লেখক : অর্পিতা চক্রবর্তী
ছোট্ট তিন্নি প্রথমবার সমুদ্র দেখতে গিয়েছে। চারিদিকে এত জল, এত বড় বড় ঢেউ দেখে ছোট্ট সোনাটা কেঁদে ফেলেছে। ওর মা-বাবা কেমন লাফিয়ে লাফিয়ে স্নান করছে আর ছোট্ট পুঁচকিটা বসে আছে বালিয়ারিতে, ওর দিদানের সাথে। তবে ওর বানানো বালির বাড়িখানা দেখতে বেশ চমৎকার হয়েছে। শুধু বাড়িটাতে দরজা জানালা নেই, এই যা। ওদিকে তিন্নির মা উল্কা হঠাৎ করেই জল থেকে উঠে দৌড়ে দৌড়ে আসছে আর ওর পেছন পেছন ওর স্বামী কুশলও আসছে।
“মা, এই দেখো, সমুদ্রে স্নান করতে করতে আমরা কি পেয়েছি।”
“ও মা, এ তো ছোট্ট কাঠের জগন্নাথ দেবের মন্দির। ভিতরে আবার তিন ভাই বোনের মূর্তি। আবার তাতে একটা ছোট্ট দরজা লাগানো। বাহ, ভারি সুন্দর তো।”
তিন্নির দিদান মন্দিরটিকে মাথায় তুলে নিয়ে প্রনাম ঠুকলো। ওদিকে পাকা বুড়ি তিন্নি এগিয়ে এসে ওটা দিদানের হাত থেকে টেনে নিয়ে বলল,
“ও, তুমি বুঝি জগন্নাথ ঠাকুর?”
ওর দিদান বলল, “কেন সোনামা, তুমি ওনাকে কাল ঐ বড় মন্দিরটাতে দেখেছো না?”
তিন্নি বলল, “ওইখানে, যেখানে খুব ভিড় ছিল? কিন্তু ওখানে তো আমি কিছুই দেখতে পাইনি। আমার সামনে লম্বা লম্বা কাকু কাকিমারা দাঁড়িয়ে ছিল। ওরা আমাকে কিছু দেখতে দেয়নি। আমার তো খুব রাগ হচ্ছিল, আর তাই তো আমি কাল ঘরে এসে ঐ বড় ঠাকুরটাকে একটা চিঠি লিখেছি আমার ড্রইং খাতায়। তোমরা ঘরে চলো আমি দেখাব।”
উল্কা বলল, “ঠিক আছে, তবে তাই চলো। আমরা বরং ঘরে গিয়ে তোমার চিঠিটাই পড়ি।”
তিন্নি সবার সাথে ছোট্ট জগন্নাথ দেবের মন্দির নিয়ে চলে আসল ওদের হোটেলে। তারপর বালি পরিষ্কার করে তাঁকে শুকোতে দেওয়া হল ব্যালকনিতে। ও এখন ক্লাস টু-তে পড়ে। এই তো আর কিছু দিন মাত্র বাকি, তারপর ম্যাডাম উঠে যাবে ক্লাস থ্রি-তে। কিন্তু তাও সবাই ওকে ছোট্ট বলে।
“ধুর, ওরা আসলে কিছু বোঝে না। খুব বোকা।”
ড্রইং খাতায় লেখা চিঠিটা খুলে তিন্নি বলল, “সবাই এখানে বসো। আমি এখন এটা পড়ব আর তোমরা শুনবে। আর এই যে জগন্নাথ ঠাকুর, তুমি একটু মন দিয়ে শোন তো বাপু। উফ, আমি আর পারি না। কাল ওই বড় মন্দিরটাতে গিয়ে তোমাকে একটুও দেখতে পেলাম না। আমার বুঝি কষ্ট হয় না, বলো বাপি? আমার কিন্তু আবার একটু একটু রাগও হচ্ছে।”
কুশল মেয়েকে জড়িয়ে ধরে বলল, “তাই বুঝি। আমার পাকা বুড়ির নাকটা তাই জন্য একটু ফুলো ফুলো লাগছে। আচ্ছা, আমারা কি এবার তোমার লেখা এই চিঠিটা পড়তে পারি?”
তিন্নি বলল, “বাপি, তুমি এই চিঠিটা পড়ো। আমি বরং ঐ জগন্নাথ ঠাকুরকে ঘরে এনে বসাই।”
পাকা বুড়ি এক দৌড়ে বারান্দা থেকে সমুদ্রে পাওয়া ঐ মন্দিরটাকে নিয়ে আসলো ঘরে। ততক্ষণে সবাই গোল করে বসে পড়েছে চিঠি শুনতে। তিন্নি হঠাৎ করেই বলে উঠলো, “শোন জগন্নাথ ঠাকুর, আমি তোমাকে একটা চিঠি লিখেছি। আমার বাপি এখন ওটা পড়বে আর তুমি চুপটি করে শুনবে। এবার এখানে চুপটি করে বসো দেখি। দিন দিন তোমার দুষ্টুমি খুব বাড়ছে। আমি আর কত দিক সামলাব বলতে পারো?”
সবাই হেসে গড়াগড়ি পাকা বুড়ির কথায়। কুশল পড়া শুরু করল,
“শোন জগন্নাথ ঠাকুর। আমি তিন্নি পাল। ক্লাস টু, সেকশন এ, রোল নম্বর ১, বাড়ি বেহালায়। আমরা এখন পুরীতে বেড়াতে এসেছি। আমার মা বলেছে, এখানে নাকি তোমার একটা বড় বাড়ি আছে। তোমার নাকি আবার একটা মোটা দাদা আর একটা রোগা বোন আছে। জানো আমি শুনেছি, তোমার দাদা না কি খুব রাগী। তা তুমি বুঝি তোমার দাদাকে খুব ভয় পাও? ভয় নেই, আমি আছি তো। আমি খুব বকে দেব তোমার মোটা দাদাকে। আচ্ছা, তোমার বোন কি আমার সাথে খেলবে গো?
বলো না প্লিজ, বলো না গো, তোমার বোনকে আমার সাথে খেলতে। আসলে আমার তো কোন ভাইবোন নেই। আছে শুধু মা, বাপি আর দিদান। যাক ভালই হল, আজ থেকে তোমার একটা দাদা, একটা বোন, আর তুমি, আর আমি তিন্নি – তাহলে হলো গিয়ে ১-২-৩-৪, মানে আমরা মোট চারজন। কি মজা, এখন থেকে আমরা চার ভাইবোন একসাথে থাকব।
বেশ, তাহলে ব্যাপারটা ঠিক কী দাঁড়ালো বল তো? এই যা, বলতে পারলে না তো? দাঁড়াও আমি বুঝিয়ে বলছি।
আমি তিন্নি, আমার একটা বাড়ি হ’ল বেহালায় আর একটা বাড়ি হ’ল পুরীতে। কি মজা আজ থেকে আমার দুটো বাড়ি। এবার বেহালার বাড়িতে গিয়ে আমি যখন স্কুলে যাব, তখন সবাইকে বলব আমার পুরীর বাড়ির কথা, তোমাদের কথা।
জানো তো জগন্নাথ, মা বলেছে তুমি না কি এত এত খাও। তাই তোমার পেটটা এত মোটা। আমি কিন্তু বাপু অত খাই না। এই দেখো, আমার কিন্তু তোমার মত ইয়া মোটা ভুঁড়ি নেই। আচ্ছা তুমি কি খালি খাও গো? একটুও পড়াশোনা করো না? ও বুঝেছি, তোমার মা তোমাকে একটুও বকে না। আর তাই তুমি এত এত দুষ্টু করো।
দাঁড়াও এবার দেখাচ্ছি মজা। এবার তোমাকে আমি বাড়ি নিয়ে গিয়ে সোজা ক্লাস থ্রি তে ভর্তি করে দেব আমার স্কুলে। দেখবে কেমন কঠিন কঠিন অঙ্ক করতে হয়।
সেদিন জানো তো কি হয়েছিল? সেদিন আমি সবকটা অঙ্ক ভুল করেছিলাম আর তারপর মা কি রেগে গেলো। আমার পিঠে একটা দুম করে বসালো। আর আমি কত কাঁদলাম কিন্তু মা আমার কোন কথা শুনলো না। আবার বড় বড় চোখ করে তাকালো। তারপর আমার বাপি অফিস থেকে এসে অঙ্কটা করে দিলো।
এবার আমার কথা একটু মন দিয়ে শোনো। তুমি যদি বেশি দুষ্টু করো তবে মা কিন্তু তোমাকেও গুম গুম করে দেবে। আর তখন কিন্তু তোমাকে কেউ বাঁচাবে না।
আচ্ছা জগন্নাথ ঠাকুর তুমি কি দুধ খাও? তিন্নি কিন্তু রোজ দুধ খায়। জানো তো দুধে খুব পচা গন্ধ। তবে দুধ না খেল কেউ না কি বড় হয় না। আমার দিদান বলেছে। এ মা তোমার চোখে জল, তুমি কাঁদছো কেন? আচ্ছা আচ্ছা ঠিকাছে, আর কাঁদতে হবে না। আমি তোমাকে কোলে শুইয়ে বোতলে করে দুধ খাইয়ে দেবো।
তবে তুমি যদি তিন্নির মতো কান্না করো তাহলে কিন্তু একটা দেব পিঠে।
জানো তো জগন্নাথ ঠাকুর, তোমাকে না আমি খুব খুব ভালোবাসি। আমার মা বাপি দিদান সবাই তোমাকে খুব খুব ভালোবাসে। তুমি যদি আমাদের বাড়ি যাও দেখবে ওরা তোমাকে অনেক আদর করবে। চলো না গো, প্লিজ চলো। আচ্ছা ঠিকাছে, আমি তোমাকে আমার ঘন্টু মন্টু পুতুল দুটো দেবো। আমার আবার রান্নাবাটি আছে জানো তো? আমরা সবাই মিলে রান্না করবো। কি মজা হবে, তাই না?
আচ্ছা শোনো, এটা কিন্তু আমার ড্রইং খাতা। আমি এতে ছবি আঁকি। আমি তোমাকেও পাখি আঁকতে শিখিয়ে দেবো, কেমন? উফ আমি আর পারি না বাপু তোমাকে নিয়ে। এবার কিন্তু আমি আর লিখতে পারছি না। আমার বুঝি হাতে ব্যাথা করে না। এবার এসে তিন্নির হাতটা একটু টিপে দাও দেখি কেমন পারো।
ও বুঝেছি, তুমি তো সেটাও পারো না। তুমি তো একটা বুদ্ধু। আচ্ছা ঠিক আছে তাহলে ঐ কথাই রইলো, তোমরা এবার আমার সাথে আমার বাড়ি যাচ্ছো বেহালায়।”
কুশল মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে চিঠিটার আদ্যপ্রান্ত পড়ে গেল। চিঠিতে লেখা কথাগুলো শুনে ঘর সুদ্ধু সবাই তখন বাক্যহারা। হঠাৎ নীরবতা ভঙ্গ করে তিন্নি এসে ওর বাপিকে জড়িয়ে ধরে বলল, “বাপি, ও আমাদের সাথে আমাদের বাড়ি যাবে তো?”
কুশল বলল, “যাবে সোনা, অবশ্যই যাবে। ও তো তোমার জগন্নাথ আর আমাদের প্রাণনাথ।”
উল্কা এসে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে বলল, “মা রে, এ লেখা তুই লিখলি কি করে?”
তিন্নি বলল, “কেন? পেন দিয়ে।”
দিদান তিন্নিকে আদর করতে করতে বলল, “দিদিভাই, তুমি আজ বালিতে একটা বাড়ি বানাচ্ছিলে না, মনে আছে?”
তিন্নি বলল, “মনে আছে দিদান।”
দিদান বলল, “দেখো, তোমার বাড়িতে তো দরজা ছিল না। কিন্তু এই বাড়িতে আছে।”
তিন্নি তখন ছোট্ট মন্দিরটাকে কোলে নিয়ে বলল, “তাই তো দিদান, তুমি ঠিক বলেছো। আমি তো খেয়াল করিনি।”
দিদান বলল, “তোমার জগন্নাথ আজ থেকে তোমার সাথেই থাকবে। কিন্তু তুমি কি জানো দিদিভাই জগন্নাথ ঠাকুর আসলে ঠিক কোথায় থাকে?”
“কোথায় দিদান?”
“তোমার আমার আমাদের সবার মনের মধ্যে আমাদের শরীরের মধ্যে। আমরা যদি ভক্তি আর ভালবাসা দিয়ে ওনাকে ডাকি তবে উনি ঠিক চলে আসেন।”
তিন্নি বলল, “ভক্তি কাকে বলে দিদান?”
দিদান বলল, “ভক্তি হল এই চিঠি যা তুমি লিখেছ।”
তিন্নি এক দৌড়ে ওর মায়ের কাছে গিয়ে বলল, “মা এই কাগজটা আমাকে একটু ছিঁড়ে দাও তো?”
মা বলল, “কেন কি করবি?”
তিন্নি বলল, “দাও না প্লিজ।”
ছোট্ট মেয়েটা ওর ড্রইং খাতার ছেঁড়া পাতাটা নিয়ে গিয়ে সেই মন্দিরের সামনে রাখল আর বলল, “চলো তাহলে বেহালায়। আর এই নাও, এটা তোমার চিঠি। কিন্তু মনে থাকে যেন, গিয়ে আমার স্কুলে ক্লাস থ্রি-তে ভর্তি হতে হবে। আর এই তিন্নি হবে তোমার দিদিমনি। তবে পড়া না পারলে কী হবে সেটা জানো তো? পিঠের উপর পড়বে এক দুই তিন, গম গুম। উফ, আর পারি না বাপু। চলো, এবার আমরা একটু ঘুমু ঘুমু করি। কাল আবার ছপাৎ ছপাৎ করে সমুদ্রে স্নান করব আর একটা বাড়ি বানাব।”
উল্কা বলল, “আর সে বাড়ির নাম দেব জগন্নাথ আবাস।”
লেখক পরিচিতি : অর্পিতা চক্রবর্তী
আমি অর্পিতা চক্রবর্তী। খুব সাধারণ একজন গৃহবধূ। মনের খেয়ালে আর কল্পনায় করি শব্দের আঁকিবুকি। নানা বিষয়ের উপর লিখতে আমার ভালো লাগে। তবে প্রতিটি লেখার মাঝে রেখে যাই একটি নিঃশব্দ বার্তা। একাধিক পত্র পত্রিকার সাথে আমার পথ চলা। ইতিমধ্যে আমার স্বরচিত বই "নীড় ভাঙা ঢেউ" প্রকাশিত হয়েছে "নীরব আলো পত্রিকার" হাত ধরে যা "হাজার দুয়ারী সাহিত্য সম্মান 2025" এ সম্মানিত হয়েছে। আমার লেখা দ্বিতীয় বই "মুখোশের আড়ালে" প্রকাশিত হয়েছে "সময়ের আনন্দ প্রকাশনী" থেকে ৪৯ তম কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলাতে।

