লেখক : বিজুরিকা চক্রবর্তী
শৈশব থেকে আমার পাড়াতেই বেড়ে ওঠা মেয়েটির নাম দোলনচাঁপা, ভালবেসে ডাকতাম ‘দোলন’। আমাদের সেই মুগ্ধ কৈশোর একদিন এক অলিখিত অঙ্গীকারে বাঁধা পড়েছিল— “কেউ কাউকে ছাড়া বাঁচব না।”
কিন্তু নিয়তির পরিহাস বড় নিষ্ঠুর। বছরখানেক আগে আমার শরীরে থাবা বসাল এক মারণ স্নায়ুরোগ। স্নায়ুগুলো একে একে অকেজো হয়ে আসছে, চিকিৎসকেরা জানিয়ে দিলেন আয়ু ফুরিয়ে আসছে দ্রুত। দোলনকে এক পঙ্গু ভবিষ্যতের অন্ধকূপের দিকে ঠেলে দেব? নিজের অধিকারবোধ বিসর্জন দিয়ে এক কঠিন চাল চাললাম। আমারই এক বন্ধুকে অনুরোধ করলাম দোলনের জীবনে আসার অভিনয় করতে, যাতে আমার চলে যাওয়ার পর সে অন্তত একা না হয়ে পড়ে।
বিগত বছরগুলোয় পুজোর সিঁদুরখেলার ভিড়ে, সবার অলক্ষ্যে দোলনের গালে আলতো করে সিঁদুর ছুঁয়ে দিতাম। এবার তীব্র শারীরিক ও মানসিক কষ্টে ঘরবন্দী ছিলাম, কিন্তু মহাদশমীতে পরিবারের জোরাজুরিতে মণ্ডপে আসতেই থমকে গেলাম। দেখলাম, দোলন সেই বন্ধুর হাত ধরে দাঁড়িয়ে। আমার সাজানো নাটক সফল, অথচ বুকের ভেতরটা যেন অসাড় হয়ে গেল।
দর্পণ বিসর্জনের মুহূর্তে জলের পাত্রে মায়ের প্রতিচ্ছবির পাশে ভেসে উঠল দোলনের মুখ। প্রতিমা বিসর্জনের লগ্নেই আজ আমার প্রাণপ্রতিমাও চিরতরে বিসর্জন হয়ে গেল। বন্ধুটি দূর থেকে ইশারায় আশ্বস্ত করল— দোলন সুরক্ষিত। নিজের ভালবাসাকে অন্যের দায়িত্বে সঁপে দিয়ে, এবার আমার নিঃশব্দে নিভে যাওয়ার পালা।
লেখক পরিচিতি : বিজুরিকা চক্রবর্তী
বিজুরিকা চক্রবর্তী, কলকাতা দমদমের, বাসিন্দা। সেন্ট জেভিয়ার'স কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পি.এইচ.ডি ডিগ্ৰী পাওয়ার পর বর্তমানে এন.আর.এস মেডিক্যাল কলেজের এম.আর.ইউ ডিপার্টমেন্টে রিসার্চ-সায়েন্টিস্ট হিসেবে কর্মরত। কবিতা লেখা হঠাৎ করে খুঁজে পাওয়া এক জেদী, একরোখা, অবিচ্ছেদ্য বন্ধু। এখনও যেই বন্ধু বেইমানি করেনি। 🙏

