শাপমোচন

লেখক : শুভাশিস দাস

দেবনারায়ণপুরের প্রসিদ্ধ সিদ্ধিকালী মন্দিরের বাইরে বুড়ো বটতলায় সালিশি সভা বসেছে। শতাব্দীপ্রাচীন বটগাছটির ছায়ায় একটি তক্তপোষের ওপরে মাদুর বিছিয়ে যে কয়েকজন‌‌ বসে, তাঁদের সকলেই উপবীতধারী ব্রাহ্মণ। বাঁ‌দিকে‌ একটি কাঠের বেঞ্চে বসে‌ গ্রামের বাকি মাতব্বররা। একটু দূরে ডানদিকে জটলা করে দাঁড়িয়ে গ্রামের অন্যান্য মানুষ। এদের সবার থেকে আলাদা হয়ে মাটিতে হাঁটু গেড়ে হাতজোড় করে বসে আছে একটি নিরীহ গোবেচারা দেখতে লোক। তার পরনে একটা ময়লা ধুতি, গায়ে জড়ানো একখানি গামছা। তার অপরাধের বিচারের জন্যই আজ এই সভার আয়োজন। লোকটির নাম হারাধন। সে গ্রামের অন্যান্য সম্পন্ন গৃহস্থ বাড়িতে নানা রকম ফাইফারমাশ খাটে। আজ সকালে সে মাধব ঘোষের বাড়িতে গোয়ালঘর সাফ করার কাজ পেয়েছিল। দু’দিন ধরে তার বউয়ের ভারী অসুখ, তাই সে কাজে বেরোতে পারেনি। কিন্তু বাড়িতে বেশিদিন বসে থাকলে গরীবের পেট চলে না, তার ওপর তার একটি পাঁচ বছরের ছোট মেয়ে আছে। তাই বাধ্য হয়েই আজ হারাধনকে কাজে বেরোতে হয়েছিল। ঘোর জ্বরে প্রায় অচৈতন্য স্ত্রীর কাছে মেয়েটিকে একা ছেড়ে যেতে না পেরে সে নিতান্ত বাধ্য হয়েই মেয়েটিকে তার সাথে মাধবের বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিল। মেয়েকে মাধবের বাড়ির উঠোনে এক কোণে বসিয়ে সে যখন গোয়াল ঘর পরিষ্কার করছে, ছোট্ট মেয়ে কখন যে আপন খেয়ালে সেখান থেকে বেরিয়ে গিয়েছে, হারাধন তা জানতেও পারেনি। হঠাৎ চিৎকার চেঁচামেচির আওয়াজ শুনে সে বাইরে বেরিয়ে আসে। মাধব ঘোষের বাড়ির একটু দুরেই পুরুতমশাই অবনী চাটুজ্যের বাড়ি। আর এই রাস্তা ধরে কিছুদূর এগোলেই সিদ্ধিকালী মায়ের মন্দির। নীচু জাত বলে এ মন্দিরে হারাধনের পরিবারের প্রবেশাধিকার নেই। ছোট্ট মেয়েটিকে দু’টি পঞ্চমুখী জবা ফুল নিয়ে খেলা করতে দেখে চাটুজ্যে মশাইয়ের সন্দেহ হয়, যে এই ফুল সে মন্দিরের গাছ থেকে তুলে এনেছে, অর্থাৎ সে মন্দিরপ্রাঙ্গণে প্রবেশ করেছিল। এর ফলে যে কি মহাপাতক সংগঠিত হয়েছে এবং তার পরিণামে যে গ্রামের কতবড় সর্বনাশ ঘটতে পারে, সেই কথাই চাটুজ্যে মশাই আশেপাশে জড়ো হওয়া লোকজনকে বোঝাচ্ছিলেন। তাঁর বলার ভঙ্গি বেশ নাটকীয়, কপালে করাঘাত করে, কাঁপাকাঁপা গলায় তাঁর কথা শুনে সেই ভিড় থেকে “হায় হায়”, “একি সব্বনাশ হল”, “কি অনাসৃষ্টি” ইত্যাদি নানাবিধ মন্তব্য ভেসে আসছিল। ছোট মেয়েটি একবার বলার চেষ্টা করেছিল, যে ফুলদু’টো সে রাস্তার ধার থেকে কুড়িয়ে পেয়েছে। কিন্তু চাটুজ্যে মশাইয়ের এক বিষম ধমক খেয়ে সে তার কথা থামিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে। হারাধন তাড়াতাড়ি গিয়ে তার মেয়েকে নিজের কাছে টেনে নেয়। ছোট্ট শরীরটা কুঁকড়ে যেন হারাধনের শরীরের ভেতরে ঢুকে পড়তে চায়। হারাধন হাতজোড় করে অনেক অনুনয় বিনয় করেও চাটুজ্যে মশাইকে ক্ষান্ত করতে পারেনি। তিনি হারাধানকে তখনই জানিয়ে দেন যে বিকালে সালিশি সভা ডেকে এর বিচার হবে, এবং হারাধন যেন যথাসময়ে সেখানে উপস্থিত হয়।

গরীব, তায় আবার নীচু জাত, তাই হারাধনকে দোষী সাব্যস্ত করতে বিশেষ দেরি হল না। হারাধনের কি শাস্তি হওয়া উচিৎ, সে নিয়ে উপস্থিত মাতব্বররা নানা মত ব্যক্ত করলেন। বিশেষতঃ চাটুজ্যে মশাইয়ের অভিপ্রায় এই যে হারাধনের সাথে তার পঞ্চমবর্ষিয়া কন্যাটিরও যেন উপযুক্ত শাস্তির বন্দোবস্ত হয়। এই নীচু জাতগুলিকে তিনি দু’চক্ষে দেখতে পারেন না। শাস্তি কি হওয়া উচিৎ, এই নিয়ে আলোচনা যখন প্রায় তর্ক-বিতর্কে পরিণত হয়েছে, এমন সময় তক্তপোষের উপর উপবিষ্ট ব্রাহ্মণদের মধ্যে থেকে একটি গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে আসতেই সব কোলাহল একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেল। এই কণ্ঠস্বরের মালিক এ গ্রামের ব্রাহ্মণশ্রেষ্ঠ হরিচরণ তর্কালঙ্কার মশাই – হরি’ঠাকুরের নাম আশেপাশের দশ গ্রামে  সবাই জানে। তাঁর দীর্ঘ দেহ, বলিষ্ঠ গড়ন, গায়ের রং ঈষৎ তামাটে, চোখের দৃষ্টি অন্তর্ভেদী, তীক্ষ্ণ নাক-মুখে প্রখর ব্যক্তিত্বের ছাপ স্পষ্ট। তিনি সিদ্ধিকালী মন্দিরের প্রধান পুরোহিত। শাস্ত্রের কঠিন অনুশাসন মেনে চলা এই মানুষটিকে গ্রামের সবাই অত্যন্ত সমীহ করে। এই ধরনের সালিশি সভাতে তাঁর কথাই শেষ কথা, তাঁর বিধান অলঙ্ঘনীয়। জলদগম্ভীর স্বরে তিনি জানালেন হারাধানের শাস্তি এই, যে ওই দুটি ফুল তাকে খালি পায়ে হেঁটে গিয়ে ব্রহ্ম সরোবরে বিসর্জন দিতে হবে, এবং গ্রামে ফিরে মাথা কামিয়ে, দেবীর মন্দিরের চতুর্দিকে নাকে খত দিয়ে প্রদক্ষিণ করে প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। যতদিন না এই কাজ সম্পূর্ণ হচ্ছে, ততদিন হারাধন এ গ্রামে কোন বাড়িতে কাজ করতে পারবে না। ব্রহ্ম সরোবর দেবনারায়ণপুর থেকে প্রায় পনেরো ক্রোশ পথ, পায়ে হেঁটে সেখানে গিয়ে একদিনে ফিরে আসা অসম্ভব। হারাধন এবার একেবারে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে কাঁদতে কাঁদতে দু’টি দিনের সময় ভিক্ষা করল। ঘরে তার গৃহিণী রোগে শয্যাশায়ী, এ অবস্থায় ছোট মেয়েটিকে সে কার ভরসায় দু’দিন ছেড়ে যাবে! তাছাড়া ঘরে তার এক কণা চাল নেই, আজ মাধবের বাড়ি কাজ করে যা উপার্জন হবে, তাই দিয়ে সে তার পরিবারের মুখে দু’টি ভাত তুলে দিতে পারবে ভেবেছিল। দু’টি দিন সময় পেলে সে মাধবের বাড়ির কাজ সেরে, একটু চালের ব্যবস্থা করতে পারে, আর এর মধ্যে তার বউও খানিক সুস্থ হয়ে গেলে সে মেয়েকে নিশ্চিন্তে বাড়িতে ছেড়ে যেতে পারবে। কিন্তু তার কোন কাকুতি মিনতি হরি’ঠাকুরের পাষাণ হৃদয় এতটুকু আর্দ্র করতে পারল না। ভাবলেশহীন মুখে তিনি জানালেন যে একবার যে বিধান তাঁর মুখ দিয়ে উচ্চারিত হয়েছে, তার কোন নড়চড় হওয়া অসম্ভব। এই বলে তিনি সন্ধ্যারতির জন্য মন্দিরের দিকে প্রস্থান করলেন।

গ্রামের বর্তমান জমিদার শশধর রায়ের প্রপিতামহ স্বর্গীয় শ্রী হলধর রায় প্রায় একশ বছর আগে দেবীর এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। দেবী সিদ্ধিকালী সচরাচর গৃহে পূজিতা হন না, তিনি গৃহত্যাগী সাধকের আরাধ্যা। হরিচরণের পিতামহ জ্ঞানদাচরণ তর্কালঙ্কার ছিলেন মহান সাধক। জমিদার হলধর রায়ের ওপর কোন কারণে বিশেষ প্রীত হয়ে, তিনি জমিদার বংশের মঙ্গলার্থে দেবীকে এই মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। শোনা যায়, যে এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠার পর থেকেই রায় পরিবারের মর্যাদা ও প্রতিপত্তি বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। সেই থেকে তর্কালঙ্কার পরিবার বংশানুক্রমে সিদ্ধিকালী মন্দিরের প্রধান পুরোহিত। জমিদার শশধর রায় হরি’ঠাকুরকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করেন, এবং ধর্মের বিষয়ে তাঁর যেকোন উপদেশ মেনে চলেন। সালিশি সভায় হরি’ঠাকুরের কথাই যে শেষ কথা, তার অন্যতম কারণ এই যে গ্রামের সবাই খুব ভাল করে জানে, যে স্বয়ং জমিদারমশাইও হরি’ঠাকুরের মতের বিরুদ্ধে কোন কথা বলবেন না। দেবী সিদ্ধিকালীর মন্দিরের গর্ভগৃহে পৌঁছে হরি’ঠাকুর তাঁর সহকারী দিনু ঠাকুরকে বিশেষ কিছু উপকরণ সংগ্রহ করার দায়িত্ব দিলেন। মন্দিরে আজ যে অশুদ্ধতার স্পর্শ লেগেছে, তার প্রতিকারে তিনি আজ মধ্যরাত্রে এক বিশেষ যজ্ঞ করবেন। দেবী বড়ই জাগ্রত, এবং কুপিত হয়ে তিনি যদি সংহারমূর্তি ধারণ করেন, তাহলে গ্রামের সমূহ বিপদ দেখা দেবে। তাই এই যজ্ঞ যতক্ষণ না সুসম্পন্ন হচ্ছে, ততক্ষণ তাঁর স্বস্তি নেই। দিনু ঠাকুর প্রস্থান করলে হরি’ঠাকুর সন্ধ্যারতির প্রস্তুতি করতে লাগলেন। মাত্র তিন বছর বয়স থেকে বাপ-ঠাকুরদার সাথে এই আরতি করতে তিনি রোজ মন্দিরে আসছেন, গত সাতচল্লিশ বছরে একদিনও এর অন্যথা হয় নি। শুদ্ধ মনে, শুদ্ধাচারে মায়ের পূজায় যখন তিনি বসেন, শুদ্ধ সংস্কৃত উচ্চারণে তাঁর কণ্ঠ থেকে নির্গত মন্ত্রগুলি তখন যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে। মায়ের পূজা করার জন্য যে তিনিই একমাত্র যোগ্য ব্যক্তি, সে কথা সকলে একবাক্যে স্বীকার করে। সেই গৌরব, পঞ্চপ্রদীপের আলোর সাথে মিশে গিয়ে তাঁর মুখে প্রতিফলিত হয়। পূর্বপুরুষের কত পূণ্য থাকলে, কত কঠোর অনুশাসনে নিজেকে বেঁধে দেহ এবং মনের শুদ্ধি অক্ষুণ্ণ রাখলে দেবীকে পূজা করার অধিকার পাওয়া যায়, সে কথা তিনি সহস্রবার দিনু ঠাকুরকে শুনিয়েছেন। দিনু ঠাকুরের ভাল নাম দীননাথ ভট্টাচার্য। নাতিদীর্ঘ, গৌরবর্ণ, সাত্ত্বিক, সদাচারী এই মানুষটিকে গ্রামের সকলেই অত্যন্ত ভালবাসেন। শান্তস্বভাব মানুষটি বড়ই কোমল হৃদয়, মানুষ এমনকি পশুপক্ষীরও কোন দুঃখ দেখলে তিনি অত্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়েন। সন্ধ্যারতি সম্পন্ন হলে নির্জন মন্দিরপ্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে থাকা হরি’ঠাকুরকে তিনি হারাধনের শাস্তির বিষয়টা আর একবার বিবেচনা করতে অনুরোধ করলেন। সন্ধ্যরতির পরের এই কোলাহলবিহীন একান্ত সময়টুকু হরি’ঠাকুরের বড়ই প্রিয়। এই নির্জন মন্দির প্রাঙ্গণ, এই জাগ্রত দেবীপ্রতিমা, প্রদীপের অনির্বাণ শিখা, মন্দিরের উন্নত চূড়া – এই সব মিলে তাঁকে সনাতন ধর্ম ও হিন্দুশাস্ত্রের মহানতার উপলব্ধি প্রদান করে। এই সময়ে দিনু ঠাকুরের এই অনুরোধ তাঁর একান্ত চিন্তায় ছেদ ঘটাল। তিনি একাধারে বিরক্ত এবং ক্রুদ্ধ হলেন। এমনিতে এই মিতভাষী, সদাহাস্যময় ব্রাহ্মণ তাঁর অতি প্রিয়পাত্র। মানুষটির শাস্ত্রের জ্ঞানও অসাধারণ। কিন্তু তাঁর এই দুর্বলচিত্তের জন্যে বহুবার হরি’ঠাকুর তাঁকে ভর্ৎসনা করেছেন। দেহ, মন এবং আরাধ্য দেবতার শুচিতা রক্ষা ব্রাহ্মণের অন্যতম কর্তব্য, এবং সে কর্তব্যে কঠোর হওয়া ব্রাহ্মণের জন্য আবশ্যক – এই হরি’ঠাকুরের জীবনের নীতি। ধর্মের শুদ্ধতা রক্ষা করার জন্যই বিধাতা ব্রাহ্মণের সৃষ্টি করেছেন, এবং এই কর্তব্যে বিন্দুমাত্র বিচ্যুতি ঘটা তাঁর কাছে জাত যাবার সমান অপরাধ। বেঁচে থাকতে তিনি তা কিছুতেই ঘটতে দিতে পারেন না। কোন মানুষ যদি এমন কাজ করে যাতে ব্রাহ্মণ অথবা দেবতার গ্লানি ঘটে, তবে কঠোর প্রায়শ্চিত্তই সেই পাপের একমাত্র প্রতিকার। সেই প্রায়শ্চিত্ত না করলে তার একমাত্র শাস্তি হ’ল জাতিচ্যুতি। তাঁর দেওয়া প্রায়শ্চিত্তের বিধান না মানায় এর আগে অনেককেই তিনি একঘরে করেছেন, এবং প্রয়োজনে আবার সে কাজ করতে তিনি যে পিছপা হবেন না, এ কথা মৃদু ভর্ৎসনার সাথে তিনি দিনু ঠাকুরকে জানিয়ে দিলেন। শুনে দিনু ঠাকুর নীরবে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

ঘরে ফিরে হারাধন দেখল তার স্ত্রীর অবস্থার আরও অবনতি হয়েছে। সকাল থেকে পুরো পরিবারের পেটে এক কণা খাবার পড়েনি। মেয়ে এবং স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে হারাধনের চোখ জলে ভরে এল। এ অবস্থায় দু’দিন পরিবারকে ফেলে যাওয়া মানে তাদের সম্ভাব্য মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া, অথচ না গেলে যে তাকে একঘরে হতে হবে, তা নিশ্চিত। একঘরে হলে হারাধন আর এই গ্রামে কোন কাজ পাবে না, অথচ এই গ্রাম ছাড়া তার আর কোন মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই। বিনা অপরাধে ভাগ্যের এই নিষ্ঠুর পরিহাস হারাধনকে সহ্যের শেষ সীমায় এনে দাঁড় করাল। আকাশের পানে চেয়ে সম্ভবত তার ভাগ্যবিধাতাকে উদ্দেশ্য করেই সে একবার বুকফাটা চিৎকার করল। তারপর ধীরে ধীরে তার চোয়াল কঠিন হয়ে উঠল। যৎসামান্য তার যা কিছু ছিল, সব একটি কাপড়ের পুঁটলিতে জড়িয়ে সে তার পিঠে বাঁধল। রাতের গভীর অন্ধকারে প্রায় অচৈতন্য স্ত্রীকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে সে বেরিয়ে পড়ল, সঙ্গে তার সারাদিন অভুক্ত ও ক্লান্ত পাঁচ বছরের মেয়ে। যে পথে সে পা বাড়াল, তা যেমন অনিশ্চিত, তেমনই ঝুঁকির। কিন্তু এছাড়া আর কোন উপায় তার জানা ছিল না। ধীরে ধীরে গ্রামের সীমানা ছাড়িয়ে, প্রায় আধ ক্রোশ দূরে হাঁড়িয়ার জঙ্গলে যখন সে প্রবেশ করল, তখন তার শরীর পথশ্রমে ক্লান্ত, অবসন্ন। ক্লান্তিতে সেখানেই একটি গাছের তলায় স্ত্রীকে শুইয়ে দিয়ে, মেয়েকে বুকে জড়িয়ে সেখানেই সে বসে পড়ল। ঠিক সেই সময় তার গলার কাছে একটা ধাতব ঠান্ডা স্পর্শ পেয়ে সে চেয়ে দেখল যে তিনজন ভীষণদর্শন লোক হাতে বর্শা নিয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। একজন ডাকাত পিছমোড়া করে হারাধনকে বেঁধে নিয়ে চলল, আর বাকি দু’জন তার মেয়ে আর বউয়ের পাহারায় রইল।

হাঁড়িয়ার জঙ্গল বড় ভয়ানক স্থান। দিনের বেলাতেও প্রাণ থাকতে কেউ সেমুখো হয় না। বুনো জানোয়ারের ভয় তো আছেই, তার ওপর এ জঙ্গলে নাকি নানা ভৌতিক উপদ্রবও আছে। তবে এসব ছাপিয়েও যে ত্রাস গত কয়েক বছর এই জঙ্গলকে মানুষের অগম্য করে তুলেছে, তার নাম আদ্যা বাগদি। আদ্যা এই গ্রামেরই মেয়ে ছিল। অন্য জাতের একটি ছেলেকে ভালবেসে সে বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। সেই অপরাধে হরি’ঠাকুর তার পরিবারকে একঘরে করেন। তার বুড়ো বাবা-মা এই কষ্ট সহ্য না করতে পেরে কয়েক মাসের মধ্যেই ইহলোক ত্যাগ করেন। এদিকে বছর ঘুরতেই আদ্যার স্বামী কোন এক অজানা রোগে মাত্র দু’দিনের জ্বরে মারা যায়। তার স্বামীর তিনকুলে কেউ ছিল না। তাই সে নিজের গ্রামে ফিরে আসে। এদিকে হরি’ঠাকুরের বিধানে দেবনারায়ণপুরে আদ্যার প্রবেশ নিষিদ্ধ। অসহায় মেয়েটি কোন উপায় না পেয়ে দিশাহীনভাবে গ্রাম ছেড়ে উল্টো পথে চলতে থাকে। তারপর তার ঠিক কী হয়েছিল কেউ জানে না। অনেকে বলে সে নাকি হাঁড়িয়ার জঙ্গলে ডাকাতের হাতে পড়ে। তারপর যে কোন ঘটনাপ্রবাহে সেই মেয়েটি আজকের দুর্ধর্ষ ডাকাতরাণী আদ্যা বাগদি হয়ে উঠল, সে কথা কেউই ঠিক বলতে পারে না। হাঁড়িয়ার জঙ্গলের কাছেই একটি পরিত্যক্ত শ্মশান আছে। শোনা যায়, কোন মানুষ তার হাতে ধরা পড়লে আদ্যা তাদের সেই শ্মশানকালীর মন্দিরে নিজের হাতে নরবলি দেয়। তাই দেবীর বরে সে নাকি মানুষের অবধ্য। আজ অবধি কোন ডাকাতি করতে গিয়ে তার গায়ে আঁচড়টিও লাগেনি। দশ জোয়ান লাঠিয়ালের মহড়া একাই নিতে পারে, দেবীর বরে এমনই তার ক্ষমতা! লোকে এও বলে যে সে নাকি প্রতিজ্ঞা করেছে, একদিন সে হরি’ঠাকুরকে দেবীর চরণে বলি দেবে।

এদিকে পরদিন সকালে গাঁয়ের লোক দেখল যে হারাধনের ঘর ফাঁকা। এরপর হারাধনের বা তার পরিবারের কি হ’ল, তা আর কেউ জানতেও পারল না। এমন করে আরও এক বছর কেটে গেল। হঠাৎ দেশে এক নতুন বিপদ উপস্থিত হ’ল। দুই ধর্মের লোক, যারা এতকাল একসাথে শান্তিতে বাস করে এসেছে, হঠাৎ তারা একে অপরের রক্তপিপাসু হয়ে উঠল। এই বিপদের ঢেউ একদিন দেবনারায়ণপুরেও এসে পৌঁছল। একদিন খবর এল, যে আগামী চতুর্থীর রাতে দুষ্কৃতীরা দেবনারায়ণপুরে হামলা করার পরিকল্পনা করেছে। পুরো গ্রামের লোকজনকে একা তাঁর পক্ষে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব নয় বুঝে বুদ্ধিমান শশধর রায় গ্রামের সমস্ত মানুষকে দুই ক্রোশ দূরে তাঁর বন্ধু এক জমিদারের গ্রামে এক রাতের জন্য আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দিলেন, আর চতুর্থীর দিন নিজের বাড়ির চারিদিকে কড়া পাহারার ব্যবস্থা করলেন। সমস্যা বাধল হরি’ঠাকুরকে নিয়ে। তিনি কিছুতেই দেবীর পূজা বন্ধ রেখে অন্যত্র যেতে রাজি হলেন না। অগত্যা জমিদার মশাই তাঁর সুরক্ষার জন্য দু’জন পাহারাদার নিযুক্ত করলেন, এবং সন্ধ্যারতি শেষ হওয়া মাত্র তাঁকে জমিদারগৃহে চলে আসতে বললেন। দিনু ঠাকুর এই দুর্দিনে হরি’ঠাকুরকে কিছুতেই একা ছেড়ে যেতে পারলেন না। তিনিও রয়ে গেলেন। সেদিন সন্ধ্যায় জমিদারগৃহ ছাড়া গ্রামে জনপ্রাণী নেই, শুধু মন্দিরে দুই প্রবীণ পূজারী প্রাত্যহিক পূজার আয়োজনে রত, সঙ্গে দুই প্রহরী। এমন সময় দূর থেকে হামলাকারীদের কোলাহল ভেসে আসল। প্রহরী দু’জন ঠাকুরমশাইদের অবিলম্বে মন্দির ছেড়ে জমিদারগৃহে যাবার জন্য অনুরোধ করল, কিন্তু হরি’ঠাকুর আরতি না সেরে কিছুতেই মন্দির ছাড়বেন না। প্রহরীরা এই একগুঁয়ে ব্রাহ্মণের প্রাণরক্ষা অসম্ভব বুঝে নিজেদের প্রাণ বাঁচানোর জন্য জমিদারবাড়ির দিকে রওনা দিল। দেবীর আরতি যখন শেষ হল, ততক্ষণে হামলাকারীরা মন্দিরের থেকে আর মাত্র দু’শো হাত দূরে। তাদের না আছে ধর্ম, না আছে জাত, অর্থই তাদের একমাত্র আরাধ্য দেবতা। অর্থের বিনিময়ে তারা আপন ভাইয়ের প্রাণ নিতেও দ্বিধা করে না। জমিদারবাড়ি আর মন্দিরের মাঝখানের রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে সেই নরপিশাচের দল। উপায়ান্তর না দেখে দুই ব্রাহ্মণ চুপিসারে উল্টো পথ ধরলেন, কিন্তু হামলাকারীরা তাদের দেখে ফেলল। প্রায় দশজন লোক লাঠি হাতে তাঁদের পিছু নিল। প্রাণভয়ে দুই ব্রাহ্মণ দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে এবার গ্রামের সীমানা ছাড়িয়ে দৌড়তে শুরু করলেন সেই দিকে, যে পথে এগোলে পড়বে সেই ভয়ানক হাঁড়িয়ার জঙ্গল। এতটা পথ দৌড়ে তাঁরা ক্রমশ ক্লান্ত হয়ে পড়ছিলেন, ফলে হামলাকারীদের সাথে তাঁদের দূরত্ব কমতে লাগল। রক্তপিপাসু হায়নার দল শিকার বাগে আসতে চলেছে বুঝতে পেরে তাদের গতি আরও বাড়িয়ে তুলল। দু’শো হাতের দূরত্ব কমতে কমতে এখন মাত্র বিশ হাতে এসে ঠেকেছে। হঠাৎ একজন হামলাকারী একটা লাঠি হরি’ঠাকুরকে লক্ষ্য করে ছুঁড়ে মারল। শক্ত কাঠের লাঠি সজোরে উড়ে এসে হরি’ঠাকুরের মাথায় আঘাত করল। আর্তনাদ করে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। উষ্ণ রক্তের ধারা তাঁর শরীর বেয়ে গড়িয়ে শুকনো মাটিকে ভিজিয়ে দিল। দিনু ঠাকুর তাঁকে জড়িয়ে ধরে নিজের শরীর দিয়ে তাঁকে আড়াল করলেন। এমন সময় হঠাৎ জঙ্গলের দিক থেকে এক হাড় কাঁপানো চিৎকার শোনা গেল। হরি’ঠাকুর মাটিতে শোওয়া অবস্থায় দেখতে পেলেন জঙ্গলের ভিতর থেকে কালান্তক যমের মত তাঁদের দিকে ধেয়ে আসছে এই অঞ্চলের ত্রাস – ডাকাতরাণী‌ আদ্যা বাগদি। তিনি সভয়ে‌ ইষ্টদেবতাকে স্মরণ করলেন। আজ তাঁর কোন রক্ষা নেই, একদিকে ভাড়াটে খুনীর দল আর অন্যদিকে তাঁকে বলি দিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ এক পিশাচিনী। মাথার চোটের থেকে হওয়া রক্তক্ষরণ তাঁকে ক্রমশ দুর্বল করে দিচ্ছিল, দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছিল, চেতনা হারানোর পূর্বে তিনি শুধু দেখলেন সেই ভয়ালদর্শন নারীমূর্তি, উন্মুক্ত খড়্গহস্তে তাঁর দিকে ধাবিত।

শাস্ত্রবিদ পণ্ডিত হরিনারায়াণ তর্কালঙ্কার বুঝতে পারেন না যে তিনি জীবিত না মৃত! অবচেতনে তিনি শুধু তাঁর আরাধ্যা দেবীকে দেখতে পান। দেবী কখনও বা উগ্রচণ্ডা সংহারকারিণী মূর্তিরূপে প্রকট হন, আবার কখনও স্নেহময়ী জননীর বেশে দেখা দেন। এ কি স্বপ্ন, নাকি বাস্তব, নাকি ভূলোক ছেড়ে তিনি অন্য কোন লোকে পৌঁছে গিয়েছেন, কিছুই তিনি বুঝতে পারেন না। অবশেষে একদিন তাঁর চোখ খুললে তিনি দেখলেন দিনু ঠাকুর তাঁর সামনে বসে আছেন। হরি’ঠাকুর উঠে বসার চেষ্টা করতেই দিনু ঠাকুর শশব্যস্ত হয়ে তাঁকে ধরে আবার শুইয়ে দিলেন। স্মিতহেসে তিনি হরি’ঠাকুরকে জানালেন যে আজ পাঁচদিন পরে তাঁর জ্ঞান ফিরেছে। এই পাঁচদিন তিনি শুধু বিকারগ্রস্ত রোগীর মতো প্রলাপ বকেছেন, এবং বারংবার দেবী কালীকে স্মরণ করেছেন। হরি’ঠাকুর তখন গত পাঁচদিন তিনি অবচেতনে যা প্রত্যক্ষ করেছেন, সেই কথা দিনু ঠাকুরকে জানালেন। দিনু ঠাকুরের মুখে একটু রহস্যের হাসি দেখা দিল। তিনি বলতে শুরু করলেন –

“ঠাকুর, তুমি তো সেদিন অজ্ঞান হয়ে পড়লে, আর আমি যা দেখলাম তার কল্পনাও কোন মানুষের পক্ষে করা সম্ভব নয়। আদ্যা মা যেন দেবী চামুণ্ডার মত রণক্ষেত্রে রক্তবীজ নিধনে এসেছেন। ওই এক মেয়ে একলা অতগুলো জোয়ান পুরুষকে ছত্রভঙ্গ করে দিল। কয়েকজন শয়তান মায়ের খাঁড়ার আঘাতে সেখানেই ভবলীলা ত্যাগ করল, আর কয়েকজন এমন‌ প্রচণ্ড মারের পর‌ সম্ভবত সারাজীবন আর কখনও হাতে অস্ত্র তুলতে পারবে না। বাকি অল্প কয়েকজন মায়ের সেই ভীষণ মূর্তি দেখে ভয়েই চম্পট দিল। মা আমাকে তখন অভয় দিয়ে সেখানেই অপেক্ষা করতে বললেন, আর কিছুক্ষণ পরেই তার লোকেরা সেখানে একটি দোলা নিয়ে হাজির হল। সেই দোলায় করে অতি যত্নে সে তোমায় এখানে জঙ্গলের ভেতরে নিয়ে এল। সেই দিন থেকে আজ পর্যন্ত যে পরম মমতায় সে তোমার সেবা করল, তা একমাত্র কোন মা তার সন্তানের জন্য করতে পারে। সে শুধু তোমার প্রাণরক্ষাই করেনি গো ঠাকুর, সে তোমাকে নতুন জীবনও দিয়েছে। এই পাঁচদিন ঘোরের মধ্যে তুমি আদ্যা মাকেই দেখেছ গো ঠাকুর, অন্য কাউকে নয়।” হরি’ঠাকুর সব শুনলেন, কিন্তু মুখে কিছুই বললেন না। শুধু চোখের ইশারায় দিনু ঠাকুরকে আদেশ করলেন, তাঁকে ধরে ঘরের বাইরে নিয়ে যেতে। ঘরের বাইরে বেরিয়ে তিনি দেখলেন হারাধন আর তার বউ মিলে রান্নার আয়োজন করছে, আর ছোট্ট মেয়েটা জঙ্গলের গাছ থেকে অনেকগুলো ফুল তুলে সুন্দর করে আদ্যা বাগদির পায়ের কাছে সাজিয়ে রাখছে। দুর্বল শরীর নিয়ে অতিকষ্টে শুধুমাত্র মনের জোরে ভর করে হরি’ঠাকুর আদ্যা বাগদির সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। আদ্যা তাঁর দিকে তাকিয়ে একবার দেখল আর তারপর বলল –

“কি ঠাকুর, এ যাত্রা বেঁচে গেলে তাহলে! তবে ভেব না যে আদ্যা বাগদি সব কথা ভুলে গিয়েছে। এবারে তোমায় কিছু করব না, কারণ অসহায় মানুষের আমি কোন ক্ষতি করি না। কিন্তু একদিন তোমাকে ঠিক সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় তোমার গ্রাম থেকে তুলে আনব। শুনেছ তো নিশ্চ়ই, যে মায়ের কাছে আমি কি প্রতিজ্ঞা করেছি? এখন যাও, নিজের ঘরে গিয়ে প্রায়শ্চিত্ত কর। আদ্যা বাগদির ঘরে এতদিন থাকতে হল, প্রায়শ্চিত্ত না করলে তোমার নিজেরই যে জাত যাবে গো ঠাকুর।”

এই বলে আদ্যা হরি ঠাকুরের পানে চেয়ে একবার তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল, আর তারপর হারাধনের মেয়েকে কোলে নিয়ে তার গালে একটা চুমু দিল। হঠাৎ হরি’ঠাকুর এক আশ্চর্য কাণ্ড ঘটালেন। হাঁটু গেড়ে সেখানেই আদ্যা বাগদির পায়ের কাছে মাটিতে বসে পরে, তাঁর শীর্ণ হাতদু’টি বাড়িয়ে আদ্যা বাগদির হাত দু’টির ওপর রাখলেন। আজ তিনি সত্যিই জাত খুইয়েছেন। জাতপাতের অভিশাপ থেকে আজ তিনি মুক্তি পেয়েছেন। সেই মুক্তির আনন্দধারা দু’চোখ বেয়ে ঝরে পড়ে তাঁর দেহ, মন, আত্মা সব শুদ্ধ করে দিতে লাগল।


লেখক পরিচিতি : শুভাশিস দাস
তথ্য প্রযুক্তি সংস্থায় কর্মরত। অবসর সময়ে বাংলা সাহিত্যের চর্চা। অন্তর্জালেই লেখালিখি - বিভিন্ন পেজ, গ্রুপ বা ওয়েবজিনে। প্রিয় লেখক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, প্রিয় উপন্যাস শ্রীকান্ত। মূলতঃ গল্প ও উপন্যাস লিখলেও, অল্প সংখ্যক কবিতাও লিখেছি। তবে নিজেকে কবি না বলে লেখকই বলব।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।