লেখক : দীপিকা পালিত
একা একা সংসারে মুখ বুজে থাকতে থাকতে মৃন্ময়ীর মনটা সবসময়ই খারাপ লাগে, ছেলে সকাল আটটায় বেরোয়, আসতে আসতে একটু রাত হয়, এসে খেয়েই শুয়ে পড়ে। উনি সেই একাই থাকেন বইপত্র নিয়ে। ছেলের আপত্তি সত্ত্বেও মেয়ে দেখা শুরু করলেন মৃন্ময়ী। অবশেষে মায়ের একজন সঙ্গী হবে বলে ছেলে নিমরাজি হ’ল। ছেলের একটাই ভয় – নতুন একটা মেয়ে এসে তার সরল বিধবা মাকে না জ্বালিয়ে খায়।
ছেলের বিয়ের জন্য ঘটক লাগিয়ে বেশি না হ’লেও অন্তত পঞ্চাশটি মেয়ের খোঁজ পেলেন মৃন্ময়ী। সবই আধা মফস্বলি মেয়ে হ’লেও সাজগোজের কমতি নেই। কারও চুল ছোট তো কারও নখ বড়, কারও ভুরু ছাঁটা, কেউ কাঁধ সমান দুল পরেছে। এসব দেখে দেখে তিনি অবাক এরা কি সংসার করবে! এরা সাজগোছ নিয়েই তো মেতে থাকবে। ছেলে প্রশান্ত বলল “মা, এখন সব মেয়েরা এরকমই। আমি আর মেয়ে দেখতে যেতে পারব না।”
মৃন্ময়ী ভাবলেন, তাঁর মেজদি বলছিল তাঁদের বাড়ীর পাশে একটি মেয়ে আছে। খুব শান্ত, বাড়ির নিয়ম মেনে চলে। এরকম মেয়ে আজকাল আর দেখা যায়না। ঠাকুমা একেবারে শিখিয়ে পড়িয়ে সুন্দর মানুষ করেছেন। নামটিও সুশীলা।
ছেলের আবার ওই গণ্ডগ্রামে মেয়ে দেখতে যাওয়ার সময় নেই, অগত্যা তিনিই গেলেন। মেয়ে দেখে তো তাঁর খুব পছন্দ। একেবারে দিন ঠিক করে এলেন। শুভস্য শীঘ্রম, যথারীতি বিয়ে হয়ে গেল। রান্নাঘর নিয়ে ব্যস্ত থাকেন মৃন্ময়ী। ভাবেন ছোট মেয়ে, কিছুদিন যাক, পরে তো বৌমাই করবে সব। ছেলে রাগ করে বলে, “মা, তোমার জন্যই বিয়ে করা আমার, একটু যাতে অবসর পাও”। বৌ বিধবা মাকে বলে, “এক রান্নাঘরেই আঁশ-নিরামিষ রান্না করেন। ও আমি সইতে পারব না। আপনি বরং সিঁড়ির তলায় একটা রান্নার ব্যবস্থা করে নিন। আপনার মত আপনি একফুটের ভাত সেদ্ধ করে নিন। আমি এটা আমার আঁশ হেঁশেল করে নিই।”
মৃন্ময়ী এ’কথায় কোন দোষ দেখলেন না। কিন্তু পাড়ার রমণীকুল এসে বলে গেল, “বুঝলে না? কায়দা করে তোমায় রান্না ঘর থেকে সরিয়ে দিল।” মৃন্ময়ী ভাবলেন, আমায় আর সরাবে কোথায়, আমার স্বামীর বাড়ী। তবে উনি তো সত্যি একফুটের হবিষ্যান্ন খান না, মাছটা বাদে তিনি সবই খান। রাতেও ভাত খান। বউ মুখ বেঁকিয়ে বলতে লাগল, “সে কি গো মা! মুড়ি-বাতাসা বা খই খাও। আমার ঠাকমা তো তাই খেত।” লজ্জায় মৃন্ময়ী তাই খেতে লাগলেন।
শুধু কি তাই, বউ বলতে লাগল, “আমার ঠাকমা দিনে চারবার ডুবে আসে পুকুরে, তুমি মোটে একবার নাও? সংসারের কল্যাণ অকল্যাণ মানো না।”
চিরকালের শান্ত মৃন্ময়ী চুপ করে থাকেন, জিজ্ঞেস করেন কখন কখন চান করতেন তিনি। বউ গড়গড় করে বলে যায়, “ধরো গে, সকালে উঠে বাসি কাপড় ছাড়বে বলে একবার নেয়ে আসত। তারপর শুধু এককাপ চা খেয়ে বাসন কোসন মেজে উঠোন ঝাঁট দিয়ে গোয়াল কেড়ে দুধ দুয়ে চান করে নিজের রান্নাঘরে ঢুকত। সেখানেই তো সব নিরামিষ রান্না হত। মা-কাকিমা আঁশ হেঁশেলে মাছ মাংস করত। আঁশ গন্ধ নাকে গেলে বেধবার পাপ বলে ঠাকমা সিঁড়ির তলায় রান্না করত। সেও তোমার মতো শাকপাতা খুব ভালো রান্না করত।”
মৃন্ময়ী অভিমানে একটু আলুসিদ্ধ ভাত করে খান, কি করার আছে। রোজ মাছের ঝাল আর ভাত খেতে খেতে প্রশান্ত ভাবে, “মা কেন রাঁধে না”? বউ বলে সে দাসী এনেছে গো, সে কেন রাঁধবে? প্রশান্ত ভিতরের ব্যপার বোঝে না। রোজ কলকাতায় যাওয়া আসা করে হাঁপিয়ে পড়ে। আগে টাকাপয়সা মায়ের হাতে দিত। এখন আর মা নেয় না, বলে, “বউয়ের হাতে দে।” শাশুড়ির পেপার পড়া, বই পড়া দেখেও গালে হাত বউয়ের। বলে, “সে কি গো মা! বেধবা হয়ে পেপার পড়ো, এসব নাটক নভেল পড়ো? আমার মা-ঠাকুমা তো কোনদিন পেপার পড়তো না বেটাছেলেদের মত। আর তা ছাড়া ছেলের মুখের দিকে তো একবার চাইবে? দু’টো পেপার আসে ঘরে, তুমি পড়ো বলে ছেলে বাংলাটা নেয়।” অভিমানে মৃন্ময়ী পেপারওয়ালাকে বলে দিলেন একটা পেপার দিতে।
ছেলের প্রিয় ধোঁকার ডালনাও রান্না হয়না। পেঁয়াজ-রসুন ছাড়া, বৌমা ইঁচড়, ধোঁকা এসব খেতে পারেনা, আর অত ডাল বাটাবাটির ঝামেলায়ও যেতে পারে না বৌমার ব্যবস্থাপনায় ওনার এখন শুধু শাকপাতা, উচ্ছে-চচ্চড়ি, বেগুনপোড়া বরাদ্দ। বেধবা মানুষ এর থেকে বেশি খাবে বৌমা ভাবতেই পারেনা।
মৃন্ময়ীর যেটাই করেন বৌমার চোখে অসৈরন লাগে। তিনি রেডিও খুলে আর গান শোনেন না নিজেও গুনগুন করে গান করেন না। বৌমা বলে, “এ কোন ম্লেচ্ছ ঘরে বিয়ে দিলে গো ঠাকুমা? এসব তো বাইজী পাড়ায় হয় শুনেছি। একটু দেখলে শুনলে না, ‘ওঠ ছুঁড়ি তোর বে’ বলেই হাত ধুয়ে ফেললে। ছেলেও তো মা বলতে অজ্ঞান। এখন এসব কথা কার কাছে বলি আমি? তোমাদের চিঠি লিখতে হলেও তো পাশের বাড়ির পুঁটুদিকে দিয়ে লেখাতে হবে। সেও তো কাকিমা বলতে অজ্ঞান।”
বউ ভেবে পায় না, ম্লেচ্ছ বেধবাটাকে পাড়ার মানুষ এত ভালবাসে কেন! ছেলে এখন অফিস যাওয়ার সময় ভাত টিফিন পায় না। বউ মাকে বলে, “আপনাকে দেখতে হবে না, আমি সব গুছিয়ে দিয়েছি। আপনি বাসনগুলো মেজে ফেলুন, কাজের লোক আর আসতে পারবে না বলেছে। ওদিকের কাজগুলো সেরে ফেলুন গে আপনি। গেরস্থ বাড়ি চৌকাঠে গোবর জল দিন। ছেলে বেরোবে, একটা কল্যাণ-অকল্যান বলে কিছু আছে তো!”
অফিস যাওয়ার সময় প্রশান্ত ভাত পায় না, অথচ মা আগে ভাজা থেকে চাটনি অব্দি করে দিত। ছেলের মনে অভিমানের পাথর জমতে থাকে; মায়ের সাথে বিশেষ কিছু বলে না।
বউ বলে, “এত সকালের ভাত দুপুরে ঠাণ্ডা হয়ে যায়, ও আমি খেতে পারি না”। ছেলেও অশান্তির ভয়ে দুটি মুড়ি জল খেয়ে চলে যায়।
প্রশান্ত সংসারের হাল ধরার জন্য একটা লোহা ইস্পাতের কারখানায় কাজ করতো। সামান্য জমির আয় আর মায়ের গান শেখানোর স্কুলের টাকায় কুলিয়ে উঠতে পারত না। বাড়িতেই একটা ঘরে বসে মা পাড়ার মেয়েদের গান শেখাতেন। সব পাত্রপক্ষ এসে জিজ্ঞেস করেন, “মেয়ে যখন, রান্নাবান্না তো জানবেই। একটু আধটু গান জানে তো?” প্রশান্তর মা ছিলেন পাড়ার সকলের কাকিমা তিনি – একটু আধটু সবই জানতেন। পাড়ার সব মায়েরা মেয়েদের মৃন্ময়ীর কাছে দিয়ে নিশ্চিন্ত ছিল।
বউয়ের আঁটোসাঁটো ব্যবস্থায় রাস্তায় সস্তার কেনা খাবার খেতে খেতে অজীর্ণ আমাশয়ে প্রশান্তর শরীর গেল দুর্বল হয়ে। দুর্বল শরীরে ইস্পাত কারখানার ক্রেনে কাজ করার সময় পড়ে গিয়ে গুরুতর জখম হয় প্রশান্ত। বিদ্যুতে ঝলসেও যায় দেহের অধিকাংশ অঙ্গ। ক’দিন হাসপাতালে থাকার পর তার কারখানার কিছু শ্রমিক তার দেহ নিয়ে আসে প্রশান্তর বাড়ীতে। নিজের অন্যমনস্কতায় পড়ে গিয়েছে, এই অজুহাতে কোন টাকাপয়সাও দেয় না কোম্পানি।
পাথরের মতো বসে থাকেন মা, সব কিছু নিয়ে চলে গেল ছেলেটা!! এমন কি চোখের জলটুকুও নিয়ে গেল! প্রায় মূর্ছিত শাশুড়ীকে তখনওঁ বউ বলতে থাকে, “এসেই বলেছিলুম, স্বামী খে*গো বেধবার আচার-বিচার নেই, সময় পেলেই বই মুখে করে বসে থাকে, কত ঢং জানে। বিকেলে চওড়াপেড়ে শাড়ি পরে রেডিও শুনবে আর চা খাবে। গায়ে এত আতর ঢালে, সামনে দিয়ে গেলে নাক জ্বলে যায়। ছেলেও তেমনই মায়ের জন্য দামী দামী এসেন্স আনবে। এসেই বলেছিলাম, স্বামী খে*গো বেধবা, ও ছেলেও খাবে। কি, এখন ফলল কিনা আমার কথা?”
মৃন্ময়ীর দৃষ্টি তখন ঝাপসা চারিদিকে আঁধার। আচ্ছন্নতার মধ্যে শুনছেন প্রশান্ত ডাকছে, “মা, মা গো, আমি এসে গেছি। তুমি চোখটা শুধু একবার খোলো।” কিন্তু চোখ আর তিনি খুলতে পারেন না। ডাক্তারবাবুই এতক্ষণ চোখ খোলানোর জন্য “মা-মা” করে ডাকছিলেন। নাঃহ, চোখ আর মৃন্ময়ীর খুলল না। স্বামী খে*গো বেধবার চালচলনের অপবাদের ধাক্কাটা সয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ছেলে খাওয়ার ধাক্কাটায় তার শান্ত হৃদয়টা অশান্ত হয়ে গেল। কিছুক্ষণ ধুকপুক করে থেমে গেল চিরতরে।
লেখক পরিচিতি : দীপিকা পালিত
কলমে দীপিকা ✍️পালিত

