হাবুকথা : যদি ভালবাসা নাই থাকে

লেখক : রাজীব চক্রবর্ত্তী

লাইনটা শুনলেই মনে পড়ে যায় হাবুকে। সাড়ে পাঁচ ফুট লম্বা, রোগা চেহারা। মুখটা লম্বাটে আর মাথায় কোঁচকানো চুল। বড় গোল গোল চোখ দুটো যেন গরুর গাড়ির হেডলাইট। কুড়ি বছর আগে আমরা যখন সদ্য বিশের কোঠায়, পাড়ার দাদাদের কথায় হাবু তখন পুরো বিষ মাল। সর্বক্ষণের সঙ্গী বিড়ি তো ছিলই এছাড়া আরও নানা শুকনো নিষিদ্ধ বস্তুর সাথে ওর সখ্যতা ছিল। বন্ধুরা ওকে দেখলেই বলে উঠত, এসে গেছেন নেশার জগতের বেতাজ বাদশা। চিমসে শরীরে বুকের সব ক’টা হাড় গোনা যেত। পাড়ার ব্যানার্জী ডাক্তার মজা করে বলত, তোর বুকের এক্স-রে করার দরকার নেই। ফটো তুলে ফিল্মের নেগেটিভ দেখলেই সব বোঝা যাবে। হাবুও ছাড়ার পাত্র নয়। সঙ্গে সঙ্গে উত্তর, সাবান খরচাও কম লাগে ডাক্তারবাবু। বুকে মাখলে পিঠ দিয়ে ফেনা বেরোয়।

হাবুর আগে সাধারনত কেউ আসত না আড্ডায়। যত আগেই আসি রোজ একই দৃশ্য। রকের কোনটা দখল করে বাবু হয়ে বসে বিড়ি টানছে। দুর্ঘটনাবশতঃ হাবুর কোনও দিন আসতে দেরি হলে কেউ কিছু বলার আগেই ফিল্মি ষ্টাইলে বলে উঠত, ম্যায় দের করতা নেহি …..।এটাকে কেউ অজুহাত বললেই হাবুর যুক্তিরা ফর্‌ফর করে ডানা মেলত। আমি কি আর দেরি করি, দেরি হয়ে যায়। দেরি করাটা কারোর হাতে থাকে না বুঝলি। ধর তুই এক মিনিট দেরিতে ষ্টেশনে পৌঁছালি, ট্রেনটা চোখের সামনে দিয়ে ঠিক সময়ে চলে গেল। তোর দেরি হয়ে গেল। কোনদিন পাঁচ মিনিট দেরিতে পৌঁছে শুনলি ট্রেন দশ মিনিট লেট। ব্যস, আনন্দ আর ধরে না। দেরি হওয়া থেকে বেঁচে গেলি। আবার ধর সময় মত ষ্টেশনে পৌঁছালি কিন্তু ট্রেন দেরি করে এল। তাহলে কি দাঁড়াল? আমরা আর ধরতে পারতাম না। সকলে রে রে করে উঠতাম। হাবু কিন্তু নির্বিকারভাবে বলে যেত, মোদ্দা কথা দেরি করাটা আমাদের নিজেদের হাতে নেই।

সত্যিই দেরি করা হাবুর ধাতে ছিল না। ফলে সময়ের আগেই পেঁকেছিল। মাধ্যমিকের প্রস্তুতি নিতে নিতেই বিড়ি টানা শুরু করে দেয়। আর মাথার খোপে খোপে থরো নলেজ নিয়ে দুবারে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পর কয়েক মাস কলেজ গিয়েই, হাফ ছেড়ে বলল, না আর দেরি করা উচিত হবে না। পড়াশুনা ছেড়ে এবার পয়সা কামানোর ধান্দা করতে হবে।

কয়েক দিন পর দেখি ফুলবাবুটি হয়ে হাতে ব্যাগ নিয়ে সকালবেলাই হাবু কোথায় একটা যাচ্ছে। জিজ্ঞেস করতেই বলল, কাজে যাচ্ছি। দেরি হয়ে যাবে। পরে কথা বলব। সন্ধ্যেবেলা যথারীতি সবার আগে ঠেকে হাজির। কাজের কথা তুলতেই বলে, মার্কেটিং এর কাজ। ওসব তোরা বুঝবি না। নিন্দুকদের মতে, হাবু ট্রেনে ধুপিকাঠি বিক্রি করত। আমরা অত বুঝতাম না। ভাবতাম যাই করুক, সৎ পথে খেটে তো কামাচ্ছে। মাস খানেক পরে হাবু একদিন বলল, বুঝলি মার্কেটিং এর কাজটা পোষালো না। ছেড়ে দিলাম। এখন অ্যাকাউন্টসের কাজ নিয়েছি। দশটা – পাঁচটার ডিউটি। পরে শুনেছিলাম বড়বাজারে একটা দোকানে খুচরো ক্যাশের হিসাব রাখার কাজ করে।

কোন কাজই হাবুর বেশিদিন পোষাত না। একটা ধরে একটা ছাড়ে। এমন ধরা ছাড়া করতে করতেই শ্রীমান একদিন এক অষ্টাদশীকে বাগিয়ে ফেললেন। হাবু কখনো রোজগেরে কখনো বেকার। তাতে অবশ্য হাবুর প্রেমের জোয়ারে ভাটা পড়ল না। ক্রমে ক্রমে প্রেমের ঢেউ এত প্রবল হলে যে দূরের পার্ক , রাস্তার মোড় ছাড়িয়ে পাড়ার গলিতে এসে আছড়ে পড়ল। টিমটিমে আলোর আধো অন্ধকারে যুগল মুর্তি যত্র তত্র  দৃশ্যমান হত। পাড়ার দাদারা বলত সে দৃশ্যে মদন দেবের প্রভাব এতই বেশি যে চক্ষু পীড়ার কারণ হত। ফলত: রাস্তায় এদিক ওদিক ঘাড় ঘোরানো যেত না। টাট্টু ঘোড়ার মত টগবগ করে সোজা হাটতে হত। রকের ফাজিল ছোড়ারা অবশ্য বলত যেসব দাদাদের আঙুল বিড়ির বদলে এখনও কোনও চাপা কলির স্পর্শ পায় নি তাদেরই হাবুকে নিয়ে বেশি মাথা ব্যথা ছিল।

হাবুর প্রেম লীলা আরও উচ্চমার্গে পৌঁছলে মদন-রতি দুই জনেই আবির্ভুত হলেন। তাদের আমন্ত্রনে হাবু প্রেমিকাকে নিয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে গেল। দুদিন পর যখন সমুদ্র সৈকত থেকে জলকেলি করে ফিরল, পাড়ার চায়ের দোকান, রক থেকে শুরু করে বাড়ির সান্ধ্য চায়ের আসরে ঝালমুড়ির অভাব পূরন করল প্রেমিক যুগলকে নিয়ে আলোচনা। সেসব আলোচনায় যে পরিমাণ আদি রসের ধারা প্রবাহিত হয়েছিল তাতে বড়ু চন্ডিদাস এ যুগে জন্মালে আর শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন লেখার সাহস করতেন না। আদি রসের ফল্গুধারা স্রোতস্বিনী হবার আগেই দুই বাড়ির অভিভাবকরা মা কালীর স্মরণাপন্ন হলেন। সপ্তাহ ঘুরতে না ঘুরতেই হাবু কালীঘাট থেকে গলায় মালা ঝুলিয়ে বউ নিয়ে বুক ফুলিয়ে পাড়ায় ঢুকল।

মধু চন্দ্রিমা বিয়ের আগেই সেরে ফেলায় হাবু আর নতুন বউকে নিয়ে বেড়াতে গিয়ে পয়সা নষ্ট করা উচিত মনে করে নি। যদিও তার সে রেস্ত ছিল বলেও মনে হয় না। মাথা গোঁজার জন্য ছিল ভাঙা একতলা পৈত্রিক বাড়িটা।  আর রোজগার বলতে সিজিনাল সার্ভিসিং জব মানে ক্যাটারিঙের সার্ভিস বয়। দুজনের ভাতের যোগানের জন্য দুবেলা বাপের হোটেলই ছিল ভরসা।

বছর ঘুরতে না ঘুরতেই বউ পুরোনো হয়ে গেল। প্রেমট্রেম সব ধোঁয়া হয়ে হাওয়ায় মিলিয়ে গিয়ে হাবুর কথা অনুযায়ী জীবনটা পেঁপে গাছ হয়ে উঠল। বড় করে বিড়িতে টান মেরে এক মুখ ধোঁয়া ছেড়ে চোখ কুঁচকে বলল , জীবনে ঘেন্না ধরে গেল মাইরি। সেকথা শুনে একজন বলল – সে কিরে , এত তাড়াতাড়ি? সঙ্গে সঙ্গে আরেক জন ফোড়ন কাটল, জানিস না হাবুর কোন কাজে দেরি নেই। কোনদিন যা হয় নি, কয়েক দিন পরে তাই হল। পরপর দুদিন হাবুর দেখা নেই। আড্ডার মূল বিষয় হয়ে উঠল হাবুর অনুপস্থিতির কারণ। কত রকম আলোচনা ! কেউ বলল হাবু বউকে নিয়ে শ্বশুর বাড়ি গেছে। কেউ আবার হাবুকে দ্বিতীয় বার হনিমুনে পাঠিয়ে দিল। বাকিরা আত্মবিশ্বাসের সাথে বুক ঠুকে বলল, ওসব কিচ্ছু না। বউয়ের হাতে ঠেঙানি খেয়ে আর উঠতে পারছে না।

তৃতীয় দিনেও হাবু না আসায় সবাই চিন্তিত হয়ে পড়ল। গুরুতর কিছু একটা হয়েছে বুঝতে পারলেও খোঁজ নিতে সাহস হল না। হাবুর বাবা খুব গম্ভীর প্রকৃতির। হাবু এখন যাবে না , কিংবা ও  বাড়ি নেই – এইরকম দু একটা কথা ছাড়া খুব বেশি কথা আমরা কোনদিন শুনি নি। তবে ভয়ের আসল কারণ ছিল হাবুর দাদু। মাথা ভরা টাক , সাদা গোঁফ দাড়িতে মুখ ঢাকা বুড়োটাকে দেখলেই সুকুমার রায়ের কাঠবুড়োর কথা মনে পড়ত। আমাদের গলা শুনলেই বুড়ো তেলেবেগুনে জ্বলে উঠত। খিটখিটে বুড়োটাকে দেখলে মনে হত আমাদের মাথা সেদ্ধ করে চেটে চেটে খেলে তবেই শান্তি পাবে। হাবুর বিয়ের পরে তো আমাদের দেখলেই লাঠি নিয়ে তেড়ে আসত। বুড়োর ধারণা ছিল তার গুনধর নাতির অকাল পক্কতার জন্য আমরাই দায়ী।

প্রায় ঘন্টাখানেক আলোচনার পরেও সমস্যা সমাধানের কোন রাস্তা না পেয়ে আমরা যখন হাল ছেড়ে দিয়েছি তখন দেখি হাবু আসছে। ওর নিজস্ব ষ্টাইল অর্থাৎ বড় বড় পায়ে সামনে ঝুঁকে নয়। ধীর পদক্ষেপে হেলে দুলে। বুকের বোতামটাও আটকানো। গলায় একটা রুমাল বাঁধা। রকে বসতে বসতে বলল, অতি কষ্টে জেলখানা থেকে ছাড়া পেলাম। কেউ একটা বিড়ি খাওয়া। আমরা মুখ চাওয়া চাওয়ি করছি। বলে কি? হাবু তো বিড়ির গুদাম। ভাত না হলেও চলে, কিন্তু বিড়ি ছাড়া যার চলে না তার কাছে ষ্টক নেই! বিড়ি ধরিয়ে লম্বা একটা টান দিয়ে এক মুখ ধোঁয়া ছেড়ে গম্ভীর গলায় দার্শনিক ষ্টাইলে বলল, বলেছিলাম না অন্যে সময় মত কাজ করলে অনেক সময় দেরি হয়ে যায়। হাবুর হেঁয়ালি মার্কা কথা শুনে বিরক্ত হয়ে সমস্বরে প্রশ্নবান, গলায় রুমাল বেঁধেছিস কেন? কি হয়েছে খুলে বলবি নাকি…. । দাবড়ানি খেয়ে হাবু শুরু করল , বলেছিলাম না রোজ রোজ ক্যাচাল আর ভাল্লাগে না। সেদিন রাত্রে হেভি খিচাইন হল। তারপর হাবু যা বলল শুনে আমরা একদম চুপ।

রাত্রে বাড়ি ফিরতেই শুটকি সুন্দরী (হাবু বউকে আদর করে এই নামে ডাকত) পঞ্চাশ টাকা চেয়ে বসে। হাবুর মাথায় বাজ ভেঙে পড়ল। একে পকেটে মাল্লু নেই। তার ওপর এত টাকা! গরম নিয়ে বলে , টাকা কি গাছে ফলে? এতো আমার দুদিনের রোজগার। ব্যস শুরু হল আকাশ ভাঙা বৃষ্টি। একটা কথাতেই বউয়ের দুচোখ দিয়ে কর্পোরেশনের মুখ ভাঙা কলের মত জল পড়তে শুরু করল। ধীরে ধীরে জল শেষ হয়ে একটু ফোঁপানি , তারপরেই প্রতি আক্রমণ। ফাঁটা কাঁসর ঘন্টা বাজতে লাগল চারিদিকে। হাবুও পুরুষ সিংহ। খাঁচা বেড় করা বুকের ভেতর থেকে বজ্র হুংকার ছাড়ল। দু পক্ষের বাক্যবাণে দশ বাই দশ ঘরটা হয়ে উঠল কুরুক্ষেত্রের প্রান্তর। সূর্যাস্তের পূর্বে মানে সূর্যোদয়ের বেশ কিছু আগে মধ্যরাতে যুদ্ধ বিরিতি হল।

ভোর রাতে হাবুর ঘুম ভেঙে যায়। পাশ ফিরে দেখে রণক্লান্ত বউ অকাতরে ঘুমাচ্ছে। বউয়ের দিকে তাকাতেই লড়াইয়ের শেষ পর্বে বলা কাথাগুলো হাবুর মনে পড়ে গেল। যে বউকে সুখে রাখতে পারে না, তার মরে যাওয়াই ভাল। হাবু ঘরের ছাদের দিকে তাকাল। সেখান থেকে কে যেন তাকে ইশারায় ডাকছে। কানে গান ভেসে এল, “ফাঁসির মঞ্চে গেয়ে গেল যাঁরা জীবনের জয়গান …”। ডাক যখন এসেই গেছে আর দেরি কেন! হাবু উঠে লুঙ্গিটাকে গলায় জড়িয়ে নিল। পাখা বন্ধ করে লুঙ্গির আরেক প্রান্ত পাখার ব্লেডের সাথে পেচিয়ে সবে ঝুলে পড়ার চেষ্টা করেছে , বউয়ের ঘুম ভেঙে গেল। লাফিয়ে উঠে হাবুর পা দুটো জড়িয়ে ধরল। মটকাতে গিয়েও ঘাড়টা বেঁচে গেল।

সবাই হাবুর দিকে দেখছি। কেউ কোন কথা বলছে না দেখে হাবুই নিরবতা ভাঙল। কি ভাবছিস , ঢপ মারছি? রুমালটা সরিয়ে ঘাড়ের কাছের কালশিটে দাগটা দেখিয়ে বলল, জীবনের দৌড় শেষ করেই ফেলেছিলাম। বউটা দেরি করিয়ে দিল। এই দুদিন ঘরের মধ্যে আটকে মাথার দিব্যি দিয়ে অনেক বোঝাল। সত্যি বলছি , বিয়ের পর এই প্রথম এত ভাল ভাল কথা শুনলাম। আমিও সেন্টু খেয়ে প্রমিস করে দিয়েছি , যা হয়েছে ভুলে যাও। আর কখনো হবে না। নতুন জীবন শুরু করব। মেয়েটা আমাকে সত্যিই ভালবাসে। চলি রে। এক ঘন্টার মধ্যে ফিরব কথা দিয়েছি। রক থেকে নেমে বিড়িটা পা দিয়ে মাটিতে পিষে বলল, ভালবাসা না থাকলে স্বপ্ন দেখা যায় না বুঝলি।

ছবিঃ রুবাই শুভজিত ঘোষ


লেখক পরিচিতি : রাজীব চক্রবর্ত্তী
জন্ম ১৯৭০ সালের ৩০শে ডিসেম্বর, কলকাতার সিঁথিতে। পেশায় কেন্দ্রীয় সরকারী কর্মচারী। দৈনন্দিনতার ক্লান্তি কাটাতেই মূলত: কলম ধরা। বেশ কয়েকটি লিট্ল ম্যাগাজিনে লিখেছেন গল্প, কবিতা। ২০১৭ সালে প্রকাশিত "সংশ্লেষ" নামক গদ্য সংকলনে স্থান পেয়েছে তাঁর মুক্তগদ্য। ঐ একই বছরে সোনারপুর কাব্যমঞ্চ আয়োজিত স্বরচিত কবিতা প্রতিযোগিতায় তৃতীয় স্থান লাভ করেন তিনি। ২০১৯ সালে প্রকাশিত "অন্য গদ্য" গ্রন্থে স্থান পেয়েছে তাঁর গদ্য। জীবনের বিবিধ অনুভূতি, বাস্তবতাকে ছন্দে বাঁধার প্রয়াসে তাঁর কবিতাচর্চা।

শেয়ার করে বন্ধুদেরও পড়ার সুযোগ করে দিন
  •  
  •  
  •  
  •  

2 Comments

  1. Swapan Nag

    ভালো গদ্য সেটাই, যা পড়তে শুরু করলে পাঠক শেষ না করে পারে না। হাবুকে নিয়ে এ গদ্যটিও তেমনই। রাজীবকে অজস্র ধন্যবাদ, এমন মনমরা দিনে একটু টাটকা অক্সিজেনের মত গদ্য উপহার দেয়ার জন্য।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।