লেখক : শিপন হোসাইন
বাতাসে বহমান এক অদৃশ্য প্রেম, চোখে লেগে থাকা এক নীরব নেশা; এইসব মিলিয়েই বসন্তের আগমন। কখন যে সে পেছন থেকে ডাক দেয়, টের পাওয়ার আগেই বুঝে যাই, বসন্ত এসে গেছে। ঋতুর কথা বলতে আমার বরাবরই ভাল লাগে, বিশেষ করে বাংলার প্রকৃতির কথা। কারণ বাংলার প্রকৃতি কেবল চোখে দেখা নয়, অনুভবে ধারণ করার বিষয়।
ফেব্রুয়ারি মাস এলেই চারপাশে এক ভিন্ন রকমের সাড়া পড়ে যায়। ফাল্গুনের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে বাতাসে মিশে যায় এক পরিচিত ঘ্রাণ। সেই ঘ্রাণ শুধু ফুলের নয়; সে ঘ্রাণ স্মৃতির, অপেক্ষার আর নতুন হয়ে ওঠার। বসন্তকে কত দিন যে দেখি না; সে কথা যদি সে জানত! তবু না দেখেও অনুভবের ভেতর দিয়ে তাকে সম্পূর্ণভাবে পাওয়া যায়।
ফজরের নামাজের পর যে হাওয়া আসে, তা কেবল বসন্তের নয়; সে হাওয়া সারা বছর জুড়েই নূরের; শান্তির হাওয়া। তবে বসন্তের দিনে সেই হাওয়ার মাধুর্য যেন আরও গভীর হয়ে ওঠে। মনে হয়, বাতাসও তখন আলাদা করে কথা বলে; হৃদয়ের সঙ্গে ধীরে ধীরে।
একদিন ফজর পড়ে করস্থানে যাওয়ার পথে এমনই এক দৃশ্য চোখে পড়ল। হালকা কুয়াশাচ্ছন্ন আকাশের ভেতর দিয়ে দোয়েল পাখি উড়ে যাচ্ছিল। সাধন স্যারের টিউশনি হলের কাছে পৌঁছতেই কানে এল বসন্তের পাখির ডাক; কোকিলের ডাক। সেই ডাক কেবল প্রকৃতির শব্দ নয়, বরং কারও আগমনের পূর্বাভাস।
এই স্মৃতিগুলো খুব বেশি পুরোনো নয় ২০২২ সালের কথা। সাধন স্যারের কোচিং হলের পাশে একটি আমগাছ ছিল; বসন্ত এলেই যার ডালে ডালে মুকুল ফুটত। সেই মুকুলের পাশে বসে কোকিল পাখির ডাক শুনতে পেতাম প্রায় প্রতিদিন। কোচিং হলে ঢোকার আগেই সেই অতিথি পাখির ডাক শ্রবণগোচর । মনে হত, সে ডাক যেন কারও জন্য অপেক্ষা করছে।
আমি প্রায়ই স্যারের কথা মোবাইলে রেকর্ড করে রাখতাম। একদিন শুনে দেখি, স্যারের কণ্ঠের সঙ্গে সঙ্গে একটি কোকিলের ডাকও রেকর্ড হয়ে গেছে। যেন প্রকৃতি নিজেই সেই পাঠে অংশ নিতে চেয়েছিল।
বসন্ত এলে প্রকৃতির নতুন পল্লবগুলো সকালের নূরী হাওয়ার সঙ্গে খেলায় মেতে ওঠে। মসজিদের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বুড্ডা গাছগুলো কিচিরমিচির শব্দ তুলে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেয়। মধ্যপাড়ার আতাউর কাকার কবরের পাশ থেকে ভেসে আসে হাসনুহানার সুবাস। আমি ভাবলাম, নিশিগন্ধার ঘ্রাণ হয়ত বুঝি এখনও বাতাসে লেগে আছে।
বসন্তের দুপুর মানে এক নীরব মুহূর্ত, এক নীরব বাতাস, পাতার নীরব গুঞ্জনময় শব্দ।
দ্বিপ্রহরের এই নীরব মুহূর্তে একদিন দেখতে পেলাম, পশ্চিমের ডোবার পাড়ে যে শিমুলগাছ দাঁড়িয়ে আছে, বসন্তের হাওয়ায় সে তার পল্লব ঝরিয়ে দিয়ে রক্তিম ফুলে ভরে ওঠে; যেন দূর থেকে কেউ দেখে বলে, “আকাশে আগুন লেগেছে।”
চৌদ্দ পুকুরের পাড়ে মেহগনির পল্লবগুলো নীরবে মাটি স্পর্শ করছে; যেন শিকড় ছেড়ে অতীত ধীরে ধীরে ভেসে যাচ্ছে।
বসন্তের দুপুরে আম্রকুঞ্জে মুকুলের গন্ধে হালকা মাতাল হাওয়া বয়ে যায়। মনে হয়, সময় নিজেই একটু থেমে আছে; কোন অজানা স্মৃতির জন্য।
চারদিকে সোনালি-সবুজ খেত। সূর্য ডুবো-ডুবো প্রান্তরে হালকা লাল আভায় শীতলভাবে ডুবে যাচ্ছে। আকাশপথে একদল পাখি উড়ে যাচ্ছে তাদের নীড়ে। তিতাস নদীর দিক থেকে বসন্তের হাওয়া বইছে মৃদু সুরে।
আমাদের বাংলার মধ্যযুগের পণ্ডিত কবি সৈয়দ আলাওল তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ পদ্মাবতী-তে ‘ঋতুবর্ণন’ খণ্ডে লিখেছেন,
“মলয়া সমীর হৈলা কামের পদাতি,
মুকুলিত কৈল তবে বৃক্ষ বনস্পতি।”
বসন্তের সুগন্ধি দক্ষিণ বাতাস যেন প্রেমদেবের অগ্রদূত; মনে এক অদৃশ্য পদাতিক অনুভব জাগে। তবে এই বসন্ত কেবল প্রেমদেবের সৈনিক হয়ে আসে না—পৃথিবীর সব পাখি নতুন বাতাসে ডানা মেলে, এক নিরুদ্দেশের পথের পথিক হয়ে যায়, সব বৃক্ষ সবুজ হয়ে নিজস্ব গর্জনে জেগে ওঠে। প্রকৃতির প্রতিটি সত্তা যেন তার নিজস্ব উল্লাসে মাথা তোলে, নতুন জীবনের আহ্বানে সাড়া দেয়।
এইভাবেই বসন্ত আসে; কখনও পাখির ডাকে, কখনও বাতাসের ঘ্রাণে, কখনও পুরনো স্মৃতির ভিতর দিয়ে। বসন্ত শুধু একটি ঋতু নয়, সে আমাদের অনুভবের এক জীবন্ত অধ্যায়।
(সংক্ষিপ্ত)
লেখক পরিচিতি : শিপন হোসাইন
একজন সাহিত্যপ্রেমী, কবিতা ও গল্প লিখতে ভালোবাসি।

