ফ্রেন্ডশিপ ব্যান্ড

লেখক : রোহিত দাস

প্রথম পিরিয়ডের বেল পড়তেই ক্লাসে রেজিস্ট্রার খাতা হাতে প্রবেশ করলেন সৌম্যদীপ্তা ম্যাম। সবাই যখন দাঁড়িয়ে তাকে গুড মর্নিং বলতে যাচ্ছে তখনই ম্যামের ছায়া অনুসরণ করে অন্য একজন ক্লাসে প্রবেশ করলো। টিচার্স টেবিলে রেজিস্টার খাতা রেখে ম্যাম গুড মর্নিং বললেন। দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সেই নতুন মানুষটি একটি মেয়ে। একটু নার্ভাস তবু তার মুখে একখানা অমায়িক হাসি যেন ভগবান একেবারে পারফেক্ট ভাবে বসিয়ে দিয়েছেন। ম্যাম তাকে তার পাশে দাঁড় করিয়ে বললেন, স্টুডেন্টস আলাপ করে নাও তোমাদের নতুন ক্লাসমেটের সাথে।-

হাই মাই নেম ইস ইন্দিরা, ইন্দিরা মণ্ডল। আমি তোমাদের নতুন ক্লাসমেট। আমি এখানে নতুন তাই প্লিজ তোমরা আমাকে হেল্প করো সবকিছু গুছিয়ে নিতে এবং আমি আশা করি আমি সকলের ভালো বন্ধু হয়ে উঠতে পারবো। ম্যাম বললেন, ও তোমাদের সাথে পরীক্ষা দিয়েছে এবং হাইয়েস্ট নাম্বার পেয়ে তোমাদের ক্লাসে প্রথম স্থান দখল করেছে। ওর জন্য একটা জোরে হাততালি হয়ে যাক। গোটা ক্লাস কয়েক সেকেন্ডের জন্য হাত তালির আওয়াজে গর্জে ওঠার পরই গুন গুন করে বলতে লাগলো, আরে ও তো রোহিত কেও…..। সৌম্যদীপ ম্যামের ‘সাইলেন্স’ ধমক শুনে সবাই গুনগুন বন্ধ করলে ম্যাম ইন্দিরাকে গিয়ে মেয়েদের রো তে বসতে বললেন। এক পলকের জন্য গুনগুন থেমে গেলেও ক্লাসের কিছু ছেলে এই বিষয়টা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে থাকে। এক কথায় গত চার বছরে যাকে কেউ নাড়াতে পারেনি তাকে পেছেনে ফেলে দিয়েছে এতে জল্পনা হওয়ারই তো কথা। এতকিছুর মধ্যেও একমাত্র যে শান্ত আর অবাক হয়ে আছে সে হলো রোহিত। ক্লাসে অন্য কেউ প্রথম হয়েছে এই বিষয়টা তার কাছে অবাক করার নয় বরং প্রতিবছর ফার্স্ট হতে হতে একটু বিরক্তি হয়ে গেছিল সে। সে অবাক অন্য কারণে, তার মুখ দেখে ঠিক অবাক বলা চলে না কিছুটা অন্যমনস্ক। নিজেকে যেন হারিয়ে ফেলেছে কোন কিছুর মধ্যে। সৌম্যদীপ্তা ম্যাম অ্যাটেনডেন্স নেওয়া শুরু করলে সে সম্বিত ফিরে পায় এবং চুলটায় একবার হাত বুলিয়ে সে বোর্ডের দিকে তাকায়। না এবারে আর তার এক রোল নাম্বার নয়, এবার সে দুই। নতুন ক্লাসে এসে এমন একটা খবর পেয়ে সবার মন প্রাণ আনচান করছিল নিউ কামার সেই মেয়েটির সাথে কথা বলার জন্য। কিন্তু রোহিত, সে তখনও নিজেকে বারবার হারিয়ে ফেলছে কোনো এক অজানা কিছুতে। প্রথম পিরিয়ডটা সৌম্যদীপ ম্যামের ইংলিশ ক্লাস ছিল। ক্লাসটা শেষ হতেই রোহিত একছুটে বাথরূমে গিয়ে ভাল করে মুখটা ধুয়ে নিল। না! ভালো করে এবার পড়াশোনায় মন দিতে হবে। এতদিনে একটা মনের মতো কম্পিটিটর পাওয়া গেছে, কম্পিটিশনে নেমে এবার বেশ মজাই আসবে।

– নতুন ক্লাসে প্রথম দিনটা নতুন ক্লাসমেটকে ঘিরেই কেটে গেল। সব ছেলেমেয়েরাই তাকে নানান প্রশ্নের জালে তাকে বেঁধে রেখেছিল। ইন্দিরা নতুন বলে সকলকে তাদের প্রশ্নের উত্তর দিতে বাধ্য হচ্ছিল, কোনো কোনো প্রশ্ন এমন ছিল যার উত্তর খুঁজে পাচ্ছিল না। স্কুল শেষে বাড়ি ফেরার সময়ও অনেক ছেলেমেয়ে ইন্দিরাকে প্রশ্ন করে যাচ্ছিল সারাদিনেও তাদের প্রশ্নের শেষ হয়নি। ইন্দিরার বাড়ির কালো মারুতি গাড়িটা ওকে নিতে এলে সবাইকে টাটা করে গাড়ির দিকে এগিয়ে যায়। রোহিত দেখল ওর দিকে একবার, আজ কথা বলার সময় হয়নি। কথা বলতে চেয়েছিল এমনটাও নয়। কালো গাড়িটা ধীরে ধীরে দূরে গিয়ে মিলিয়ে গেল।

– এভাবে এক সপ্তাহ কেটে গেল ছেলেদের ভীড় এখনো ইন্দিরার সাথে লেগেই থাকে। ইতিমধ্যে কিছু সিনিয়র তো তাকে প্রপোজ করে ফেলেছে।ঘটে গেছে আরো কত কাহিনী। কিন্তু যেটা বদলায়নি সেটা হল রোহিতের সেই আনমনা ভাব।

– রোহিতের আনমনা ভাবটা লক্ষ্য করেছে ইন্দিরা। বাকি মেয়েদের জিজ্ঞেস করাতে তারা তাকে বলেছে, ও ওই রকমই, সারাদিন একলা একলাই থাকে, খুব একটা বন্ধুও নেই, বড্ড একারোখা আর হিংসুটে স্বভাবের ছেলে। ছাড়তো ওর কথা। ওকে নিয়ে বেশি ভাবিস না। ওদের কথা ইন্দিরা যেন পুরোপুরি বিশ্বাস হয়না, এরকম কি কেউ হতে পারে? মনে মনে ভাবে সে।

– সবার কাছ থেকে জেনে নিয়ে ইন্দিরা সবার সাথে একই প্রাইভেটে কোচিং নিয়েছে। স্কুল শেষে আবার দেখা হয় তাদের, আড্ডা জমে। নতুন জায়গায় নতুন বন্ধুদের সাথে ঘুরতে যাওয়া,খাওয়া-দাওয়া করা। এককথায় খুব তাড়াতাড়ি মিশে গেছে সে সবার সাথে। সবার খুব ভালো বন্ধু হয়ে উঠেছে। বেশ পছন্দ করে সবাই ওকে।‌ নাম্বার এক্সচেঞ্জ করে অনেক রাত পর্যন্ত কথা হয় অনেকের সাথে। ক্লাসের গ্রুপটায় সবার সাথে কথা বলতে বলতে অনেকের অনেক কিছুই জানতে পেড়েছে সে। জানতে পেড়েছে ক্লাসের কিছু প্রেমের গল্প। সবাই প্রায় অ্যাক্টিভলি কথা বলে গ্রুপটায় শুধু একজনই থেকেও না থাকা হয়ে আছে গ্রুপটাই সেটাও লক্ষ্য করেছে সে। ইন্দিরার কৌতুহল বাড়তে থাকে। যাকেই ওর বিষয়ে জিজ্ঞাসা করে সেই একই কথা বলে।

– নতুন স্কুলে এসে দু মাস কেটে গেছে ইন্দিরার। প্রথম একমাস তো কিভাবে হাসতে খেলতে পেরিয়ে গেছে বুঝতেই পারিনি। চরম গরমের পর শহর ভেসেছে বর্ষার স্নিগ্ধতায়। স্কুল ছুটির পর একদিন রোহিত রোজকার মতো ফুটপাত ধরে হাঁটছিলো। হঠাৎ দেখল রাস্তার ওপারে বাসস্ট্যান্ডে একটা বেঞ্চের উপর বসে আছে ইন্দিরা। রোহিত রাস্তাটা পার করে বেঞ্চের কাছে গিয়ে বলল, তুমি এখানে! ইন্দিরা চমকে উঠেছিল পাশ ফিরে বলল, ওহ তুই..! ভয় পেয়ে গেছিলাম রে..। আসলে আমাদের ড্রাইভার এর শরীর খারাপ আসতে পারবেনা বলল তাই বাসে যাবো।

– কিন্তু আজ তো বাস অবরোধ। একজন ড্রাইভার কে কেউ মেরেছে তাই তারা আজকে বাস অবরোধ করেছে।

– এমা একদম জানতাম না রে, কি করি এখন?

– এখান থেকে কিছুটা গিয়ে ডান দিকে ঘুরে গিয়ে কিছুটা গেলে একটা অটো স্ট্যান্ড আছে। আমি ওদিকেই যাচ্ছি চাইলে আসতে পারো। এরপর আর কিছু বলল না ইন্দিরা। ওরা দুজনে হাঁটতে শুরু করল। কিছুক্ষণ দুজনেই নীরব। নীরবতা ভেঙে ইন্দিরাই প্রথম প্রশ্নটা করলো, তুইতো এদিকে আসিস না আজ তাহলে এদিকে? রোহিত বললো, ওই রাস্তায় কাজ চলছে রাস্তাটা বন্ধ তাই আজকে এদিকে আসতে হলো। দুপুর দিকে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে এদিকে। একটা ঠান্ডা হাওয়া খেলে বেড়াচ্ছে চারিদিকে। রাস্তার যে দিকটা দিয়ে ওরা হেঁটে যাচ্ছিল সেদিকে ছোট ছোট গর্তে জল জমেছে। পাশাপাশি হেঁটে চলা ইন্দিরা হঠাৎ মাঝরাস্তায় ঘেঁষে একটা গর্তের জলে ঝপাৎ করে লাফিয়ে উঠলো। কিছুটা জল ছিটকে গিয়ে রোহিতের জামাকাপড়ে লাগলো। কিন্তু আজ রেগে গেলো না সে। পাশের গর্তে জলের উপর লাফালাফি করা মেয়েটাকে দেখে আজ কেমনি যেন অনুভব হল তার। মনে হল যেন এভাবেই সে লাফালাফি করুক আর কিংকর্তব্যবিমূঢ় সে দাঁড়িয়ে দেখুক তাকে। ঠান্ডা হাওয়া ভিজে জামাটা গায়ে ঠিক তেই শিউরে উঠল সে। সচরাচর হাসে না সে‌। কিন্তু আজ তার ঠোঁটের কোণে একটা অকৃত্রিম হাসি ফুটে উঠল। চোখের কোণে জমতে শুরু করেছে আনন্দের ফোঁটা জল। মিষ্টি গলায় সে বলল, চলো এবার।ওরা আবার হাটা শুরু করে। আচ্ছা তুই এত চুপচাপ কেন? কারো সাথে কথা বলিস না! infact এখনও দেখ কিরকম চুপচাপ যাচ্ছিস আমার সাথে। রোহিতের ঠোঁটের কোণে এখনো সেই হাসিটা লেগে আছে। সে উত্তর দেয়, কই কি বলবো?

– তখন থেকে দেখছি তুই হাসছিস। কেন রে?

– নাহ্ কই হাসছি? হাসিটা লুকানোর চেষ্টা করে সে। রোহিতের এরকম আচরণ দেখে মুচকি হাসে ইন্দিরা। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎই রোহিতকে একটা অবাক করা প্রশ্ন করে ইন্দিরা, আচ্ছা তোর ফুচকা না চাট কোনটা ভালো লাগে?

– রোহিত ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলে, কি?

– ইন্দিরা জোর গলায় বলে, তোর ফুচকা না চাট কোনটা পছন্দ? রোহিত প্রশ্ন করে, কেন?

– দেখ ওখানে ফুচকার দোকানটা খোলা চল ফুচকা খায়…।

– না আমি খাই না।

– না খায় না! ভ্যাংচাই ওকে ইন্দিরা। চল তো আমি খাওয়াবো। রোহিতের ডান হাতটা ধরে টান দিয়ে রাস্তা আর ওপারে নিয়ে যায়। দোকানদারকে খুব বেশি ঝাল দিয়ে ফুচকা বানাতে বলে। কালো ত্রিপলের নিচে শালপাতার বাটি হাতে রোহিত প্রথম ফুচকা টা মুখে নিতেই খুব ঝাল লাগে ওর। রোহিতকে জল খেতে দেখে ইন্দিরা হাসতে থাকে। আহারে আহারে বলে রাগাতে থাকে। রোহিত কোনরকমে দশটা ফুচকা খেয়ে শেষ করে। আবার অটো স্ট্যান্ড এর দিকে হাঁটা দেয় ওরা। মিনিট দুয়েকের মধ্যেই পৌঁছে যায় স্ট্যান্ডে। একটা অটোতে চেপে ইন্দিরা বলে মাঝে মাঝে বন্ধুদের সাথে একটু সময় কাটা দেখবি ভাল লাগবে। রোহিতের উস্কো চুলগুলোতে হাত বুলিয়ে এলোমেলো করে দেয় ইন্দিরা। অটো কিছুটা এগিয়ে গেলে মুখ বের করে হাত নাড়িয়ে টাটা বলে ইন্দিরা। রাস্তা পার করে সরু গলির ধারে বাড়ির পথ ধরে রোহিত।

– দেখতে দেখতে চলে আসে ক্লাস টেস্ট। অন্য ক্লাসের ছেলেমেয়েদের সাথে বসে পরীক্ষা দেয় ক্লাসের ফার্স্ট গার্ল এবং সেকেন্ড বয়। শেষ পরীক্ষা টা ছিল জীবন বিজ্ঞান। তিন ঘন্টার পরীক্ষা প্রায় দু’ঘণ্টা কুড়ি মিনিটে কমপ্লিট করে খাতা গুছিয়ে রোহিত নিজের পেন হাতে নিয়ে এদিক ওদিক দেখছিল। হঠাৎই তার চোখ গেল ইন্দিরার দিকে। দেখল ইন্দিরা বারবার তার হাতের ব্যান্ড টা খুলছে আর একবার করে হাতে পড়ছে। কোনো কোনো সময় তো খুব বিরক্তিতে ওটাকে ছুড়ে ফেলে দিচ্ছে নিচের ডেস্কে। এরকম করতে ওকে আগে কখনো দেখেনি। হাতের ব্যান্ড টাকে খুব যত্ন করে সে। কিন্তু আজ তার এইরকম আচরণের কারণ খুঁজে পায় না রোহিত। নিজের খাতার দিকে মুখ ফিরিয়ে নেয় সে। কিছুক্ষণ পর আবার যখন গোটা ক্লাসে চোখ ঘোরাতে গিয়ে ওর চোখটা আবার আটকে পড়ে ইন্দিরার কাছে। এখনো একইরকম ভাবে সে পড়ে আছে ব্যান্ডটাকে নিয়ে। রোহিতের মনে প্রশ্ন জাগে আদৌ সে কিছু লিখেছে কিনা? জবাব খুঁজে পায়না সে। সময় গড়িয়ে পরীক্ষা শেষের ঘন্টা বাজে। স্যার একে একে সব আর খাতা গুলো তুলে নেয় টেবিল থেকে। রোহিত ভাবে ইন্দিরা কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করবে একবার। কিন্তু খাতা জমা দিয়ে ছুটে বেরিয়ে যায় ক্লাস থেকে ইন্দিরা। নিজের খাতা জমা দিয়ে সে খোঁজে ওকে কিন্তু কোথাও দেখতে পায় না আর। আবার ক্লাসে ফিরে গিয়ে ওর বেঞ্চে গিয়ে নিচের ডিস্কে হাত বোলায় একবার সে। হাতে আসে সেই ব্যান্ডটা। নিজের কাছেই রেখে দেয় ওটা। পরীক্ষা শেষ, কাল শনিবার হাফ ডে তাই ছুটি দিয়ে দিয়েছে স্কুল পরশু রবিবার! ইন্দিরার সাথে আবার দেখা হবে সেই সোমবার, সেদিনই ফিরিয়ে দেবে তাকে তার জিনিসটা। এই ভেবে পকেট এ রেখে নেয় ব্যান্ডটা।

– ফোনটা বারবার বেজে চলেছে। একঘেয়ে রিংটোনটা শুনতে শুনতে বিরক্তিটা মাথায় চলে যায় রোহিতের। রেগে গিয়ে ফোনটা রিসিভ করে আচ্ছা করে এই ঝারন দিতে যাবে, ওপাশ থেকে একটা মেয়ের গলা। – হ্যালো রোহিত আমি অপূর্বা বলছি রে খুব ইমারজেন্সি তাই ডিস্টার্ব করছি রে। রোহিত শান্ত হয়ে বলে কি হয়েছে বল..। আসলে ইন্দিরা ওর হাতের ব্যান্ডটা খুঁজে পাচ্ছে না ওটা ওর খুব প্রিয়। তোরা এক রুমে পরিক্ষা দিচ্ছিলি, পরশু দিন লাস্ট দেখেছিল ওটা। স্কুলে ফেলে এসেছিল বোধহয়। তুই কি ওটা কুড়িয়ে পেয়েছিস?

– রোহিত কড়া গলায় না দেখিনি বলে ফোনটা কেটে দেয়। মনটা ভালো নেই ওর। আজ ওর মায়ের মৃত্যু বার্ষিকী। সকাল থেকে মা’র কথা মনে পড়াতে কেঁদে ফেলেছে একবার। একটু ভাবতেই ব্যান্ডের কথাটা ওর মাথায় আসে। একলাফে বিছানা ছেড়ে উঠে দেওয়াল হেঙ্গার টার দিকে যায়। স্কুলের ইউনিফর্মের পকেট থেকে বের করে আনে ব্যান্ডটা। বারান্দায় সোফায় বসে স্কুলের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপটা থেকে ইন্দিরার নাম্বারটা বের করে। ফোনটা করতে গিয়েও ফোনটা রেখে দেয় পাশে। দেখতে থাকে ভালো করে ব্যান্ডটাকে। আর পাঁচটা ফ্রেন্ডশিপ ব্যান্ড এর মতই এই ব্যান্ডটা। খুঁজে পাইনা এটাকে নিয়ে ইন্দিরার এত ব্যতিব্যস্ত হবার কারণ। কাল তাকে ফিরিয়ে দেবে এটা। ভুলে যাতে না যায় তার জন্য আবার ওটাকে প্যান্টের পকেটে রেখে দিল সে।

– স্কুল পৌঁছতে একটু দেরি হয়ে গেল আজ। ঘন্টা পরার মিনিট পাঁচেক আগে ক্লাসে ঢুকলো সে। ঢুকেই প্রথমে যেটা লক্ষ করলো ভগবানের পারফেক্ট ভাবে হাসি বসানো মেয়েটার মুখে দুঃখের কালো রং। অপূর্বা ওকে সান্তনা দিচ্ছে আর বলছে, আজ তোর বার্থ ডে আজ এমন মুখ করে থাকলে চলে? রোহিত পকেটে হাতটা ঢুকিয়ে রেখেছিল। কথাটা কানে যেতেই ওর খুব কষ্ট হলো। মনে হল ওর জন্যই এত কষ্ট পাচ্ছে ইনু..। ইনু! নামটা বেশ ভালো লাগে ওর। কষ্টের মাঝেই একটা মুচকি হাসি ফুটে ওঠে। নামটা বলতে বলতে প্রেয়ার হলের চলে যায় সে।

– টিফিনের ঘন্টা পরার পরেই ইন্দিরা মাঠে চলে যায়। রোহিত সাহস করে ওর কাছে যায়। কি ব্যপার একলা একলা বসে আছো যে জিজ্ঞেস করে রোহিত।

– না এমনি! ধরা গলায় উত্তর উত্তর দেয় ইন্দিরা।

আয় বস এখানে। কাঠের বেঞ্চটায় ইন্দিরার একটু দূরে বসে পরে রোহিত। কি বলে কথা শুরু করবে ভেবে পাইনা সে। প্রথম প্রশ্ন টা ইন্দিরাই করে, আচ্ছা তুই করো সাথে কথা বলিস না কেন? তোকে নিয়ে সবাই কত রকম উল্টো-পাল্টা ভাবে!

– কে কি ভাবলো তা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই।

– কিন্তু আমার তো খুব খারাপ লাগে নাহ্ তোকে নিয়ে এভাবে বলে ওরা…। রোহিত অবাক হয়ে একবার তাকায় ইন্দিরার দিকে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা একসাথে ছোঁয়াছুঁয়ি খেলছে, ওদের দেখতে দেখতেই রোহিত বললো আমার তখন চার বছর বয়স বাবা হার্ট অ্যাটাকে মারা যান। মা কাজ করতে শুরু করেন। কথা হতো না খুব একটা। সারিদিন অফিসের কাজে ব্যাস্ত থাকেন। আমিও সকালে স্কুল যেতাম তখন। বাড়ি যখন ফিরতাম মা তখন‌ অফিসে। আস্তে আস্তে চুপচাপ একলা থাকাটা অভ্যাস হয়ে ওঠে।

– আচ্ছা তুই মায়ের সঙ্গে থাকিস তবে.. কেমন আছেন তিনি??

– নেই..বছর চারেক আগে মাও..

– ওহ্ সরি…।

– ইটস ওকে। তোর বাবা মা…

কথা শেষ করতে দেয়না ইন্দিরা। আগেই বলে দেয়, নেই, একটা দূর্ঘটনায় দুজনেই…। গলাটা আবার ধরে আসে ইন্দিরার।

– সরি ইনু তোকে কষ্ট দিতে চাইনি.. দুজনেই একে অপরের দিকে তাকাই… মনে মনে বলা নামটা নার্ভাস হয়ে বলে ফেলছে রোহিত। নাম শুনে একটু হেসে ফেলে সে। ওকে হাসতে দেখে ভালো লাগে ওরও

– আচ্ছা ব্যান্ডটা খুব প্রিয় না তোর? জিজ্ঞেস করে রোহিত।

– হুম। এক্সিডেন্টের ঠিক আগের বছর জন্মদিনে বাবাকে ওটা আমাকে গিফট করি। একটিবারের জন্যও কোনদিনও হাত থেকে খুলে রেখেনি বাবা।

– আজ তো তোর বার্থডে, একটা জিনিস আছে তোর জন্য বললো রোহিত।

নরম গলায় বলে, চোখটা বন্ধ কর হাতটা বাড়া। চোখ বন্ধ করে হাতটা বাড়িয়ে দেয় ইন্দিরা। পকেট থেকে ব্যান্ডটা বের করে পড়িয়ে দেয়।

– হ্যাপি বার্থডে ইনু। বন্ধু হবি আমার?

– তুই এটা কোথায় পেলি? আবার সেই পুরোনো হাসিটা খেলে উঠে ইন্দিরার মুখে। রোহিত বলে চলে, সেদিন পরীক্ষা শেষে তোর ডেস্কে নিচে পেয়েছিলাম। তুই তো বাড়ি চলে গেলি তাই তোকে দেওয়া হয়নি। ভেবেছিলাম আজ ফিরিয়ে দেব আর বন্ধু বানাবো তোকে।

– আমি তো তোর বন্ধুই রে…।

– না শুধু বন্ধ নয় স্পেশাল বন্ধু। মানে বেস্ট ফ্রেন্ড।

– ধুর তুই না পাগল একটা। রোহিতের হাতে একটা আলতো ঠেলা দেয় ইন্দিরা। দুজন

হাসতে থাকে একে অপরের দিকে তাকিয়ে।।


লেখক পরিচিতি : রোহিত দাস
রোহিত দাস

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।