স্নেহ

লেখক : দেবাত্রেয়ী গুহ(দেবী)

-“ঘটি বাড়ির মাইয়া, ওই কতগুলো চিনির সিরা বানানো ছাড়া কি শিখছস রে? থু থু, তুই খা এই খাবার।”
-“জন্ম সময় তো মা তোমার মুখে মধু দেয় নি। তাই কাঁটা তার পার করে যখন এখানে এসেই পড়েছ তখন না হয় মুখে একটু মিষ্টি দিলাম, ঝগড়াটে বুড়ি।”
-“আমার বাপের ভিটা তুলে কথা কইবি না, কি দেখে যে আমার ওই রামছাগলটা তর মতো একটা গা জ্বালানিরে পছন্দ কইরা আনছিল জানি না, মর মর ওলাউঠায় মর, বিষ খাইয়া তুই মর।”

নিত্যকালী ও তাঁর একমাত্র ছেলের বউ রিতার এই রোজকার ঝগড়া অশান্তিতে এই বাড়িতে কাক চিল বসতেও ভয় পায়। পাড়ার লোকও অতিষ্ঠ হয়ে সুবিনয়কে বলেছে বউকে নিয়ে অন্য জায়গায় থাকতে। তাহলে অন্তত তারা একটু রেহাই পায় এই আর কি!

সুবিনয় অত্যন্ত গো-বেচারা একজন ছেলে! মা ও বউ দুজনকেই বিভীষিকা লাগে তাঁর। অফিসের ডিউটির সময় আরও বাড়িয়ে দিলে সে কালীঘাটে মা কে সন্দেশ দেবে এই মানসিক কম করে ছাপ্পান্ন বার করেছে, কিন্তু মাও যে মুখ তুলে তাকায় না। সুবিনয় অত্যন্ত বিনয়ের সাথে মায়ের ঘরে ঢোকে। রিতাকেও একটু চা দেওয়ার বাহানায় ডেকে নেয় সেই ঘরে। তারপর মিনমিনে কণ্ঠে দুজনকে উদ্দেশ্য করে বলে- তোমাদের নামে পাড়ায় প্রচুর নালিশ আসছে, সবার দুপুরের ঘুম, সন্ধ্যার সিরিয়াল তোমরা নষ্ট করে দিচ্ছ, মানে পাড়ার লোকজন বলেছে। তাই রিতা, তোমায় তোমার বাবার বাড়ি পাঠিয়ে দেব। সাড়ে তিনদিন আমি এখানে মার কাছে আর সাড়ে তিনদিন তোমার কাছে…

“হতভাগা রামছাগল, পাড়ার লোক তরে খাওয়ায় না পড়ায়?” ধমকে ওঠে নিত্যকালি!

“আমায় বাড়ি ছাড়া করে পাশের বাড়ির মিনতি বৌদির সাথে গালগল্প করবে, আমি এই বাড়ি ছেড়ে এক পাও যাব না, এটা আমার শ্বশুরের ভিটা…”, গর্জে ওঠে রিতা।

ভয়ে ভয়ে কালীঘাটের মাকে দুই বাক্স মিষ্টির মানত করে ঘর থেকে তখনের মতো পালিয়ে বাঁচে রামছাগল ওরফে সুবিনয়।

-“দেখেছ মা কেমন জ্বলন এই পাড়ার লোকগুলোর?”
-“সে আর কইতে! সব তো ঘটি বাড়ির বেহায়ার দল।”
-“তাঁর সাথে কাঁটা তার টপকানো তারকাটাও আছে।”
মর মর ওলাউঠায় মর…….আবার, বারবার, প্রতিবার …

হঠাৎ একদিনের জ্বরে নিত্যকালীর মৃত্যু হয়।

হাপুস নয়নে কেঁদে চলেছে রিতা। পাশের বাড়ির মিনতি বৌদি বলে, ভালোই হয়েছে বুড়ি মরেছে। যা জ্বালিয়েছে তোমায়! কান্না থামিয়ে কটমট চোখে মিনতি বৌদির দিকে তাকিয়ে রিতা বলে, এমনিতেই ঝগড়ুটে বলে সুনাম আছে। কিন্তু আমি যে মারতেও পারি, সুবিনয় বলেনি বৌদি? কথা না বাড়িয়ে ওখান থেকে পালিয়ে বাঁচে মিনতি বৌদি। অপরদিকে হরিপ্রিয়া যে কিনা বয়সে প্রায় নিত্যকালিরই সমান সে কেঁদে কেঁদে আকুল। দিদি গো, এই জন্মে তো সুখ পেলে না! ওই ঘর জ্বালানি বউ-এর যন্ত্রণায় কত না কষ্ট পেয়ে তোমায় চলে যেতে হলো, দিদি গো….সপাটে গালে একটা চড় এসে পড়ল হরিপ্রিয়ার! বাবা গো ভূত…বলে কান্না থামিয়ে দৌড়।

শ্রাদ্ধ শান্তি শেষ। সুবিনয়ও অফিসে যায়। রিতা এই কদিনে কেমন শুকিয়ে গেছে, মনমরা হয়ে থাকে সারাদিন। শুনশান বাড়িতে একটা কাক এসে একনাগাড়ে ডেকে চলেছে।

“হতভাগী, মরছি বলে কি তর হাতির পাঁচ পা গজায়েছে! নে নে, ঝাল ঝাল করে একটু শুঁটকি রাঁধ তো।”
“মরেও শান্তি দিল না আমায়। লোভী বাঙাল বুড়ি! পঁচা মাছ রাঁধি।” বলে হাসি মুখে শুঁটকি মাছ রান্না করে ভাত গুছিয়ে নিত্যকালির ছবির সামনে দিল।
-“ওরে মুখপুরি আগে তুই খা। তোর ওই বিকট রান্না খাইয়া ভূত হইয়া মরনের চেয়ে আগে নিজে খা তারপর তুই বাইচ্চা থাকলে আমি খামু নে।”
ভাত দিয়ে শুঁটকি মাছ খেতে খেতে চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে রিতার।
-“ওরে মা আমার, খাইতে বইয়া অমন করে কান্দে না! দওতে তোর সোয়ামী, ওই রামছাগলের অমঙ্গল হই রে।”
-“বয়ে গেছে আমার কাঁদতে, ঝাল লেগেছে।”
-“কান্দে ক্যানে ঘটি বাড়ির বেহায়া মাইয়া! শাউড়ি মরছে, এবার তুইও মরবি! মর মর, নে মিষ্টি খা।”
শূন্য থেকে দুটো রসগোল্লা এসে পড়ল রিতার পাতে। তবুও জল গড়িয়ে পড়ছে, মা মা মাগো এইভাবেই থেকো তুমি ভূত হয়ে। কথা দিচ্ছি আর ঝগড়া করব না। আমায় ছেড়ে যেও না, আমি মরে যাবো গো মা। কাঁদতে কাঁদতে কথা গুলো বলে রিতা।

কোথাও একটা স্নেহের পরশ মাথায় হাত বুলিয়ে বলে, “ওরে পাগলী, মরনের কথা মুখেও আনবি না আর কোনোদিন, আমি আছি তো তোর সাথে সবসময়।”


লেখক পরিচিতি : দেবাত্রেয়ী গুহ(দেবী)
একজন লেখিকা।বাংলা সাহিত্যে মাস্টার্স এবং বি.এড করেছেন।ভালোবাসা থেকে গল্প ও উপন্যাস লেখেন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।