অম্বিকা (পর্ব – ২)

লেখক : দামিনী সেন

গত পর্বের লিঙ্ক এখানে

৪র্থ পরিচ্ছদ

মুখচোরা ছেলেটার গলা আবৃত্তিতে পেলে যে এতটা উদাত্ত হয়ে উঠতে পারে, তার কোনও আন্দাজই ছিল না ওদের কারুর। এমনিতে তো বসত ক্লাসের পিছনের দিকে; না, একেবারে পিছনে নয়, তার থেকে একটু আগে; সবসময়েই আরও একদঙ্গল ছেলেমেয়ের মাঝে, অতি সাধারণ গোবেচারা মুখে। ক্লাসে প্রফেসর জিজি যখন ওদের লেকচারের মাঝে প্রশ্নে প্রশ্নে অতিষ্ঠ করে তুলতেন, সামনের সারির অতি সিরিয়াস পড়ুয়া হিসেবে ওরা রীতিমতো হিমশিম খেয়ে যেত উত্তর হিসেবে স্যর ঠিক কী চাইছেন, তার কোনও আন্দাজ না পেয়ে, আর একেবারে পিছনের বেঞ্চের আনসার, সুদীপ্ত, তারিকদের মেধাবী ও স্মার্ট অ্যানসারগুলোও খালি মিসফায়ার করে পরিবেশকে আশঙ্কায় আরও ভারী করে তুলত, মাঝের নিরাপদ সারিতে নিশ্চিন্তে বসে থাকত ও গোলাগুলির আয়ত্তের বাইরে। ক্লাসের বাইরেও এমন কোনও সপ্রতিভ কিছুই কারুর চোখে পড়েনি, যাতে ও কোনওভাবে নজরের বৃত্তে এসে পড়ে।

সেই শ্যামলা মুখচোরা অতি সাধারণ জামাকাপড়ের ছেলেটাকেই যখন হাত ধরে এক কোণা থেকে টেনে এনে তন্নিষ্ঠা দাবি জানিয়েছিল, “একটা কবিতা শুরু কর দেখি”, ওরা নিজেদের মধ্যেই মুখ চাওয়া চাওয়ি করেছিল।

কলেজের অ্যানুয়াল ফেস্ট’এ ওদের ডিপার্টমেন্ট থেকে কী কী করা যেতে পারে সেই নিয়েই তখন তোলপাড় চলছিল ওদের মধ্যে। যথারীতি এসব ক্ষেত্রে যা হয়, আলোচনায় উঠে এসেছিল কিছু ক্লিশে ধরনের রবীন্দ্রসঙ্গীত ও নৃত্যকলা, যার সাথে ওদের যাপিত উচ্চকিত জীবনের বাস্তবে কোনও যোগই ওরা তখনও পর্যন্ত খুঁজে পায়নি; আর অন্যদিকে কিছু চটুল মিমিক্রি, হাস্যকৌতুক এবং নৃত্য – ওদের মুহূর্তপ্রিয় জীবনের সাথে ভীষণ মানানসই, চলতি জনপ্রিয় টিভি প্রোগ্রামের অনুসারী আর ওদের মতে ভীষণ উপভোগ্য।

কিন্তু গোল বেধেছিল অন্য জায়গায় – মঞ্চে বিচারক মণ্ডলীতে এবং শ্রোতাদের মধ্যেও বেশ কিছু প্রাক্তনী, কেষ্টবিষ্টু, অভিভাবক এবং অধ্যাপকদের উপস্থিতি। তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে ওদের পছন্দের বিষয়গুলোকে নন-ভেজ ছেঁটে ছেঁটে ক্রমাগত ম্যাড়ম্যাড়ে করে তোলা ছাড়া আর উপায়ই বা কী।

ফলে সত্যিকারের আকর্ষণীয় কী করা যেতে পারে, তাই ভেবে ভেবে যখন সকলের মাথার চুল ছেঁড়ার উপক্রম, তখনই তন্নিষ্ঠার হঠাৎ ঐ কাণ্ড।

ওর অপ্রতিভ মুখের দিকে চেয়ে বিরস মুখে একটা উদারতার ভাব এনে প্রশান্ত বলেছিল, “দেখ, বিকেল হয়ে আসছে। হাতে বেশি সময় নেই। ঝটপট শুনিয়ে ফেল দেখি, কী শোনাবি।”

“হ্যাঁ, শুরু কর”, উৎসাহ জুগিয়েছিল তন্নিষ্ঠা।

“যাব্বাবা। একটা কবিতা বলবে, তার জন্যও আবার এর পায়ে এত তেল মালিশ করতে হবে নাকি !” দ্বিধাগ্রস্ত মুখে  তখনও ওকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ফুট কেটেছিল তারিক। তারপর পকেট থেকে রুমালটা বের করে ঘাড়ের উপর ফেলে হাত জোড় করে রীতিমতো নাটুকে গলায় একটু নিচু হয়ে বলে উঠেছিল, “গলবস্ত্র হয়ে হাত জোড় করে অনুরোধ করা হচ্ছে মহাশয়কে, একটি আবৃত্তি পরিবেশন করে এই অধমদের বাধিত করুন।” সকলে হেসে উঠেছিল হো হো করে।

আরও যেন খানিকটা ঘাবড়ে গিয়েছিল শুভ্রজিৎ।

শেষপর্যন্ত তন্নিষ্ঠা ওর হাতটা চেপে ধরে একটু সাহস জোগাতে নিতান্তই নিচু স্বরে শুরু করেছিল ও, “দেখিনু সেদিন রেলে” –

কবিতা যত এগোতে শুরু করেছিল, খুলতে শুরু করেছিল ওর গলাও। কখনও ঊঠে যাচ্ছিল চড়ায়, কখনও নেমে আসছিল খাদে; এইমুহূর্তের আশ্চর্য নিস্পৃহ গলায় পরমুহূর্তেই ঝরে পড়ছিল কখনও বা তীব্র ব্যঙ্গ, দ্বেষ, কখনও অবদমিত কান্না, আবার কখনও বা উদাত্ত আহ্বান। কবিতার পর কবিতা। কখনও ছোটবেলায় পাঠ্য বইয়ে পড়া নিতান্ত বিরস কিছু এবড়োখেবড়ো লাইন – কঠিন ও প্রাণহীন, কখনও বা একেবারেই অপরিচিত, ওদের যাপিত জীবনবৃত্তের অনেক বাইরে থেকে পেড়ে আনা কিছু কবিতা। কিন্তু ওগুলো যে এত জীবন্ত, ওদের এত কাছের, যেন ওদের নিজেদেরই বলা কিছু কথা, ওদের ভিতর যে লুকিয়ে আছে এতটাই স্নিগ্ধতা, বেদনা, মিষ্টত্ব ও আগুন – কোনও আন্দাজই ছিল না ওদের কারুর কাছে। গ্রাম থেকে আসা, শ্যামলা, মুখচোরা, তুচ্ছ, সাধারণ একটি ছেলের কন্ঠ হঠাৎই ওদের এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল এমন এক বন্ধ দরজার সামনে, সামান্য ফাঁক পেতেই যার ওপাশের রং ও ঐশ্বর্য যেন ওদের হতবাক করে দিয়েছিল; একরাশ মুগ্ধতার মধ্যে হঠাৎই ওরা টের পেয়েছিল ওদের নিজেদের  অনুভূতির সীমাবদ্ধতা, আর তার বাইরে পড়ে থাকা এক বিশাল জগতের অস্তিত্ব, যার বিপুল বিস্তারের সামনে এসে পড়ে ওরা কেমন মোহগ্রস্ত হয়ে দাঁড়িয়েছিল। নজরুল থেকে শঙ্খ ঘোষ, জীবনানন্দ থেকে কৃষ্ণা বসু, সুভাষ মুখোপাধ্যায় – কখন যে বাইরে বিকেল বিদায় নিয়ে নেমে এসেছিল ‘সন্ধ্যে নামার একটু আগের’ সেই আশ্চর্য             আলো -আঁধারি, ওরা বুঝতেও পারেনি।

কলেজের দারোয়ান বিষ্টুদার হঠাৎ কড়া নাড়ার অত্যন্ত কর্কশ বেরসিক শব্দে ওরা বেরিয়ে এসেছিল অনেকটা একরকম ঘোরের মধ্যে থেকে। রীতিমতো কড়া গলাতেই হুকুম করেছিল সে –“কলেজ অনেকক্ষণ ছুটি হয়ে গেছে। আজকের মতো তোমরা এস। আমাদেরও তো বাড়ি যেতে হবে, নাকি।”

আসরে ছেদ ঘটেছিল ওদের। চুপচাপ ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিল ওরা। কলেজের ফাঁকা সিঁড়ি করিডোর বেয়ে আশ্চর্য নিঃস্তব্ধতার মধ্যে ওরা জনা পনেরো যখন গেট পেরিয়ে নেমে এসেছিল রাস্তায়, তখনও ওদের কানে বেজে চলেছে –

“আকাশের আজ যত বায়ু আছে, হইয়া জমাট নীল

মাতামাতি করে ঢুকুক এ’ বুকে, খুলে দাও যত খিল।”

অতি সাধারণ থেকে হঠাৎই বিশিষ্ট হয়ে উঠেছিল শুভ্র ওদের সকলের মাঝে।

৫ম পরিচ্ছদ

– ‘মাকোন্দো’! মানে? সেটা আবার কী?

– তেমন কিছু না। ওর আদত মানে ‘কলা’। আফ্রিকার বান্টু ভাষায়। কিন্তু ওর অন্য একটা মানেও আছে। কথাটার ভৌগলিক ও সামাজিক প্রেক্ষিত এখন লাতিন আমেরিকার কলম্বিয়া থেকে ছড়িয়ে পড়েছে সারা পৃথিবীতেই।

– সত্যি বলছি, তোর কথা না অনেক সময়ই আমাদের মাথার বেশ খানিকটা উপর দিয়ে যায়।

– হ্যাঁ, কথায় কথায় অমন বাউন্সার ছাড়লে খেলব না বলে দিচ্ছি। বাবা, মাঝে মাঝে একটা আধটা অন্তত ফুলটসও ছাড়। নাহলে আমরা কী করি ! একতরফা আবার কোনও খেলা হয় নাকি।

ওদের সম্মিলিত প্রতিরোধের সামনে পড়ে খানিকটা বাধ্য হয়েই ব্যাখ্যায় আসতে হয়েছিল শুভ্রকে। প্রসঙ্গটা ছিল ওদের নতুন পত্রিকার জন্য একটি নাম বাছা। ‘প্রয়াস’, ‘খেলাচ্ছলে’, ‘রংধনু’, ‘বেপরোয়া’ – এরকম বেশ কয়েকটি নাম উঠে এসেছিল ওদের আলোচনায়। কিন্তু কোনওটাই ঠিক পছন্দ হয়নি ওদের কারুরই। হয় বড্ড সাধারণ ও ক্লিশে, নয় ঐ নামে ইতিমধ্যেই অন্য পত্রিকা চালু।

প্রথমে প্রস্তাবটা ছিল নিজেদের বন্ধুবান্ধবদের মধ্যেই। ওদের নতুন গজিয়ে ওঠা কলম নিজেদের প্রকাশের একটা মাধ্যম খুঁজছিল। কিন্তু একটা বেশ জুৎসই নাম তো দরকার। তারউপর আবার ওদেরই বিভিন্ন বন্ধুর সূত্রে এমন কয়েকটি নতুন, প্রকাশোন্মুখ কিন্তু শক্তিশালী কলম এসে এরমধ্যেই ধরা দিয়েছিল ওদের চৌহদ্দিতে, যে শুধুমাত্র কলেজবন্ধুদের সঙ্কীর্ণ সীমা ছেড়ে বেরিয়ে আসতে হয়েছিল ওদের। ফলে সম্ভাব্য নামটির কয়েকটি নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যর কথা আলোচনার শুরু থেকেই ওদের মাথায় রাখতে হয়েছিল। ওটিকে হতে হবে এমন, যা একদিকে হবে ওদের কলমের বহুমুখী সম্ভাবনার ইঙ্গিতবাহী, আবার একই সাথে যার শিকড় প্রোথিত হবে মানুষের মধ্যে, বিশেষত খেটে খাওয়া মানুষ; তাদের দৈনন্দিন জীবন, দারিদ্র, বঞ্চনা, সংগ্রাম – এককথায় সমাজের নিচুতলারও বাস্তব প্রতিফলন ঘটবে সেখানে।

তারিক, প্রশান্ত, অম্বিকাদের গ্রুপটা অবশ্য ওখানে নিতান্ত শ্রোতা হয়েই বসেছিল। ওদের নিজস্ব বিজ্ঞান পরিমণ্ডলের বাইরে এই সৃষ্টিশীলতার আঙ্গিনায় টেনে আনার পিছনে সেতু ছিল সেই অদ্ভুত মেয়েটাই – তন্নিষ্ঠা। দেখতে বেশ নিরীহ, চোখে মোটা চশমা। বেশভূষা ছিমছাম, কিন্তু উচ্চকিত আধুনিকতা সেখানে খুব একটা দাঁত বসাতে ব্যর্থ। অবশ্য পোশাকের ক্ষেত্রের সেই খামতি যেন পুরোদস্তুর পুষিয়ে দেয় অদ্ভুত আধুনিক এক মন। আধুনিক, সংস্কারবিহীন ও উচ্ছল। একদঙ্গল আরও অনেক ছেলেমেয়ের মধ্যে প্রথম দর্শনে একেবারেই চোখে না পড়া মেয়েটির আকর্ষণ পরিচয়ের গভীরতা বাড়ার সাথে সাথেই এতটাই বেড়ে উঠেছিল যে ওর কথায় ওরা নিজেদের সীমানা নির্দ্বিধায় টপকে এরকম আরও বেশ কিছু জায়গাতেই হাজির হতে শুরু করেছিল। পরিধি বেড়ে গিয়েছিল ওদের অনেকটাই। এখানে একদল সাহিত্যপাগলের নেওয়া উদ্যোগের মধ্যে ওদের অবস্থিতিরও প্রাথমিক কারণ ছিল সেটাই।

তবে শুভ্রর মুখ থেকে এই অদ্ভুত নামের প্রস্তাবটা শুধু ওদের নয়, ব্যোমকে দিয়েছিল প্রায় সবাইকেই। শুধু রাইহান আর লোপা প্রায় লাফিয়ে উঠেছিল। সোচ্চারে সমর্থন জানিয়েছিল নামটিকে। কিছুক্ষণ হইহই আর বাদানুবাদের মধ্য দিয়ে শেষপর্যন্ত কিছুটা পরিষ্কার হয়েছিল ব্যাপারটা। কলম্বিয়ার সমুদ্রতীরে আরাকাতাকা শহরের চারিপাশে বিরাট কলাবাগানের নাম ছিল মাকোন্দো। ওখানকার পূর্বতন আফ্রিকান দাস শ্রমিকদের দেওয়া নাম। ১৯২৮ সালে এই বাগানেই বাগিচাশ্রমিকদের ধর্মঘটে মালিক ইউনাইটেড ফ্রুটস কোম্পানির হয়ে সরকারি সেনাবাহিনী চালায় নির্বিচার হত্যাকাণ্ড। হাজার হাজার শ্রমিক মারা যায়, উধাও হয়ে যায় চিরতরে আরও কয়েক হাজার। ঘটনার সময়ে মাত্র দেড় বছরের শিশু গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস’এর কলমে বিভিন্ন গল্পের পটভূমি হিসেবে পরবর্তীকালে অমরত্ব লাভ করে এই নাম – এক কল্পিত শহর, শিকড় প্রোথিত যার কিন্তু বাস্তবেই – অত্যাচারিত, বঞ্চিত, শোষিত, নিরুপায় মানবিকতায়, তাদের দৈনন্দিন জীবনের নিরন্তর সংগ্রামে।

– “এতক্ষণে বুঝতে পারছি, এত নাম থাকতে তুই হঠাৎ অমন ‘মাকোন্দো’ নাম প্রস্তাব করেছিলি কেন”, হাসতে হাসতেই কথাটা ছুঁড়ে দিয়েছিল ও।

হঠাৎ ছুঁড়ে দেওয়া কথাটায় ওর হাসি হাসি মুখের দিকে একটু অবাক হয়েই তাকিয়েছিল শুভ্র। তারপর ওর দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকিয়েছিল রাস্তার ডানদিকে। সেখানে একটা ছোট নয়ানজুলির ওপাশেই সারি সারি কলাবাগান। একটু লাজুক হেসে উত্তর দিয়েছিল – “হ্যাঁ রে, এই অঞ্চলটায় কলাবাগান আছে অনেক।”

রাস্তার পাশেই সরু একটা খাত – এতটাই সরু যে নয়ানজুলি নামটা তার পক্ষে যথেষ্ট ভারী হয়ে দাঁড়ায়। তার ঠিক ওপাশেই বিশাল কলাবাগান। অন্তত কয়েক বিঘে জায়গা জুড়ে তো হবেই। কলা গাছগুলোর সীমানা জুড়ে রয়েছে আরও বেশ কিছু গাছ – বিশেষত সজনে, নারকেল, কাঁঠাল। এক জায়গায় কাছাকাছি বেশ কয়েকটা বাতাবি লেবু গাছ দেখে আরও উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল অম্বিকা – “তোদের এখানে প্রচুর ফলের গাছ দেখছি। ফল বিক্রি করে তার মানে এখানের লোকের আয় হয় ভালোই, কি বলিস?”

– “ভালো আয় ! তা অবশ্য নিশ্চয়ই হয়। তবে যায় সে আয় কার পকেটে, সেটাই প্রশ্ন। ” – উত্তরটার সাথে একটা অদ্ভুত হাসিও ফুটে উঠেছিল শুভ্রর মুখে। তারপর হেসে যোগ করেছিল – “সেই কোন সকালে তো বেরিয়েছিস। চল, আগে একটু চা-বিস্কুট খেয়ে নে এখানে। বাড়িতে অবশ্য তোর জন্য টিফিন থেকে শুরু করে সব আয়োজনই আছে, কিন্তু তার জন্য তো এখনও কিলোমিটারটাক হাঁটতে হবে। আর ঐ যে চায়ের দোকানটা দেখছিস, দীপ্তিবৌদি – দারুণ চা করে।  আমার তো আবার এখান দিয়ে গেলেই ভীষণ চা-তেষ্টা পেয়ে যায়।”

চারিদিকের এত সবুজ দেখে এতটাই বিমুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল তখন অম্বিকা যে কোনও ছদ্ম আপত্তি তোলার কথা মনেও আসেনি ওর। তাছাড়া একটু গলা ভেজানোর প্রস্তাবটাও সেই মুহূর্তে বেশ মনে ধরেছিল। ফলে নির্দ্বিধায় দুই বন্ধুতে এসে জুটেছিল দোকানের একপাশে চেরা বাঁশের তৈরি মাচাটিতে। খুব কাছেই কী একটা পাখি শিস দিচ্ছিল। বেশ তীক্ষ্ণ, কিন্তু মিষ্টিও। কান পেতে শোনার চেষ্টা করছিল অম্বিকা। দোকান থেকে একটা স্টিলের প্লেটে দু’টো মাটির ভাঁড়ে চা আর সাথে ক’টা সুজির বিস্কুট নিয়ে শুভ্র ফিরে আসতে জিজ্ঞেস করেছিল – “ওটা কী পাখি রে। শিসটা কিন্তু বেশ সুন্দর।”

– বুলবুলি। ঐ, ঐ দেখ, উপরের ঐ ডালটায়। দেখতে পাচ্ছিস? হ্যাঁ, ঐ একটু ঝুঁকে আসা গাঢ় সবুজ পাতাটার পাশেই।

– ওটা তো শালিক।

– না রে, ওর পেটের দিকটা লক্ষ কর। সাদার উপর একটা লাল দাগ – বেল্টের মতো। ওটা বুলবুলি। মাথাটা অবশ্য এখান থেকে ভালো দেখা যাচ্ছে না, পাতার মধ্যে ঢুকে গেছে। ওখানে একটা ঝুঁটি মতো আছে – কালচে খয়েরি রং’এর। তুই বুলবুলি চিনিস না !

একটু লজ্জাই পেয়ে গিয়েছিল অম্বিকা। কিন্তু ওর কী দোষ? পাখি বলতে তো ওরা যা চেনে – কাক, চিল, চড়ুই, শালিখ। আর পোষা টিয়ে, ময়না। বুলবুলিও অবশ্য দেখেছে ও ছবিতে। কিন্তু বাস্তবে যে সেটা এরকম ওর ধারণাই ছিল না।

– কি রে, চাটা বেশ ভালো না?

চায়ে চুমুক দিতে দিতে তখনও মাথার উপরের বিশাল অশ্বত্থ গাছটার পাতার জঙ্গলের মধ্যে বুলবুলি পাখি ক’টাকে খুঁজে চলেছিল অম্বিকা। শুভ্রের প্রশ্নে বাস্তবে ফিরে এসে ওর দিকে আবার তাকিয়েছিল ও। তারপর মুখে কিছু না বলেই ঘাড়টা কাৎ করে জানিয়ে দিয়েছিল, ভালোই লেগেছে ওর চাটা।

– দীপ্তিবৌদি, পাশ। আমার বন্ধুরও ভালো লেগেছে তোমার চা।

শুভ্র যে সরাসরি ওর ‘ভালো’ বলাটাকে এরকম উচ্চকিত স্বরে ঘোষণা করে জানান দেবে, তার জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিল না অম্বিকা। নিজের শহুরে এটিকেটজনিত কুন্ঠাটুকুকে খানিকটা গিলে নিয়েই অগত্যা তাকেও গলা মিলাতে হয়েছিল, “হ্যাঁ, সত্যি বেশ ভালো।”

– “তাহলে আরেকটু করে দিই”, একগাল হেসে দোকানের মহিলাটি এগিয়ে এসেছিল কেটলি হাতে।

– “না না, আবার কেন?” একটু অবাক হয়েই ভাঁড়টা হাত দিয়ে আড়াল করার চেষ্টা করেছিল ও।

– আরে নে না। ঐটুকু ভাঁড়ে কি আর কারু চা-তেষ্টা মেটে?

– হ্যাঁ, আরেকটু দিই। শুভ্রদার তো আবার এইটুকু ভাঁড়ের চায়ে কিছুই হয় না। আপনিও আরেকটু নিন।

মহিলার অন্তরঙ্গ অনুরোধকে আর ফেরানো সম্ভব হয়নি ওর পক্ষে। আর শুভ্র যেভাবে নির্দ্বিধায় তার ভাঁড়টা বাড়িয়ে ধরেছিল, আর মহিলাও তা আবার একেবারে কানায় কানায় ভর্তি হয়ে প্রায় উপছে ওঠা পর্যন্ত চা ঢেলেই চলেছিলেন, তাতে দুজনের মধ্যে একটা সহজ স্বাভাবিক সম্পর্ক পরিষ্কার ফুটে উঠেছিল অম্বিকার চোখে।

– “এই যে দীপ্তি বৌদি”, মহিলা দোকানে ফিরে যেতে মুখ খুলেছিল শুভ্র – “ওর বর মধুসূদনদা ভ্যান রিক্সা টানেন। দু’টো ছেলেমেয়েও আছে। কাছেই স্কুলে পড়ে। ওরা কিন্তু জানিস, প্রায় বিঘে তিনেক বাগানের মালিক। পুরোটাই লিজে দেওয়া। বাগানে প্রচুর ফল, সেগুলো কিন্তু ওদের না। এই চায়ের দোকান, আর ভ্যানরিক্সা – এই দিয়েই চলে ওদের।”

– কেন? বাগান লিজে দিয়ে যে টাকা পেয়েছিল?

– সে আর ক’ টাকা বল? তাছাড়া গরিবের ঘরে আলগা কাঁচা টাকা কি আর থাকে? উড়ে যাবার কত পথ চারিদিকে। বাজারের দিকে গেলেই দেখতে পাবি, চারদিকে একের পর শোরুম। এমনকি ছোট ছোট মলও। সব ওঁত পেতে বসে আছে। হঠাৎ পাওয়া টাকা ক’টা উবে গেলে এইসব ছোট ছোট গুমটি দোকান, ভ্যানরিকশা, নদীর ওপারে গিয়ে ট্রেনে কি বাসে হকারি, এইসবই হয় ভরসা। তার উপর আছে আরেকটা জিনিস।

জিনিসটা দেখিয়েওছিল শুভ্র। ওদের বাড়ির পথে হাঁটতে হাঁটতেই। রাস্তা থেকে একটু নিচে একটা জায়গায় একটা খোড়ো চালে ছাওয়া মাচা মতো। তারউপর বসে আছে বেশ ক’জন লোক। নানাবয়সী। কাউকেই দেখে খুব একটা অবস্থাপন্ন বলে অবশ্য মনে হয়নি অম্বিকার। হাতে ওদের প্রায় সকলেরই ছোট ছোট চায়ের গ্লাসের মতো কিছু। রাস্তার ধারের আকন্দ ঝোপের আড়াল ভেদ করে এর থেকে বেশি কিছু অবশ্য বুঝে উঠতে পারেনি অম্বিকা।

খানিকটা তথ্য দেবার মতোই শুকনো গলায় শুভ্র কেবল বলেছিল – “এরকম চোলাইয়ের ঘাঁটির সংখ্যা আশেপাশে ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকটা। মধুসূদনদার মতো অনেককেই বিভিন্ন সময় পেয়ে যাবি এইসব জায়গায়। আর যাদের এটা রোচে না, সরকার থেকেই তাদের জন্যও ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে। রীতিমতো লাইসেন্স নিয়েই এফএল শপ। বাজারের দিকে। আয়োজনের ঘাটতি নেই কোনওদিকেই।

 (চলবে)

শেয়ার করে বন্ধুদেরও পড়ার সুযোগ করে দিন
  •  
  •  
  •  
  •  

One Comment

  1. বিপ্লব ব্যানার্জি

    গল্পের চরিত্রগুলো চোখে ভেসে উঠলো। খুব ভালো লাগলো। বিশেষতঃ ছাত্রদের ক্যাম্পাস আলোচনায় শ্রমজীবী মানুষের জীবন যন্ত্রণার প্রসঙ্গ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।