হিপ্পোলিটাস

লেখক : নাহার তৃণা

(প্রথম পর্ব)

টিঙ্কু পাঁচপেয়ের কাছ থেকে ফিরে আসা অবধি গুম হয়ে আছে হিপ্পো। স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে, কিছু একটা ওকে গভীরভাবে ভাবাচ্ছে। শৈশব থেকেই হিপ্পো অর্থাৎ হিপ্পোলিটাস চিন্তাশীল স্বভাবের। কোন ব্যাপারে না জেনে হুটহাট সিদ্ধান্তে পৌঁছায় না। আজ টিঙ্কু পাঁচপেয়ে পাঁজিসহ আরও বিভিন্ন তথ্যসূত্র দেখিয়ে যা বোঝাল তাতে হিপ্পো নিশ্চিত, সে এশিয়ান প্রজাতিভুক্তদের একজন।

নিজের বংশপরিচয় উদঘাটনে মরিয়া ছিল সে এতদিন। আজ বুড়োর মুখে তথ্যটুকু পেয়ে সামান্য হলেও বুকের ভার খানিকটা নামল। সাধারণত প্রজাতি সনাক্তের জন্যে ওরা এক ধরণের সংকেত ব্যবহার করে থাকে। শুঁড় দিয়ে একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে সংকেত পাঠিয়ে স্বগোত্রীয় অন্যদের সহজে চিনে নেয়। কিন্তু, ঘোঁট পাকিয়ে বিদ্রোহ বা ষড়যন্ত্র রুখতে ওদের মত যুদ্ধবন্দিদের সনাক্তকরণ শুঁড়টি উপড়ে নেওয়া হয়। টিঙ্কু পাঁচপেয়ে লক্ষণ বিচারে বিশেষ পারদর্শী, যে কারণে হিপ্পোর প্রজাতি সনাক্ত করা তার পক্ষে সম্ভব হয়েছে। হিপ্পোলিটাস যুদ্ধশিশুদের একজন। ওর মত যারা খাদ্য, বাসস্থান ইত্যাদি দখলের যুদ্ধে হেরে গিয়ে বিজয়ীপক্ষের হাতে বন্দি হয়, তাদের বেশির ভাগই যোগ্যতার ভিত্তিতে শ্রমিক হিসেবে এই পিঁপড়ে টুলির (কলোনি) নানান কাজে নিযুক্ত হয়। পরবর্তী ধাপে সৈন্যবাহিনীতে নাম লেখানো বাধ্যতামূলক। ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে রাণীর জন্য নির্বাচিত কিছু পুরুষ পিঁপড়ে দ্রণ হিসেবে মনোনয়ন পেয়ে যায়। দ্রণের পদ খানিকটা রাজার মত, তবে ক্ষমতাহীন। আর কে না জানে, ওদের সমাজে সব ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকে রাণী। দ্রণেরা সাক্ষীগোপাল, তাদের তেমন কিছুই করতে হয় না, যে কারণে অনেকের কাছে দ্রণের জীবন আরাধ্য। বিশেষ করে ফাঁকিবাজ অনেকেই নির্ঝঞ্ঝাট একটা জীবনের আশায় রাণী মহলের প্রতি ছুঁকছুঁক করে। পায়ের উপর পা তুলে কাটিয়ে দেওয়ার জন্য এর চেয়ে ভাল ব্যবস্থা আর হতেই পারে না।

বাইরের পৃথিবী জানে ওদের সমাজের সবাই দিনরাত বিরামহীন কর্মযজ্ঞে ব্যস্ত। কথাটা পিঁপড়ে টুলির বাইরে মুক্ত জীবনে অভ্যস্ত গোত্রের জন্য হয়ত ঠিক। পিঁপড়ে টুলির জীবনে শীতকালটা গরমকালের তুলনায় খানিকটা কম খাটুনির, তবে একেবারে শুয়ে বসে কাটানোর নিয়ম নেই। নিয়ম মেনে কাজেকর্মে লেগে থাকতে হয়। বিশেষ করে সৈন্য আর শ্রমিকদের বসবার ফুরসতটুকুও মেলা ভার। দুঃখজনকভাবে ওদের মধ্যেও কাজে ফাঁকি দেবার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। পরিশ্রমী পিপীলিকা সমাজের প্রাথমিক যুগের ইতিহাস ছিল মোটামুটি শ্রেণীহীন। যদিও তাদের মধ্যে খাদ্য, বাসস্থান ইত্যাদি নিয়ে কোলাহল-ক্যাচাল লেগে থাকত প্রায়ই। তাদের পৃথিবীর হিসেব সোজাসাপটা। যোগ্যতাই টিকে থাকবার মাপকাঠি। জাতপাতের ধার এরা তেমন ধারেনি খুব একটা। পরে জাতপাতের রেষারেষিটা মনুষ্যসমাজের সাথে পাল্লা দিয়ে তাদের মাঝেও সংক্রামিত হয়েছে। আলস্য বা কাজে ফাঁকি দেবার প্রবণতা এদের সমাজে প্রায় অকল্পনীয়, কিন্তু হালে তা মহামারীর আকার নিয়েছে। এই কুপ্রবণতাটি মনুষ্যসমাজে বসবাসকারী পিপীলিকাদের মাধ্যমে টুলিগুলোতে আশঙ্কাজনকভাবে ছড়াচ্ছে।

ধারণাটা নিছক পাঁচপেয়ের মনগড়া না। পিপলীবিজ্ঞানীরা রীতিমত গবেষণা করে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছিয়েছে। পাঁচপেয়ে এসব নিয়ে ভীষণ চিন্তিত। এ বিষয়ে সে পিলপিল গবেষণাকেন্দ্রের বিজ্ঞানীদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে সমাজে সচেতনতা সৃষ্টি করতে একটি ধারাবাহিক প্রবন্ধ লিখছে সপ্তাহিক পিপীলিকাবার্তার জন্য। আজ খসড়া দেখে দেবার সময়টুকুতে হিপ্পোর কাছে আরও কিছু খবরের সাথে এ তথ্যটাও আগাম ফাঁস করেছে বুড়ো। এ কাজটি সে প্রায়ই করে থাকে। পাঁচপেয়ে এই টুলির শুধুমাত্র রাজপণ্ডিত নয়, বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীদের প্রথম সারির একজন। ইতিহাস, বিজ্ঞান, সমাজকথা ইত্যাদি বিষয়ে তার বিস্তর লেখালিখি। হিপ্পোকে এসব কাজে নিজের সহকারী হিসেবে নিয়োগের অনুমতি সে রাণীর কাছ থেকে আদায় করে নিয়েছে। কাজের ফাঁকে যে কোন তথ্য বা প্রশ্নের উত্তর পেতে হিপ্পোর তেমন বাধা নেই। তবে হিপ্পো কর্তব্য-কাজে অবহেলার পাত্র নয়। নিয়ম করে নিজের কাজ শুরুর আগে ও পরে দু’দফায় সে পাঁচপেয়ের কাজে প্রয়োজন মত সাহায্য করে। এই বাড়তি দায়িত্ব পালনে সে বিশেষ আনন্দ পায়। তার জানবার আগ্রহ অসীম।

টুলির বিশেষ মহলের কানাঘুষো, হিপ্পোকে রাণীর একজন দ্রণ হিসেবে নিযুক্তির আলোচনা চলছে। খবরটা যে স্রেফ গপ্পো নয়, সে তথ্যটা পাঁচপেয়ে জানিয়েছে আজ। লেখার খসড়া দেখাবার ফাঁকে ফাঁকে বিভিন্ন ইতিহাস, নিয়মিত লিখে যাওয়া ডায়রি পড়তে দেওয়াসহ টুলির অলিতে-গলিতে ঘটে যাওয়া গোপন সব তথ্য হিপ্পোর কাছে উজাড় করে দিতে না পারলে বুড়ো যেন ঠিক স্বস্তি পায় না। বুড়ো পাঁচপেয়ে হিপ্পোকে কোন এক অজানা কারণে ভীষণ পছন্দ করে। ডাকতে সুবিধা, এই অজুহাতে বুড়ো তার জাঁকালো নাম হিপ্পোলিটাসকে ‘হিপ্পো’ করে ছেড়েছে। অজানাকে জানার অদম্য আগ্রহ আর শান্ত-চিন্তাশীল স্বভাবের জন্যে হিপ্পো বিশেষ প্রশ্রয় আর স্নেহ পায় টিঙ্কু পাঁচপেয়ের, যা পিঁপড়ে টুলির অনেকের গাত্রদাহের কারণ। পেশায় পাঁচপেয়ে রাজপাঠশালার পণ্ডিত। যদিও তাদের এই পেশা নিয়ে কোথাও কোন উচ্চবাচ্য হয় না। ওর মত বিশেষ কয়েকজন এই পেশায় জড়িত। রাণীর ইচ্ছা অনুযায়ী, তার নির্দিষ্ট সংখ্যক সন্তানকে শিক্ষা দেবার জন্য তাদের টুলিতে রাজপাঠশালা আছে। সৈন্যদের মধ্যে যারা যুদ্ধে আহত হয়ে শারীরিক ভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করে, দক্ষতার বিচারে তাদের বিভিন্ন কাজে নিযুক্তি দেওয়া হয়। জ্ঞানের দৌড়ে অন্যদের চেয়ে এগিয়ে থাকবার কারণে টিঙ্কু পাঁচপেয়ে পাঠশালার প্রধান পণ্ডিতের পদটি লাভ করেছে।

রাণীর জন্য নির্বাচিত হওয়াটা যেখানে অন্যরা ভাগ্য বলে মানে, সেটাই হিপ্পোর জন্য চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে আর দশজনের মত আটপৌড়ে চিন্তা আঁকড়ে দিন পার করতে চায় না। ওর চিন্তা কেবল নিজেকে নিয়েই নয়, পুরনো শ্রেণীহীন সমাজ ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনবার স্বপ্ন দেখে হিপ্পো, যার বীজ ওই টিঙ্কুবুড়োই সযত্নে বুনে দিয়েছে ওর মনে। সেটা কীভাবে সম্ভব, অথবা আদৌও সম্ভব কি না, তার যৌক্তিকতা নিয়ে দিনের পর দিন ভাবছে হিপ্পো। স্বপ্নই তো পারে যে কাউকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার বীজমন্ত্র দিতে। সে অর্থে হিপ্পো একজন যথার্থ স্বপ্নবাজ। নিজেদের মধ্যে বিভেদের সব রেখা মুছে একক সাম্রাজ্য তৈরির স্বপ্ন দেখে সে। এই কাজের জন্য চাই অসীম ধৈর্য। তাছাড়া যথেষ্ট সময়ও দরকার। ওর একার পক্ষে এ’ কাজ অসম্ভব। গোপনে সে ওর মত চিন্তা-ভাবনা ধারণ করে, এমনদের সংগঠিত করার পরিকল্পনা করছে। তার জন্য প্রচুর খাটাখাটনি প্রয়োজন। সবার আগে চাই সংকেতের মাধ্যমে নিজেদের সনাক্ত করা। এই কাজে কারা কারা দক্ষ তাদের খুঁজে নেওয়া কিংবা দক্ষতা শিক্ষা দেওয়া। হিপ্পো নিজেও প্রশিক্ষণ দেওয়ার মত শিক্ষা অর্জন করে ফেলবে কিছুদিনের মধ্যেই। এই সনাক্তকরণ পদ্ধতির মাধ্যমে স্বজাতির স্বজনদের একত্রীকরণের কাজটা সহজ হবে তখন।

বিষয়টা নিয়ে টিঙ্কু পাঁচপেয়ের আরও পরামর্শ নেওয়া এবং আলাপ করা প্রয়োজন। যদিও টিঙ্কুবুড়ো ওকে বার বার সাবধান করেছে। সম্ভাব্য বিপদের কথা বলেছে। কিন্তু সে বাধাদান বা ভয় পাওয়ানোর ব্যাপারটা তেমন জোরালো নয়, সেটা হিপ্পো বেশ বোঝে। অর্থাৎ টিঙ্কু পাঁচপেয়ে মনে মনে ঠিকই চায় ওর স্বপ্নের বাস্তবায়নে হিপ্পো লেগে থাকুক। যুদ্ধে এক পা হারানো বুড়োটার প্রতি হিপ্পো কম ঋণী নয়। আজ ওর জানার পরিধিতে টিঙ্কুর অসীম অবদান। আর সে এটাও জানে, টিঙ্কু পাঁচপেয়ে তার জীবনের শেষ পর্যায়ে না পৌঁছলে তার সঙ্গী হতে দ্বিধা করত না। কিন্তু টিঙ্কু পাঁচপেয়ের পক্ষে তা সম্ভব নয়, তার পাখার আভাস দেখা দিয়েছে। ওদের জীবনচক্রে পাখার আভাস মানেই মৃত্যুর হাতছানি! অবশ্য রাণী এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। টিঙ্কুবুড়ো না থাকলে হিপ্পো সব দিক থেকেই খুব একা হয়ে যাবে। চিন্তাটা তাকে ব্যথিত করলেও আবেগের রাশ টেনে ভবিষ্যৎ কর্তব্য নিয়ে মাথা ঘামাতে চায় সে। বাঁচোয়া যে, আবেগের অনুভূতি ওর মস্তিস্ক থেকে মুছে যেতে সময় লাগে না।

হিপ্পো আপাতত রাণীমহলে নিযুক্তির ব্যাপারটা নিয়ে বিশেষ চিন্তিত। সম্ভাব্য এই বিপদ কীভাবে এড়ানো যায় তা নিয়েই সে গভীর ভাবে চিন্তাগ্রস্ত। বুদ্ধিমানের কাজ হবে আরও দুটো দিন অপেক্ষা করা। কানাঘুষো যখন, ওটা সত্যি নাও তো হতে পারে? নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে হিপ্পো।

সম্ভাব্য উত্তরটা তৈরি হ‌ওয়ার আগেই হুট করে সামনে এসে দাঁড়ায় শ্রমিক প্রধান হুলোহুলো। ওদের বাকশক্তি নেই। সাংকেতিক বা লিখিত ভাষায় নিজেদের মধ্যে ভাবের আদান প্রদান করে থাকে। এ সময় শরীর থেকে ফেরোমোনেস নামের এক ধরণের গন্ধযুক্ত রাসায়নিক পদার্থের মাধ্যমে একে অন্যকে সংকেত পাঠায়। যখন ওরা কোথাও যায়, তখন সারা পথেই এই বস্তুটি লেগে যায়। ফেরার সময় সেই গন্ধ শুঁকে শুঁকে টুলিতে ফিরে আসে। তো, হুলোহুলো সেই সাংকেতিক ভাষায় হিপ্পোকে প্রশ্ন করে, ‘কাজ নেই তোমার? বিশ্রামের সময় শেষ হয়ে আ—ধা সেকেণ্ড পেরিয়ে গেছে! এখনও বসে কেন?’ আধা শব্দটা বেশ টেনে টেনে মিনিটের খণ্ডাংশ নষ্টের গুরুত্বটাকে ইঙ্গিত করে হুলোহুলো।

নানান ভাবনায় হিপ্পো এতটাই অন্যমনস্ক ছিল যে এই ব্যাপারটা খেয়ালই করেনি। নিয়মের প্রতি ওরা সবাই ভীষণ রকমের শ্রদ্ধাশীল। এই আধা সেকেণ্ড কর্তব্য কাজে অবহেলা করার জন্য কপালে কি শাস্তি আছে, সেটা ভাবতেই একটা অস্বস্তি ফুটে ওঠে হিপ্পোর চোখেমুখে। অপরাধীমুখে কাজে ফিরতে উদ্যত হতেই, পিছন থেকে বাধা আসে। আঙুল তুলে হুলোহুলো যেদিকটায় নির্দেশ করে, ওদিকটায় রয়েছে শাস্তিগুহা। পৃথিবীর ইতিহাসে পরিশ্রমী প্রাণী হিসেবে পিঁপড়েদের সুনাম আজও অক্ষুণ্ণ থাকবার পিছনে আইন মেনে চলবার এই কঠোর ব্যবস্থার বিশেষ ভূমিকা আছে। নিয়মভঙ্গকারীদের কোনও ক্ষমা নেই এখানে। দোষের মাত্রাভেদে বিভিন্ন পর্যায়ের শাস্তির বিধান রয়েছে। শাস্তিগুহার বিটকেল গন্ধের বিশাল স্যাঁতসেঁতে গাছটার কথা ভেবেই মনটা বিষাদগ্রস্ত হয় হিপ্পোর।

নতমুখে শাস্তিগুহার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে, ‘পিপীলিকা ইতিবৃত্তে’ বর্ণিত আইনভঙ্গ ও তার শাস্তি বিষয়ক পাতাটায় মনে মনে একবার চোখ বুলিয়ে নেয়। শাস্তিগুহার গোমড়ামুখো বুড়োটা যেন ওর জন্যেই অপেক্ষা করছিল। হিপ্পোর সেখানে পৌঁছানোর আগেই হুলোহুলোর নিক্ষিপ্ত ফেরোমোনেসের সংকেত গুনগুনবার্তায় বুড়োর কাছে পৌঁছে গিয়েছে। গম্ভীরমুখে সে তার দিকে একখানা প্যাপিরাসের ঢাউস খাতা এগিয়ে দেয়। সেটা পূরণের এক ফাঁকে হিপ্পো খেয়াল করে বুড়োর শরীরে পাখার আভাস আসতে শুরু করেছে। তার মানে এই বুড়ো জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে গেছে। আর ক’টাদিন বাদেই বুড়ো মৃত্যুমুখে পতিত হবে।

নিজের কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনা আর শাস্তিগুহা নিয়ে বিরক্তির ভিতরও বুড়োটার জন্য কোত্থেকে একধরণের মমতাবোধ উড়ে এল ওর মনে! হিপ্পোর খুব জানতে ইচ্ছে করল, এই বুড়ো কি ওর মত যুদ্ধ শিশু? সে জানে তার প্রজাতির পরিচয়? ঠিক কোন সময়কালে, কিংবা কোন ধরণের যুদ্ধবন্দি হয়ে তার এই আগুনমুখো টুলিতে আবির্ভাব? টিঙ্কু পাঁচপেয়ের কাছে লক্ষণ বিচারের হাতেখড়ি চলছে হিপ্পোর। ওর প্রাথমিক বিদ্যার সূত্র বলছে, বুড়ো আগুনমুখো প্রজাতির নয়। ওর দৈহিক আকারে, মাথার ছাঁচে পার্থক্য সুস্পষ্ট। প্যাপিরাসের বুকে হিপ্পো নিজের নামধাম সব লিখে প্রজাতি পরিচয়ের জায়গাতে এসে থমকে যায়। সদ্যই জেনেছে সে এশিয়ান প্রজাতির। কিন্তু সেটি আপাতত গোপন রাখার ব্যাপারে টিঙ্কু পাঁচপেয়ে পইপই করে বলেছে ওকে। কাজেই দক্ষিণ আমেরিকার আগুনমুখো প্রজাতির নামটাই আপাতত লিখতে হবে। ওর থমকানো ভাব দেখে বুড়ো শুঁড় তুলে তাগাদা দেয়, ‘আহ্ বাপু, জলদি করো!’ গম্ভীরমুখে প্রজাতির ঘরে আগুনমুখোর নামটা লিখে হিপ্পো। হঠকারিতায় অনেক ভাল কাজ কিংবা বিপ্লব ভেস্তে যাবার ইতিহাস সে পড়েছে টিঙ্কু পাঁচপেয়ের ডায়রিতে। বুড়ো হয়ত সেসব চিন্তা করেই পরিচয় গোপনের কথা বলেছে। যাক, কোন রকমের বোকামি করা চলবে না। মনে মনে নিজেকে শাসায় সে।

খাতা জমা দিয়ে ঘুরে শাস্তিগুহার দিকে পা বাড়াতেই বুড়োর দিক থেকে ঘড়ঘড়ে সংকেত ভেসে আসে, ‘ঠিকই ধরেছ বাছা, আমি যুদ্ধ শিশুই বটে। অস্ট্রেলিয়ান জ্যাক জাম্পারের নাম শুনেছ? ওটা আমারই প্রজাতি। আজ স্বজাতি হারিয়ে বন্দি দাসের জীবন কাটাচ্ছি!’ কেমন একটু চমকে ওঠে হিপ্পো। আশ্চর্য! বুড়ো কীভাবে যেন ওর মন পড়ে ফেলেছে! বিস্ময়ের রেশ ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পায় না হুলোহুলোর তীব্র সংকেতে, ‘বলি হচ্ছেটা কী!’ বুড়োর দীর্ঘশ্বাস আর নিজের বিস্ময় পিছনে রেখে সে দ্রুত পা চালায় গন্তব্যের দিকে।

হিপ্পোলিটাস – অন্তিম পর্ব


লেখক পরিচিতি : নাহার তৃণা
নাহার তৃণা, বাংলাদেশের ঢাকায় জন্ম, বেড়ে ওঠা। বর্তমানে আমেরিকায় বসবাস করছেন। তিনি মূলত মাতৃভাষা বাংলায় লেখালিখি করেন। পাশাপাশি ইংরেজি কিছু ওয়েবজিনে লিখছেন। বাংলা ভাষায় নাহার তৃণার প্রকাশিত বই রয়েছে ৭টি। সম্প্রতি তার প্রথম ইংরেজি ফ্ল্যাশ ফিকশন প্রকাশিত হয়েছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।

মাসিক দীপায়ন প্রতিযোগিতা

মাসিক দীপায়ন পুরস্কার pop up