পাহাড় বার্তা

লেখক : ইয়াসেফ মোহাঃ রিয়ান

সম্প্রতি, ২০২৫ এর শেষের দিকে, ভারতের সর্বপ্রাচীন পর্বতমালা আরাবল্লীর রক্ষার দাবিতে আমরা একজোট হয়ে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রতিবাদ করেছি। এই সম্মিলিত প্রতিবাদ আজ সুপ্রিম কোর্টকে বাধ্য করেছে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার জন্য। এটি নিঃসন্দেহে আমাদের সম্মিলিত জয় – অন্ততঃ এখনকার মত তো বটেই।

কিন্তু দুঃখের বিষয়, গল্পের আরেকটি দিক আমাদের চোখে উপেক্ষিত। পাহাড় বাঁচানোর শ্লোগান তুলি, প্রকৃতির পাশে দাঁড়ানোর কথা বলি—কিন্তু ঘরবাড়ির সৌন্দর্য বাড়াতে আমরা এখনও মার্বেল ও গ্রানাইটেই মুগ্ধ। এই সৌন্দর্যলোভ আসলে পাহাড়ের কাছে আতঙ্কের, এ এক গভীর ক্ষত। প্রতিদিন মাইনিং-এর নিষ্ঠুর আগ্রাসনে পাহাড়ের হাড় গুঁড়িয়ে চামড়া ছিঁড়ে ছোট-বড় টাইলস বানানো হচ্ছে। এভাবে দিনের পর দিন ভূতাত্ত্বিক ভারসাম্য ধ্বংস হচ্ছে।

ভারতে প্রতিঘণ্টায় বিপুল পরিমাণ মার্বেল ও গ্রানাইট ব্যবহৃত হচ্ছে ছোট-বড় নানা নির্মাণকাজে, যা প্রকৃতি, পাহাড় ও পরিবেশের ওপর নিরন্তর নৃশংস আক্রমণ, রোজ। এভাবে দিন দিন হাজার হাজার নিরীহ বন্যপ্রাণীদের আশ্রয় কেড়ে নিচ্ছি আমরা নিজেদের আশ্রয়গুলো সুন্দর বানাতে, কোথাও কোথাও তাদের অস্তিত্বও বিলীন হয়ে যাচ্ছে, পাখিদের বাসাগুলো খননকার্যের শব্দে আর ধুলোয় ধূলিসাৎ হচ্ছে।

দোষ কি তাহলে খনিখনন কোম্পানিগুলির, বা নেতা মাথার ?

না, বরং দোষী তুমি-আমি। মার্বেল আর গ্রানাইটের চাহিদা তো তোমার-আমার। আমরা চাই বলেই তারা পাহাড় কাটে, আর আমাদের যোগান দেয়। সত্যিই বলতে কি, হয় আমরা ভণ্ডতপস্বী (hypocryt), অথবা পরিবেশরক্ষার ব্যাপারে নিরেট মূর্খ । আমরা আসলে ঠিক তেমনই এক অদ্ভুত “প্রকৃতি-প্রেমী”—যেমন এক তথাকথিত “পশু-প্রেমী”, যে প্রতিদিন নিজের পাতে নির্দ্বিধায় আমিষ সাজিয়ে বসে।

যদি সত্যিই প্রকৃতিকে ভালোবাসি, তবে এই ঝাঁ চকচকে পাথরের বিকল্প কিছু ভাবতে হবে। জাতিসংঘ (United Nation)-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী নির্মাণ খাত হল বিশ্বব্যাপী পরিবেশ দূষণের অন্যতম মূল কারণ । তাই স্থিতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি (Sustainable approach), পুনর্ব্যবহারযোগ্য নির্মাণ উপাদান (recycled aggregates) এবং বর্জ্য-জাত নির্মাণ উপাদান (waste-based materials)-এর ব্যবহারের দিকে আমাদের এগোতে হবে—গাছ কেটে কাঠ নয়, বা পাহাড় কেটে পাথর নয়। প্রকৃতি থেকে নিয়ে যদি আবার ফেরত দিতে পারি, তবেই সার্থক হবে sustainable practice-এর। ঘরবাড়ি বা স্থাপত্য নির্মাণের উপকরণ (building materials)-এর নির্বাচন হোক এইরকম ভাবেই।

Sustainability শুধু নিছক শ্লোগানের মাধ্যমে সম্ভব নয়, সত্যিকারের পরিবেশ-অনুকূল নির্মাণ সচেতনতার মাধ্যমেই তা সম্ভব। আমরা সাধারণত অন্যকে দোষ দিই, অথচ অনেক সময় ক্ষতির মূল কারণ আমরা নিজেরাই বা আমাদের অজ্ঞানতা ।

তাহলে বিকল্প কী?

বিকল্প হ’ল প্রকৃতিকে নতুন করে ক্ষতিগ্রস্ত না করে পুনর্ব্যবহার (reuse / recycling) বাড়ানো। ভাঙা টাইলস, পুরনো ইঁট বা ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়ির উপকরণ দিয়েই কার্যকর ও নান্দনিক নির্মাণ সম্ভব। পাশাপাশি স্থানীয় ও কম প্রক্রিয়াজাত উপকরণ (local, low-processed materials)—যেমন মাটি (earth), টেরাকোটা (terracotta), বাঁশ (bamboo), চুন (lime)—ব্যবহার করলে কার্বন ফুটপ্রিন্ট (carbon footprint) কমে।

একই সঙ্গে স্বীকার করতে হবে—সিমেণ্ট, স্টিল বা কংক্রিট একেবারে বাদ দেওয়া এখনও সবক্ষেত্রে সম্ভব নয়। কিন্তু গবেষণা ও প্রযুক্তির সহায়তায় এগুলোর পরিবেশবান্ধব বিকল্প (eco-friendly materials) ও কম-ক্ষতিকর সংস্করণ ধীরে ধীরে সামনে আসছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হ’ল—Sustainability কোন একটিমাত্র উপকরণের নাম নয়। এটি আমাদের চিন্তাভাবনা, নকশার দর্শন (design philosophy) এবং সৌন্দর্যভোগের সীমা নির্ধারণের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।

পাহাড়েরা অন্তত একটু প্রাণ খুলে শ্বাস নিক—ধীরে ধীরে সারিয়ে তুলুক তাদের ক্ষতগুলো।


লেখক পরিচিতি : ইয়াসেফ মোহাঃ রিয়ান
ইয়াসেফ মোহাঃ রিয়ান

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।

মাসিক দীপায়ন প্রতিযোগিতা

মাসিক দীপায়ন পুরস্কার pop up