লেখক : অভিজিৎ সুর
‘যদি তুমি না এ গান কোনোদিন শোনো, কেউ শোনে বা না শোনে কি আসে যায়’ – শ্যামল গুপ্ত।
‘শুধু তোমারই জন্যে সুর তাল আর গান বেঁধেছি, এর আর কোনো নেই প্রয়োজন’ – সলিল চৌধুরী।
‘তুমি একজনই শুধু বন্ধু আমার শত্রুও তুমি একজন, তাই তোমাকেই ভালো লাগে’ – পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়।
‘কি হবে গান লিখে তবু লিখি গান… তুমি শোনো বা না শোনো শুধু তোমাকে শোনাই’ – কবীর সুমন।
কেন এমন হয়? এত বড় পৃথিবী, এত মানুষের মধ্যেও আসলে সব কিছুই শুধু সেই একজনের জন্য, তার জন্যই এত কিছু, এত আয়োজন, এত বেদনা, এত আঘাত; তারপরেও সে-ই থেকে যায়, মানে, না থেকেও থেকে যায়। সে ছাড়া যেন আমার কবিতার, গানের, সৃষ্টির কোন অস্তিত্ব নেই, হয়ত আমারও নেই। তার মধ্যেই আমার বেঁচে থাকা, আর এই বেঁচে থাকার অনুষঙ্গেই, শুধু তারই জন্য তার মত করেই, এই সৃজনশীলতা। আগে এই গানগুলোর এমনধারা কথা আমার ঠিক ভাল লাগত না, মনে হত যে গেছে সে যাক না, অন্য কেউ তো আছে। তা হয়ত আছে, হয়ত থাকেও, কিন্তু সেই বিশেষ একজন, যে না থেকেও থাকে, সেইখানটাতেই আমাদের যাবতীয় আশ্লেষ, সেখানেই আমরা চিরকাল নতজানু। যদি জিজ্ঞেস কর কেন, তবে তার উত্তর নেই। শুধু গোধূলির ম্লান আলোর মতো পুড়ে যেতে ভাল লাগে। সৃষ্টি মানেই তো অগ্নিহোত্র, যেখানে আহুতি দিতে হয় নিজেকেই।
অনেক সন্ধ্যে চুপচাপ একা ঘরে ভেবেছি ভালবাসলে কি বলতেই হবে? যেমন গভীর অতলে শুক্তির বুকে মুক্তোর মত জমিয়ে রেখে দেওয়া কি খুব বড় বেশি বোকামো? নাই বা জানল কেউ, নাই বা জানল সে-ও। শুধু তার জন্যেই, তাকে ভেবেই একটা গোটা জীবন কাটিয়ে দেওয়া খুব কি পাগলামি? ভালবাসলে কি একটা সম্পর্ক তৈরি করতেই হবে? ভালবাসলে কি তাকে ঘরে আনতেই হবে? কবিতা আর ভালবাসার মধ্যে একটা অদ্ভুত মিল আছে, দুটোই হয়ে যায়, জোর করে হয়ানো যায় না। কখন হবে কেউ জানে না, আর হয়ে গেলে কিছু করার থাকে না। সাংসারিক বন্ধন, নিয়মকানুন – এসব কোনদিন ভাল লাগেনি, তাই হয়ত আমার ভালবাসা অবোধ বোকামির মত রয়ে গেল। কেউ জানল না, গোপন বাক্সে বন্দী রইল। ময়ূরের পাখায় লেখা সে নাম কোন গহন অরণ্যে চেনা বাতাসে সন্ধ্যা নামায়, আর দিনান্তের আয়নায় প্রতিদিন দেখি আমার মনের ঘরে ‘সে’ চিরকালীন বসত বানিয়ে রেখেছে, যাকে ভেঙে ফেলার ক্ষমতা আমার সাধ্যাতীত। এখানটাতে আমি বড় অসহায়। ক্লান্ত বাঁশির শেষ রাগিণীর মত শুধু এই বুঝেছি, সবকিছু জানতে নেই, সবকিছু জানাতেও নেই।
পৃথিবীর সকলে ভাল থাকুক, আরও ফুল ফুটুক, আরও একটু ভালবাসার জন্ম হোক।
(শিরোনামের ঋণ স্বীকার – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়)
লেখক পরিচিতি : অভিজিৎ সুর
একক জীবন, পরিচিতিহীন

