রোপণ

লেখক: অর্পিতা

রেলগাড়িটা এত জোরে যাচ্ছে মনে হচ্ছে কোনোদিন আর থামবে না, কিংবা কখনো থেমে ছিল এই গাড়ি, তার গতি দেখে বোঝা মুশকিল। একটার পর একটা স্টেশন চলে যাচ্ছে, হলুদ কালোয় লেখাগুলো চোখে দেখা যায় না। কামরায় যাত্রী বলতে ও একা, দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়। গাছপালা বাড়িঘর সবকিছু ছুটছে পিছনদিকে। বুকের ভিতরে কী যেন একটা চেপে আছে, এর নাম বোধহয় ভয়। ভয়! ভয় কিসের জন্য? মা’র মুখে ছোটো থেকে শুনে আসছে ওর নাকি ভয় নেই, বরং যেখানে ভয় পাওয়ার কথা সেখানেই ও অবাক হয়। আজ তবে কিসের ভয় লাগছে ওর! দুদ্দাড় করে হাওয়া ওর গায়ে ভেঙে পড়ছিল, এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল চুলগুলো। রেলগাড়ির গতি কমে আসছিল, থামবে কিনা জানা নেই। ব্যাগটাকে চেপে ধরে ও। না নেমে যেতে পারলে জানেনা কোথায় পৌঁছে যাবে, মাথার ভিতরটা ভারী লাগে হঠাৎ করে, রেলগাড়িতে চেপেছিল কোথা থেকে মনে পড়ে না। গতি কমছে, প্ল্যাটফর্ম দেখা যাচ্ছে। গতি কমে অথচ গাড়ি থামে না, ও লাফিয়ে নেমে পড়ে, রেলগাড়ি এগিয়ে যায়, সারা শরীরময় দুলুনি লাগে, প্ল্যাটফর্মে আছড়ে পরে শরীর। রেলগাড়ি চলে যায়, ও দেখতে পায় অনেকগুলো মুখ গাড়ির মধ্যে থেকে ওকে ডাকার ভঙ্গিমায় হাত বাড়াচ্ছে।
বাঁ হাতটা ছড়ে গেছে , উঠে দাঁড়ায়, চারপাশ দেখে, মাথার ভিতরে যেন কোলাহল করে ওঠে কেউ। এটা কোথায় এসে পড়েছে ! চারপাশে মানুষজন তো দূরে থাক একটা কাক পর্যন্ত নেই। ও ছুটবে না দাঁড়িয়ে থাকবে বুঝে উঠতে পারে না, বিপরীত দিকে কোনো প্ল্যাটফর্মই নেই, ফিরে যাওয়া নেই, ‘আমি কোথায়?’ চিৎকার করে ওঠে আহেলী….।
অন্ধকার… অন্ধকার… অন্ধকার।

‘রাত্রি দুটো, অ্যালকোহলের গন্ধমাখা কিছু কবিতার ঘুম ভাঙে। কবিতা চিঠি হয়ে চলে যেতে চায়, তাই রাতের সিলিং এ বোথ সাইড আঁঠা দিয়ে আটকানো রেডিয়ামের জ্বলজ্বলে তারাগুলোর দিকে চেয়ে থাকে।’

(১)

একটা জলের ফোঁটা কপাল ছুঁয়ে ডান হাতে এসে পড়ল। আহেলী চোখ তুলে উপরে তাকায়, আকাশের দিকে তাকালে আজকাল মনে হয় প্যাস্টেল কালারের বেশ কয়েকটা রং আকাশ হারিয়েছে। রোজই সাদা কালো ছবি তারপর টিপটিপ, ঝিরঝির, শেষ পর্যন্ত ঝম্ঝম্ এ গিয়ে থামবে। জুলাই মাসের আকাশ বৃষ্টি ছাড়া কীই বা দেবে। ইস্ আজ ছাতাটাও সাথে নিয়ে আসেনি। একটু জোরে পা চালায় আহেলী, কফিহাউসে বসাই যায়। সিঁড়ি ভেঙে উপরে ওঠে, ভেতরে ভিড় থিকথিক করছে। আহেলী চোখ ঘোরায়, ডানদিকের কোণায় একটা টেবিল ফাঁকা। বাঁ কাঁধ থেকে ব্যাগটা খুলে আহেলী বসে। বৃষ্টির ছাঁটে ভিজে গেছে কুর্তি, ঘাড় আর কপালে রুমাল বোলায়, ঘাম আর বৃষ্টি ছড়িয়ে আছে মুখময়। পাশেই পাঁচটা মেয়ে একটা টেবিল জুড়ে বসে আছে, কলেজে পড়ে বোধহয়, বড্ড জোরে কথা বলছে ওরা, আহেলীর বিরক্ত লাগে এই অকারণ হাসি ঠাট্টা।
চশমাটা টেবিলে রাখে।
‘একটা কফি, দাদা।’
‘আর কিছু?’
‘নাহ্। আচ্ছা একটা চিকেন কাটলেট দেবেন।’
ওফ! আবার হাসির কল্লোল উঠছে। আহেলীর বয়স সাতাশ, হাতে শাঁখা পলা নেই, কপালে সিঁদুরের ছোঁয়া নেই, ও আইবুড়ো নয়, বিধবাও নয়, বিবাহিতা। নাহ্ স্বামীর সাথে ডিভোর্স বা মিউচুয়াল সেপারেসনও ওর হয়নি, রাজারহাটের ফ্ল্যাটে গত তিন বছর ধরে শমিতের সাথে থাকছে, নাহ্ লিভ টুগেদার নয়, কাগজে কলমে ওরা স্বামী স্ত্রী এবং দাম্পত্য জীবনের সম্পর্কও ওদের মধ্যে রয়েছে, তবু দুজনে ‘সংসার করছে’ বলতে বাধে।

ধোঁয়া ওঠা কফির কাপ সামনে এসে যায়, প্লেটে কাটলেট। কবজি উল্টে ঘড়ি দেখে আহেলী, সাড়ে পাঁচটা, এখনো অনেকটা সময় আছে হাতে, শমিতের বাড়ি ফিরতে ফিরতে সাড়ে আটটা তো বাজবেই। কফিতে চুমুক দিয়ে আহেলী ভাবে এখন কী করবে, কফিহাউসে মিনিট পঁয়তাল্লিশ কাটিয়ে নেবে তারপর কোথায় যাওয়া যায়।
‘আরে! এতো আমাদের অহল্যা!’
‘তিয়াস না!’ অবাক হয় আহেলী, কলেজের বান্ধবীর সাথে এমনিভাবে দেখা হওয়াটা অবাকজনক হলেও সুখকর লাগে না ওর।
একটা চেয়ার টেনে তিয়াস বসে পড়ে, তিয়াসের চোখে মুখে অজস্র জিজ্ঞাসা, এই প্রশ্নচিহ্নগুলোকে আহেলী দারুন ভয় পায়। ‘অহল্যা নই আমি’ ঠোঁট টেনে হাসে আহেলী।
তিয়াসের গলায় উচ্ছ্বাস, ‘আচ্ছা বাবা আচ্ছা, তুই বল কোথায় ছিলিস এতদিন? তুই তো রাতারাতি উবেই গেলি, না ফেসবুক না হোয়াটস্অ্যাপ, কিছুতে নয়! নাম্বারও বদলেছিস মনে হয়।’
‘এতগুলো প্রশ্ন একসাথে করলে উত্তর দেব কিভাবে শুনি।’ আহেলী বিরক্তি চাপা দেওয়ার চেষ্টা করে।
কত বছর পর দেখা ওদের, পাঁচ, নাকি ছয় হবে, তিয়াসের বিয়েতেও তো আহেলী যায় নি। তিয়াস একটু মোটা হয়েছে, সুখী সুখী ছাপ চোখে মুখে, লাল ভেলভেটের টিপটার জন্য মুখের শ্রী বেড়েছে।
‘আমার তর সইছে না, বল না চুপ কেন’, হাতের ব্যাগগুলো পাশে রাখে তিয়াস।
‘নাকছাবি টা কি হীরের?’
‘কি! ওহ্, তুই না একটুও বদলাসনি’ তিয়াস হাসে।

পাশের টেবিলের মেয়েগুলো একবার ঘুরে তাকালো মনে হয়। মেঝেতে সিগারেটের ফিল্টার পড়ে। পায়ের কাছে একটা বিড়াল ঘুরে ফিরে, মুখতুলে তাকিয়ে চলে গেল। বড্ড ভিড় কফিহাউসে, আহেলীর মনে হল না আসলেই ভালো হতো, না হয় একটু ভিজত। ভিজতে তো ওর ভালোই লাগে। বিয়ের পর প্রথম প্রথম কত বৃষ্টি ভিজেছে শমিত আর ও। রাস্তার লোকজন টেরিয়ে টেরিয়ে দেখত, নিশ্চয়ই ভাবত কলেজকাটা প্রেমিক-প্রেমিকা, ছবিগুলো দ্রুত বদলাতে থাকে।
‘কফি বলি তোর জন্য?’
‘সে আর বলতে, কফি খেতেই তো আসা।’

আহেলী বেয়ারাকে ডাক দেয়, ‘দাদা একটা কফি দেবেন…কাটলেট বলি?’
তিয়াস হাত নাড়ে ‘না, না, দেখছিস না কেমন মুটিয়েছি, না হয় তোরটায় ভাগ বসাব সামান্য।’
আহেলী হেসে ফেলে তিয়াস এর বলার ভঙ্গিতে, ‘তাই খাস।’
‘অত সহজে ছাড়ব না ম্যাডাম, সব শুনব, শুরু কর।’

আহেলী ভুরু কোঁচকায়, কতটাই বা তিয়াসকে বলা যায়, কতটাই বা তিয়াসকে বলতে পারবে। গত তিন বছরের ইতিবৃত্ত ওর নিজের কাছেই যেন অজানা। তিয়াস বা অন্যান্য বন্ধু-বান্ধব সব যেন গতজন্মের কেউ। কাউকেই আহেলী নবজন্মে চিনে উঠতে পারছে না।
‘সব শুনবি, আগে কফি খা ঠান্ডা হয়ে যাবে।’
তিয়াস সবুজ তাঁতের শাড়ির আঁচলটা ঠিক করে কফিতে চুমুক দেয়, ‘ইঃ! বাজে, তবু আজ সব চ্যলেগা তু যো সাথ হ্যায়।’
কাঁটা ছুরি দিয়ে আহেলী কাটলেটটা দুপিস করতে করতে জিজ্ঞেস করে, ‘একা একা কফিহাউস তুই কী করছিলিস, তোর উনি কোথায়?’
‘হুম, আপনি বিয়ে-থা করেননি বলে একা একা ঘুরছেন, এদিক ওদিক ডেটিং সেটিং করছেন, আর আমাদের মাথায় স্ট্যাম্প আর হাতে লাল সাদা শেকল আছে বলে আমরা বুঝি একা চলাফেরা করতে পারিনা।’

আহেলী সহজ হচ্ছিল আস্তে আস্তে, যেন গতজন্মের কথা মনে পড়ছে। সেই দুরন্ত আহেলী, কলেজের যেকোনো অনুষ্ঠান ডাক পড়ে আহেলীর, রাত জেগে নোটস বানাও আহেলী, পূজোর প্ল্যান কে বানাবে আহেলী, ঘুরতে যাওয়ার জন্য বান্ধবীর বাবাকে রাজী করাবে আহেলী। এই চটপটে মেয়েটা কলেজ শেষ করে চাকরি করতে করতে অর্কুটে আলাপ হওয়া ছেলের প্রেমে পড়ে যেতে পারে ভাবলে আহেলীর নিজেরই অবাক লাগে। কতটুকু চিনেছিল শমিতকে? চিনেছিল, সঠিকভাবেই চিনেছিল, ভেবেছিল চিনতে পারার আড়ালে নিশ্চই অচেনা শমিত আছে। ধীরে ধীরে আহেলী তাকে খুঁজে পাবে, একটার পর একটা ঝিনুক খুলবে, মুক্তো খুঁজবে সারারাত, ভোররাতে একটা ঝিনুকবন্দী মুক্তো নিশ্চয়ই খুঁজে পাবে। পরে বুঝেছিল ভুল, অনেক বড় ভুল করেছে, এখানে ক্লান্তি নেই তাই ক্লান্তির শেষে মুক্তো খুঁজে পাওয়ার পুরস্কারও নেই। সব ঝিনুকেই যদি মুক্তো থাকে সেই খেলায় জিত থাকলেও শান্তি নেই।

তিয়াসের কথা শুনে আহেলী হাসে, ‘আমার বিয়ে হয়ে গেছে তিয়াস।’
‘সেকি!’
তিয়াসের চোখ ঠেলে বিস্ময় বেরিয়ে আসে। আহেলীর মনে হয় আশপাশের সবাই ওদের দিকে ঘুরে তাকালো।
‘আস্তে!’
‘আহ্ নিকুচি করেছি আস্তের! তুই বিয়ে করে নিয়েছিস, কবে? কার সাথে? নেমন্তন্ন কই? লাভ না অ্যারেঞ্জ ? তুই নিঘ্ঘাত মিথ্যে বলছিস, মাথায় স্ট্যাম্প কই তোর?’
আহেলী ঠোঁট টিপে হাসে, ‘শমিত, আমার বর, আমরা রেজিস্ট্রি ম্যরেজ করেছি প্রায় আড়াই বছর হতে চলল, রাজারহাটে থাকছি, শাঁখা সিঁদুর পরি না, ওর কোনো আপত্তি নেই এতে।’
‘ওমা! দারুন বর তো তোর।’
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আহেলী, ‘হ্যাঁ, দারুন।’
আহেলীর হঠাৎ করে খারাপ লাগে, তিয়াসের সাথে কত দিন পর দেখা, একবারও তিয়াসের খবর ও নেয়নি। শমিতের সাথে থাকতে থাকতে ওর মতনই হয়ে উঠছে, পাথর!
‘তুই এখানে কোথায় এসেছিলিস বলিসনি কিন্তু, একটু নিজের খবরও দে।’, কাটলেটে কামড় বসায় আহেলী।
‘আমি তো ভালোই আছি, এসেছিলাম কাঞ্জিলাল এ, ননদের সামনে বিয়ে, শাড়ি কিনতে। এমনিতে এখন সপ্তাহখানেক হলো মায়ের কাছে আছি, মার শরীরটা ভালো নেই।’
একসাথে এতটা কথা বলে চুপ করল তিয়াস, এতক্ষণ ওর চোখে মুখে যে আলোটা ঘোরাফেরা করছিল হঠাৎ যেন নিভে গেল। আহেলী সাথে সাথে উত্তর দেয়, ‘ওহ্, তোর হাতে প্যাকেটটা আমি খেয়ালই করিনি, তা কফিহাউসে কেবল কফি খেতে নাকি অ্যাপো আছে?’
পরিস্থিতি হালকা হয়, ‘কি যে বলিস না! কতদিন পর এলাম, ভাবলাম যাই পুরনো জায়গায় গিয়ে স্মৃতি উল্টে পাল্টে দেখি, আর দেখ তোর সাথে দেখা হয়ে গেল।’
‘আমি কয়েকটা বই কিনতে এসেছিলাম, বৃষ্টি এলো, ভাবলাম বসি কফিহাউসে।’
‘ওমা! তুই পড়াশুনা করছিস নাকি আবার?’
‘ধুর পাগলী, এমনি বই পড়া যায় না বুঝি?’

বেশ অনেকটা সময় তিয়াসের সাথে কাটিয়ে ভালো লাগে আহেলীর। পুরনো বন্ধুদের সাথে দেখা করাই যায় মাঝে মাঝে, ভালো লাগবে হয়ত। শমিত সারাদিন ঘরে থাকেনা, কথা বলারও কেউ নেই। মায়ের বাড়ি কি আর রোজ য়াওয়া যায়। মা’র কাছে গেলে একই কথা বলবে। ওই তো শেষ যেবার মা’র কাছে গেল মা একটা আসন বুনছিল। আহেলী অবাক হয়, আজকাল আসন বুনে সময় আর চোখ নষ্ট করে লাভ আছে। মাকে বলতে মা উত্তর দিল, ‘সারাদিন কী করব আমি বসে, কতক্ষণই বা টিভি দেখা যায়।’
আহেলী কৌতুহল দেখিয়েছিল, ‘বই পড়! আমিও তো তাই করি।’
টুলের উপরে বসিয়ে মা আলতা পরাতে পরাতে বলেছিল, ‘বই বই করে তো জীবন গেলো, কতবার বলেছি একটা বাচ্চা নে এবার। সন্তান আসলে দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে।’
আহেলী বলতে চেয়েছিল, ‘ভুল তো কোথাও নেই মা।’ বলতে পারেনি, সমস্তটাই তো ভুল, বছর খানেক হল আহেলী চাকরি ছেড়েছে, ভালো লাগছিল না কাজ করতে, মনে হচ্ছিল শমিতকে আরো একটু সময় দেওয়া প্রয়োজন। সম্পর্কটাকে একটু সময় দেওয়া দরকার। নাহ্ লাভ হয়নি, চাকরি ছেড়েছে শুনে শমিত ভুরু কুঁচকেছিল, ‘কেন? সারাদিন ঘরে বসে কী করবে?’
মজা করে আহেলী উত্তর দিয়েছিল, ‘বরের সেবা করবো।’
ছাই সমেত সিগারেটের টুকরোটা আ্যসট্রেতে গুঁজে দিয়ে বলেছিল, ‘ন্যাকামিটা আগে করলে, বাচ্চাটা বেঁচে থাকত।’
স্থবির হয়ে গেছিল আহেলী, শমিত এমনভাবে আগে কোনোদিন কথা বলেনি, আর তিন সাড়ে তিন মাসের প্রেগনেন্সিতে কে কাজ ছেড়ে বসে থাকে! বাচ্চটা কি আহেলীর ছিল না! যখন বাথরুম রক্তে ভেসে যাচ্ছিল কষ্ট আহেলী পায়নি? শমিত তখন পাশে ছিল প্রতি মুহূর্তে। তারপর থেকে শমিতের পাশে শুয়েছে প্রতিদিন, কিন্তু শমিতকে পায়নি আর।
বিয়ের পর শমিত বদলায়নি, আহেলী কিন্তু চেয়েছিল ও বদলে যাক, যেমন সবাই বদলায়। বিয়ের আগে একা জীবন যেমন কাটছিল বিয়ের পর তেমন হয় না। শমিতটা পাগলাটে ধরণের, কেমন যেন নির্বিকার, আহেলীর মন খারাপ হলে, পাশে বসে দুটো কথা বলবে না, বরং সরে গিয়ে সময় দেবে সামলে নেওয়ার জন্য। আবার কখনও নিজেই পাগলামিতে মেতে উঠে আহেলীকে পাগল করে তুলবে। আহেলী শমিতকে চিনেছিল কিন্তু বুঝে উঠতে পারেনি, মানুষটা কী চায় ওর কাছ থেকে? কতগুলো মাস হয়ে গেল কেবল পাশাপাশি রয়েছে, কাছাকাছি থাকা হচ্ছে না।
তিয়াস ঘড়ি দেখে, ‘ম্যাডাম, সন্ধ্যে গড়াচ্ছে ওঠা যাক এবার?’
আহেলী সম্বিত ফিরে পায়, ‘হুম্ চল, বৃষ্টি কমে গেছে তাই না?’
তিয়াস খোঁপাটা ঠিক করে হাত দিয়ে, ‘চিন্তা নেই ছাতা আছে, শিয়ালদা যাবি তো?’
বাঁকা সিঁড়ি দিয়ে দুজনে নেমে আসে, বাইরেটায় ভেজা পেয়ারার মতন সবুজ গন্ধ ঝাপটা মারে। প্রতিটা জায়গার একটা নিজস্ব আওয়াজ আছে, মাত্র একটা সিঁড়ির তফাতে গমগমে যৌবনের থেকে ট্রামের টিং টিং মেশানো অক্ষরের বোবা কথার দেশে যেন ওরা এসে পৌঁছে যায়। বৃষ্টি পড়ছে না, ভেজা রাস্তায় পাশাপাশি দুজন হাঁটে, তিয়াসকে চুপ থাকতে দেখে আহেলী প্রশ্ন করে, ‘কি রে ছেলে মেয়ে ক’টি? বললি না তো?’
তিয়াস হাসে, সেই হাসি চোখ ছোঁয় না, ‘আমার সাথে এক জায়গায় যাবি আহেলী?’
আহেলী থমকায়। বৃষ্টি ভেজা ম্লান আলোয় কফিহাউসের তিয়াসকে অচেনা লাগে প্রথমবার, একটা চাপা কষ্ট যেন ওর সারামুখে ছড়িয়ে পড়েছে। মনটা খচ্খচ্ করে আহেলীর, ওর মনে হয় সন্তর্পনে লুকিয়ে রাখা কোনো দেরাজে আহেলী যেন হঠাৎ হাত দিয়ে ফেলেছে।
‘কোথায় রে? বেশী দেরী করা যাবেনা কিন্তু, শমিত অফিস থেকে ফিরে আসার আগে আমায় পৌঁছাতে হবে।’
‘ওরে বাবা! আমাদের অহল্যা স্বামী দেবতাকে ভয় পাচ্ছে যে!’
‘ধ্যাত! ফ্ল্যাটের চাবি আমার কাছে, ডুপ্লিকেটটা হারিয়েছেন বাবু, তাই ফেরার কথা বললাম।’
‘ও আচ্ছা, চিন্তা নেই, শিয়ালদার ওখানেই যাব, নার্সারিতে, কিছু গাছ কিনব।’
‘তুই গাছ কিনবি! মানে?’
‘আহ্ ফুলগাছ কিনব, ট্যক্সি না বাস?’
একটু ভেবে আহেলী বলে, ‘হাঁটবি?’
তিয়াস আহেলীর গাল টিপে বলে, ‘মিস অহল্যা, এখন আমরা কলেজে পড়ি না, পায়ে সেই জোর নেই, বুড়ি হচ্ছি।’
দুজনে হেসে ওঠে একসাথে। হাওয়ায় ভেজা ভাব, গুঁড়োগুঁড়ো বৃষ্টি উড়ছে, রাস্তা পেরিয়ে ওরা বাসে গিয়ে ওঠে, বসার জায়গা নেই, ঘসা কাচে আহেলী নিজের মুখের আদল দেখে চমকায়, সারা মুখ জুড়ে অজস্র রেখা, রেখাগুলো ওর অতীত, ওর বর্তমান, ওর ভবিষ্যত যেন চিৎকার করে বলছে।
‘ওই, ফোন নম্বরটা দে, কবে আবার দেখা হবে। ‘
আহেলী তিয়াসকে দেখে, কই তিয়াস কিছু বলছে না কেন!
‘কী হল! তাকিয়ে আছিস যে বড়।’
আহেলী আবার কাচের দিকে তাকায়, ভুল ভাঙে, জানলার কাচটা পুরনো ঘসে যাওয়া, সমস্যাগুলো বোধহয় গভীর হয় না, নিজেরাই সেগুলো বাড়িয়ে তুলি। আহেলী দুটো টিকিট কাটে, শিয়ালদা পর্যন্ত।
ঘষা কাচটাকে কেবল সরিয়ে দিতে হয়। আহেলীর এখন প্রায় মনে পড়ে বিয়ের প্রথমদিকে সেদিনও ভোরে বৃষ্টি পড়ছিল, আহেলীকে ভোরের আদর মাখিয়ে দিতে দিতে শমিত বলেছিল, ‘তুমি ভালোবাস তো আমায়?’
আহেলী শমিত এ ডুবে গিয়ে অস্ফুটে উচ্চারণ করেছিল ‘হুম’
আহেলীর এখন খুব কষ্ট হয় শমিতের ব্যবহারে, কিছুতেই বুঝে উঠতে পারে না। আগেরদিন ভোর রাতে আহেলীর ঘুম ভেঙে গেছিল, অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেছিল, একটা ফাঁকা স্টেশনে পৌঁছে গেছিল আহেলী, যেখান থেকে ফেরার কোনো রাস্তা নেই! আহেলীর ঘুম ভেঙে গেছিল ভয়ে, বিছানায় ধড়ফড়িয়ে উঠে বসেছিল ও, শমিত ঘুমাচ্ছিল অকাতরে কোল বালিশটাকে আঁকড়ে ধরে, আহেলীর খুব ইচ্ছা করছিল একবার শমিতকে জড়িয়ে ধরে। পারেনি, পাশেই টেবিলে রাখা জলের বোতল থেকে দু’ঢোঁক জল খেয়ে আবার শুয়েছিল, ঘুম আসেনি আর, ভোরের গুঁড়ো গুঁড়ো আলো জানলা দিয়ে এসে ঘর ভরাচ্ছিল। আহেলী বিছানা ছেড়ে উঠে চায়ের জল বসিয়েছিল, মনের মধ্যে কথাগুলো রয়ে যায়, কখন যে অবচেতনের কোনো ফাটল দিয়ে বেরিয়ে আসে আহেলীও বোঝে না।
‘কিরে কী ভাবছিস বলতো?’
আহেলী অপ্রস্তুত হাসি হাসে, ‘কই না তো!’
শিয়ালদায় নেমে পড়ে দুজনে, ‘তুই আসিস একদিন আমাদের বাড়িতে, উজানদাকেও আনিস।’
তিয়াস হাসে, ‘আসব, তোরও আসা চাই কিন্তু।’ তিয়াস থামে, ‘আহেলী তোর একটা প্রশ্নের উত্তর আমার দেওয়া হয়নি।’
আহেলী ভুরু কুঁচকায়।
রাস্তা দিয়ে দুই বান্ধবী হাঁটতে থাকে, এই জায়গাটায় যদিও বেশ ভিড় আর ঠেলাঠেলি তবু হাঁটে দুজনে।
‘আমার কোনোদিন সন্তান হবে না রে।’
‘মানে!’ অস্ফুটে বলে ওঠে আহেলী।
‘হবে না।’
তিয়াসকে কিছু জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছা হয়না আহেলীর, সব ‘কেন’ র উত্তর সবসময় জানা উচিত নয়। আজ সেই ‘উচিত নয়’ এর দিন। আহেলী কলেজের পুরনো বান্ধবীর হাতটায় চাপ দেয়।
তিয়াস কাঁদছে?
না, চোখের কোনায় হীরের কুচি লেগে থাকে, ‘আসিস আমার বাড়ি দেখবি কত সুন্দর বাগান করেছি, কত ফুলগাছ। গাছ ভরে ফুল ফল হয়, আসবি তো?’

(২)

“আধুনিকতার ছঁচে ঢালা কবিতার শরীরে ফুল নেই, পাখি নেই, মেঘলা দিন কিংবা বৃষ্টিও নেই। কবিতা মনে মনে উসখুস করে সকালের প্রথম আজান এর আগেই পৌঁছাতে হবে।”

শিয়ালদহ থেকে ট্যাক্সি ধরে বাড়ি ফেরে আহেলী। ফ্ল্যাট এর দরজার কাছে এসে থমকায়, দরজা ভেতর দিয়ে লক্।
ঘড়ি দেখে আটটা, শমিত কি ডুপ্লিকেট চাবি পেয়ে গেছে? শমিত ফিরে এসে একবার তো ওকে ফোন করতে পারত! আহেলী দরজা খোলে, ‘শমিত…।’
কোনো সাড়া শব্দ নেই কেন। হাতের ব্যাগটা টেবিলে রাখে, জানলার সামনে রাখে তিয়াসের দেওয়া উপহার।
‘শমিত…আছো?’
বেডরুমের দরজাটা খোলে আস্তে করে, শমিত বসে আছে বিছানায়, শমিতের মুখ দেখতে পায় না আহেলী। লোকটা অফিস থেকে ফিরেও ল্যাপটপে মুখ গুঁজেছে, আহেলী বুঝে উঠতে পারেনা কতটা রাগ করা যায়।
সারাদিন কেবল কাজ নিয়ে থাকলে হয়! অথচ মুখ ফুটে আহেলী বলে উঠতে পারল না কিছু, বলেই বা লাভ কী, অপর প্রান্ত থেকে উত্তর আসলে তো! আহেলী কানের দুল আর হাতঘড়ি ড্রেসিং টেবিলের উপর খুলে রাখে। আহেলীর চা খেতে ভালো লাগছিল না, মনে হচ্ছিল কলেজের পুরনো বান্ধবীর সাথে কাটানো মুহূর্তর স্বাদ নষ্ট হয়ে যাবে। তবু দু’কাপ চা বানায় ও, সাঁ- সাঁ শব্দ করে জলটা ফুটলেই চা-পাতা দিয়ে নামিয়ে নেওয়া, সাদা জলে রং ধরছিল আস্তে আস্তে।
‘শমিত চা…’ কাপটা পাশে রাখে আহেলী।
শমিত কথা বলে না, ল্যাপটপের দিকে স্থির হয়ে বসে, আহেলী শমিতের মুখ দেখে চমকে ওঠে, ‘এই কী হয়েছে তোমার?’
শমিত উত্তর করে না, যেন ওর শেষ ভাষাটুকু কেউ ছিনিয়ে নিয়েছে। ‘শমিত… কী হয়েছে বল!’
শমিতের চোখ লাল, দৃষ্টি এলোমেলো, নাহ্ , ড্রিঙ্ক করলে আহেলী গন্ধ পেতো। আহেলী বিছানায় উঠে এসে পাশে বসে শমিতের।
‘শমিত…’ মাথায় হাত রাখে আহেলী।
‘অ্যা’ম সরি আহেলী, অ্যা’ম রিয়েলি সরি।’
শমিত আহলীর বুকে শিশুর মতন মাথা রাখে, একটা দীর্ঘশ্বাস যেন দূরের অস্ত যাওয়া পাহাড়ের গুহা থেকে বেরিয়ে আসছে।
‘আহেলী, আমার কাছ থেকে ওরা প্রজেক্টটা নিয়ে নিল! দিনরাত খেটে আমি প্রপোজাল তৈরী করেছি, ক্লায়েন্টের কাছে বসে থেকেছি কেবল অর্ডারটা তুলব বলে! আর আজ যখন ডিলটা ফাইনাল হলো, ওই বাস্টার্ড সান্যাল বললো কিনা, আমি পার্টি হ্যন্ডেল করতে পারি না!’
‘আহ্! শান্ত হও প্লিজ। তুমি চিন্তা করো না, সব ভালো হবে।’
‘কিচ্ছু ভালো হবে না, কিচ্ছু ভালো হচ্ছে না।’
‘সব কিছুর জন্য সময় দেওয়াটা প্রয়োজন, শমিত!’
‘সরি! মনে হচ্ছে কোনোদিন আর খুশির মুখ দেখতে পাব না।’
‘আহ্! শমিত।’
আহেলীর খারাপ লাগছিল শমিতকে কাঁদতে দেখে, আবার ভাল লাগছিল একটা অচেনা মানুষকে দেখতে পেয়ে। না পাওয়ার অতৃপ্তি সবসময়ে বোধহয় ব্যথা দেয় না!
‘আহেলী…’
‘হুম বলো’
‘চাকরিটা আমি আর করতে চাই না।’
বুকের ভেতরটা ধড়াস করে ওঠে আহেলীর, বাবা শমিতকে খুব একটা পছন্দ করে না। তবুও আহেলীর মুখের দিকে চেয়ে কোনোদিন কিছু বলেনি। চাকরিটা শমিত ছেড়ে দিলে, ও আর কিছু ভাবে না, ভাবতে চায় না।
শমিত বহুদিন পর ওকে স্পর্শ করছে, আজ বোধ হয় অহল্যার পাষাণ মুক্তি ঘটবে।
‘আহেলী, আমার মনে হয়েছিল আমাদের বাচ্চাটাকে… তুমি বোধহয় এখনই বাচ্চাটা চাও না, তাই…’
আহেলী স্তব্ধ হয়, মাথার ভেতর সেই নাম না জানা রেলস্টেশন ভেসে ওঠে। ডুকরে কান্না আসতে চায় ভেতর থেকে, তিয়াসের বাগানে অনেক ফুল তবু ওর কোলে কোনো দিন ফুল ফুটবে না।
‘শমিত সন্তানটা আমারও ছিল!’
শমিত দুহাতে আহেলীকে ধরে, আজ আশ্রয় খোঁজার পালা, দুজন দুজনকে আঁকড়ে ধরে তরী ভাসাবে। আহেলী চোখ বোজে, শুনতে পাচ্ছে একটা আওয়াজ দূর থেকে ভেসে আাসছে, রেলগাড়ি আসছে, ফেরা যাবে কি? বুকের ভিতরকার কাঁপুনিটাকে শমিতের শরীরে ডুবাতে চায়।
শমিত অনেকদিন পর আহেলীর শরীরের গন্ধ পায়, জীবনের ছোট ছোট ভুলগুলোকে ভুলিয়ে দেওয়াই ভালো।
চায়ের কাপ উল্টে যায়, চাদরে চায়ের রং লাগতে থাকে, লাগুক ক্ষতি নেই। বাইরের ঘরে রাখা আহেলীর ব্যাগ থেকে কভারে মোড়া ফ্রয়েড উঁকি মারছে। সব কিছু ছাপিয়ে আহেলী গন্ধ পায় তিয়াসের দেওয়া উপহারের। রাত্রি নামছে, হাসনুহানা গন্ধ বিলায়। দুটো মন আজ আবার ব্যস্ত অনেকদিন পর, একটা চারা পুঁতবে ওরা।


লেখকের কথা: অর্পিতা
অর্পিতা কলকাতার বাসিন্দা। নেহাত খেয়াল বশেই একদিন ডায়েরির পাতা থেকে লেখাটা মেইল করে পাঠিয়ে দিয়েছিল পরিচিত বানিজ্যিক ম্যগাজিনে ৷ সেই ছাপার অক্ষরে প্রকাশ পেল অনুগল্প। তারপর খোলা চোখে বাস্তব অভিজ্ঞতায় কখনও কল্পনার আঁচড় মিশিয়ে একের পর এক লেখা প্রকাশ পেল কখনও ফেসবুকের দেওয়ালে কখনও বা লিটিল ম্যগাজিনের পাতায়। কখনও বা প্রকাশিত হল গল্প সংকলনে।

শেয়ার করে বন্ধুদেরও পড়ার সুযোগ করে দিন
  •  
  •  
  •  
  •  

7 Comments

  1. পীযূষ কান্তি দাস

    ভুল বোঝা মানুষকে দূরে ঠেলে দেয় , কিন্তু ভালবাসায় যদি ফাঁকি না থাকে তবে ভুল বোঝার অবসানে রোপণের সাথে ফুল তো ফুতবেই।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।