়া দেখছি। কতোজন বেরিয়েছে কত-শত কাজে। ঠিক তখনই দেখি একলোক সিগারেট জ্বালালেন। আহ্ সিগারেট। দেখলে বা শুনলেই মাথায় ঘুরে-বেড়ায় – “এটি স্বাস্থ্যের জন্য হানিকর, এতে ক্যান্সার হয়”। প্যাকেটের গায়েও লেখা থাকে এই কথা। তবুও, কে শুনে কার বাণী? সিগারেট হলো ধূমপানের একটি রূপ। ভাবি – কোন ব্যাটার মাথায় ধূমপানের কুচিন্তা এসে সর্বপ্রথম বস করে?!

ধূমপানের ইতিহাস সুপ্রাচীন। সেই মায়ান সভ্যতায় এর দেখা মেলে। ধূমপানের মূলে যে তামাক তা সকলেরই জানা। তবে তামাক ছাড়াও সম্ভব। মায়ান সভ্যতায় এই তামাক ব্যবহার হতো ভেষজ উপায়ে, চিকিৎসার জন্য। আর ধূমপান? তাদের গুহাচিত্র থেকে জানা যায় মায়ান পুরোহিতরা ধূমপান করতো। তবে, বর্তমানে আমরা যে উদ্দেশ্যে করি সেই উদ্দেশ্যে নয়। তার বিশ্বাস করতো – ধূমপানের মাধ্যমে আত্মাদের সাথে যোগাযোগ করা যায়। পরবর্তীতে মায়ানরা আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়ে, সেই সাথে তামাক গাছও। আমেরিকা আবিষ্কারের পর সেখান থেকে তামাক এসে পৌঁছায় ইউরোপে।

মায়ানদের বিশ্বাসটি অদ্ভুত তাই-না? যুগে যুগে নানান সভ্যতার এসব বিশ্বাস সম্পর্কে জানতে আজকাল বেশ ভালো লাগে৷ সেকালে আমাদের পূর্বপুরুষদের চিন্তাভাবনা কেমন ছিলো – তা জানতে এসব পড়া যায়৷ কিংবা পড়া যায় আনন্দের জন্য, নিছক গল্প রূপে।

একালে সিগারেট যত্রতত্র পানকরা বারণ। নানান দেশে এর জন্য আছে আলাদা কক্ষ। তবে, এদেশে কে শুনে কার কথা? পাবলিক জাগায় নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্বেও মাথা উঁচিয়ে, বুক ফুলিয়ে যে যার যার মতো ধূমপান করে। নিজেরাতো ধূমপান করেই সাথে অধূমপায়ীদেরও করায়। রাস্তাঘাটে জ্বলতে থাকা সিগারেট থেকে ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে চারিদিকে। ভিড়ের মাঝে অসংখ্য অধূমপায়ীদের মাঝে একজন ধূমপায়ী তার নাকমুখ দিয়ে ছড়ায় ধূমপানের সহিত দূষিত বায়ু। ধূমপান যে শুধু মানুষের জন্য ক্ষতিকর তা নয়। ক্ষতিকর প্রকৃতির জন্য, জীবজগতের জন্য।

“ঢং ঢং ঢং………”, বেজে ওঠে সামনে একটু দূরেই একটি কেজি স্কুলের ঘণ্টা। হঠাৎ শব্দ শুনে ভাবনার ঘোর ভেঙে যায়। ঘণ্টার মানে অনেক সময় পেরিয়েছে। বসা থেকে ওঠে, আড়মোড়া ভেঙে বাসায় চলে আসি। আজ এক গুরুত্বপূর্ণ কাজে যেতে হবে। দেরি করলে চলবে না।

জামাকাপড় পড়ে চুল আঁচড়াতে দিয়ে শুরু হলো চিরুনি খোঁজ। চিরুনি নিখোঁজ হয়ে গেলে, তার খোঁজাখুজি কে আমি বলি চিখোঁজ। অনেককিছুর মধ্যে এই একটা জিনিস কখন কোথায় তার কোনো ঠিকঠিকানা নেই৷ কে জানে প্রাচীন কালে আমার মতো চিখোঁজা মানুষ ছিলো কিনা। তবে, চিখোঁজা মানুষ না থাকলেও চিরুনি ঠিকই ছিলো। তা-ও সেই প্রস্তর যুগ থেকেই।

অবশ্য তখনকার গুলি আমাদের বর্তমান চিরুনির মতো এতো সুসজ্জিত, সুগঠিত ছিলো না। থাকবার কথাও নয়। কারণ, সেগুলি বানানো হতো পাথর এবং নানান প্রাণীর হাড়গোড় দিয়ে। আরো পরে পশুর শিং দিয়েও চিরুনি বানানো হতো। এরো পরে আসে সেলুলোজ, প্লাস্টিকের চিরুনি। আমাদের যশোর কিন্তু ইতিহাসে চিরুনির জন্য সুবিখ্যাত। আর এর সাথে জড়িয়ে আছে মন্মথ বাবু’র নাম। মন্মথ বাবু’র প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

বহু খোঁজাখুজির পর অবশেষে চিখোঁজ মিশন সফল। কিন্তু চুল আঁচড়াতে গিয়ে হুট করেই হাত থেকে চিরুনি পড়ে গেলো। দেখে, নিজের অজান্তেই খিকখিক করে হেসে ফেলি। এদেশে হাত থেকে চিরুনি পড়ে যাওয়া নিয়ে একটি কুসংস্কার আছে। হাত থেকে চিরুনি পড়ে নাকি বাড়িতে মেহমান আসে। মনে পড়লো অনেক আগেকার পড়া ফেইসবুকের চিরুনি পড়ার একটি গল্প। অবশ্য তা চিরুনির নাকি থালাবাটির ঠিক মনে নেই। তবে আমি নিজের মতো বলি –

বাসায় অসময়ের মেহমান এসেছে। অতিরিক্ত খাবার নেই। নিজেদের জন্য যা রান্না হয়েছে তা দিয়েই মেহমানদারি করতে হবে। পরিবারের কেউ খেতে এলেই বুঝি খাবার কম পড়বে। বাড়ির মা তার স্বামীর এবং ছেলেমেয়েদের বললেন সামলিয়ে নিতে। কিন্তু মেহমানরা একা কিভাবে খায়? ডাকলেন তাদের, একসাথে খেতে। কিন্তু ওরা কেউ খেলেই যে কম পড়বে! মা জানালেন তিনি আগেই খেয়ে নিয়েছেন, স্বামী বুদ্ধি করে পাশের বাসার দাওয়াতের উছিলা দিয়ে পালালেন। ছেলে জানালো বন্ধুর বাসা থেকে খেয়ে এসেছে। আর বাড়ির মেয়ে? ওকেও জিজ্ঞেস করে উত্তর পেলো মায়ের সাথে খেয়ে নিয়েছে৷ তারপর মেহমানের একজন বললেন, তবে এত্তো আগে তোমরা খেয়েদেয়ে এতো কিছু রেঁধে রেখেছো কেন? আমরা যে আসবো তাতো জানাইনি কাউকে! তোমরাকি আগে থেকেই জানতে আমরা যে আসবো? তখন বাড়ির মেয়ে উত্তর দিলো, “হ্যাঁ! আজকে চুল আঁচড়াতে গিয়ে আমার হাত থেকে চিরুনি পড়ে গিয়েছিলো। মাকে জানালাম। মা’ই বলেছিলেন আজ তাহলে মেহমান আসবে।”

ঘড়িতে তাকাতেই দেখি অনেক সময় পেরিয়েছে। তাড়াতাড়ি চুল আঁচড়ে দে ছুট!

তথ্যসূত্র: ব্রিটানিকা ও উইকিপিডিয়া


লেখক পরিচিতি : হৃদয় হক
শিক্ষার্থী। সময়ে অসময়ে প্রধানত জ্যোতির্বিদ্যা নিয়ে লেখালেখি করি।

শেয়ার করে বন্ধুদেরও পড়ার সুযোগ করে দিন
  •  
  •  
  •  
  •  

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।