লেখক : ভাস্কর সিন্হা
“বুদ্ধির পরীক্ষায় যদি তোর জয় হয়,” দাদাজি বলেছিলেন, “দেখবি—খোলা হাতে বকশিস দেব, এমন বকশিস শহরে আর কেউ তোকে দিতে পারবে না।”
দাদাজির গলায় তখন এক অদ্ভুত সুর পুরনো ঘড়ির মত টিকটিক করে বাজছিল, তাঁর চোখে ছিল চাঁদের মত এক অন্তরীক্ষের আলো। আমি তখন কলেজে সদ্য ঢুকেছি; আর বকশিসের অভিলাষ—আমার কাছে ছিল দৌড়োতে থাকা এক ঘোড়ার ঘন্টাধ্বনি। শুনলেই ছুটে যেতে ইচ্ছে করে।
পরদিন সন্ধ্যায় আমরা চারজন—আমি, তপু, শুভ আর কুহু—হর্ষবর্ধন রোডের ঠিক মাঝখানে এসে দাঁড়ালাম। রাস্তাটা দিনের বেলা আধুনিকই লাগে, কিন্তু রাতে দেখায় কেমন পুরনো। দিনের বেলায় এখানে লাল-নীল রঙের বিজ্ঞাপনেরা ঝলমল করে, রাতের বেলায় বিজ্ঞাপনের নিচে শুয়ে থাকে ছেঁড়া পোস্টারের কঙ্কাল। “পরিষ্কার শহর, সুন্দর শহর” ব্যানারে লেখা, আর ব্যানারের নিচে প্লাস্টিক কাপ, ফেলে দেওয়া চিপসের প্যাকেট। শহরটা কথায় কথায় শুদ্ধির ঝাঁটা ধরে, আসল কাজের বেলায় নাক সিঁটকায়।
চায়ের দোকান, পেট্রোল পাম্প, আর এক কোণে সেই বাড়ি—পাঁচিলের গায়ে শ্যাওলা, জানালায় কালো কাচ, উঠোনে অন্ধকার জমে আছে ঘন তেলের মত। লোকজন একে বলে ‘পরিচ্ছন্ন ভূতবাড়ি’। নাম শুনে তপু হেসে বলেছিল, “ভূত যদি ঝাঁটা ধরে, তোর ভয় কিসের? আমরা জীবিতরাই তো উঠতে বসতে ঝাঁটা খাই!”
সুদেবদা, আমাদের পাড়ার কিংবদন্তি গল্পকার, সন্ধ্যায় এসে দাঁড়ালেন। গলায় গামছা, হাতে একখানা পুরনো পাইপ, চোখে রহস্যের উজ্জ্বল জ্যোতি। বললেন, “তোমরা বকশিসের লোভে এসেছ। কিন্তু মনে রেখ, এই বাড়ির ভূত কাউকে কামড়ায় না, কেবল বিবেকটাকে জাগিয়ে দেয়।”
শুভ খোঁচা দিল, “বিবেক জাগলে তো খারাপ না! আমাদের মধ্যে বিবেকেরই তো অভাব।”
সুদেবদা হাসলেন। তারপর গল্প শুরু করলেন—চাবুকের মতো টানটান সে গল্প, ঘোড়ার খুরের মতই টকটক করে এগিয়ে চলল।
“এই বাড়ির খুড়িমা মরণোত্তরও বদরাগী। জীবিতকালে উঠোনে একটুও ময়লা দেখলেই বকাবকি করতেন। এক শেষরাতে, সবাই ঘুমিয়ে কাদা, উঠোনে ঝাঁট দেওয়ার শব্দে সকলের ঘুম ভেঙে যায়। খুড়োমশায় উঠে বলেন, ‘তুমি আবার শুরু করলে কেন? এখন যাও। আমি সকালে বউঝিদের বলে দেব।’ তখনই বোঝা গেল খুড়িমা আর নেই, কিন্তু ঝাঁটাটা আছে। আর যে হাত ঝাঁটা ধরে, সে হাতও আছে, ছায়ার মত।”
কুহু কাঁপা গলায় বলল, “আর… তারপর?”
“তারপর,” সুদেবদা বললেন, “যে-যে ময়লা ফেলে, তার নাম রাতের ধুলোয় লিখে রাখে। সকালে উঠোনে পাওয়া যায় সাদা রেখায় কারও কারও নাম। সেই নাম মুছে না দিলে নাকি দাদাজির বুদ্ধির পরীক্ষায় পাশ করা যায় না।”
দাদাজির নাম শুনতেই আমার বুকের ভিতর একটা ঢাক বাজল। বকশিস! এখন এখানে এসে কেমন করে জড়িয়ে গেল ভয়ও!
রাত নামল। আমরা ঢুকলাম। পাঁচিল টপকে উঠোনে নামতেই মনে হল পা-টা মাটিতে নয়, কারও পুরনো দীর্ঘশ্বাসে পড়ছে। বাতাসে নোনতা গন্ধ, ঘাম আর ভেজা শ্যাওলার মিশ্রণ। আকাশে চাঁদ ছিল। কিন্তু এমন চাঁদ, যেন কারও হাতে আধখানা ছুরি, আলো কাটতে কাটতে নামছে।
“বাহ,” তপু ফিসফিস করল, “এখানে তো মোবাইলের নেটওয়ার্কও ভূত হয়ে গিয়েছে!”
হঠাৎ ঝাঁটার শব্দ। ঠিক যেন কেউ পাতার শিরা চিরে চিরে সময়কে পরিষ্কার করছে। আমরা একসঙ্গে থমকে গেলাম। উঠোনের মাঝখানে, চাঁদের আলোয়, একটা সাদা ছায়া। মাথায় আঁচল, হাতে ঝাঁটা। সাদা কি বৃষ্টির ফোঁটা? নাকি মেঘের ভিতর উঁকি দেওয়া চাঁদ? আমি বুঝে উঠতে পারলাম না কোনটা বেশি সাদা, ভয় না চাঁদের আলো?
ছায়াটা ঝাঁট দিচ্ছে। ঝাঁটার আঁচড়ে ধুলো উঠছে, ধুলোয় আলোর কণা ঝিকমিক করে। সে যেন ময়লা সরাচ্ছে না, স্মৃতি সাজাচ্ছে। আর ঠিক সেই মুহূর্তে বারান্দা থেকে এক বৃদ্ধের গলা—রুক্ষ, ক্লান্ত, অথচ ভাঙা কোমল: “তুমি আবার শুরু করলে কেন? এখন যাও… আমি সকালে বলব পরিষ্কার করতে।”
ছায়াটা থেমে গেল। মুহূর্তে, নিঃশব্দে, যেন কেউ বাতাসে একটা প্রদীপ নিভিয়ে দিল। সাদা শরীরটা গলে গেল অন্ধকারে।
শুভ কাঁপতে কাঁপতে বলল, “ভূত…!”
আমি হঠাৎ লক্ষ করলাম, বারান্দায় যে বৃদ্ধ দাঁড়ালেন, তাঁর হাতে ঝাঁটার একটা ভাঙা ডাঁটা। আর তাঁর পায়ের নিচে ধুলোয় একটা নাম লেখা—আমার নাম, “রুদ্র।”
দাদাজির বুদ্ধির পরীক্ষা মাথায় ঝলসে উঠল, “যদি জিতিস…”
কিন্তু কীভাবে জিতব? ভূতের সঙ্গে দর কষাকষি করে? নাকি নিজের নাম মুছে?
আমি ধীরে এগোলাম। তপু পিছন থেকে টেনে ধরল, “পাগল! যাবি না।”
আমি বললাম, “ভয় পেলে তুই বাইরে দাঁড়া। আমি দেখি ভূত কি সত্যি, না আমাদের শহরের ময়লাই ছায়া হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
বারান্দার সিঁড়ি ভাঙা, তবু উঠলাম। বৃদ্ধ ঠিক যেন মোমের আলোয় গড়া মানুষ। চোখের নীচে কালি, মুখে অনন্ত রাতের রেখা। আমাকে দেখে তিনি হকচকিয়ে গেলেন।
“তুমি কে?”
“আমি… দাদাজির নাতি,” বললাম। “বুদ্ধির পরীক্ষা দিতে এসেছি।”
বৃদ্ধ হেসে উঠলেন। হাসির মধ্যে কাঁদার মত শব্দ। “সবাই বুদ্ধির পরীক্ষা দিতে আসে, কেউ হৃদয়ের পরীক্ষা দিতে আসে না।”
আমি বললাম, “উনি… আপনার স্ত্রী?”
বৃদ্ধের চোখটা একবার জ্বলল, তারপর নিভল। “স্ত্রী ছিল। এখন… অভ্যাস। আমি রাতে উঠোন ঝাঁট দি। লোকজন দূর থেকে দেখে ‘ভূত’ বলে। ভূত বললে ভয় পায়, আর ভয় পেলে ময়লা ফেলতে আসে না। দেখেছ, দিনের বেলা সবাই ‘পরিষ্কার’ লিখে পোস্টার টাঙায়, রাতে সেই পোস্টারের নিচে নিজের আবর্জনাটা রেখে যায়।”
তিনি ধীরে ধীরে যোগ করলেন, “আর যাঁরা সত্যি সত্যি পরিষ্কার করেন—ঝাড়ুদার, কাজের মাসি, হাসপাতালের সাফাইকর্মী—তাঁদের দিকে মানুষ এমন তাকায়, যেন ওরা মানুষের ছায়া। আমার বউ বলত, ‘ছায়াকে অস্বীকার করলে একদিন ছায়াই ফিরে এসে ভূত হয়ে দাঁড়ায়।’”
আমি নীচে নাম লেখা দেখালাম। “তাহলে এটা?”
বৃদ্ধ মাথা নিচু করলেন। “ওটা… আমার রাগ। যেদিন দেখি কেউ কলার খোসা, প্লাস্টিক, বাকি-খাওয়া ফেলে গেছে, আমি ধুলোয় তাদের নাম লিখি। নাম লিখলেই কি শহরটা বদলায়? না। কিন্তু রাতের বেলা অন্তত মনে হয়, আমি কাউকে জবাবদিহির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছি।”
তখনই হঠাৎ একটা শোঁ শোঁ শব্দ, কোথাও একটা দরজা খসে পড়ল। বাতাসে ধুলো উড়ল। বৃদ্ধ বললেন, “শুনছ? এ বাড়ির ভিতরে কেবল ভূতের গল্প নেই, ভিতরে মরা কাগজও আছে।”
তিনি একটা টিনের বাক্স খুললেন। ভিতরে একটা পুরোনো কাগজ, কাঁথার মতো সেলাই করা। আমার দাদাজির হাতের লেখা।
“দাদাজি!” আমি চমকে উঠলাম।
বৃদ্ধ ধীরে বললেন, “তোমার দাদাজি এই বাড়ির গল্প জানেন। তিনি আর আমার বউ একসঙ্গে স্কুলে পড়াতেন, একশো বছরের সেই পুরোনো স্কুলে। আমার বউ হেসে বলত, ‘মানুষ ফেল করে না, ব্যবস্থাই ফেল করায়।’ তোমার দাদাজি বলেছিলেন, ‘যে এক রাতে অন্যের উঠোন পরিষ্কার করে, সে-ই বুদ্ধির পরীক্ষায় পাশ করবে।’ বকশিস টাকা নয়, রুদ্র। বকশিস হ’ল, তুমি শহরের ময়লার ভিতরেও মানুষকে খুঁজে পাবে কিনা।”
আমি কাঁথা-সেলাই কাগজটা খুললাম। ভিতরে খুড়িমার হাতের লেখা, ছোট ছোট অক্ষরে, যেন ঝাঁটার আঁচড়, “ভয় পেলে ঝাঁটা ধরো। কাউকে আঘাত করলে ময়লা বাড়ে। কাউকে বুঝলে ময়লা কমে। উঠোন পরিষ্কার রাখো, কারণ উঠোন শুধু মাটি নয়, সংসারের অঙ্গন।”
আমি নীচে নামলাম। ধুলোয় লেখা আমার নামটা হাত দিয়ে মুছতে গেলাম, তারপর থামলাম। ঝাঁটাটা তুলে নিলাম। একটা নিশ্বাসে উঠোন ঝাঁট দিলাম, রেখা মুছে গেল, নাম মুছে গেল। তপু, শুভ, কুহুও এগিয়ে এল। চারজনের হাত একসঙ্গে, যেন চারটা ছোট্ট নদী মিলে একখানা পরিষ্কার স্রোত। কাজের মধ্যে ভয় ভেঙে পড়ল। ঝাঁটার শব্দটা আর ভূতের নয়, আমাদের।
আমরা উঠোনের কচুরিপানা, পাতা, শুকনো ডাল, জংধরা ক্যান তুলে একপাশে রাখলাম। শুভ হেসে বলল, “দেখ, বকশিসের আগে বকাবকি!” তপু গুনগুন করল, “পরিষ্কার করলে ভয়ও হালকা হয়ে যায়।” ঘরের ভিতর থেকে আমরা পেলাম একটা পুরনো স্কুলঘণ্টা আর চক-ধুলো মাখা ডাস্টার—যেন খুড়িমার ক্লাসরুম এখনও এই উঠোনেই বসে আছে, এখনও কেউ কাউকে শেখাচ্ছে—চুপ করে, রাতের ভাষায়।
যখন আমরা থামলাম, উঠোনের এক কোণে ধুলোয় নতুন করে একটা শব্দ ফুটে উঠল—আমরা কেউ লিখিনি, তবু লেখা, “ধন্যবাদ।”
কুহু ফিসফিস করে বলল, “রুদ্র… এটা কি…?”
আমি কিছু বললাম না। শুধু মনে হল, ছায়া কখনও কখনও সত্যি ফিরে আসে। মানুষকে ভয় দেখাতে নয়, মানুষকে মানুষ করতে।
ভোরে আমরা ফিরলাম। দাদাজির সামনে দাঁড়িয়ে আমি বললাম, “বকশিস চাই না। ঐ বৃদ্ধকে একটু সাহায্য করো। ওঁর উঠোনটা… আমাদেরও উঠোন।”
দাদাজি দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর আমার হাতে একটা ছোট্ট প্যাকেট দিলেন। খুলে দেখলাম একটা রুপোর কলম, গায়ে খোদাই, ‘পরিচ্ছন্নতা নয়—দায়।’
দাদাজি বললেন, “আজ থেকে লিখবি—ভূতের গল্প নয় শুধু। লিখবি—কেন শহর মানুষকে ভূত বানায়। আর কেন মাঝেমাঝে ভূতই মানুষকে বাঁচায়।”
বাইরে তখন রোদ উঠছে। চাঁদ হারিয়ে গেছে। কিন্তু আমার মনে হ’ল, সবচেয়ে সাদা জিনিসটা চাঁদও নয়, বৃষ্টিও নয়। সবচেয়ে সাদা হ’ল, একটা রাতের পরও, অন্যের উঠোন ঝাঁট দেওয়ার সাহস।
লেখক পরিচিতি : ভাস্কর সিন্হা
বিশ্ব ভারতী এবং আই আই টি দিল্লীর প্রাক্তনী। দুবাই নিবাসী। বিভিন্ন পত্রিকা, সাময়িকী, পুস্তক ইত্যাদিতে অনেক লেখা বেরিয়েছে। দুটি স্বনামে ইংরেজিতে পরীক্ষা বিষয়ক পুস্তক প্রকাশিত হয়েছে ব্রাইট পাবলিকেশন থেকে। এবারের কলকাতা পুস্তকমেলায় নৈঋত প্লাবিকেশন থেকে প্রকাশিত হয়েছে "Strings of Pearls". কেতাবই প্রকাশন একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস নিয়ে আসছে।

