চৌপাহাড়ির জঙ্গলে

লেখক : রাণু শীল

স্টেথোস্কোপটা খুলে ঘড়ির দিকে তাকাল দিব্যেন্দু। ন’টা চল্লিশ। ইস, আজ বেশ রাত হয়ে গেল। হেতমপুর থেকে দুর্গাপুরে পৌঁছতে কম করেও পৌনে দু’ঘণ্টা সময় লাগবে। প্রথম থেকেই দিব্যেন্দুর ইচ্ছে ছিল গ্রামাঞ্চলে চিকিৎসা করার। পরিবারের পিছুটান নেই। আছে শুধু এক পিসি আর পোষ্য শ্যাডো। তাই নিশ্চিন্তে বোহেমিয়ান জীবন উপভোগ করে ডাক্তার দিব্যেন্দু পালিত। ওর এই বাউণ্ডুলে পিচ্ছিল মনটা বাঁধার মত কাউকে পায়নি। বাল্যবন্ধুরা আর পিসি ওকে সংসারী করার চেষ্টা করে করে হাল ছেড়ে দিয়েছে। দিব্যেন্দু বলে, “সঙের মতো রঙ পাল্টে, বিভিন্ন সামাজিক চরিত্রে ঢুকে যেতে আমি নারাজ।” একমাত্র শ্যাডোই ওর দুর্বলতা।

আজকাল চেম্বারে বেশ ভিড় হচ্ছে, সময়টা এগোতে হবে, ভাবল দিব্যেন্দু। বেরিয়ে দেখল, উথাল-পাথাল ঠাণ্ডা হাওয়া দিচ্ছে, তাতে বৃষ্টি বৃষ্টি গন্ধ। বৃষ্টি এই ঊনপঞ্চাশেও রোমাণ্টিক করে তোলে ওকে। দু’হাত ছড়িয়ে ঠাণ্ডা হাওয়া গায়ে মেখে মনটা খুশি খুশি হয়ে উঠল। মেঘ ডাকল গুরর্ গুরর্… দিব্যেন্দু চেঁচিয়ে বলল, “আলম! গেট বন্ধ করে দিও।”
“বারিশ আসছে ডাগটারবাবু! আজ মৎ যাও।”
আলম তাড়াতাড়ি আসছিল। ততক্ষণে পেস্তা রঙের গাড়িটা দূরে চলে গেছে। স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে জানলার কাচ নামিয়ে দিল, গুনগুন করে গান ধরল, ‘রিমঝিম গিরে শাওন, সুলঘ সুলঘ…’
কিছুটা যাওয়ার পরে বৃষ্টিটা বেশ জাঁকিয়েই এল। পাগল হাওয়ার সঙ্গে বৃষ্টি আজ আদিম ধ্বংস খেলায় মেতে গাছগুলোকে নাজেহাল করে তুলেছে। এর পাতা ছেঁড়ে, ওর ডাল মটকায়। গাড়ি সাবধানে চালাতে হবে। রাস্তার দু’পাশে জঙ্গল। গাড়ির আলোকবৃত্তে যেটুকু দেখা যায়, সেটুকু ছাড়া ভিতু ভিতু কয়েকটা লাইটপোস্ট আলো দেওয়ার বৃথা চেষ্টা করে অন্ধকারটা আরও ঘন করে তুলেছে। রোজ শ্যাডোর জন্য কুকিজ বা বিস্কিট নিয়ে যায়। আজ নেওয়া হয়নি। ঝড়-বৃষ্টির বেগ বাড়ছে। চুনপলাশিতে ইণ্ডিয়ান অয়েলের পেট্রোল পাম্পের কাছে এসে স্লো করল গাড়ি। একটা দোকান আছে বটে, কিন্তু এখন বন্ধ। কাউকে দেখাও গেল না পাম্পে। চৌপাহাড়ি জঙ্গল তাড়াতাড়ি পেরিয়ে না গেলে গাছ পড়ে রাস্তা বন্ধ হইয়ে যাওয়ার সম্ভবনা। গতকাল নাকি হাতির ডাক শোনা গিয়েছে জঙ্গলে। বৃষ্টি কমার লক্ষণ নেই। গাড়ির স্পিড বাড়াল যতটা সম্ভব। রাস্তা ভাল, কিন্তু বৃষ্টি পড়লে লালমাটি গলে পিচ রাস্তাকে পিছল করে দেয়। এই জঙ্গলে আবার শেয়ালের রাজত্ব। জঙ্গলে শুধু হেডলাইটই ভরসা। রাস্তায় বনদপ্তরের গাড়ি থাকে অন্যদিন, আজ নেই। সতর্ক দৃষ্টি রেখে চালাতে হচ্ছে। ডানদিকে একটা সুবিশাল অশ্বত্থ গাছ, তার তলায় সিঁদুরমাখা কিছু পাথর। এটা বনবাবার থান। এসব চেনা দিব্যেন্দুর, কম দিন তো হলো না এ পথে! কাচ বন্ধ থাকায় বাইরে তুমুল শব্দ হলেও গাড়ির ভেতর ওয়াইপারের একঘেয়ে শব্দ ছাড়া কিছু নেই। এখানে টাওয়ারও নেই যে পিসিকে একটা ফোন করতে পারে। হঠাৎ —

কেঁ-উঁ-উঁ —

মুহূর্তে ব্যাপার বুঝে ব্রেক কষল দিব্যেন্দু। খানিকটা পিছলে একটা গাছে ঘষা খেল । ডানদিকের লুকিংগ্লাসটা ভাঙল বোধহয়। খুব সামলানো গেছে। কী চাপা পড়ল, কে জানে! বৃষ্টির দাপট কম একটু। দিব্যেন্দু নেমে মোবাইল টর্চ জ্বেলে দেখল, একটা সাদাটে ধূসর শেয়াল। মুখে কী যেন ধরে আছে? খরগোশ! ওর পেট থেকে নিচের দিকটা চাকায় পিষে গেছে। মর্মান্তিক দৃশ্য। ইসস্, মনটা খারাপ হয়ে গেল। কিন্তু রাত হয়ে গিয়েছে অনেক। ওটাকে পাশে সরিয়ে গাড়িতে স্টার্ট দিল। চৌপাহাড়ি জঙ্গল পেরিয়ে একটা কালভার্ট। বাঁকের মুখে গাড়ির আলো ওটার ওপর পড়ে। গরমকালে দিব্যেন্দু এখানে মাঝেমধ্যে বসে। ওর কবিতা লেখার দরদী মনটাকে বেশ যত্ন করে এই পরিবেশ। বনের দীর্ঘশ্বাস শুনতে পায় দিব্যেন্দু। কিন্তু আজ এই তুমুল বৃষ্টিতে কালভার্টের ওপর ওটা কী? নিচের ঝোপগুলো পাগলের মত মাথা দোলাচ্ছে, যেন অনেকগুলো কালো হাত। রেলিঙের ফাঁক দিয়ে জল ঝর্ণার মতো নামছে। ওখানে জড়সড় হয়ে বসে আছে একটি মেয়ে। হেডলাইটের আলোয় কয়েক শতাব্দী আগের কোন দৃশ্য দেখছে যেন! গাড়ি নিজের অজান্তেই থামিয়ে ফেলেছে দিব্যেন্দু।

মেয়েটি উঠল, এগিয়ে এল। কাচে টোকা দিল। দিব্যেন্দু যন্ত্রচালিতের মত কাচ নামাল। মেয়েটির স্বরে উদ্বেগ, “আমার মিল্কিকে দেখেছেন? বাচ্চাদের জন্য খরগোশ আনতে গেল! এখনও তো ফিরল না? দেখেছেন?”
দিব্যেন্দুর কথা বলার ক্ষমতা কোন মন্ত্রবলে নষ্ট হয়ে গেছে। মেয়েটির চোখ থেকে চোখ সরাতে পারছে না। হিপনোটাইজড্ হয়ে গিয়েছে যেন।
“আমাকে নিয়ে যাবেন? মিল্কিকে খুঁজে দেখি। কোথায় আবার গেল। ওদিকে বাচ্চারা…”
দিব্যেন্দু লক খুলে দিতে মেয়েটি উঠে এল। স্বচ্ছন্দভাবে পাশের সিটে বসে বলল, “চলুন!”
দিব্যেন্দু যেন ঘুম থেকে জেগে উঠে দেখল মেয়েটি বসে আছে। অবাক হয়ে বলল, “কোথায় যাব?”
“আপনি যেখানে যাচ্ছেন!”
“আমি তো বাড়ি…”
“তাই চলুন, এই বৃষ্টিতে আর কোথায় খুঁজব!”
দিব্যেন্দুর প্রায় অবশ হাতদু’টো স্টিয়ারিং ধরে বসে রইল বাকি রাস্তাটা। স্বাভাবিক হওয়ার জন্য রেডিও অন করেও ভাল লাগল না। জনহীন দীর্ঘ হাইওয়ে… মুচিপাড়া চেকপোস্ট। বৃষ্টিস্নাত মুচিপাড়ার ঝকঝকে আলো দিব্যেন্দুকে অনেকটা স্বাভাবিক করে তুলল।
“ইয়ে, আমি তো আপনাকে বাড়ি নিয়ে যেতে পারব না। কোথায় নামবেন বলুন।”
কোন সাড়া না পেয়ে, “কই বলুন —” বলে পাশে তাকিয়েই স্টিয়ারিংয়ে রাখা হাতদু’টো কেঁপে গেল। কেউ তো নেই সেখানে! শুধু একটা অশরীরী অস্তিত্ব ছমছম করছে। অজান্তেই স্পিড বাড়িয়ে ফেলল।

বিধাননগরে ইউরি গ্যাগরিন স্ট্রিটে তিন নম্বর বাড়ি। বেল বাজাল, কোন সাড়া নেই। পিসি কি ঘুমিয়ে পড়ল? শ্যাডোও? চাবি ঘুরিয়ে ঢুকল। একটা গরর্ গরর্ শব্দ। ডাইনিং অন্ধকার। শুধু জ্বলজ্বলে দুটো চোখ।
“শ্যাডো! শ্যাডো!”
ডুকরে কেঁদে ওঠার শব্দ। আলো জ্বালতে হলে একটু ভেতরে যেতে হবে। কান্নাটা পিসির। কিন্তু শ্যাডো এমন করছে কেন?
“পিসি!”
“আসিস না দিব্য, শ্যাডো পাগল হয়ে গিয়েছে।”
দিব্যেন্দু এগিয়ে গিয়ে আলো জ্বালতেই চক্ষুস্থির। পিসির কাঁধ থেকে রক্ত ঝরছে, শ্যাডো ঘাড় নিচু করে চেয়ে আছে। লাল মাড়ি আর ঝকঝকে ধারাল দাঁতের সারি রক্ত আর লালায় বীভৎস! হিংস্র চোখ দিব্যেন্দুর দিকে। দিব্যেন্দু টেবিলে রাখা খাবার থেকে এক পিস মাংস ছুড়ে দিল শ্যাডোর সামনে। তাকালেও খাওয়ার ইচ্ছে দেখাল না। ওর চোখ দিব্যেন্দুর ওপর থেকে সরছে না। ও কি আক্রমণ করবে? লক্ষণ ভাল না। সকালেও তো স্বাভাবিক ছিল। হঠাৎ কেন… এত বছরে শ্যাডো এমন ব্যবহার কক্ষনও করেনি! এদিকে পিসি এলিয়ে পড়েছে!

বাইরে থেকে একটা ক্ষীণ শব্দ ভেসে এল, “মিল্কি… মিল্কি… খরগোশ এনে দিবি না? বাচ্চারা কাঁদছে! মিল্কি… মিল্কি…!”
শব্দটা শিরশিরে একটা তরঙ্গ ছড়িয়ে দিল। শীত করে উঠল দিব্যেন্দুর। শ্যাডোর কান খাড়া, দৃষ্টি দরজায় । আবার অশরীরী হিমেল স্বর, “মিল্কি…মিল্কি…!”
শ্যাডো দুই পা এগিয়ে এল দিব্যেন্দুর দিকে। ও কি বাইরে বেরোবার চেষ্টা করছে? তাহলে তো বিপদ, এই অবস্থায় বেরিয়ে গেলে যে কোন লোককে কামড়ে মেরেও ফেলতে পারে। আজ এতরকম ঘটনায় দিব্যেন্দু ভয়টাকে বোধহয় জয় করে ফেলেছে। না হলে, কেন চেনটা নিয়ে এগিয়ে গিয়ে ওকে বাঁধার সাহস দেখাল? এগোনো মাত্রই গর্জন করে ঝাঁপিয়ে পড়ল দিব্যেন্দুর ওপর। হাত কামড়ে ছিঁড়ে ফেলল প্রায়। পিসি বাধা দিতে গেলে গলা লক্ষ্য করে কামড় বসাল! আর্তনাদ করার সময়টাও দিল না।
“মিল্কি… তোর বাচ্চারা বসে আছে… আয়… আয়… মিল্কি-ই-ই…”
দিব্যেন্দু কাঁপা কাঁপা হাতে দরজা খুলে দিল। যেতে গিয়েও মুখ ফেরাল। প্রচণ্ড আক্রোশে ওর পায়ে কামড় বসাল, একটা বিরাট লাফে বেরিয়ে গেল। ওর তাড়া আছে, খরগোশ আনতে হবে বাচ্চাদের জন্য…

এখনও চৌপাহাড়ির জঙ্গলে একটা ধূসর সাদা প্রাণী আনাচে কানাচে ঘোরে। গাছেদের আড়ালে কান পাতলে শোনা যায়, “মিল্কি…মিল্কি…!”


লেখক পরিচিতি : রাণু শীল
আমি রাণু শীল। হুগলীর চুঁচুড়ায় জন্ম ও পড়াশোনা। অধুনা হাওড়া বালী নিবাসী। ছাত্রাবস্থা থেকেই লেখালেখির শুরু। নানা পত্রিকায় ছোটো গল্প প্রকাশিত। তিনটি বই আছে। একটি ছোটো গল্প সংকলন। একটি উপন্যাস। একটি ছোটোদেরজন্য। মূলত ছোটো গল্পই লিখতে ভালেবাসি। বই,

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।

মাসিক দীপায়ন প্রতিযোগিতা

মাসিক দীপায়ন পুরস্কার pop up