শিমাচলমে নৃসিংহ দর্শন

লেখক: সুদীপ্ত আচার্য্য

প্রকৃতির হাতছানিতে সৌন্দর্যের আকর্ষণে কিংবা ভক্তির টানে মানুষ পাড়ি দিয়েছে অজানার পথে। অতীতের স্বাক্ষর রাখা প্রাচীন স্থাপত্যে চিরকাল লুকিয়ে থাকে গন্তব্যের ডাক। সেই ডাকে ছুটে যেতে হয় কখনও স্মৃতির সরণি দিয়ে, কখনও জীবনের মুহূর্তগুলো উপভোগের বাসনায়,কখনও সময়ের কালঘড়িতে আগামীর চিন্তায় ব্যস্ততা ছেড়ে বর্তমানের রস আস্বাদনে বা সুযোগের অভিযান তরণী বেয়ে একলা পথের হাতছানিতে। এরকমই একবার ইডলি ধোসার দেশ অন্ধ্রপ্রদেশ ভ্রমণের সৌভাগ্যে উটি থেকে ভাইজ্যাগ ফিরে এক সকালে রওনা দিয়েছিলাম স্নিগ্ধ প্রকৃতির কোলে শিমাচলমে।

বিশাখাপত্তনম থেকে মাত্র ১৭ কিলোমিটার ছাড়িয়ে উত্তরে অবস্থিত অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা ছোট্ট শৈলশহর শিমাচলম। বিশাখাপত্তনম থেকে স্থলপথে গাড়িতে ছাড়াও রেলপথে যেতে গেলে নামতে হয় শিমাচালম নর্থ হল্ট স্টেশনে। সমুদ্র উপকূলবর্তী এই স্থানটি মূলত বিখ্যাত, শিমাচলম শৈলশ্রেণির উপর বহু প্রাচীন নৃসিংহদেবের মন্দিরের জন্য। শিমাচলমকে চারিদিক বেষ্টন করে রয়েছে সবুজ চাদরে মোড়া একাধিক শৈল শ্রেণি। প্রাকৃতিক জঙ্গলে ভরা উপত্যকার মাঝেই চোখে পড়বে পাহাড়ের ঢালে চাষ হচ্ছে নানান ফলমূল। সারাবছর স্থানীয় ভক্তের পাশাপাশি ভাইজ্যাগ ভ্রমণে আসা অগুনতি পর্যটক এই নৈস্বর্গিক স্থানে ভীড় করেন। ভক্তের অর্ঘ্যে বর্তমানে এই বরাহ নৃসিংহ মন্দির তিরুমালার পর অন্ধ্রপ্রদেশের দ্বিতীয় ধনী এবং বিখ্যাত মন্দির।

শিমাচলমে নৃসিংহ দর্শন
শিমাচলমে নৃসিংহ দর্শন

ভারতের পূর্ব উপকূল তথা করমণ্ডল জুড়ে পূর্বঘাট পর্বতমালার যে বিক্ষিপ্ত শৈলশ্রেণিগুলি ছড়িয়ে রয়েছে এটি সেরকমই একটি পাহাড় চূড়ার সমগ্র উত্তরাংশ জুড়ে প্রাচীন রোমের অ্যাম্ফিথিয়েটার এর মতো অবস্থিত। স্থানীয়ভাবে পাহাড়টি কৈলাশ নামে পরিচিত। পাদদেশে রয়েছে মন্দির ট্রাস্টের বাসষ্ট্যান্ড; সেখান থেকে বাস ধরলেই বাস পৌঁছে দেবে পাহাড়ি পথ দিয়ে উপরে ৩০০ মিটার উচ্চতায় মন্দিরের নিকট। পথে দেখা যায় নানান ভেষজ উদ্ভিদের বন, কিছু বড় গাছের জঙ্গল এবং নীচের অসম্ভব সুন্দর উপত্যকা। এ যেন এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। সমুদ্র এবং পাহাড় একসাথে উপভোগের অভিজ্ঞতা ভারতের খুব কম জায়গাতেই হয়। বিশাখাপত্তনমের সমুদ্র সৈকত বিচ্ছিন্নভাবে পূর্ব ঘাটের একাধিক পাহাড়কে স্পর্শ করেছে। শিমাচলমে পাহাড়ের চূড়ায় এই মন্দিরটিকে দেখতে আপাতদৃষ্টিতে বিশাল এক দুর্গের মতো মনে হয়। যেন দুর্গটি তিন সুরক্ষা বলয়, যাকে বলে ‘প্রকরণ’ দ্বারা সুরক্ষিত। রয়েছে ৫টি প্রবেশ তোরণ,দুটি জলাধার; যার একটি পাহাড়ের উপরে অপরটি পাদদেশে। হাজার বছরের পুরনো এই মন্দিরটি অন্ধ্রপ্রদেশের বিখ্যাত ৩২টি নৃসিংহ মন্দিরের মধ্যে অন্যতম।

শিমাচলমে নৃসিংহ দর্শন
শিমাচলমে নৃসিংহ দর্শন

শ্রীশ্রী বরাহনৃসিংহদেব প্রভু স্বামী ভরু, মন্দিরের প্রধান আরাধ্য দেবতা ভগবান বিষ্ণু এখানে বরাহ নৃসিংহ অবতারে পূজিত হন। নৃসিংহদেব স্থানীয় ভক্তদের কাছে সিংহাদৃনাথ, সিংহাদৃআপ্পান্না, আপ্পারু প্রভৃতি নামে উপাস্য। অন্যদিকে লক্ষ্মীদেবী পূজিত হন সিংহবলি থায়ার রূপে। অদ্ভুতভাবে মন্দিরের মূল উপাসনাগৃহ প্রচলিত নিয়মকে ব্যতিরেখে পূর্বদিকের পরিবর্তে পশ্চিমমুখী। প্রাচীন মন্দিরের দেওয়ালে স্থানে স্থানে খোদিত প্রাচীন লিপি,কারুকার্য। ছড়িয়ে রয়েছে ওড়িশা-চোল-চালুক্য স্থাপত্যশৈলীর এক অদ্ভুত মিশেল। মন্দির প্রাঙ্গণে দেখা যাবে স্থানীয় দোকান বাজারের পশরা। বিক্রি হতে চোখে পড়বে গ্লাসভর্তি দুধের মতো কোনও বিশেষ পানীয়। চোখে পড়বে মন্দির নিকটবর্তী পাহাড়ের কোলে বেশ কিছু হোটেল। দক্ষিণ ভারতের মন্দিরগুলির স্থাপত্যশৈলীতে মন্দিরের প্রবেশ দ্বারটির ভূমিকা প্রায় সব মন্দিরেই উল্লেখ্যভাবে পরিলক্ষিত হয় যাকে বলে ‘গোপুরম’। উচ্চতা, কারুকার্য, নির্মাণ-ভঙ্গি সবদিক থেকেই গোপূরমটি প্রাধান্য পায়। এই মন্দিরের রাজা গোপুরমটিও অত্যন্ত সুন্দর। প্রধান মন্দিরগৃহের চূড়া বা বিমানটি অনেকটা কোনারকের আদলে তবে স্বর্ণখচিত। প্রাচীন মন্দিরটির অঙ্গে অঙ্গে রাজকীয়তার স্বাক্ষর মেলে। আজও মন্দিরের এক বিশেষ দায়িত্ব বিজয়নগর সাম্রাজ্যের মহান গজপতি রাজবংশ পরিচালনা করে।

ইতিহাস বলে শিমাচলম ছিল মধ্যযুগের এক গুরুত্বপূর্ণ বৈষ্ণব কেন্দ্র। বৈষ্ণব সূত্রে শ্রীশ্রী ভক্তি সিদ্ধান্ত সরস্বতী স্থাপিত শ্রী চৈতন্যমহাপ্রভুর পদচিহ্ন আজও মন্দিরগৃহে দেখা যায়। অতীতে কালক্রমে চোল চালুক্য থেকে শুরু করে পূর্ব গঙ্গেয় রাজবংশ, রেড্ডী রাজবংশ, বিজয়নগর সাম্রাজ্যের গজপতি রাজবংশ, তুলুভ রাজবংশ বিভিন্ন সময় এই মন্দিরটির পৃষ্ঠপোষকতা করেছে। তবে বর্তমান মন্দিরটির বেশিরভাগ অংশই পুনঃনির্মাণ হয়েছে রাজা নরসিংহদেব (প্রথম)-এর আমলে।

মন্দিরে নৃসিংহদেবের বিগ্রহ শুধুমাত্র অক্ষয় তৃতীয়া ছাড়া সারা বছর পুরু চন্দন কাঠের লেপ দিয়ে আবৃত থাকে যার ফলে ভালো করে না লক্ষ্য করলে মূর্তি চিনতে একটু অসুবিধা হয়, অনেকটা লিঙ্গের মতো দেখতে লাগে। বছরের বিভিন্ন সময় মন্দিরকে কেন্দ্র করে কল্যানোৎসব, চন্দ্রনোৎসব, কাম দহন,নৃসিংহ জয়ন্তীর মতো বেশ কয়েকটি বিশাল উৎসব মহা সাড়ম্বরে উদযাপিত হয়। এই উপলক্ষে ব্যাপক ভক্ত সমাগম হয় এবং সেখানে দ্রাবিড় সম্প্রদায়ের বিশেষ প্রভাব দর্শিত হয়।

মোটামুটি একদিনেই নৃসিংহ-দর্শন সম্পন্ন হয়েছিল। ফেরার পথে রস হিল পেরিয়ে ডলফিন নোজ লাইট হাউসে এই কাহিনি লিখেছিলাম। সামনে স্মৃতির সীমানায় শিমাচলম ছাড়িয়ে দিগন্ত বিস্তৃত অশেষ নীলাচল। শান্ত গভীর নীল জলরাশি বয়ে নিয়ে আসছে অপ্রতিরোধ্য হিমেল হাওয়া। পশ্চিম দিগন্তে হেলে পড়েছে সূর্য। দূরে বন্দরের দিক থেকে ভেসে আসে অস্পষ্ট জাহাজের হর্ন।


লেখকের কথা: সুদীপ্ত আচার্য্য

সুদীপ্ত আচার্য্যের জন্ম: ১৬শে মে, ১৯৯৯ সালে বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুর শহরে। লেখক বর্তমানে বাঁকুড়া সম্মিলনী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে (এম বি বি এস) স্নাতক স্তরের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। লেখাপড়া ছাড়া রোমাঞ্চ, ঐতিহাসিক, কল্পবিজ্ঞানের গল্প পড়তে ভালোবাসেন। কবিতা লেখা এবং রংতুলির টানে স্বপ্ন আঁকায় আগ্রহী এই তরুণ কবি-প্রাবন্ধিক-ছোটগল্পকার অবসর সময়ে গানে তবলায় সঙ্গত দিতেও ভালো বাসেন। লেখক নানান জায়গায় বেড়াতে ভালোবাসেন। অঙ্কুর, প্রয়াস, প্রাঙ্গণ, দর্পণ ব্লগজিন, আল্পনার কবিতা, হৃদয়ং, সাতকাহন প্রভৃতি সাহিত্য পত্রিকার কয়েকটি সংখ্যায় এবং কচিপাতা প্রকাশন নিবেদিত কবিতা সংকলন, ছোটগল্প সংকলনে নানান আঙ্গিকের লেখা প্রকাশিত হয়েছে।

শেয়ার করে বন্ধুদেরও পড়ার সুযোগ করে দিন
  •  
  •  
  •  
  •  

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।