ঐ পাড়ে

লেখক: রুবাই শুভজিৎ ঘোষ

রাত্রিবেলা খাবার পরে দাঁত মাজা শেষ হলে মুখে জলের ঝাপটা দিল অর্ণব। কয়েক ফোঁটা জল ছিটকে বেসিনের আয়নাটাতেও লাগল। স্থির জলের মধ্যে জলের ফোঁটা পড়লে যেমন তরঙ্গের সৃষ্টি হয়, আয়নাটাতেও তেমনিই তরঙ্গের সৃষ্টি হল। মুখ তুলে আয়নায় সেটা দেখে চমকে গেল অর্ণব। আয়নায় তার প্রতিবিম্ব কাঁপছে। জলের মধ্যে ছোট নুড়ি ফেলে তাতে তরঙ্গ সৃষ্টি করে, সেই জলে মুখ দেখলে যেমন কাঁপা কাঁপা মুখের প্রতিবিম্ব দেখা যায়, আয়নাটাতেও সেরকমই প্রতিবিম্ব দেখতে পেল অর্ণব। দেখে মনে হচ্ছে এটা যেন আয়না নয়, উল্লম্বভাবে রাখা জলের আধার।

আয়নার কম্পন স্থির হলে তাতে স্পষ্টভাবে অর্ণবের আশ্চর্য মুখের প্রতিবিম্বটি প্রতিফলিত হল। অর্ণব আস্তে আস্তে হাত বাড়াল আয়নার দিকে। এখন আয়নাটা শান্ত, কোনও তরঙ্গ নেই তাতে। মনের ভুল ভেবেই অর্ণব আয়নাটা ছুঁয়ে দেখল। কিন্তু ছোঁয়ার সাথেই তার মনের ভুল ভেঙ্গে গেল। অর্ণবের আঙুলের ছোঁয়ায় আয়নাটায় আন্দোলন বা তরঙ্গের সৃষ্টি হল। আর আয়নাটা ছোঁয়ার ফলে অর্ণবের মনে হল, আয়নার মত শক্ত নয় এটা, অনেকটা জলের মত, কিন্তু জলের চেয়ে অনেক বেশি ঘন। অর্ণব ভয়ে হাত গুটিয়ে নিল। কিন্তু আয়নাটাকে ছোঁয়ার ফলেও সেই উপাদানের এতটুকু অর্ণবের হাতে লাগল না।

সে আয়নাটাকে চারপাশ থেকে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করতে থাকল। আয়নাটা যেমন তেমনই আছে, শুধু মধ্যিখানে কাঁচের বদলে অন্য কোনও উপাদান অন্য কোনও অদ্ভুত উপায়ে চলে এসেছে। অর্ণব আবার ছুঁয়ে দেখল আয়নার সেই অদ্ভূত উপাদানটাকে। আগের বারের মতই এবারেও হাতে তার কিছু লাগল না, শুধু আয়নার কম্পন বেড়ে গেল বেশ খানিকটা। ভয় কিছুটা হলেও কেটে গেছে তার। বদলে এসেছে আগ্রহ। সেই আগ্রহে সে হাতের অনেকটা ঢুকিয়ে দিল আয়নাটার মধ্যে দিয়ে। অপর প্রান্ত ফাঁকা অনুভব করল সে। হাতটা বের করে আনল অর্ণব। বেসিনের ওপর পা দিয়েই সে উঠে দাঁড়াল এবার। ভয় এতক্ষণে পুরোপুরিই কেটে গেছে, মনে এখন শুধুই জিজ্ঞাসা। মাথাটা গলিয়ে দিল সে আয়নাটার ভেতর দিয়ে। গলিয়ে নিল শরীরের অর্ধেকটাই। আর গলিয়ে নেওয়ার প্রায় সাথে সাথেই পায়ের চাপে বেসিনটা ভেঙে পড়ল মাটিতে। আর অর্ণব টাল সামলাতে না পেরে শরীরের বাকিটা নিয়ে উল্টে পড়ল আয়নাটার ঐ পাড়ে।

মেঝেতে পড়ার পর মাথা তুলে ওপরে চাইল অর্ণব। এ তো তারই ঘরের বারান্দা। যেখানে তার বেসিন আর আয়না রাখা থাকে, এ তো সেই জায়গাটাই। এ তো তারই বারান্দার মেঝে। মাথা তুলে ওপরে চাইল, দেখল চারদিক। সবটাই তার চেনা। যেদিক দিয়ে গলে এদিকে এসেছে, চেয়ে দেখল সেদিকে। জায়গাটায় রাখা অর্ণবের বেসিনের আয়না। অর্থাৎ অর্ণব তার বেসিন দিয়ে গলে আবার সেখানেই চলে এসেছে। এটা কেমন হল? মেঝে থেকে উঠে অর্ণব বারান্দা পেরিয়ে হলঘরে এল। আর আসার সাথে সাথে চমকে গেল সামনের দৃশ্য দেখে। অবাক দৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে রইল সে, নিশ্চল পাথরের মত  তাকিয়ে রইল তার সোফার দিকে।

Advertisements

সোফার ওপর বসে রয়েছে আরেকটা অর্ণব, হুবহু একই রকম চেহারা এবং একই রকম পোশাক। হাতে একটা বই, “থিওরিজ অফ ম্যাটার”। একের পর এক আশ্চর্য। অর্ণবের কাছেও এমনই একটা বই আছে। একই রকম আকার ও মলাটের। শুধু তার নামটা হল, “থিওরিজ অফ অ্যান্টিম্যাটার”। এখনও সে বইটা আয়নার ওপারে অর্ণবের সোফার ওপর রাখা আছে। দাঁত মাজবার পর শুতে যাবার আগে এটা নিয়ে সে বসত আজই। ওই বইটা থেকেই সে জানতে পেরেছে অ্যান্টিম্যাটার সম্বন্ধে অনেক অজানা কথা, জানতে পেরেছে কি ভাবে ম্যাটার আর অ্যান্টিম্যাটার পরস্পরের সংস্পর্শে এলে অ্যানাইহিলেট হয়ে যায়। অনেক অজানা আশ্চর্যজনক তথ্য সে বইটা থেকে পেয়েছে।

“থিওরিজ অফ ম্যাটার” হাতে নিয়ে আরেকটা অর্ণব এবার মুখ তুলে চাইল। চোখের সামনে সেও আরেকটা নিজেকে দেখে একদম হতবাক। হাত থেকে বইটা পড়ে গেল তার। সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল আরেকটা অর্ণব।
“কে তুমি?”, কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল সে।
“তুমি কে?”, প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই জিজ্ঞেস করল আসল অর্ণব। আর দুজনেই তাদের দুজনের গলার স্বর শুনে বুঝতে পারল যে দুটো স্বর একেবারেই এক। দুই অর্ণব আস্তে আস্তে পরস্পরের দিকে এগোতে থাকল। প্রায় একহাত দূরে এসে থামল দুজনেই। দুজন দুজনকেই ভালো করে দেখতে থাকল। দেখতে একেবারেই এক। মাথার চুলের ধরন থেকে পায়ের নখ অবধি সব এক। এতটুকু অমিল নেই কোথাও। এমন সময় হঠাৎ চারদিক অন্ধকার হয়ে গেল। আর আচমকা কি হল তাকাতে গিয়ে  দুজন দুজনের সাথে ধাক্কা খেল। সেই ধাক্কায় অর্ণব এবং আরেকটা অর্ণব দুজনেই মিলিয়ে গেল প্রচণ্ড আলোতে।

আলোটা চোখ থেকে সরলে অর্ণব বুঝতে পারল সেটা আসছে মায়ের হাতের টর্চটা থেকে। টর্চের আলো ছাড়া ঘরের বাকিটা অন্ধকার।
“কি রে?”, মা বলল, “ঘরে গিয়ে শুবি চ’! আলো চলে যেতে এখানে এসে দেখছি পড়তে পড়তে এখানেই শুয়ে পড়েছিস! চ’ ঘরে চ’!”
অর্ণব যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।  একটু আগেই সে তার অ্যান্টিম্যাটারের সাথে ধাক্কায় অ্যানাইহিলেট হয়ে গেছিল। ওটা তাহলে স্বপ্ন ছিল।  বাঁচা গেল, মনে মনে ভাবল অর্ণব। কিন্তু সোফার নীচে মেঝের দিকে তাকিয়েই তার চোখদুটো বড় হয়ে গেল। সেখানে যে বইটা পড়ে আছে, সেটা তার বই না, স্বপ্নে দেখা আরেকটা অর্ণবের হাতে বইটা ছিল, “থিওরিজ অফ ম্যাটার”।


লেখকের কথা: রুবাই শুভজিৎ ঘোষ
লেখকের জন্ম পশ্চিমবাংলায়। পেশায় একটি বহুজাতিক সংস্থার তথ্যপ্রযুক্তিবিদ। নেশায় লেখক এবং পরিচালক। বাঙালির জনপ্রিয় ওয়েবসাইট সববাংলায় এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা তিনি। কবিতা থেকে শুরু করে গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস, চিত্রনাট্য সবকিছুই লিখতে ভালবাসেন। লিটিল ম্যাগাজিন থেকে শুরু করে বাণিজ্যিক বিভিন্ন ম্যাগাজিনে নিয়মিত লিখেছেন। স্রোত থেকে প্রকাশিত তাঁর কবিতার সংকলন দৃষ্টি এবং বালিঘড়ি। এছাড়া তথ্যচিত্র, শর্ট ফিল্ম বা অন্যান্য বিভিন্ন ধরনের ভিডিও পরিচালনা করেন। ধর্ম এবং বিজ্ঞান তাঁর প্রিয় বিষয়। ভ্রমণ তাঁর অন্যতম শখ। অন্যান্য শখের মধ্যে রয়েছে স্কেচ, ফটোগ্রাফি, ছবি ডিজাইন করা।

শেয়ার করে বন্ধুদেরও পড়ার সুযোগ করে দিন
  •  
  •  
  •  
  •  

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

Back to Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।