লেখক : হৃদয় হক
১
নাসিম নিকোলাস তালেবের সবচেয়ে জনপ্রিয় বই হিসেবে ‘দ্য ব্ল্যাক সোয়ান’ বইটাকে ধরা যায়। বইটা আমি নিয়েছিলাম গতবছর ঢাকায় থাকাকালীন। বইটাকে তিনি চারটি পর্বে ভাগ করেছেন। তার মধ্যে প্রথম পর্বটা তিনি ইণ্টারেস্টিং একটা বিষয় দিয়ে শুরু করেন। পর্বটির নাম ‘Umberto Eco’s Antilibrary, or How we seek validation’। বইটা আমার যদিও কেনার পর পড়া হয়নি, কিন্তু এই এন্টিলাইব্রেরি শব্দটার জন্য তিনি পর্বের ভিতর চ্যাপ্টার শুরুর পূর্বে কী লিখেছেন, তা ঠিকই পড়েছিলাম। এখানে এন্টিলাইব্রেরি, না পড়া বই এবং বই পড়া নিয়ে একটু কথা বলব। বিধায় ‘দ্য ব্ল্যাক সোয়ান’ বইটা থেকে ওনার কিছু প্রাসঙ্গিক কথা তুলে দিচ্ছি।
The writer Umberto Eco belongs to that small class of scholars who are encyclopedic, insightful, and nondull. He is the owner of a large personal library (containing thirty thousand books), and separates visitors into two categories: those who react with “Wow! Signore professore dottore Eco, what a library you have! How many of these books have you read?” and the others—a very small minority—who get the point that a private library is not an ego-boosting appendage but a research tool. Read books are far less valuable than unread ones. The library should contain as much of what you do not know as your financial means, mortgage rates, and the currently tight real-estate market allow you to put there. You will accumulate more knowledge and more books as you grow older, and the growing number of unread books on the shelves will look at you menacingly. Indeed, the more you know, the larger the rows of unread books. Let us call this collection of unread books an antilibrary.
We tend to treat our knowledge as personal property to be protected and defended. It is an ornament that allows us to rise in the pecking order. So this tendency to offend Eco’s library sensibility by focusing on the known is a human bias that extends to our mental operations. People don’t walk around with anti-résumés telling you what they have not studied or experienced (it’s the job of their competitors to do that), but it would be nice if they did. Just as we need to stand library logic on its head, we will work on standing knowledge itself on its head. Note that the Black Swan comes from our misunderstanding of the likelihood of surprises, those unread books, because we take what we know a little too seriously.
Let us call an antischolar—someone who focuses on the unread books, and attempts not to treat his knowledge as a treasure, or even a possession, or even a self-esteem enhancement device—a skeptical empiricist.
২
উমবের্তো একো ওনার অতিথিদের দু’টো ভাগে ভাগ করতেন। এই ভাগটা তিনি করতেন ওনার ব্যক্তিগত লাইব্রেরি দেখে তারা কী ভাবত, তার ভিত্তিতে। একদল লাইব্রেরি দেখে অবাক হত। অন্যদল বুঝত, এটা আসলে একটা রিসার্চ টুল। এখানে একটু বলে রাখা প্রয়োজন যে, একো-র সময়ে কিংবা নাসিম তালেব যখন এটা লিখছেন, তখন ইণ্টারনেট এত ফেমাস হয়নি জনসাধারণের কাছে। এখন রিসার্চের জন্য তথ্যের অভাব নেই ইণ্টারনেটে, আগে লাইব্রেরিই ছিল ভরসার জায়গা। হোক সেটা পাবলিক কিংবা প্রাইভেট লাইব্রেরি।
এখন লাইব্রেরি আসলে অনেকভাবে রিসার্চ টুল কিংবা আইডিয়ার টুলও হতে পারে। যারা বইপত্র পড়েন কিংবা কনটেণ্ট বানান, তাঁরা তো জানেন লেখক বা ক্রিয়েটর কীভাবে তাঁর বইয়ের কালেকশন ব্যবহার করেন। তবে এখানে আমার জীবনের একটা ঘটনা শেয়ার করি, যদিও সেটা রিসার্চ নিয়ে না। কিন্তু এই ঘটনাটা ইণ্টারনেট যখন সবার হাতে ছিল না, সেই সময়ের সাথে রিলেট করতে কাজে আসবে। বিশেষ করে বইয়ের কালেকশন কখন কিভাবে কাজে আসতে পারে সেটা বুঝতে।
আমার প্রথম এডমিশন হয় বাংলাদেশ মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে আমি কিছুকাল ওশেনোগ্রাফি বা সমুদ্রবিদ্যায় পড়াশোনা করি। সমুদ্র নিয়ে আমার আগ্রহ অবশ্য এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগে থেকেই ছিল। সেই আগ্রহ থেকে আইজ্যাক আসিমভের সমুদ্র বিষয়ক একটা বই আমি অনুবাদ করেছিলাম ২০২৩ সালের দিকে ‘যে জীবন সমুদ্রের’ নামে। তো এই আগ্রহের সুবাদে ভর্তির আরও ২-৩ বছর আগে আমার লাইব্রেরির কালেকশনে ছিল কলকাতার ‘পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষৎ’ কর্তৃক প্রকাশিত নিখিলকৃষ্ণ দে ও অজিত কুমার বেরা-র লেখা বই ‘সাগরীয় ভূগোল ও উদকবিদ্যা’ বইটি। তখনও আমি বাংলাদেশে এমন বই দেখিনি। এখন বর্তমান যুগে ইণ্টারনেট ঘাঁটলে অনায়েসেই ওশেনোগ্রাফির আগামাথা বের করে ফেলা যাবে। কিন্তু উমবের্তো একো-র সময়ে এটা সম্ভব হত না এত সহজে। ওই সময়ে নিজেকে চিন্তা করলে এই একটা বই থেকে আমি একটা আভাস পেতাম সামনের চার বছর আসলে আমি কী কী ধরণের জিনিসপত্র নিয়ে পড়াশোনা করতে যাচ্ছি। যদিও পরে আমি ওশেনোগ্রাফি নিয়ে আর পড়িনি। কিন্তু এটা আমার লাইফের সবচেয়ে সুন্দর একটা ঘটনা হয়ে থাকবে।
লাইব্রেরির এগজিস্টেন্সটাই বেনিফিশিয়াল। আমার প্রাইমারি স্কুলের লাইব্রেরি থেকে আমার বই পড়া শুরু। নানান জ্ঞানী ব্যক্তির জীবনে প্রাইভেট বা পাবলিক লাইব্রেরির অবদান অনস্বীকার্য। লাইব্রেরি নানা প্রশ্নের উত্তর তো দেয়ই, তার সাথে রিসার্চের জন্য প্রশ্নের যোগানও দেয়। যেমন, দু’টো বই বা দু’টো টপিক পাশাপাশি থাকলে আপনার মনে তাদের নিয়ে নানা প্রশ্ন খেলা করতে পারে। ধরা যাক পাশাপাশি একটা বিজ্ঞানের বই আর একটা অর্থনীতির বই দেখে আপনার মনে প্রশ্ন আসতেই পারে যে, “বিজ্ঞানের সাথে অর্থনীতির সম্পর্কটা ঠিক কেমন?” অথবা বিজ্ঞানের বইগুলো দেখে “গণিত কিংবা পদার্থবিজ্ঞানের সাথে জীববিজ্ঞানের সংযোগটা কেমন?” এই প্রশ্ন বা চিন্তা এক্টিভলি বা প্যাসিভলিও আসতে পারে লাইব্রেরিটা ঘাঁটার সময় বা দেখার সময়। ফোনে কিন্তু এই সুবিধাটা একটু কম। আবার লাইব্রেরি অনেক কিছুর সুন্দর সমাধান দেয়। যেমন ধরা যাক, কোথাও প্রেজেণ্টেশন বা বক্তৃতা দিতে হবে। এখন আপনার দরকার আইডিয়া। এই আইডিয়ার খোঁজে দেখবেন লাইব্রেরিতে তাকালে এর উত্তর পেলেও পেতে পারেন। যদিও বর্তমানে নানা অ্যাপ এবং এ.আই.-এর মাধ্যমে এসব প্রশ্ন বা আইডিয়া অনেক দ্রুত ধরা দেয়। কিন্তু নিজে এসব আবিষ্কার করার মজাটাই আলাদা।
৩
নাসিম তালেব এখানে দু’টো গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন, “Read books are far less valuable than unread ones” এবং “Indeed, the more you know, the larger the rows of unread books.” কথাদু’টো সত্য। আমার সাবস্ট্যাকে Rolf Dobelli এর The Art of Thinking Clearly বইটা পড়ার সময় আমি একটা লেখা লিখেছিলাম Unknown unknowns নিয়ে। কথাটা ইউ.এস.-এর প্রাক্তন ডিফেন্স সেক্রেটারি ডোনাল্ড রামসফিল্ড এর। তিনি বলেন, ❝There are known knowns, things we know that we know; and there are known unknowns, things that we know we don’t know. But there are also unknown unknowns, things we do not know we don’t know.❞ এই যে Known unknowns এবং unknown unknowns এই ডোমেইনের বিশাল জায়গা কিন্তু এন্টিলাইব্রেরিতে অবস্থিত। এই জন্য না পড়া বই কিন্তু পড়ে ফেলা বইয়ের থেকেও বেশি ভ্যালুয়েবল।
আবার বেশি জানার সাথে না পড়া বইয়ের সংখ্যা বাড়াটাও লজিক্যাল। কারণ পড়তে গিয়েই আসলে আমরা আমাদের নানা Known unknowns অথবা unknown unknowns আবিষ্কার করে বসি। আমরা বুঝি যে আমরা অনেক কিছুই জানি না কিংবা বুঝি না। আর এসব অজানাকে আমরা জানতে চাই, বুঝতে চাই। আর এই আগ্রহ থেকেই আমরা বই পড়ি, বই কিনি। এই যে আমরা অনেক কিছু জানি না বা বুঝি না, এ বিষয়ে যে আমরা সচেতন– এই মাইণ্ডসেটটাকে বলা হয় Epistemic Humility (এপিস্টেমিক হিউমিলিটি)। অনেককে দেখবেন কোন একটা বিষয়ে একটু বেশি পড়াশোনা করলে বা গতানুগতিক একাডেমিক্সের বাইরে দু’-একটা এক্সট্রা বইটই পড়লে ওই পড়াটার ভিত্তিতে নিজেকে বেশি জ্ঞানী ভাবে আর সেই জ্ঞানটা নিয়েই কনফিডেণ্ট থাকে। এই সীমিত জ্ঞান নিয়েই তার মধ্যে একপ্রকার আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়। সে মনে করে যে বিষয়টা সে বোঝে। কিন্তু অনেক সময় এটা সে খেয়াল করে না যে তার জানা জ্ঞানটি সীমিত, অসম্পূর্ণ কিংবা ভুলও হতে পারে। এটা কিন্তু একটা ইলিউশন। এখানে একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন যে, কোন বিষয়ে প্রকৃত বিশেষজ্ঞদের ক্ষেত্রে এটা বলা হচ্ছে না। বরং একজন প্রকৃত বিশেষজ্ঞও চাইলে এপিস্টেমিক হিউমিলিটির অধিকারী হতে পারেন। অনেকক্ষেত্রেই দেখা যায় সত্যিকারের বিশেষজ্ঞরা তাদের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে বেশি সচেতন থাকেন। জ্ঞানের এই সীমাবদ্ধতা নিয়ে সচেতন থাকার দিকটা এপিস্টেমিক হিউমিলিটিকে প্রমোট করে। আফটার অল, ডাউট থেকেই জ্ঞানের শুরু।
কম জেনেও বেশি জানার নাটক ভাল কিছু বয়ে আনে না। এই নাটকের ফলে জ্ঞানের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। আমার কিছু একটা নিয়ে পড়া হয়ে গিয়েছে, জানা হয়ে গিয়েছে – এর মানে আমার জানার দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়া। বরং এর উল্টোটা লাভজনক। যদি স্বীকার করা যায়, আমি আসলেই জানি না বা আমার আরও জানার আছে, তাহলে তার মন খোলা থাকে শেখার জন্য এবং সে আসলেই শিখতে পারে। এপিক্টেটাস তো সরাসরি বলেই দিয়েছেন, “It is impossible to learn that which one thinks one already knows.” আমরা দেখেছি, “I know that I know nothing” বলে আমাদের সক্রেটিস অনেক কিছুই জেনে ফেলেছেন। এটা হ’ল এনলাইটেড ইগনোরেন্স। এপিস্টেমিক হিউমিলিটির শিক্ষাটা এখানেই। এটা আমাদের ওভারকনফিডেন্স আর কনফার্মেশন বায়াস থেকে সরাসরি রক্ষা করে। নাসিম তালেব এটা নিয়েও সতর্ক করেছেন। আমরা স্বভাবতই যা জানি, সেটা নিয়ে একটু বেশিই কনফিডেণ্ট থাকি বা গুরুত্ব দিই। ফলে অজানা দিকটাকে খুব একটা গুরুত্ব দিই না বা দিতে চাই না।
এপিস্টেমিক হিউমিলিটির একটা সুন্দর বাইপ্রোডাক্ট আছে। এটা আমাদের গুড লিসেনার বা এক্টিভ লিসেনার হতে সাহায্য করে। কারও সাথে কথা বলতে গিয়ে যদি আমরা নিজের বেশি জ্ঞানী বা পণ্ডিত না ভেবে (অনেককে দেখবেন কথায় কথায় জ্ঞান জাহির করতে চায়) যার সাথে কথা বলছি, তার থেকে অজানা কিছু শেখার আছে ভেবে কথা বলতে বসি, তাহলে দিনের শেষে মানুষের থেকে শেখার সম্ভাবনাই বেশি। এপিস্টেমিক হিউমিলিটি আবার আমাদের ড্যানিং-ক্রুগার এফেক্ট থেকেও রক্ষা করে।
এখানে আরেকটা বিষয় মনে এল। অনেক সময় অনেকেই ক্লাসের মধ্যে শিক্ষককে প্রশ্ন করে, তাদের ভাষায় বাজানোর জন্য বা বাজিয়ে দেখার জন্য। এটা হয়ত কোন শিক্ষার্থী করে মাঝেমধ্যে যদি ঐ টপিকে সে একটা বা দুটো বিষয় একটু বেশি জানে। পরে শিক্ষক সরাসরি শিক্ষার্থী যা জানে তার মত হুবহু উত্তর না দিলে, শিক্ষার্থীটা যে প্রশ্নের উত্তর জানে এটা প্রচার করে হয়ত স্মার্ট সাজতে চায়। অথবা ভিতরে ভিতরে বেশি জানার ফিল নিতে চায়। এখানে এই দুই-একটা লাইন বেশি জানার ফলে যে ফেক কনফিডেন্স বা ইলিউশন তৈরি হয়, এর ফলে সে আসলে শিক্ষকের কালেকটিভ জ্ঞানকে অবজ্ঞা করে। এর কারণ ওই বিষয়ে পাঠদানকারী শিক্ষক তাঁর জীবন ও জ্ঞানের অভিজ্ঞতা ও নানা দিক বিবেচনা করে বা ইণ্টিগ্রেট করে সেই প্রশ্নের উত্তর চিন্তা করেন। এটা শিক্ষার্থীর ঐ দুই লাইনের বেশি জানার উত্তর না হলেও প্রসেসটায় ঠিকই শিক্ষার্থীর জন্য অনেক অজানা কিছু থেকে যায়। কিন্তু শিক্ষার্থী বিষয়টা অনেক সময় বুঝতেও পারে না, কারণ সে তার জানা উত্তর নিয়ে কনফিডেণ্ট বা জানার একটা ইলিউশনে থাকে। সে ভাবে তারা জানাটাই ঠিক, ভিন্ন কিছু বা অজানা কিছু নেই তার। অথচ শিক্ষক বিষয়টা দুই লাইন জানা নিয়ে ডিল করেন না। আর শিক্ষার্থীও হয়ত এই দুই লাইন শুধুই জানে, বোঝে না। এই কারণে সীমিত জ্ঞান থেকে তৈরি হওয়া অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস অনেক সময় আমাদের অন্যের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও সমন্বিত জ্ঞানকে অবমূল্যায়ন করতে প্ররোচিত করে। নিজের জানাটা যে ভুল হতে পারে, সেটাও একটা পর্দায় ঢেকে ফেলে। আর এখানেই এপিস্টেমিক হিউমিলিটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জানার পরিমাণ যতই বাড়ুক, নিজের জ্ঞানের সীমা সম্পর্কে সচেতন থাকা প্রয়োজন।
না-পড়া বইগুলো পড়া ও সেসব বই সম্পর্কে জানার মধ্যে দিয়ে আমরা আমাদের নিজের জ্ঞানের সীমা সম্পর্কে সচেতন থাকতে পারি। বিজ্ঞানী রিচার্ড ফাইনম্যানও জ্ঞানের সীমা ও ধোঁকা নিয়ে সতর্ক করে করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “The first principle is that you must not fool yourself and you are the easiest person to fool.” ফাইনম্যানের ভাষ্যে, বোকা না হতে চাইলে দরকার এপিস্টেমিক হিউমিলিটির চর্চা। ‘আমি জানি না’ বলা, কিউরিয়াস থাকা, সেল্ফ রিফ্লেকশন, ডাউট করা, ফাইনম্যান টেকনিক, সক্রেটিক মেথড – এগুলোর মাধ্যমে এর চর্চা করা যায়। আমার পড়ার টেবিলের সামনে দু’টো কোট আমি টাঙিয়ে রেখেছি। তার মধ্যে ফাইনম্যানেরটা একটা। এটা আমার জন্য রিমাইণ্ডার হিসেবে কাজ করে।
৪
Epistemic humility হ’ল Intellectual humility-এর একটা অংশ। ইণ্টেলেকচুয়াল হিউমিলিটি আসলে বড় টার্ম। এটা অনেকটা বাস্তব জীবনের আচার-আচরণের সাথে কানেক্টেড। মানে এটা একটা ভার্চু। অনেককে দেখবেন যে, তিনি মনে করেন তাঁর চেয়ে জ্ঞানী বা বেশি জানেন এমন কেউ নেই, সবাই ওনার চেয়ে কম জানেন। আবার তিনি যা জানেন সেটাই ঠিক এবং বাকিরা ভুল জানেন বা বোঝেন। ওনার জানায় যে ভুল থাকতে পারে বা উনি যে আসলেই ভুল করেছেন, সেটা তিনি স্বীকার করতে চান না। অনেক ক্ষেত্রে সেটা হয়ত অনুধাবনও করেন না। এটা হয় ইণ্টেলেকচুয়াল হিউমিলিটির অভাবে।
এই টার্মটার সাথে আমার অনেক দেরিতে পরিচয় হলেও এর মূল বিষয়টার সাথে আমার পরিচয় ঘটে অনেক বছর আগে। ছোট থাকতে যখন আমি স্টিফেন হকিংয়ের বিখ্যাত ‘A Brief History of Time’ বইটার অনুবাদ পড়ি, সেখানে তিনি উদাহরণসহ ভাবে বিষয়টা তুলে ধরেছিলেন এভাবে— “Some people never admit that they are wrong and continue to find new, and often mutually inconsistent, arguments to support their case – as Eddington did in opposing black hole theory. Others claim to have never really supported the incorrect view in the first place or, if they did, it was only to show that it was inconsistent. It seems to me much better and less confusing if you admit in print that you were wrong. A good example of this was Einstein, who called the cosmological constant, which he introduced when he was trying to make a static model of the universe, the biggest mistake of his life.”
নিজের বা পুরাতন আইডিয়া, মডেল কিংবা থিওরিকে চ্যালেঞ্জ করে এমন নতুন আইডিয়া গ্রহণের মনোভাব, কোন একটা আর্গুমেণ্টে বা বিতর্কে জেতার চেয়ে শেখাকে প্রাধান্য দেয়া, কেউ যখন দ্বিমত প্রকাশ করে তখন সেটা মন দিয়ে শোনা ও সম্মানের সাথে কারণটা বোঝার চেষ্টা করা, ক্রিটিক বা সমালোচনা গ্রহণ করতে পারা, নিজে কোন ভুল করলে সেটাকেই ঠিক ভেবে জেদ ধরে বসে না থেকে ভুলটা স্বীকার করা— এগুলো সব ইণ্টেলেকচুয়াল হিউমিলিটির উদাহরণ।
অন্যের সাথে কথোপকথনের সময় মাইণ্ড ওপেন থাকা যেমন দরকারি, তেমনই এটা দরকার বই পাঠের সময়ও। কারণ বই পড়ার সময়ই নতুন আইডিয়া, পুরনো আইডিয়াকে চ্যালেঞ্জ কিংবা ভিন্ন দিক থেকে আর্গুমেণ্টের দেখা মেলে। না-পড়া বইতে এদের সংখ্যা স্বভাবত বেশি। ফলে বইয়ের সাথে রক্তারক্তি পাঠের সময় ইণ্টেলেকচুয়াল হিউমিলিটি না থাকলে লার্নিংটা হয় না। সব বইয়ের ক্ষেত্রে না হ’লেও ভাল বই পড়ার আগে ও পরে মানুষ একই থাকে কীভাবে? বই পড়া নিয়ে আস্ত একটি ক্লাসিক বই লিখে ফেলা দার্শনিক Mortimer Adler-এর থেকে ধার করে বলতে হয়, “In the case of good books, the point is not to see how many of them you can get through, but rather how many can get through to you.” এই রক্তারক্তি পাঠের সময় যদি হেরে যান তাতে ক্ষতি নেই, কারণ এই প্রসেসের মধ্যদিয়েই জ্ঞানলাভ হয়, মানুষ পাল্টায় নিজেকে। এপিকুরোস বলেছিলেন, “In a philosophical dispute, he gains most who is defeated, since he learns most.” এই একটা জায়গাতে হেরে গিয়েও জিতে যাওয়া যায়। Epistemic আর Intellectual humility আমাদের ইগো বাড়তে দেয় না, এই দু’টোই ইগোর সাথে ফাইট করে। আর এই ফাইটটা দরকারি। কারণ রায়ান হলিডের ভাষায় যদি বলি, “ego is the enemy.” ইগো আমাদের জ্ঞান অর্জনে বাধা দেয়, ওভারকনফিডেণ্ট করে তোলে, জীবনে উন্নতির পথে বাধা দেয়।
এইটুকু পড়ে মনে হতে পারে, কেউ বোধকরি বেশি বইটই পড়লে ইণ্টেলেকচুয়াল হিউমিলিটি অর্জন করে ফেলবেন। কিন্তু তা নয়। এমনটা হ’লে ছোটবেলায় নীতিবাক্য পড়ে পৃথিবীতে আর কোন মন্দ লোক থাকত না। বই আসলে একটা টুল। খারাপ কিংবা ডিজঅনেস্ট মানুষও অনেক বই পড়েন। বই পড়ে সেই পড়া কাজেও লাগান। একাডেমিয়াতে কিংবা বাস্তব জীবনেও আমরা নানাবিধ খারাপ কাজ হতে দেখি এদের দ্বারা। কিন্তু ইণ্টেলেকচুয়াল হিউমিলিটি হ’ল একটা ভার্চু। আর সেই ভার্চু আসে সেল্ফ রিফ্লেকশন বা রিয়েলাইজেশন, চর্চা, অভ্যাস – এইসবের মাধ্যমে। শুধু বই পড়লেঈ নিজের থেকে ভার্চু জন্মাবে না। ভার্চু নিজেকেই কালটিভেট করতে হয়। তবে বই এখানে ক্যাটালিস্ট হিসেবে কাজ করে। একটা ভাল পরিবেশ কিংবা প্রয়োজনীয় নানান উপাদান বই দিতে পারে। আগে থেকে এই ভার্চুটা অল্পস্বল্প থাকলে বই পড়ার অভ্যাস সেটাকে এমপ্লিফাই করে।
আবার কারও Epistemic humility থাকলেও Intellectual humility না থাকতে পারে বা খুবই কম থাকতে পারে। এটার উদাহরণ হিসেবে নিউটনকে টেনে আনা যায়। উনার সাথে লাইবনিৎস কিংবা রবার্ট হুকের ইণ্টার্যাকশন নিয়ে অনেকেরই জানা। নিউটন ক্রিটিসিজম নিতে পারতেন না একদমই। ওনাকে কেউ ক্রিটিক করলে শত্রু বানিয়ে ফেলতেন আর পার্সোনাল এটাক করতেন। নিউটনকে গ্রেটেস্ট সায়েণ্টিস্ট অব অল টাইম হিসেবে ধরা যায়। অথচ কেউ জ্ঞানী হ’লেই যে এই ভার্চু থাকবে না, এটার উদাহরণ নিউটন নিজেই।
এই ভার্চুর চর্চা প্র্যাক্টিক্যালি দেখানো যায় স্টোয়িসিজম বা স্টোয়িক দর্শন দিয়ে। তবে শুধু যে স্টোয়িসিজম দিয়েই দেখা যায়, এমনটা নয়। স্টোয়িসিজম একটা প্র্যাক্টিক্যাল ফিলোজফি। স্টোয়িকদের চারটা কোর কার্ডিনাল ভার্চু আছে। তাদের মতে সকল ভার্চু আসলে উইজডমের ভিন্ন একটা রূপ। এই ভার্চু চারটি হ’ল উইজডম, কারেজ, জাস্টিস এবং টেম্পারেন্স। স্টোয়িকদের এই ভার্চু চারটি এমনভাবে যুক্ত যে, চর্চা করতে হ’লে চারটিই একত্রে করতে হবে, একটা বাদ দিয়ে অন্যটা হবে না। যেমন ধরুন, আপনি যদি জ্ঞান বা বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে মানুষকে ঠকান, তাহলে তো জাস্টিস হ’ল না। আর মানুষকে যদি আপনি ঠকান, তাহলে আপনার ট্রু উইজডম নেই।
ইণ্টেলেকচুয়াল হিউমিলিটি এই চারটি কোর ভার্চুর সাথে যায়। উইজডমের বিষয়টা এখানে এপিস্টেমিক হিউমিলিটির মত। আর এপিস্টেমিক হিউমিলিটি তো ইণ্টেলেকচুয়াল হিউমিলিটির অংশ। তবে স্টোয়িকদের মতে উইজডম শুধুমাত্র এটা নয়। এর পরিধি বিশাল। কারেজ বা সাহস এখানে লাগে নিজের ভুল বা জানা-বোঝার লিমিট স্বীকার করতে বা বুঝতে। জাস্টিস এখানে ‘অন্যের কথা বা মত শুনতে না চাওয়া’ বা ‘ঠিকমত না শুনে বা না বুঝেই অন্যের কথাটা ভুল’ এই মাইণ্ডসেট থেকে রক্ষা করে। আপনি কারও কথা ঠিকঠাক না শুনেই তাকে বাদ দিয়ে দিলে বা অবজ্ঞা করলে সেটা তো জাস্টিস বা ন্যায় হ’ল না। পরিশেষে, টেম্পারেন্স বা মিতাচার। এক্ষেত্রে এটা হ’ল ইগো বা প্রাইডের লাগাম ধরে রাখা। কেউ দ্বিমত হ’লে ক্ষেপে না ওঠা, নিজে দ্বিমত হ’লে তা বলার সময় আক্রমণাত্মক না হওয়া। অর্থাৎ এর মানে হ’ল আত্মনিয়ন্ত্রণে থাকা। তো, কেউ যদি স্টোয়িক ভার্চুগুলোর চর্চা করে, তাহলে ধীরে ধীরে নিজেই ইণ্টেলেকচুয়াল হিউমিলিটি কালটিভেট করতে পারবেন। উপরে এপিক্টেটাসের কথা বলেছিলাম। তিনিও কিন্তু একজন স্টোয়িক দার্শনিক।
৫
নাসিম তালেব এখানে এন্টিলাইব্রেরি বলতে লাইব্রেরির কালেকশনে থাকা যেসব বই এখনও পড়া হয়নি তাদের বুঝিয়েছেন। এই অর্থে আবার আমার ঘরের বুকশেলফটা একটা প্রকৃত এন্টিলাইব্রেরি। আসলে লাইব্রেরি না বলে বুকশেলফ অর্থাৎ এন্টিবুকশেলফ বলা উচিত। কারণ লাইব্রেরি একটা বিশাল জায়গা নিয়ে আলাদা জায়গায় হয়।
আমরটা প্রকৃত এন্টিবুকশেলফ বলার কারণ আমার দু’টো বুকশেলফ। একটা বড়, একটা ছোট। বড়টা অন্য ঘরে। বড় বুকশেলফে সাধারণত তিন ধরণের বই থাকে – ১. আমার পড়া হয়ে গিয়েছে, ২. সেসব বই, যেগুলো আমি আরও অনেক বছর পর ধরব বা অন্য কোন বই আগে শেষ করে তারপর এদের ধরব, ৩. রেফারেন্স বুক। বড় বুকশেলফ থেকে আগ্রহ ও প্রায়োরিটির ভিত্তিতে আমি কিউরেট করে ছোট বুকশেলফে নিয়ে আসি। আর এখানে যেহেতু পড়া হয়নি এমন সব বই অবস্থান করছে, সুতরাং আমার এটা একটা এন্টিবুকশেলফ।
এন্টিলাইব্রেরির মত আমার এই এন্টিবুকশেলফও আমাকে Epistemically & Intellectually humiliate করে। এই এন্টিবুকশেলফের দিকে তাকালে আমার স্মরণ হয় জীবন আসলে কত ছোট এবং এই ছোট জীবনে কত অজানা! কার্ল সেগানের কথা মনে পড়ে যায়। কসমসে তিনি বলেছিলেন, “If I were to read a book a week for my entire adult lifetime, and I lived an ordinary lifetime, when I was all done, I would have read maybe a few thousand books, no more….The trick is to know which books to read.” তিনি একটা ট্রিকও বলে দিয়েছেন। তবুও পড়া যাবে মাত্র a few thousand books! অথচ আমরা জানি এই a few thousand books নিয়ে আসবে আরও thousand books। অর্থাৎ এন্টিলাইব্রেরি কখনও ফুরাবে না।
না ফুরাক এন্টিলাইব্রেরি কিংবা আমার এই এন্টিবুকশেলফ। তাতে দুঃখ নেই। তবে প্রতি যুগেরই হয়ত নিজস্ব একটা বেদনা থাকে। আগে জন্মানোর বেদনা— আমার পরে মানুষ যা জানবে কিংবা বুঝবে আমার তা জানা-বোঝা হবে না। পরে জন্মানোর বেদনা— আমার পূর্বসূরিরা এত বেশি রেখে গিয়েছেন যে আমার এক জীবনে সময় নেই সব আত্মস্থ করার। তবুও যদি কোন এক যুগে কেউ একজন আসলেই জেনে যায়, বুঝে যায় সবকিছু, আমার মনে হয়, আমি হয়ত জানি তার পরবর্তী প্রশ্নটি হবে, “আমি যা কিছু জানি, যা কিছু বুঝি, তা কি ঠিকঠাক জানি? ঠিকঠাক বুঝি?”
লেখক পরিচিতি : হৃদয় হক
সময়ে অসময়ে লিখি আমি। লিখি আগ্রহের বিষয়গুলো নিয়ে। প্রকাশিত গ্রন্থ: আকাশজোড়া গল্পগাথা, যে জীবন সমুদ্রের (অনুবাদ)

