এক রোজার রাত

লেখক : বিপ্লব নসিপুরী

“আচ্ছা দাদা, রোজা তো অনেকগুলো হ’ল, ঈদ কবে?”
বছর আটের ছোট্ট নাতির কচি মুখের বুলি শুনে গগনে পূর্ণশশীর পানে অঙ্গুলি নির্দেশিত করে বছর সত্তরের বিছানায় শায়িত শীর্ণদেহের আতাহারবাবু বললেন, “ওই যে দেখছ চাঁদ কেমন গোল সোনামুখ করে আলো দিচ্ছে। পৃথিবীর সবকিছু উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে তার তরলায়িত জ্যোৎস্নায়। এরপর সে ছোট হতে শুরু করবে। আমার মতই শীর্ণ, দুর্বল হয়ে যাবে। তারপরে হারিয়ে যাবে ধরাকে আঁধারে ডুবিয়ে। আবার জন্ম নেবে ছোট্ট শিশুর মত খিলখিল করে আকাশের ওই কোণে। আর সেদিনই আসবে খুশির ঈদ।”
দাদুর কথায় ইমরান কৌতূহলী হয়ে জানতে চাইল, “আচ্ছা, চাঁদটা কেন বাড়ে কমে? ওই তো বাল্বটা কেমন জ্বলজ্বল করছে। ওটা তো কমে না।”
একটা শুকনো হেসে দাদা বললেন, “আরে, ওটা তো পুতুলের মত দড়িতে বাঁধা। মেলায় দেখনি দড়ির টানে পুতুলটা কেমন নাচে, দুলে দুলে ওঠে। তেমনই তারের বিদ্যুতের স্পর্শে ও প্রাণ পায়। বিদ্যুৎ চলে গেলে নিশ্চল হয়ে যায়। আমাদের জীবনটা তো চাঁদের মত, বাড়ে, কমে, কখনও হারিয়ে যায় অন্ধকারে, আবার কখনও ঝলমল করে ওঠে।”
সহসা মুখখানি হাসিতে ভরিয়ে ইমরান বলে, “এবার ঈদে আনিশের মত ঝলমলে পোশাক দেবে কিন্তু।”

মাটির কাঁচা বাড়িটা স্থির জ্যোৎস্নার স্বর্ণালি জলে কঙ্কালের মতই দাঁড়িয়ে আছে। উপরের খড়ের আচ্ছাদনে বিস্তর ফাঁক-ফোঁকর, যা দিয়ে সূর্যের খররোদ উদ্দাম তাণ্ডব করে বাটির অন্তরে। তেমনই চাঁদের জোছনা এসে মায়াবী আলোয় ভরিয়ে তোলে গরিবের গৃহখানি। এগুলো সহ্য হ’লেও অসহ্য হয়ে ওঠে বর্ষার ওইসব দিন।আগলহীন বর্ষার বৃষ্টি বর্শার মতন ঝরে পড়ে তাঁর গৃহে। তিনি ভেবেছেন বাড়িটা পাকা করবেন। কিন্তু…
আকাশের উজ্জ্বল তারাগুলোর পানে চেয়ে ইমরানের বাবা-মার কথা মনে এল তাঁর। বছর পাঁচেক আগে এক অ্যাক্সিডেণ্টে তারা মারা যান। কী করে যেন বেঁচে যায় ছোট্ট ইমরান। চোখের কোণে অশ্রুবারি ছলছল করে ওঠে। তাঁর জীবনে অমাবস্যার আঁধার যে কবে ঘুচবে?
উদাস নয়ন চাঁদের জোছনার মাঝেই ডুব দেয় অন্তরের কৃষ্ণবিভাবরীর অতল গহ্বরে। মনে মনে ভাবেন “না, এবারে একটা পোশাক কিনে দিতেই হবে তাকে।” গাভীটা ডেকে ওঠে। গাভীর শব্দে তাঁর ভাবনারা নতুন করে ডানা মেলে মনের আকাশে। “গাভীর টাকায় ওর জন্য একটা ঝলমলে পোশাক ঠিক হয়ে যাবে। আর বাড়তি টাকায় এই ঘরটা মেরামত না করলেই নয়। না হ’লে হয়ত সামনের বর্ষায় গাছতলায় আশ্রয় নিতে হবে।”
সে কথা ভাবতেই চক্ষু থেকে নির্গত অশ্রুবারি জোছনায় অবগাহন করে মুক্তোকণা সদৃশ ধীর পায়ে নেমে পড়ে আশ্রয় নেয় বালিশের দেহে। বালিশের অন্তর এইরূপ অজস্র দুঃখের মুক্তোকণা সঞ্চিত করে রেখেছে তার কোমল অন্তরে।

পাশের অশ্বত্থ গাছের ডালে নিশাচর নিঃসঙ্গ পেঁচাটা শিকারের খোঁজে ইতিউতি করছে। খাবারের খোঁজে বের হওয়া ইঁদুরগুলো ওর সঙ্গে যেন লুকোচুরি খেলছে। কেউ খাবার পাবে, কেউ খাবার হবে – এ তো প্রকৃতির খেলা। তবে মানুষের মত তাদেরও কী চোখে বারি ঝরে! নাকি তাদের নয়নাকাশে শুধু সাদা মেঘের আনাগোনা। পেঁচাটা তার বৃহৎ পক্ষটা একটু আলগা করল। টের পেয়েছে খাবারের অস্তিত্ব। উড়ে গেল বিদ্যুৎ গতিতে। সে সেহরির শেষে ঊষার আলোর ছোঁয়া এড়িয়ে তলিয়ে যাবে চাঁদের মতই দিবার সুপ্তির পাথারে।

গগন ললাটে টিকলি শোভা পূর্ণশশী ক্রমে ম্লান হয়ে আসে রবির আবির্ভাবে। দাদার নয়নতীর থেকে উছলে পড়া অশ্রুনদীর গতিপথ আটকে যায় কচি অঙ্গুলিস্পর্শে। কচি দু’টো ঠোঁট সামান্য খুলে বলে, “কেঁদো না, আমার নতুন জামা চাই না। আমার এই জামাতেই এই বছরটা সুন্দর কেটে যাবে। তুমি বেশি চিন্তা করো না। আমার শুধু তোমাকেই দরকার। চাঁদের অসংখ্য তারা আছে, আড়ালে সূর্য আছে। আমার তুমি ছাড়া আর কে আছে বলো। আমি আর একটু বড় হ’লে তোমার সব দুঃখ ঘুচে যাবে। আমি সূর্যের মত প্রকাশিত হব। আর তুমি হবে আমার পূর্ণিমার চাঁদ। এখানে একটা এতবড় পাকা বাড়ি বানাব। তার ছাদে আমরা দেখব ঈদের খুশির চাঁদ।”

ছলছল করা মুক্তোগুলো নিমেষে লুকিয়ে গেল শুক্তির অন্তরালে।


লেখক পরিচিতি : বিপ্লব নসিপুরী
গ্রাম পোস্ট শীতলগ্রাম,জেলা বীরভূম,পিন ৭৩১২৩৭,পেশা শিক্ষক শখ বই পড়া ও ক্রিকেট

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।

মাসিক দীপায়ন প্রতিযোগিতা

মাসিক দীপায়ন পুরস্কার pop up