মুক্তি

লেখক : জয়দীপ চক্রবর্তী

একটা নির্জন বাড়িতে রক্ত-ধারা বয়ে চলেছে মেঝের একপ্রান্ত হতে আরেক প্রান্তে। সিলিং-এর দিকে অপলক দৃষ্টিতে শুয়ে আছে একজন ঠাণ্ডা স্থির নারী। অন্ধকার ঘরের জানালা দিয়ে অনধিকার প্রবেশ ঘটেছে রাস্তার আলোর। সেই আলোতেই অস্পষ্ট ভাবে ধরা দিচ্ছে মহিলার নিথর দেহ। বুকের ওপর থেকে শাড়ির আঁচল সরে গিয়ে তার সদ্য পেরোনো যৌবন উঁকি দিচ্ছে।

********

তুমি সত্যি বলছ ভ্রমর দি? বেশ অবাক হয়ে প্রশ্নটা করল ত্রিপর্ণা।

–           তোকে খামখা মিথ্যে বলতে যাবো কেন? ছেলেটার নামটা কি যেন?

–           সুজন। ও কি করেছে কিছু জানতে পারলে?

–           না।  ওর সাথে কথা বিশেষ হয়নি আমার। সেদিন হাতে একদম সময় ছিল না।

সুজনের সাথে ত্রিপর্ণার পরিচয় হয় একটি অঙ্কন প্রতিযোগিতায়।

–           এই তুলিটা দিয়ে একটা হালকা শেড দিয়ে দিন। ছবিটা আরও ভালো ফুটবে।

নিজের আঁকা শেষ করে, ত্রিপর্ণার আঁকার দিকে তাকিয়ে নিজের তুলিটা ওর দিকে এগিয়ে দিয়ে কথাটা বলেছিল সুজন। কোনও রকম চিন্তা না করেই সুজনের কথা মেনে ছিল ত্রিপর্ণা। ফলও পেয়েছিল হাতে-নাতে।

–           থ্যাংকস। রাইট টাইমে রাইট অ্যাডভাইসটা দিয়েছিলেন বলেই আজ সেকেন্ড প্রাইজটা পেলাম।

–           না শুনলে হয়তো প্রথম পুরষ্কারটা পেয়ে যেতেন।

–           ফাস্ট প্রাইজটা তো আপনি আগেই রিজার্ভ করে নিয়েছেন।

এরপর দুই বছর কেটে গেছে। ত্রিপর্ণার সাথে সুজনের আর দেখা হয়নি। দেখা হওয়া সম্ভবও ছিল না। সেদিনের পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিল অ্যাডভোকেট ও বিশিষ্ট সমাজসেবী ভ্রমর সেন। ভ্রমর ত্রিপর্ণার পরিচিত। ভ্রমরের কাছে ইংরাজি পড়েই স্কুলের বৈতরণী পার হয়েছিল ত্রিপর্ণা।

******

সুজনের সাথে দেখা করা আর দুই একটা কাজ নিয়ে এই জেলা-সংশোধনাগারে এসেছে ভ্রমর। সংশোধনাগারের মুল প্রবেশ দরজা অতিক্রম করলেই অফিস। আসামী ও অভিযুক্তদের নথিপত্র সংক্রান্ত সকল কাজ এই অফিসেই হয়। উকিলরা এসে এই অফিসেই বসেন।

অফিসে পর আরও দুটো দরজা অতিক্রম করলে আসামী বা অভিযুক্তদের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। তৃতীয় দরজাটিকে চ্যালেঞ্জ গেট বলে। সূক্ষ্ম তারজালির ঘেরাটোপের মধ্যেই আসামী ও অভিযুক্তরা থাকে। তাদের বাড়ির লোক দেখা করতে এলে তারা এই তারজালির বাইরে থেকেই দেখা করে। ভ্রমর চ্যালেঞ্জ গেট পেড়িয়ে সুজনের সাথে দেখা করল।

–           তুমি সুজন তো?

–           হ্যাঁ, আমার নামটা এখনও মনে আছে আপনার!

–           আমাকে তুমি চিনতে পেরেছ?

–           – কেন পারব না। আপনি তো সেদিন আমার হাতে পুরষ্কারটা তুলে দিয়েছিলেন। আগের দিনই আপনাকে দেখেছি। ব্যস্ত ছিলেন, তাই আর কথা বলিনি।

–           হঠাৎ কি এমন ঘটল …

–           কিচ্ছু জানি না। আমি তো কিছুই করিনি। সেদিন আপনার হাত থেকে পুরষ্কার নিয়ে বাড়ি ফিরছিলাম। ষ্টেশন থেকে বাড়ির দিকে হাঁটছি, সেই সময় পুলিশ আমাকে অ্যারেস্ট করে।

–           কোনও ওয়ারেন্ট দেখায়নি তোমাকে?

–           না, বলল থানায় গেলে সব জানতে পারবে। আমি তখন আমার দিদিকে ফোন করলাম। দিদিরা এসে পুলিশের সাথে কথা বলে আমাকে জানালো যে আমাদের বাড়ির কাজের মহিলাকে খুনের অপরাধে আমাকে পুলিশ অ্যারেস্ট করেছে। আমি বললাম,

–           আমি তো এলাকাতেই ছিলাম না। আমি কি করে খুন করবো?

–           তুই কিছু চিন্তা করিস না ভাই। আজকের রাতটা যেতে দে। কাল আমি আর তোর জামাইবাবু একজন ভালো উকিলের সাথে কথা বলে তোকে ছাড়ানোর ব্যবস্থা করবো।

কথা বলতে বলতে একটু থামল সুজন। ওর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পরছে। ভ্রমর সুজনের কাঁধে হাত রেখে বলল, দিদিদের উকিল কিছুই করতে পারেনি ?

–           উকিল কোথায়? তারপর থেকে আমার কাছে একটি বারের জন্যও কেউ আসেনি আমার কাছে। আমার দিদি জামাইবাবুও নয়। দুই বছরের ওপরে হয়ে গেল, আমি জেলের ভেতরে। মাঝে মাঝে আমাকে কোর্টের লকআপে নিয়ে যাওয়া হয়। সারাদিন ওখানে থেকে আবার এখানে চলে আসি।

–           আমি দেখছি কি করা যায়। তবে হুট করে তো কিছু হবে না। সময় লাগবে। এই সময়ে তুমি হাত গুটিয়ে বসে থেকো না। ছবি আঁক। তোমার শিল্প-কর্ম চালিয়ে যাও। আর একটু ডিটেল ইনফরমেশন পেলে কেসটা নিয়ে মুভ করতে আমার সুবিধে হবে।

*********

ভ্রমরের কাছে সুজনের কথা শুনে রীতিমত হতভম্ব ত্রিপর্ণা।

–           বারে, ইচ্ছে হলেই যখন তখন যাকে খুশি খুনির আসামী সন্দেহে পুলিশ অ্যারেস্ট করতে পারে? ছেলেটা যে সে সময়ে ওখানে ছিলই না, সেটা পুলিশ দেখবে না? আর সুজনই বা কেমন! জজ-সাহেবকে বলল না কেন, যে ঘটনার সময় ও পাঁচটা ষ্টেশন দূরে ছিল? আর সে কথার যথেষ্ট প্রমাণও তো রয়েছে।

–           জজ-সাহেবের কাছে ওকে আনা হলে তবে তো সুজন ওনাকে কিছু বলবে। সাব ডিবিসনাল কোর্ট বা ডিস্ট্রিক কোর্টে সব সময় আসামীকে বিচারকের সামনে হাজির করা হয় না রে। থানা বা জেল থেকে এনে আসামীদের কোর্ট লকআপে রাখা হয়।

–           কেন? এমনটা করা হয় কেন?

–           কারণটা হল আসামীদের সংখ্যা। এদের সংখ্যা এতো বেশি যে বেশিরভাগ সময়েই তাদের জজ-সাহেবের কাছে আনা সম্ভব হয় না। তবে আসামী পক্ষের বা বিপক্ষের উকিল জজ-সাহেবকে অনুরোধ করে ওনার অনুমতি নিয়ে আসামীকে কোর্ট লকআপ থেকে বিচারের ঘরে নিয়ে আসতে পারে। আর সুজনের পক্ষে তো কোনও উকিলই দাঁড়ায়নি।

–           ভ্রমর দি, যেভাবেই হোক, ছেলেটাকে বের কর। এমন একটা প্রতিভাকে জেলে পোঁচতে দিও না।

–           তুই না বললেও কেসটা আমি লড়বো। ছেলেটা যে ঐ সময় ওখানে ছিলই না, আমি তার প্রত্যক্ষ সাক্ষী।

ওকালতি ছাড়াও কিছু সমাজসেবা মূলক কাজ-কর্ম করে ভ্রমর। আসামীদের কাউন্সেলিং করায় ও। সেই কারণেই ওর কারাগারের অন্দরমহলে যাতায়াত। কেবলমাত্র সুজনের কথার ওপর ভিত্তি করে এই কেস লড়বে না ভ্রমর। গ্রামে গিয়ে সুজনের প্রতিবেশী, বন্ধু বান্ধবদের থেকেও সুজন সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে এসেছে। সুজনের দিদি জামাইবাবুর সাথেও কথা বলেছে ভ্রমর।

সহজ সরল ছেলে সুজনের বাড়ি শহর থেকে পাঁচ ষ্টেশন দূরে। ছোটবেলায় মাকে হারিয়ে দিদি সম্পূর্ণার ওপরেই সম্পূর্ণ নির্ভরশীল ছিল ও। তাই দিদির বিয়ের পর সুজন বড্ড একা হয়ে পড়ে। মৎস্য চাষী ও ব্যবসায়ী অর্ণবের সাথে সম্পূর্ণার বিয়ে হয়। অবস্থাপন্ন পরিবারে মেয়ের বিয়ে দিয়ে, আর ছেলেকে সমস্ত সম্পত্তির মালিক করে ওদের বাবা নিশ্চিন্তে ইহলোক ছাড়েন।

সুজনের বাবার উইল অনুসারে ওনার সকল সম্পত্তির অধিকারী এখন সুজন। আর সম্পত্তি নেহাত কম নয়। জমিজমা ও বাড়ি মিলিয়ে সুজন এখন অনেক টাকার মালিক। তবে বাবা যে সবটাই ওকে দিয়ে যাবেন সেটা সুজন কখনই চায়নি। প্রশ্নও করেছিল বাবাকে। উত্তরে বাবা বলেছিলেন, সম্পূর্ণাকে এতো খরচা করে ভালো ঘরে বিয়ে দিয়েছি। তোর মায়ের গয়না তো সব সম্পূর্ণাই পেয়েছে। তাই বাকি যা আছে সব তোর। সুজনের বাবার এই কাজের পিছনে একটা বিশেষ কারণ ছিল। তিনি জানতেন যে তার ছেলে সহজ সরল, শিল্পী মানুষ। তাই ছেলের ভবিষ্যতকে সুরক্ষিত করতে চেয়েছিলেন তিনি। সুজনের বাবা তার উইলে আরেকটি শর্ত উল্লেখ করেছিলেন, যেটা থেকে ওনার বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতার একটা স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। উইলে উনি লিখে গিয়েছিলেন, সুজনের যদি অপঘাতে, দুর্ঘটনায় বা কোনোভাবে অকালে প্রাণ যায়, তবে সমস্ত সম্পত্তি একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের কাছে চলে যাবে। গ্রামের গুণী জ্ঞানী দুই ব্যক্তি সেই উইলে সাক্ষী হিসেবে সাক্ষরও করেছিলেন। গ্রামের অনেকেই এই উইলের কথা জানত।

উইল অনুসারে পৈত্রিক বাড়ি ও জমির একমাত্র মালিক সুজন হলেও, এতো বড় বাড়িতে একা থাকতে ও চাইল না।সম্পূর্ণা ও অর্ণবকে ওর বাড়িতে নিয়ে এলো সুজন। চাষ-আবাদ, জমিজমা দেখা শোনার কাজ অর্ণবই করে। আর সম্পূর্ণা, এ বাড়ির পুরনো একজন কাজের মহিলার সহযোগিতায় বাড়ি সামলায়। সুজন তার শিল্প কর্ম আর বন্ধু-বান্ধবদের নিয়েই ব্যস্ত থাকে। শুধু ছবি আঁকাই নয়, মাটি দিয়ে নানা রকম মূর্তিও বানায় ও।  মাঝে মাঝে আশে-পাশের গ্রামে বা শহরে বসে-আঁকো প্রতিযোগিতা থেকে প্রথম বা দ্বিতীয় পুরষ্কার নিয়ে আসে। এমনই এক প্রতিযোগিতার প্রথম পুরষ্কার নিয়ে বাড়ি ফিরছিল সেদিন। আর বাড়ি ফেরা হল না।

*******

নিজের পেশাগত ব্যস্ততা ও অন্যান্য কাজ সামলিয়ে সুজনের কেস সম্পর্কিত নানা তথ্য ও প্রমাণ জোগাড় করতে বেশ খানিকটা সময় লেগে গেল ভ্রমরের। আর এই সময়ে জেলের মধ্যে বসে নানা রকম ছবি এঁকে চলেছে সুজন। ছবির মধ্যে দিয়ে ফুটে উঠছে ওর মনের যন্ত্রণা, ভাগ্যের পরিহাস, অন্যায়ের কাছে বাধ্য হয়ে নতি স্বীকার প্রভৃতি।

সুজনকে কোর্টে তোলার দিন চলে এলো। জেল কাস্টেডির নির্দিষ্ট গাড়িতে সুজনকে তুলে কোর্টে নিয়ে যাওয়া হল। ভ্রমর সম্পূর্ণ রূপে প্রস্তুত। সেদিনের অঙ্কন প্রতিযোগিতার কিছু ছবি, ভিডিও, আর সে সময়ে ওখানে উপস্থিত কয়েকজনের সাক্ষীর মাধ্যমে ও সহজেই প্রমাণ করতে পারবে যে সুজন নির্দোষ। ভ্রমর আজ ত্রিপর্ণাকেও সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে।

লোয়ার কোর্টে মামলার ভাগ থাকে। কিছু মামলা প্রথমার্ধে হয়, কিছু মামলা দ্বিতীয়ার্ধে। দ্বিতীয়ার্ধের মামলা কখনই প্রথমার্ধে করা যায় না। সুজনের মামলা দ্বিতীয়ার্ধে ওঠার কথা ছিল। তবে  জজ সাহেব প্রথমার্ধের মামলার পর কি একটা দরকারে বেরিয়ে গেলেন। তাই সুজনের মামলাটি সেদিন আর হল না।

ত্রিপর্ণা লকআপে গিয়ে সুজনের সাথে দেখা করল। কোর্ট লকআপে জেলের লকআপের মত মিহি তার-জালের মধ্যে দিয়ে আসামীদের দেখতে হয় না। লকআপের বড় গেটটার ওপার থেকে দেখা করতে হয়। দীর্ঘদিন পর দেখা হলেও পরস্পরকে চিনে নিতে কোনও অসুবিধে হল না। সুজনের আঁকা ছবিগুলো নিয়ে এক্সজিবিশন করতে চাইল ত্রিপর্ণা। সুজনের সম্মতিতে সেই ছবি সংগ্রহ করে এক্সজিবিশনের কাজে নেমে পড়ল ত্রিপর্ণা।

জেলের মধ্যে দুর্গাপূজা হবে। আর সেই দুর্গা মূর্তি বানাবে সুজন। প্রথমে রাজি না হলেও সকলের অনুরোধে দুর্গামূর্তি বানাল সুজন। আকারে ছোট হলেও মূর্তিটি সকলের নজর কাড়ল। সমান নজর কাড়ল এক্সজিবিশনে প্রদর্শিত সুজনের আঁকা ছবিগুলোও।

পূজার ছুটি কেটে গেলে সুজনের কেসটা আবার কোর্টে তোলার চেষ্টা করল ভ্রমর। কিন্তু যেদিনই কেসের ডেট ওঠে সেদিনই কোনও না কোনও কারণে কোর্ট অ্যাডজর্ন হয়ে যায়। কোনও দিন জর্জ সাহেব আসেনি বলে, কখনও কোনও অ্যাডভোকেট মারা যাওয়ার জন্য, কখনও বা জজ সাহেব প্রথমার্ধের পর আর সময় দিতে না পারার কারণে মামলাটি কোর্টে উঠল না।

ভ্রমর জেলা বিচারপতির সাথে দেখা করে সুজনের সব কথা খুলে বলে, সুজনের কেসটা যাতে তাড়াতাড়ি কোর্টে তোলা যায়, সেই অনুরোধ করল। সব শুনে উনি বললেন,

–           প্রত্যেক ডিসট্রিক্টেই একজন ডিসট্রিক্ট জাজের সাথে বেশ কয়েক জন অ্যাডিশনাল জাজ থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে সেই সংখ্যা খুবই সীমিত। একজন জাজ অবসর নিলে বা মারা গেলে তার জায়গায় নতুন জাজ আসতেও অনেকটা সময় লেগে যায়। তাই আমাদের ওপর বেশ চাপ পড়ে। তবে তোমার কথাটা আমার মাথায় রইল। দেখছি কি করতে পারি।

এই ঘটনার মাস খানেকের মধ্যেই সুজনের কেস কোর্টে উঠল। সুজন যে নির্দোষ তা বেশ দক্ষতার সাথে প্রমাণ করল ভ্রমর। বেকসুর খালাস পেল সুজন।

তাহলে এখন কোথায় যাবে ঠিক করলে? কোর্টের মধ্যেই সুজনকে জিজ্ঞাসা করল ভ্রমর।

–           যেখানেই যাই, দিদিদের কাছে আর ফিরবো না।  এতোগুলো বছর কেটে গেল, একবারের জন্য কেউ আমার সাথে দেখা করতেও এলো না।

–           আমি বলি কি, তুমি তোমার সব কিছু বিক্রি করে শহরাঞ্চলে বাড়ি করে থাকো। একটা আঁকার স্কুল কর।

–           জমি-জমা বিক্রি করলেও পৈত্রিক বাড়ি বিক্রি করার ইচ্ছে নেই। ওখানে দিদিরাই থাকুক। আরেকটা কথা। আপনি আমার জন্য যা করেছেন, সেই ঋণ আমি কখনই শোধ করতে পারবো না। তবে হাতে টাকা পয়সা এলে আপনার পারিশ্রমিকটা সাধ্য মত আমি দিতে চাই। আপনাকে কিন্তু নিতে হবে।

–           ঠিক আছে, সে নয় দেখা যাবে।

ত্রিপর্ণার সহযোগিতায় ওদের বাড়ির কাছে একটা বাড়ি ভাড়া নিলো সুজন। জমি-জমা সব সব বিক্রি হয়ে গেল। সম্পূর্ণা নির্বাক। একটা অনুশোচনা ওকে কুরে কুরে খাচ্ছে। যার থেকে সম্পূর্ণার মুক্তি নেই।

পৈত্রিক সম্পত্তির এক অংশও ভাগে না পাওয়ায় অর্ণব সহ শ্বশুর-বাড়ির লোকজনদের থেকে বেশ অনুযোগ অভিযোগ শুনতে হয়েছিল সম্পূর্ণাকে। বাবার এই কাজটা সম্পূর্ণাও মেনে নিতে পারেনি। তাই সম্পূর্ণা ও অর্ণবের লক্ষ্য ছিল সুজনকে বঞ্চিত করে সমস্ত সম্পত্তি নিজেদের দখলে আনা। সুজনকে তারা মেরে ফেলতে পারবে না। তাহলে সমস্ত সম্পত্তি কোনও স্বেচ্ছাসেবক সংস্থার কাছে চলে যাবে। অনেক ভেবে অর্ণব ঠিক করল সুজনকে তাদের পৈত্রিক বাড়িতে নিয়ে গিয়ে গৃহ-বন্দী করে রাখবে। বেঁচে থাকার জন্য যেটুকু অন্ন বস্ত্র দরকার সেটুকু দিয়ে কোনওরকমে টিকিয়ে রাখবে ওকে। সম্পূর্ণ সম্পত্তি ভোগ করবে ওরা।

অর্ণবের পরিকল্পনা আড়াল থেকে বাড়ির কাজের মহিলাটি শুনে ফেলে উঁচু গলায় প্রতিবাদ জানায়। সম্পূর্নার সাথে শুরু হয় তার বচসা। একজন কাজের মহিলার এমন দৌরাত্ম্য সহ্য করতে পারেনা অর্ণব। মাথার পেছনে সজোরে লোহার রডের আঘাত হানে। মেঝেতে পড়ে গিয়ে অল্পক্ষণের মধ্যেই প্রাণ হারায় ভদ্র-মহিলা। বাড়ি সম্পূর্ণ অন্ধকার করে থানায় গিয়ে সুজনের বিরুদ্ধে খুনের অভিযোগ করে অর্ণব ও সম্পূর্ণা। থানার ওসির হাতে কিছু টাকা দিয়ে সুজন যেন কোনদিনও জেলের বাইরে বেরতে না পারে সেই অনুরোধ করে অর্ণব। মুখে একগাল হাসি নিয়ে অর্ণবকে নিশ্চিন্ত করে ওসি।

সুজন তখন প্রথম পুরষ্কার জিতে অন্ধকার বাড়ির দিকে, অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চলেছে, আর বাড়ির মেঝেতে বয়ে চলেছে প্রতিবাদের রক্তধারা।


লেখক পরিচিতি : জয়দীপ চক্রবর্তী
জয়দীপ চক্রবর্তী : পেশায় ইঞ্জিনিয়ার। নেশায় লেখক। আকাশবানী কোলকাতায় সম্প্রচারিত হয়েছে তার লেখা নাটক। পেশাদারী থিয়েটার “অবেক্ষন” তার লেখা নাটককে বেছে নিয়েছে তাদের প্রযোজনা হিসেবে। তার কাহিনী চিত্রনেট্যে তৈরী সর্ট ফ্লিম, প্রচারিত হয়েছে ইউটিউব চ্যানেলে। ২০১৮-এর কলকাতা বইমেলায় তার লেখা হাস্য রসাত্মক বই “রাশি রাশি রসিকতা” প্রকাশিত হয়েছে। নিজস্ব ফেসবুক পেজে প্রতি সপ্তাহে প্রকাশিত হয়ে চলেছে তার লেখা গল্প।

শেয়ার করে বন্ধুদেরও পড়ার সুযোগ করে দিন
  •  
  •  
  •  
  •  

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।