হিপ্পোলিটাস

লেখক : নাহার তৃণা

হিপ্পোলিটাস – প্রথম পর্ব

(অন্তিম পর্ব)

স্কুলে বসেই টিঙ্কু পাঁচপেয়ে রাণীর সাক্ষাৎ চেয়ে একটা আর্জি পত্রবাহক মারফৎ পাঠিয়ে দিয়েছে। রাণীকে সংকেতের মাধ্যমে আর্জি জানানো আইনবিরুদ্ধ। সম্মতিবার্তা নিয়ে বাহক ফিরেও এসেছে। রাণী তার জন্য আজ বিকেলে তিন মিনিট সময় বরাদ্দ করেছেন। সময়ের ব্যাপ্তি দেখে টিঙ্কুবুড়োর শুঁড়ে একটা কম্পন বয়ে যায়। অভিজ্ঞতা দিয়ে বুঝতে পারে রাণী তার সাথে গুরুতর কিছু নিয়ে আলোচনা করতে চায়। ঠিক কোন বিষয়ে রাণী তার সাথে আলোচনা করবে, সেটা তার জানবার কথা নয়। তাই সেটা নিয়ে না ভেবে টিঙ্কু নিজে যে কারণে তার সাক্ষাৎ প্রার্থনা করেছে, সেটা গুছিয়ে লিখবার জন্যে ডায়রি খুলে বসে। আগেভাগে যে কোন কাজের পরিকল্পনা করে নেওয়া এবং তার খুঁটিনাটি বিষয়াদি ডায়রিতে লিখে রাখাটা তার বহুদিনের অভ্যাস। টিঙ্কু পাঁচপেয়ের হাতের লেখা ভারি চমৎকার।

গোটা গোটা অক্ষরে ডায়রির পাতায় কিছু পয়েণ্ট টোকে বুড়ো। রাণীর সাক্ষাৎ প্রার্থনার প্রধান কারণ হিপ্পোলিটাস। হিপ্পোকে দ্রণ নির্বাচিত করবার বিষয়ে বুড়োর ঘোর আপত্তি। হিপ্পোর মত একটা প্রতিভাবান ছেলের জীবন রাণীমহলের আরাম আয়াসের আলস্যে ভেসে যাবে, তা কিছুতেই হয় না। বুড়ো তার ভিতরে আগুন দেখেছে। সে আগুন সবখানে ছড়িয়ে দেবার ক্ষেত্র তৈরিতে সে খানিকটা এগিয়েছেও। এমন সময় হিপ্পোর দ্রণ হয়ে বসা মানে একটা স্বপ্নের অপমৃত্যু। এই অপমৃত্যু ঠেকাতে অবশ্যই তার কিছু করণীয় আছে। তাছাড়া, হিপ্পো নিজেও দ্রণ হবার বিষয়ে একেবারে উৎসাহী নয়। এটা বুড়োকে সে মুখ ফুটে না বললেও ওর মন পড়ে নিতে একটুও সময় লাগেনি তার। শ্রেণিহীন সমাজ ব্যবস্থা, সমাজের উন্নতি ইত্যাদিতে হিপ্পোর আগ্রহ। টিঙ্কুর গভীর আস্থা নিজের উপর, রাণীকে এ বিষয়ে সে প্রভাবিত করতে পারবে। তার হাতে তুরুপের একটি তাস আছে। সেটিকেই বুড়ো কাজে লাগাবে আজ।

তাদের এই ট্ররটিলা নামের পিঁপড়ে টুলিতে পিঁপড়েদের লক্ষণ বিচারপূর্বক প্রজাতি, গোত্র ইত্যাদি বিচারের বিদ্যাতে টিঙ্কু পাঁচপেয়ে একমাত্র বিশেষজ্ঞ। তার সেই জ্ঞান কাজে লাগিয়ে হিপ্পোর আসল প্রজাতি সম্পর্কে নির্ভুল গণনা করেছে বুড়ো। দেখতে একই রকম হ’লেও হিপ্পো আগুনমুখো প্রজাতিভুক্ত নয়। রাণীর দ্রণ হিসেবে অন্য প্রজাতির কাউকে নির্বাচনের রীতি ট্ররটিলাদের নেই। বাজি জিতে যাওয়ার জন্যে এটিই যথেষ্ট। আসন্ন আলোচনা ফলপ্রসূ হতে যাচ্ছে, এমন একটা ভাবনা বুড়োর মুখে পাতলা একটা হাসি ছড়িয়ে দেয়। মনে মনে সে দ্রণ নির্বাচকমণ্ডলীর মুণ্ডপাত করতেও ভোলে না। ব্যাটাদের জন্যে বেহুদা সময়নষ্টের হ্যাপা শুধু শুধু। সে নিশ্চিত, হিপ্পোর চৌকস চেহারার ছবিই ওকে নির্বাচনের তালিকায় তুলে দিয়েছে। বুদ্ধিহীনেরা কবেই বা আর প্রতিভার কদর বোঝে। অবশ্য তাদের মধ্যে কেউ তো আর তার মত প্রজাতি বিশেষজ্ঞ নয়, ভুল হওয়াটাই স্বাভাবিক। ব্যাপারটা বুড়োর মনে আত্মতৃপ্তির মৃদু একটা ঢেউ তোলে। ডায়রি লেখা শেষ করে রাণীর খাসমহলে যাবার প্রস্তুতি নিতে শুরু করে টিঙ্কু পাঁচপেয়ে।


শাস্তিগুহায় ঢুকতেই মগডালে বসে থাকা টট্টরের খোঁচাময় স্বাগত সংকেত পায় হিপ্পো। টট্টরকে সে খানিকটা এড়িয়ে চলে। ছেলেটির কাজেকর্মে মন নেই, শুধু ফূর্তিবাজিতে উৎসাহ। প্রায় সপ্তাহে শাস্তিগুহায় একবার করে ঘুরে যায় টট্টর। ওদের সমাজে ভুল সংশোধন করে সঠিকভাবে চলার রেওয়াজটা এই ছেলে সত্যিই ডুবিয়ে ছাড়বে একদিন। হিপ্পো বিষণ্ণ মুখে শুঁড় নাড়িয়ে প্রত্যুত্তরে ধন্যবাদ সুলভ একটা কিছু বলে। ওর ভারি সংকোচবোধ হচ্ছে, আজকের আগে তাকে কখনও এখানে আসতে হয়নি। নিয়মশৃঙ্খলা, রুচিবোধ তার খুব প্রবল বলেই হয়ত এই সংকোচ। ঠোঁটকাটা টট্টর সেসবের তোয়াক্কা না করে যেন চেঁচায়, ‘ওহে জ্ঞানী, আজ আর তোমাতে আমাতে কোন পার্থক্য নেই। তোমার গোমরের কোমর ভাঙল আজ!’ তারপর শরীরটা বাঁকিয়ে বেসুরোভাবে গেয়ে ওঠে, ‘মোরা যাত্রী একই তরণীর।’

‘উফ্! টট্টর, শষ্যের কাঁকড় বাছা শেষ করো জলদি। সময় কিন্তু বেশি নেই।’ ডানপাশ থেকে ভেসে আসা একটা সংকেত শুনতে পায় হিপ্পো। এবার সংকেতের মালিক হিপ্পোকে উদ্দেশ করে ফেরোমোনেস নিক্ষেপ করে, ‘ভাই হিপ্পো, তুমি আমায় চিনবে না। তবে আমি তোমায় চিনি। তোমাদের যন্ত্রকৌশল বিভাগের উল্টো দিকের পূর্বকোণে আমাদের গোয়েন্দাসংস্থা। তথ্যে গড়মিল নিয়ে সংস্থাপ্রধানের সাথে ক্যাচাল করায় ব্যাটা আমার নামে কাজ ফাঁকির নালিশ ঠুকে শাস্তিগুহায় পাঠিয়েছে। আমার নাম চৌচির। তোমাকেও বুঝি ব্যাটা হুলোহুলো ফাঁসিয়ে দিয়েছে?’ একনাগাড়ে কথাগুলো বলে থামে চৌচির। সসংকোচে হিপ্পো জানায় দোষ তার নিজেরই। চৌচির শুঁড় ঝাঁকিয়ে কথাটা মেনে নিতে অস্বীকার করে। তার এক কথা, হিপ্পোর মত ভাল ছেলে কাজে ফাঁকি দেবে এটা অবিশ্বাস্য।

খাদ্য ভাণ্ডারের চট্টুলকে এখানে দেখে অবাক হয় হিপ্পো। চট্টুলকে সে ভীষণ পছন্দ করে। যেমন তার পড়াশুনা, তেমনই অমায়িক বন্ধুবাৎসল আর কর্মবীর চট্টুল। সে এখানে কী করছে! জানা গেল, তার ঘটনাও খানিকটা হিপ্পোরই মত। খুব গোপনে আর কষ্টেসৃষ্টে যোগাড় করা একটা বইতে অতিকায় প্রাণী মানুষের বিপ্লবের কাহিনিতে সে এতই মশগুল হয়ে পড়েছিল যে, কাজের সময় গড়িয়ে যাচ্ছে সেটাও খেয়াল করেনি। যার শাস্তি হিসেবে তার এখানে আগমন।

ইতিমধ্যে টট্টর সশ্রম শাস্তি শেষ করে ফিরে যাবার আগে মজার ভঙ্গি করে সবার উদ্দেশ্যে হাত নেড়ে বলে যায়, ‘ফের দেখা হবে বন্ধু!’ হিপ্পো আর চট্টুলের কাজে গাফলতির পূর্ব রেকর্ড নেই। এমন শৃঙ্খলাভঙ্গের জন্য বিনাশ্রমে পনের মিনিট শুয়ে-বসে থাকা শাস্তি হিসেবে নির্ধারিত। কাজপাগল পিঁপড়েমাত্রেরই এমন শাস্তিতে দম আটকে মরার দশা। কিন্তু এ মুহূর্তে শাস্তিটাকে হিপ্পোর শাপে বর মনে হচ্ছে। চট্টুলের কাছ থেকে মানুষ সমাজের বিপ্লব সম্পর্কে জানার আগ্রহে সে ছটফট করে ওঠে। যে বই পড়ে চট্টুল উত্তেজিত, তার পক্ষে সেটা সংগ্রহ করা সম্ভব কি না, সেটাও জেনে নিতে হবে। আপাতত চট্টুলের অর্জিত জ্ঞান আর শ্রেণীহীন সমাজব্যবস্থা নিয়ে ওর মতামত শোনার আগ্রহে হিপ্পো চট্টুলের ওদিকের ডালের কাছ ঘেঁষে বসে। এদিকটাতে স্যাঁতসেঁতে ভাবটা যেন একটু বেশি। তাতেও খুব একটা গ্রাহ্য করে না হিপ্পো। বলা শুরু করে চট্টুল। মন দিয়ে শুনে যায় হিপ্পো মানুষের শ্রেণীহীন সমাজ ব্যবস্থার সফলতা-ব্যর্থতার ইতিহাস। ‘এ পর্যন্ত গুটিকয়েক বই পড়ে যতটা বুঝেছি, তা হ’ল মানুষের সমাজে বরাবরই শ্রেণীভেদ ছিল। একপক্ষ খেটে খেটে মুখে রক্ত তুলে মরত আর আরেকপক্ষ আয়েশ করে জীবন ভোগ করে যেত। এটাই ছিল মোটা দাগে তাদের সমাজের রীতি। বুঝলে? আমাদের সমাজেও তো তেমনটাই চলে – রাজা আর প্রজা।’ হিপ্পো নিজে থেকে কিছু বলছে না দেখে চট্টুল আবার বলতে শুরু করে, ‘রাজার কাজ প্রজাকে চাবুক দেখিয়ে বশে রাখা। বাবা-বাছা বলে তাদের লাই দেবার বা মানবিকতার লেশমাত্র ছিল না, উল্টে রক্ত পানি করে খেটেখুটে তারা যে খুব সুখে থাকত, তাও নয়। রাজার শতেক খাজনার বায়না পূরণ করাতে অভাব ছিল প্রজার নিত্য সঙ্গী। এই অবস্থার ইতি টানতে একদল মানুষ স্বপ্ন দেখল এমন এক সমাজের, যেখানে ধনী-গরীব এমন শ্রেণীভেদ থাকা চলবে না। একপক্ষের খাটুনির ফল সুবিধাবাদী পক্ষ লুফে নিতে পারবে না। সবাইকে মেহনত করতে হবে। আর সবার মেহনতের ফল সমানভাবে সকলে ভোগ করবে। আইডিয়া হিসেবে বিষয়টা কিন্তু দারুণ ছিল – কি বলো?’
‘শেষমেশ আইডিয়াটা কাজে লেগেছিল?’ এতক্ষণ চুপ থাকার পর মুখ খোলে হিপ্পো।
‘কাজে যেন লাগে সেজন্য শ্রেণীহীন একটা সমাজ তৈরির বিপ্লবে জান লড়িয়ে দিয়েছিল কিছু মানুষ। নিষ্ঠুর শাসকশ্রেণীকেও রুখে দিয়েছিল বেশ কিছুকালের জন্য। কিন্তু এক পর্যায়ে আবারও সেই থোড়-বড়ি-খাড়া অবস্থায় ফিরে যায় মানুষের সমাজ। সবলের হাত চুলকায় দুর্বলের পিঠে কয়েক ঘা না দিতে পারার আফসোস, মোদ্দা কথা এটাই।’ চট্টুল খুব প্রাণবন্তভাবে বলে যায় মানুষদের বিপ্লবের কাহিনী, আর হিপ্পো গ্রোগাসে সেসব গিলতে থাকে। ‘মানুষের পৃথিবীতে বিপ্লব লেগেই আছে। এক শ্রেণী আরেক শ্রেণীকে কীভাবে জব্দ করবে, এই নিয়েই যেন তাদের সব ভাবনা। দু’দুটো বড় যুদ্ধ হয়ে গিয়েছে, যার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অভাবনীয়। এত জান আর মাল নষ্টের অভিজ্ঞতা থেকে মানুষের সমাজ যে শিক্ষা নেবার প্রয়োজন দেখিয়েছে, তা কিন্তু একদমই—’ বলতে বলতে চট্টুল খানিক থমকে যায়, দেখে হিপ্পো কেমন অস্বস্তি নিয়ে শরীর মোচড়াচ্ছে।
‘কী হ’ল তোমার?’
দ্রুত স্বাভাবিক হতে চেষ্টা করে হিপ্পো। ‘না, তেমন কিছু না। গায়ে কেমন আঠালো একটা জিনিস লেগেছে। অস্বস্তি হচ্ছে, ছাড়ানো যাচ্ছে না কিছুতেই। থাক গে, বাড়ি গিয়ে সাবান ঘষে গোসল করলে চলে যাবে নিশ্চয়। তুমি বলে যাও।’
‘সাবানে কাজ না হলে, বালি ঘষে দেখতে পারো।’
ওদের অবাক করে দিয়ে চৌচির গলা তুলল। তার মানে এই পুরোটা সময় চৌচির সবটাই শুনেছে! গোয়েন্দা বিভাগে কাজ করে চৌচির, ব্যাপারটা ওদের খানিকটা অস্বস্তিতে ফেলে দিল। যদিও বই পড়া ওদের সমাজে অপরাধের কিছু না। তবে বিষয়বস্তু নিয়ে আপত্তি আসতে কতক্ষণ! সাবধানের মার নেই। বুদ্ধিমান চট্টুল একটা কৃত্রিম হাই তুলে চৌচিরকে শুনিয়ে বলল, ‘বেশ ঘুম পেয়েছে। খানিক ঘুমিয়ে নেওয়া যাক বরং।’ একফাঁকে সংকেত পাঠিয়ে হিপ্পোকে পরে বাকিটা শোনাবে জানিয়ে পাশ ফিরে সত্যিসত্যি ঘুমের তোড়জোড় শুরু করল। মানুষের সমাজের মত পিপীলিকা সমাজের পরিবর্তনও কি হবার নয়? প্রশ্নটা হিপ্পোর মনে ঘুরপাক খেতে থাকে। এখন আর এসব নিয়ে আলোচনায় যাবে না চট্টুল – এরই ভিতর ওর নাক ডাকার মিহি শব্দ পায় হিপ্পো। হতাশ হয়ে শরীরের উটকো অস্বস্তির দিকে মনোযোগ দেয় সে।


রাণীর খাসমহলের আলোচনাকক্ষে বসে আছে পণ্ডিত টিঙ্কু পাঁচপেয়ে। একজন রাজকর্মচারী তার সামনে রাজসিক খাদ্যবস্তু রেখে দাঁড়িয়ে আছে বুড়োর সংকেতের অপেক্ষায়। সৈনিক পিঁপড়ের অস্বাভাবিক শারীরিক গঠনের জন্য তারা নিজে খাদ্য গ্রহণ করতে পারে না, অন্যের সাহায্যের প্রয়োজন হয়। টিঙ্কু বুড়ো একজন প্রাক্তন সৈনিক। বুড়ো ইশারা করতেই কর্মচারীটি মধুর পেয়ালাটা এগিয়ে ধরে তার শুঁড়ের সামনে। খানিকটা মধু মুখে নেয় বুড়ো। বাহ! চমৎকার স্বাদ। আরও খানিকটা খাবার ইচ্ছায় শুঁড় তোলার মুহূর্তে রাণী সাহেবার আগমনবার্তা ঘোষিত হয়। সসম্মানে উঠে দাঁড়িয়ে রাণীকে অভিবাদন জানায় পণ্ডিত। প্রাথমিক কুশলাদি বিনিময়ের ধাপ পেরিয়ে মূল আলোচনা শুরু করতে অনুরোধ জানান রাণী।

টিঙ্কু পাঁচপেয়ে বিনা ভণিতায় দ্রণ হিসেবে হিপ্পোর নির্বাচন চূড়ান্ত কিনা সেটা জানতে চায়। রাণী সাহেবা তার পাখায় মৃদু কম্পন তুলে পাল্টা প্রশ্ন করেন, প্রধান পণ্ডিতের পাণ্ডুলিপি সহকারীটির মনোনয়ন চূড়ান্তের সুপারিশ করাই তার আগমনের হেতু না কি? পণ্ডিতকে অপেক্ষায় না রেখে উত্তরটাও জানান দ্রুতই, সেজন্য কষ্ট করে না আসলেও তার চলত। তার সহকারী বলেই রাণীর বিশেষ সুপারিশে হিপ্পোকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। কাজেই তিনি এ বিষয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন। বুড়োর মুখ খানিকটা ঝুলে পড়ে হতাশায়। এই কথাটা তো তার মাথায় আসেনি! নিজের ওপর রাগ হয় ভীষণ। কিন্তু এখন সেসব ভেবে সময় নষ্টের মানে নেই।
গলা খাঁকারি দিয়ে স্পষ্টভাবে পণ্ডিত জানায় তার আগমনের উদ্দেশ্য একেবারেই উল্টো। এরপর কেন হিপ্পোকে দ্রণ করা ঠিক হবে না, একে একে প্রায় সবই বলে যায় বুড়ো। রাণী সাহেবার তাতে খুব একটা ভাবান্তর ঘটে না। বরং রাণী জানান, ‘এতে তো ভালই হবে পণ্ডিত মশাই, ছেলেমেয়েরা ভাল শিক্ষায় শিক্ষিত হবে ঘরে বসেই।’ তাতে কোন দ্বিমত নেই জানিয়ে খানিকটা নাটকীয় ভঙ্গিতে বুড়ো বলে ওঠে, ‘কিন্তু তা তো হবার জো নেই রাণী সাহেবা! হিপ্পো কোনদিনই সন্তান উৎপাদনে সক্ষম হবে না। কারণ সে আগুনমুখো প্রজাতির বাইরের একজন। আর আপনার তো ভালভাবে এ তথ্য জানা আছে, বাইরের অন্য প্রজাতি আগুনমুখোর রাণীকে সন্তানদানে অক্ষম!’ বুড়োর ধারণা মত রাণী এবার পুরোপুরি ধরাশায়ী হলেন।

সিদ্ধান্ত হ’ল নির্বাচকমণ্ডলীর কাছে তারবার্তা পাঠিয়ে হিপ্পোর নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার সুপারিশ যাবে। শুঁড় তুলে রাণী কেমন একটা হতাশ ভঙ্গি করে বলে উঠলেন, ‘আজ চারদিক থেকে শুধু দুঃসংবাদ পাচ্ছি পণ্ডিত মশাই!’ পাখা নাড়িয়ে হতাশা উড়িয়ে এরপর রাণী টিঙ্কু পাঁচপেয়ের সাথে গোয়েন্দা বাহিনী মারফত পাওয়া খবরগুলো নিয়ে গভীর আলোচনায় ডুবে গেলেন। একটা বিচক্ষণ উপদেশমণ্ডলী থাকা সত্ত্বেও প্রধান পণ্ডিতের পরামর্শের ওপর রাণীর অগাধ আস্থা। আজ পর্যন্ত পণ্ডিতের কোন পরামর্শ ভুল প্রমাণিত না হওয়াটা একটা প্রধান কারণ। তাছাড়া এই বুড়ো পণ্ডিতটিকে ঘিরে রাণীর নিজস্ব কিছু অনুভূতি কাজ করে। পিতা-মাতার কোন স্মৃতিই তার নেই। কিন্তু যখনই তিনি এই বিপুল জ্ঞানী বুড়োর সংস্পর্শে আসেন, খুব আপনজনের কাছে আসবার অনুভূতি পান যেন। যে কারণে টিঙ্কু পাঁচপেয়ের প্রতি রাণীর ভীষণ পক্ষপাতিত্ব। তার মন্ত্রী পরিষদের অনেকেই বিষয়টা ভাল চোখে দেখে না, রাণী সাহেবা সেসবে একদমই আমল দেন না।


শাস্তিগুহা থেকে ফেরার পরপরই হিপ্পো কেমন যেন বদলে গিয়েছে। এমনিতে শান্তশিষ্ট হলেও বন্ধুমহলে তার গ্রহণযোগ্যতা ঈর্ষণীয়। যে কোন আড্ডায় সে মধ্যমণি। আড্ডায় উপস্থিত থেকে বেশি কথায় হয়ত সে যায় না, কিন্তু যখন বলে তখন বাহবার হুল্লোড় বয়ে যায়। প্রায় প্রতি সন্ধ্যায় কিছুক্ষণের জন্য হিপ্পো আর তার বন্ধুরা আড্ডায় বসে। কিন্তু প্রায় দু’দিন হ’ল বন্ধুরা আড্ডায় তাকে পাচ্ছে না। চট্টুল বই বগলে করে বারদুয়েক ঘুরে গিয়েছে, তাকে বাড়িতে পাওয়া যায়নি। ওদিকে বুড়ো টিঙ্কু পাঁচপেয়ে সংকেতের পর সংকেত পাঠিয়েও তার কোন সাড়া পাচ্ছে না। সংবাদবাহক দিয়ে একখানা তারবার্তা পাঠিয়েছে শেষমেশ। এদিক ওদিক এলোমেলো হাঁটাহাঁটি শেষে হিপ্পো বাড়ি ফিরে সেটি পড়েছেও। বার্তায় লেখা, দারুণ কী একটা খবর আছে তার জন্যে! খবরটা কী হতে পারে ভাবনা আসবার পরবর্তী মুহূর্তেই নিজের ভেতর কেমন শূন্যতাবোধ অনুভব করে হিপ্পো।

সুস্থির হয়ে কিছু ভাবতে বা করতে সমস্যা হচ্ছে তার। চিন্তাশক্তিও কেমন অসাড় হয়ে যাচ্ছে থেকে থেকে। কাজের জায়গাতেও আজ বিরাট এক দুর্ঘটনা ঘটে যেত, যদি সময়মত আরেক সহকর্মী এসে মেশিন বন্ধ না করত। শরীরটা যেন তার ইচ্ছেতে চলছে না, অন্য কেউ তাকে পরিচালিত করছে। সারা গায়ে সাদা সাদা অদ্ভুত আবরণ পড়তে শুরু করেছে। এত আঠালো যে সাবান বা লবণ ঘষেও ছাড়ানো যায় না। দেখতেও কেমন বিশ্রী লাগে এখন তাকে। এসব কারণে সে অন্যদের কিছুটা এড়িয়ে চলছে। এসব কী হচ্ছে? কেন হচ্ছে? হিপ্পো কেমন অসহায় বোধ করে। সে ঠিক করল টিঙ্কু বুড়োর কাছে গিয়ে সব খুলে বলবে।

সেদিন কাজ শেষে অনেক ভেবেও হিপ্পো মনে করতে পারল না তার বাড়ির পথটা ঠিক কোন দিকে। এমনকী সংকেত পাঠিয়ে কারও সাহায্য চাইতেও সে ভুলে গেল। পথের মাঝখানে খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে কেমন ঘোরলাগা ভাবে সে জঙ্গলের দিকে এলোমেলো পা ফেলে হাঁটতে শুরু করে। জঙ্গলের ওদিকটায় কেউ তেমন একটা যায় না। ক্লান্তিতে শরীর কেমন ভেঙে পড়তে চায় হিপ্পোর। একটা আধমরা পাতা পেয়ে তার ওপর শুয়ে পড়ল সে। মনে হ’ল দিনের আলো কমে আসছে। সেদিন দুপুরবেলাতেই যেন সূর্যাস্ত নেমে এল হিপ্পোর পৃথিবীজুড়ে। কিছু সময় পরেই একটা সাদা আবরণ আস্তে আস্তে তাকে সম্পূর্ণ গ্রাস করল নিঃশব্দে।


হিপ্পোর নিখোঁজ হওয়ার খবরটা টিঙ্কু পাঁচপেয়ের কাছে পৌঁছতে কেমন একটা অমঙ্গল আশংকায় ভিতরটা কেঁপে উঠেছিল বুড়োর। খুশির খবর পেয়েও হিপ্পো তার কাছে ছুটে না এসে কেমন দূরত্ব রেখে চলছিল, সেটা তাকে খুব ভাবাচ্ছিল। কত ছেলে-বুড়ো পিঁপড়ে এদিক সেদিক হারিয়ে যায়। বেঘোরে মারা পড়ে প্রতিদিন। সে নিয়ে পিঁপড়ে সমাজে কোন বিকার নেই, এসব স্বাভাবিক দৈনন্দিন ব্যাপার। কিন্তু হিপ্পোর ব্যাপারটা টিঙ্কু পাঁচপেয়ের কাছে বেদনাদায়ক। তাকে নিয়ে একটা স্বপ্ন গড়ে উঠছিল। ঠিক এই সময়েই নিখোঁজ হবার ব্যাপারটা মেনে নিতে পারছে না সে।

ট্ররটিলা পিঁপড়ে টুলির প্রধান রাজপণ্ডিতের বিশেষ অনুরোধে রাণী আদেশ জারি করেন চিরুনি অভিযানের। হিপ্পোর খোঁজ দিয়ে যৌথবাহিনীকে সাহায্যের বিশেষ আহ্বান জানানো হয় সম্মিলিত পিপীলিকা কমিটির প্রতিটি সদস্যকে। এমন ঘটনা এই টুলিতেই শুধু না, পিঁপড়ে সমাজের ইতিহাসেও ইতঃপূর্বে ঘটেনি।

দিনদুয়েক পর, যৌথবাহিনী মারফত খবর এল সাদারোগে আক্রান্ত একটা পিঁপড়ের লাশ দেখা গেছে টুলির বাইরে জঙ্গলের একটা গাছের গোড়ায়। খবরটা পেয়ে বুড়ো পণ্ডিতের মনটা কেমন করে উঠল। বুড়ো পণ্ডিত কাউকে কিছু না বলে ছুটে গেল ওখানে। নিরাপত্তার কারণে তাকে কাছে যেতে দেওয়া না হলেও, বিশেষ শুঁড় সংকেত দিয়ে বুঝতে পারল ওই সাদা পর্দার নিচে নিথর শরীরটা আর কারও নয়, হিপ্পোর।

সাদারোগ পিঁপড়েদের জন্য মৃত্যুর পরোয়ানা। রোগটা একধরনের ছত্রাকের মাধ্যমে প্রথমে পিঁপড়ের শরীরে ছড়ায়, পরে শিকারকে নিজের কব্জায় টেনে নেয়। আক্রান্ত পিঁপড়ে হারিয়ে ফেলে তার চিন্তাভাবনার সব শক্তি। শাস্তিগুহার গাছে বসে চট্টুলের কাহিনি শোনার সময় যে আঠালো জিনিসটা হিপ্পোর গায়ে আটকেছিল, সেটা ছিল এই মরণঘাতী ছত্রাক। ছত্রাক আক্রান্ত শরীরটি দ্রুত বিষে চুবিয়ে মাটি চাপা দেবার আদেশ দেওয়া হ’ল, নইলে টুলিতে ওই রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে।

বিষণ্ণমুখে টিঙ্কু পাঁচপেয়ে দূরে দাঁড়িয়ে একটা সম্ভাবনাময় জীবনের শেষ পরিণতি দেখতে থাকে। হিপ্পোর ভেদাভেদহীন পিঁপড়ে সমাজ তৈরির স্বপ্ন এভাবে ভেসে যাবে সে ভাবেনি। বেচারার ইচ্ছেটা অপূর্ণই থেকে গেল। হিপ্পোকে হারানোর শোক এই ক’দিন চুপচাপ সয়ে থাকলেও এবার নিজেকে ধরে রাখতে ব্যর্থ বুড়োটা শুঁড় নামিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ল। এই প্রথম নিজেকে ভীষণরকম একা মনে হ’ল তার। বুড়োর চোখ ছাপিয়ে নামল বাঁধনহারা জলের বন্যা। ট্ররটিলা টুলির সমবেত পিঁপড়ের দল দেখল রাজপণ্ডিত টিঙ্কু পাঁচপেয়ে, প্রথমবারের মত প্রকাশ্যে কাঁদছে।


লেখক পরিচিতি : নাহার তৃণা
নাহার তৃণা, বাংলাদেশের ঢাকায় জন্ম, বেড়ে ওঠা। বর্তমানে আমেরিকায় বসবাস করছেন। তিনি মূলত মাতৃভাষা বাংলায় লেখালিখি করেন। পাশাপাশি ইংরেজি কিছু ওয়েবজিনে লিখছেন। বাংলা ভাষায় নাহার তৃণার প্রকাশিত বই রয়েছে ৭টি। সম্প্রতি তার প্রথম ইংরেজি ফ্ল্যাশ ফিকশন প্রকাশিত হয়েছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।

মাসিক দীপায়ন প্রতিযোগিতা

মাসিক দীপায়ন পুরস্কার pop up