দেয়াল

লেখক : ইন্দ্রনীল চক্রবর্তী

(১)

“আসুন, এদিক দিয়ে আসুন। হ্যাঁ, হ্যাঁ, এই দিক দিয়ে, আসুন। ওই যে সামনে লাল বাড়িটা দেখছেন, ওটার কথাই বলছিলাম ।”

“আচ্ছা, আচ্ছা”

“কলকাতা শহরে এরকম বাড়ি গোটা দশ পিস আছে। Tambourine constructionsএকমাত্র কোম্পানি ভারতে যে ভারতে এরকম বাড়ি বানাচ্ছে।”

“শুনেছি তাই তো এলাম, আগে তো দেখি।”

“হ্যাঁ হ্যাঁ নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই। আসুন এদিক দিয়ে আসুন”

 

একটা গেট খুলে ওরা ভিতরে ঢুকে পরে। ২০-২২ ফুট লম্বা একটা বাগান পেরলে একটা দোতলা বাড়ি। অপূর্ব ডিসাইন, দেখেই অনিমিখের মনটা ভরে গেল, কিন্তু মুখে প্রকাশ না করেই বলল, “চলুন, ভিতরে যাওয়া যাক। ”

“ডিসাইনটা কেমন দেখলেন,স্যার ভাল না?”

“খারাপ না”

  “অদ্ভুত এই বাড়ি স্যার, এন্রাজি স্টোরিং ব্রিক্স, আপনার ইলেক্ট্রিসিটির আলাদা কোনও সিসটেম নেই। কোনও তার নেই। সব সৌর শক্তি, এই ইট গুলোর মধ্যে রয়েছে, রাত হলে আপনি সুইচ অন করে দেবেন, অমনি, ঘরের ইটগুলোর ভিতরের দিকটা সমস্ত আলোকিত হয়ে উঠবে, ফ্যান দেয়ালে সেট করা আছে, সুইচ দিলে ফ্যানও চলতে থাকবে, প্লাগ পয়েন্টস গুলো চলবে । এমন কি হট ওয়াটার গিজার দেয়ালের সাথে জোড়া আছে, সবই ইটে চলবে, ইটের ষ্টোরড  শক্তিতে চলবে। ইট যা চার্জ হবার আপনা আপনি হবে সূর্যের আলোতে। তা ছাড়া যা ব্যাক আপ চার্জ আছে, তা এক লাইফ টাইমের জন্য যথেষ্ট।  আপনি নিজে সব পরখ করে দেখে নেবেন। ”

“তার মানে আপনি বলছেন, যে কোনোদিন পাওয়ার কাট হবে না?”

“একদমই না স্যার, আর সে আলো কি আপনি দেখবেন! সমস্ত ঘর মায়াময় লাগবে। সেই জন্য তো সন্ধ্যা সন্ধ্যা করে এলাম। আরেকটু আলোটা কমুক, আপনাকে সব দেখাচ্ছি। ততক্ষণে বাড়িটা ঘুরে দেখে নিন।”

অনিমিখ ডিলারের সাথে ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকে। আর মনে দারুন উত্তেজনা অনুভব করতে থাকে। কলকাতা শহরে এরকম বাড়ি খুব কম সংখ্যক রয়েছে। তার মধ্যে একটার মালিক সে হতে চলেছে। শুধু একটাই আক্ষেপ, বাড়িটা সেকেন্ড হ্যান্ড। না হলে যা দাম, তার পক্ষে কেনা সম্ভব ছিল না। আগের মালিক ডিলারকে বেচে দিয়ে চলে গেছে প্রায় এক বছর আগে। প্রায় দুই বছর সে এখানে ছিল। একটা পুরো পরিবার ছিল এই বাড়িতে। এখন পুরো বাড়িটা তার। যদিও অনিমিখের গার্লফ্রেন্ড কৌষিকী মাঝে মাঝে আসবে। তবে সব সময় থাকবে না। বাড়ি ঘুরে দেখতে দেখতে সন্ধ্যে হয়ে আসে।

“এই বার আপনাকে দেখাই। প্রথমে শোবার ঘরে আসুন।”

সুইচ টিপতে সারা ঘর আলোকিত হয়ে ওঠে। অনিমিখ প্রায় হ্যাঁ হয়ে যায়। এত অপূর্ব দৃশ্য আগে কখন সে দেখে নি। সারা ঘরের আলো যেন দেয়াল থেকে ঠিকরে ঠিকরে বেরোচ্ছে। অথচ একটা টিউব বা বাল্ব নেই। অনিমিখের গর্ব হতে থাকে এই বাড়িটা পেয়েছে বলে। একদিন  কৌষিকী কে এনে দেখাতে হবে। অনিমিখ নিশ্চিত যে কৌষিকী দেখে তার চিরচারিত ‘ওয়াও’ বলবে।

 

 (২)

বাড়ি দেখার পর প্রায় একমাস কেটে গেছে। সমস্ত ফর্মালিটি কাটাতে সব সময় বেরিয়ে গেছে অনিমিখের। কালকে ফাইনালি পসেশন পাচ্ছে। তাই আজ সময় করে বেরিয়ে কৌষিকীর বাড়ি চলে এসেছে ড্রাইভ করে। কৌষিকীকে ফোনে সমস্ত বাড়ির গল্প করেছে, আজ গিয়ে গল্প করবে। Tambourine constructions  এর কাগজটা সঙ্গে করে নিয়ে আসে। লাঞ্চের পর ওদের বাড়ির তিন তলার ঘরটাতে প্রতিবারের মতন উঠে আড্ডা মারতে যায়। ওপরে উঠে অনিমিখ, কৌষিকীর টেবিলের পাশে রাখা বিছানাটায় শুয়ে পড়ে। কখন ঘুমিয়ে পরে খেয়াল নেই। এক দেড় ঘণ্টা পরে উঠে দেখে কৌষিকী টেবিলের পাশে চেয়ার টেনে ল্যাপটপ নিয়ে বসে আছে। অনিমিখকে উঠতে দেখে বলে

“কিরে তুই তো একেবারে ঘুমিয়ে পড়লি। এতদিন পর গার্লফ্রেন্ডের বাড়ি এলি, তার উপর তোর নতুন বাড়ি। তাও তো আবার যে সে বাড়ি নয়। আর ভাড়া বাড়িতে থাকতে হচ্ছে না, তোকে দেখে তা মনে হচ্ছে  না।“

 “না রে তা না, বড্ড টায়ার্ড ছিলাম। দাড়া তোকে একটা জিনিস দেখাই।” বলে অনিমিখ মুখ চোখ ধুতে চলে যায়। ফিরে এসে Tambourine constructions এর কাগজটা বের করে কৌষিকীর দিকে ছুড়ে বলে,

“তুই একবার দ্যাখ, লেখাটা পড়।”

A brick wall can be used as a battery. The red pigment can be used as efficient energy storing device. It can be used to store solar energy just like solar cell and we will use this energy to illuminate your house, run all the plug points. This pigment will act as a solar-powered photovoltaic which will transform the sun’s rays into electricity by exciting electrons in silicon cells in the brick. 

It’s totally eco-friendly with low carbon foot prints. Do you dream of such houses? We welcome you to Tambourine constructions.

 

“কি বুঝলি?”

“So each brick is a kind of battery, it will store the solar energy and will convert it into electric energy.  Am I right?”

“Absolutely!”

 “মোদ্দা কথা তোর এখন বিশাল বাড়ি and on top of that your house is made up of energy storing bricks.”

“ফাজলামি মারিস না। প্রশ্নটা বিশালত্বের নয়, ইউনিকনেসের! কাল হাতে পাচ্ছি, তারপর আমরা গিয়ে সেলিব্রেট করব।“

“সে না হয় হবে, তুই কি কোনও ফিড ব্যাক নিয়েছিস, যারা যারা ব্যবহার করছে তাদের থেকে।“

“তুই কি ভাবছিস ? আমি অতটা কাঁচা কাজ করব। আমার তিনজন ইউসার থেকে ফিডব্যাক নাওয়া হয়ে গেছে। তারা দু-তিন বছর ধরে বাড়ি ব্যবহার করছে। এখন পর্যন্ত তাদের কোনও অসুবিধা হয়নি। তবে যে ভবিষ্যতে হবে না, এই গ্যারান্টি কেউ দিতে পারে না। তুই এই নিয়ে এত ভাবিস না।“

অনিমিখ এবার উঠে পরে  বলে, “নে আমি উঠি ।”

“বাহ, এখনই যাবি? ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে সময় নষ্ট করে এখন বেরিয়ে যাচ্ছিস !”

“রাগ করিস না, শিফটিংএর হ্যাপা আছে কাল, যদিও সব গোছানো আছে , তবু অনেক টুকটাক কাজ আছে।এই সপ্তাহটা একটু  গুছিয়ে নি। পরের উইকেন্ডটা খালি রাখিস। তোকে একবার  উইকেন্ডে নিয়ে যাব।”

‘আচ্ছা সে দেখা যাবে, তোর সাথে কালকে শিফটিংএ থাকলে ভাল হত। কি করবি কে জানে?

“চাপ নিস না”

 “তুই সাবধানে  যাস।”

“হ্যাঁ যাই, তুই কিন্তু খালি থাকিস।”

 

(৩)

প্রতিদিন এক একটা আশ্চর্য দিন। ভুল বললাম প্রতি রাত এক একটা আশ্চর্য রাত অনিমিখের কাছে। সে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে আসে। সন্ধ্যে হলেই সেই অপূর্ব  দেয়াল আলো সে দেখ্তে  থাকে। এক এক দিন  একেকটা আলো জ্বালায় সে। দেয়ালের ভিতর থেকে সেই আলো বেরিয়ে আসে, কোন টিউব নেই, কোনও বাল্ব নেই অথচ ঘর ভর্তি আলো। অনিমিখ ভাবতে থাকে এ ম্যাজিক ছাড়া আর কি হতে পারে। আর ভাবে আগের মালিকেরা কেনই বা এমন চমৎকার বাড়ি ছেড়ে চলে গেল? তার নিজের কপাল আছে বলতে হবে। কৌষিকী একবার দেখলে  ফিদা হয়ে যাবে। অনিমিখের আর টিভিতে ইন্টারেস্ট লাগে না। অফিস থেকে ফিরে কোনও মতে রান্না করে, খাবার নিয়ে বসে পরে রাতের দেয়ালে আলোর শোভা দেখবে বলে। এই ভাবে অনিমিখের বেশ কদিন চলে, তারপরে  আসতে আসতে ধাতস্থ হয়। বাড়িতে এসে বাকি কাজ শুরু করে।    

 

প্রথম এসে সত্যি করেই ফিদা হয়ে যায় কৌষিকী, দু মিনিট হাঁ করে থাকার পর একটাই কথা মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে,

 “ওয়াও, করেছিস টা কি?”

“তবেই বোঝ, বলেছিলাম না তোকে। তুই তো মোটামুটি থ মেরে গেছিস। হাত পা ধুবি না কি এরকমই চিত্রপটের মতন দাড়িয়ে থাকবি?”

“দাড়া আগে একটু ভালো করে দেখি। দারুন, তবে তোর অনেক রেস্ত গেছে, তিন কোটি কম টাকা নয়।”

“তাও আবার সেকেন্ড হ্যান্ড”

“Nevertheless, you are rich man”

“এই শুরু হল, দিনে আমাকে পয়সা নিয়ে খোঁটা না মারলে, তোর কি পেটের ভাত হজম হয় না?”

“Fact is a fact!”

“নে নে তুই হাত পা ধুতে যা, আমি বিয়ারের বোতল গুলো বের করছি।”

 

এরপর প্রায় ২ মাস কেটে যায়। এরমধ্যে কৌষিকী প্রায় গোটা ৭-৮ বার এসেছে। অনিমিখ আরও কিছু জিনিস প্ত্র কিনেছে বাড়ির জন্য।  এদিকে প্রচণ্ড গরমে কলকাতা পুরো তেতে উঠেছে। বৃষ্টির কোথাও চিহ্ন নেই। শনিবার বিকেল থেকে আকাশে মেঘ দেখে অনিমিখ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। রাত ৮ টার পর থেকে ঝড় বৃষ্টি শুরু হয়, তার সঙ্গে প্রবল বাজ পরতে থাকে। বাইরের আলো ঘরের আলোকে ছাপিয়ে ভিতরে আসতে থাকে। এবং হঠাৎই বাড়ির সমস্ত আলো নিভে যায়। অনিমিখ ঘাবড়ে যায়। কি হল! এটাতো হওয়ার কথা না। সমস্ত বাড়ি অন্ধকার হয়ে যায়। অনিমিখ কি করবে বুঝে উঠতে পারে না। মোবাইলের টর্চটা খুলে মোমবাতি খুঁজতে থাকে। ভাগ্যিস আসার সময় সাবধানতাবশত এক প্যাকেট মোমবাতি সে নিয়ে এসেছিল। অনেক কষ্টে মোমবাতি খুঁজে পেল। মোমবাতি জ্বালিয়ে বাইরে এসে বসে। বাইরে তখন তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে। মনে তখন অজানা ভয়, যদি ব্যাটারি না অন হয়, কাল Tambourine constructions-এ ফোন করতে হবে। এ ছাড়া কোনও উপায় নেই। এমনি কোনও ইলেক্ট্রিশিয়ানকে ডাকা যাবে না। কোম্পানি কে বলতে হবে। অন্ধকারে বসে বসে অনিমিখ  নানান কথা চিন্তা করতে থাকে।

আধ ঘণ্টা এই ভাবে বসে থাকার পর হঠাৎই কারেন্ট এসে যায়। সারা বাড়ি আলোকিত হয়ে ওঠে।ব্যাল্কনির থেকে চেয়ার টেনে ঘরে ঢুকে দেয়ালের দিকে তাকাতে অনিমিখ বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায়। প্রত্যেকটি দেয়াল যেন এক একটি লাইভ স্ক্রিন হয়ে উঠেছে। সে দেখে এক ভদ্রলোক, এক ভদ্রমহিলা খাটের উপর বসে, কথা বলছে আর একটি বাচ্চা তাদের কাঁধের উপর লাফালাফি করছে। অন্য দেয়ালে অন্য একটা দৃশ্য, কিন্তু লোক গুলো এক। কি ব্যাপারটা হচ্ছে , অনিমিখ বুঝে উঠতে পারেনা। সে দ্রুত ঘরের আলো নিভিয়ে ফেলে অন্য ঘরে যায়। ডাইনিং রুমে গিয়েও সে একই চরিত্র। দেয়ালে তাকিয়ে  দেখতে পায় যে সেই লোকেরা বসে খাচ্ছে। ঘোরের মত লাগে। দৌড়ে বাথরুমে যায়, সেই একই ব্যাপার। দেয়ালে জামাকাপড় ছাড়বার দৃশ্য। দ্রুত চোখ বন্ধ করে দরজা বন্ধ করে দেয়। যেন সমস্ত লাইভ শো চলছে। কে যেন প্রোজেক্টার দিয়ে প্রতিটি দেয়ালকে স্ক্রিন বানিয়ে ভিডিও অন করে দিয়েছে।  আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে যায় অনিমিখ। এ সব কি? কারা এরা? কোথাকার ছবি? কোনও কথা নেই, এক পর এক পারিবারিক দৃশ্য, যেন এক নির্বাক চলচিত্র চলছে। কারা এরা, কিছুই বুঝে উঠতে পারে না। সমস্ত লাইট নিভিয়ে দেয় অনিমিখ।ঘর অন্ধকার করে বসে থাকে অনিমিখ। এক অজানা আতঙ্ক তাকে চেপে ধরে। প্রতিদিন তাকে লাইট জ্বালালে দেয়ালে এই শো দেখতে হবে নাকি? রাতে কি করে থাকবে? এখন অনেক রাত হয়ে গেছে মোম জ্বালিয়ে নেয়। বিজ্ঞানের দেওয়া অন্ধকার সে মেনে নেয়। ভাবতে থাকে পরের দিন ওদের ফোন করবে আর কৌষিকীকে ফোন করবে। এই অদ্ভুত ব্যাপারের একটা সমাধান করতে হবে। এসব ভাবতে ভাবতে সোফাতেই ঘুমিয়ে পরে অনিমিখ। পাশে টিম টিম করে মোমবাতি জ্বলতে থাকে ।

 

(৪)

সূর্যের আলো মুখে পরতে ঘুম ভেঙে যায় অনিমিখের। ধড়ফড় করে ওঠে। কালকের ব্যাপারটা কি স্বপ্ন ছিল? মুখ ধুয়ে, ভয়ে ভয়ে লাইট জ্বালায়। আবার সেই এক ব্যাপার, যদিও বাইরে সূর্যের আলোর জন্য কম বোঝা যাচ্ছে, তবু সেই শো। ঝট করে ফোন বের করে,  Tambourine constructionsএ ফোন করতে হবে। কিন্তু করতে গিয়েও থেমে যায়। ভাবে আগে কৌষিকীকে বলা দরকার। অনিমিখ প্রথমে কৌষিকীকে ফোন করে পুরো ব্যাপারটা বলে।কৌষিকী বলে সে এখুনি ওদের না জানাতে, বিকেল করে চারটে নাগাদ আসবে, তারপরে ব্যাপারটা কি সে নিজের চোখে দেখতে চায়।

কৌষিকী ঠিক সময়ে এসে যায়। সন্ধ্যে হলে অনিমিখ ভয়ে লাইট জ্বালায়, আর সঙ্গে সঙ্গে  শো শুরু হয়ে যায়। কৌষিকীও  পুরো আতঙ্কে অস্থির হয়ে যায়।  এ ঘর ও ঘর ছোটা ছুটি করতে থাকে আর লাইট জ্বালাতে থাকে। ওরা দুজন প্রায় দেড়- দুই ঘণ্টা ধরে পুরো ব্যাপারটা দেখতে থাকে।   

 

“তুই কিছু বুঝলি”, প্রথমে কৌষিকী বলে ওঠে।

 “কিছুটা, পুরোটা না”

“আমি বোধহয় বুঝেছি পুরোটাই”

“কি বুঝেছিস, বল?”

“সব ভিডিও গুলো ভাল করে লক্ষ্য কর একই লোকেরা রয়েছে। সেই বাবা। মা আর ছোট ছেলে”

“হ্যাঁ, তাতে কি এল, আমি তো কাল থেকেই দেখছি, ওরা তিনজনে রয়েছে। বাব, মা ছেলে। আর কোনও লোক নেই।   তারা বাড়ির ভিতর নানা রকমের কাজ করছে। বাড়িতে যা যা কাজ করা হয়।”

“হ্যাঁ কিন্তু তুই একটা জিনিস লক্ষ্য করেছিস? যে ওরা যখন খাচ্ছে, সেই ভিডিওটা কোথায় দেখাচ্ছে? তোর ডাইনিং হলে। প্যাটার্ন টা লক্ষ্য কর। শুতে যাবার ভিডিওটা কোথায় তোর বেড রুমে। তুই রাতে লাইট জ্বালিয়ে বাথরুমে যা। তুই ওদের বাথরুমে যাবার ছবি দেখতে পাচ্ছিস। তুই লজ্জায় চোখ বন্ধ করছিস বারবার। ”

“বলছিস কিরে! ঠিকই তো বলছিস! তার মানে?”

“মানেটা খুব সহজ অনি, ভিডিও তে যে ডাইনিং রুম দেখাচ্ছে সেটা এই বাড়ির ডাইনিং রুম। একবারও তোর উলটো দিকের দেয়াল দেখে মনে হল না? এই ভিডিও গুলো এই বাড়ির ভিডিও। দেয়াল গুলো জাস্ট ক্যামেরার কাজ করেছে।এই দিকের দেয়াল থেকে ওই দিকের ছবিটা এসছে, ওই দিকের দেয়াল এই দিকের শুটটা এসছে। বাথরুমেও তাই। তুই খোঁজ নিয়ে দেখ এই পরিবারটা আগে এই বাড়িতে ছিল। আর  এই বাড়িটা ওদেরই কেনা।আমার কথা মিলিয়ে নিস। ”

“ওরা কি ভাবে এই রেকর্ডিংটা করল?”

“আমার ধারণা ওরা রেকর্ডিং করেনি, ওদের অজান্তে হয়েছে। দেয়ালে কিছু সমস্যা আছে। বিজ্ঞানটা কি আমায় বুঝতে হবে।”

“তুই কি করে সিউর হচ্ছিস যে ওরা রেকর্ডিং করেনি, ওদের অজান্তে হচ্ছে।”

“খুব সিম্পল, ওদের মোটিভেশন কি ? আর ব্যক্তিগত জীবনের রেকর্ডিং কেন করবে? আর ছেড়েই  যাবে কেন অন্য লোকের হাতে? কেই বা নিজে দের বাথরুম করার ভিডিও শুট করবে? ওদের কোনও আইডিয়াই নেই ।” বলতে বলতে হটাৎ থেমে যায়  কৌষিকী , দৌড়ে শোবার ঘরে চলে যায়।

“কি হল কোথায় যাচ্ছিস?”

“তুই একটু বস, আমি শোবার ঘর থেকে একটু আসছি”

পনের মিনিট পর আবার ফিরে আসে কৌষিকী।

“অনি, আমরা জোর বাঁচান বেঁচে গেছি। যদিও পুরো পুরি নয়। তুই এই বাড়ি ছেড়ে কোনও দিন বেরতে পারবি না। রাতে কাউকে এখানে ডাকতে পারবি না। আমি আর তুই থাকব। ”

“কি বলছিস ! আমি সিম্পলই কিছু বুঝতে পারছি না”

“দেখ এই দেয়াল গুলো আসলে কিছুই নয় এক একটি ক্যামেরা, আগের পরিবারের এখানে থাকা সমস্ত মুহূর্ত এখানে বন্দী হয়েছে। যতক্ষণ লাইট জ্বলেছে ততক্ষণ হয়েছে। যে লাইট নিভে গেছে আর কোনও রেকর্ডিং হয়নি। এই সব রেকর্ড গুলো শুরুর থেকে চলছে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস এদের রেকর্ড শেষ  হয়ে গেলে  তোর এখানে কাটানো মুহূর্ত গুলো দেয়ালে টেলিকাস্ট হবে। বেঁচে গেছি এই কারণে আমরা শোবার আগে লাইট নিভিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু অন্য সমস্যা গুলো রয়ে যাচ্ছে। ভেবে দেখ কি করবি একদিকে প্রাইভেসি, অন্য দিকে সমস্যার সমাধান। যদিও আমি তোকে কোনও দিনই দ্বিতীয় অপশনে যেতে দেব না। এটা শুধু তোর একার ব্যাপার নয়, আমিও এই বাড়িতে থেকেছি।”

সোফা থেকে উঠতে গিয়েও উঠতে পারেনা অনিমিখ। সমস্ত শরীরের মধ্যে একটা ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে যায়। এতদিন সে শুনেছিল দেয়ালের কান আছে, এখন সে বুঝতে পারছে যে দেয়ালেরও চোখ আছে।

লেখক পরিচিতি : ইন্দ্রনীল চক্রবর্তী
ইন্দ্রনীল চক্রবর্তীর জন্ম ১৯৭৮। লেখালেখির শুরু একুশ-দশের গোড়ায়। পেশায় ইইইট-হায়দ্রাবাদে কর্মরত বিজ্ঞানী ও সহযোগী অধ্যাপক। গবেষণার বিষয় কোয়ান্টাম ইনফরমেশন। এখন ৪৬ টি গবেষণা প্ত্র প্রকাশিত। সাহিত্য জগতে কবিতা, অনুগল্প, অনুবাদের মাধ্যমে বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় লেখা লেখির শুরু। বিভিন্ন পত্র প্ত্রিকার মধ্যে রয়েছে, কৌরব, ক্ষেপচুরিয়ান্স,আবহমান, কালিমাটি অনলাইন, আদরের নৌকা, দলছুট,বুকপকেট, অন্যনিষাধ,অপরজন ইত্যাদি নামী প্ত্রিকা। প্রথম বই মন খারাপের পর ।দ্বিতীয় বই “গেট নাম্বার-২২ এর কবিতা”। কবিতার লেখার পাশাপাশি রয়েছে চলচ্চিত্রের প্রতি অনুরাগ। বিভিন্ন দেশের চলচিত্র দেখা ইন্দ্রনীলের অন্যতম শখ। নিজের কবিতা প্রসঙ্গে ইন্দ্রনীল উবাচ - যেটুকু বলা হল কবিতায় তার বাইরে আসল কবিতাটুকু রয়ে গেল।

শেয়ার করে বন্ধুদেরও পড়ার সুযোগ করে দিন
  •  
  •  
  •  
  •  

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।