প্রণয়কথা

লেখক : স্বপন নাগ

 

প্রণয় আমাদের বন্ধু। প্রণয় আমাদের মুখিয়া। প্রণয় আমাদের গর্ব। অগাধ ভরসার নাম প্রণয় সেনগুপ্ত। এহেন প্রণয়ের কিন্তু নিন্দুকও কম নেই। ওকে সহ্য করতে পারে না এমন লোকও অনেক।

আজ শুধু প্রণয়ের গল্পই হবে। তার আগে ওর সম্পর্কে দু-এক কথা বলা দরকার। ওকে ঘিরে আমাদের কয়েকজনের যে-চক্র, তারা সবাই ওর রসিকতাবোধের ভক্ত। চাকরির শুরুর বেশ কিছু বছর প্রণয় কাটিয়েছে হিন্দিভাষী এলাকায়, মুরাদনগরে। হিন্দি খুব ভালো জানে। বাংলাতেও ওর দখল ঈর্ষনীয়। শব্দ নিয়ে নানারকম মজা প্রণয়ের কথার পরতে পরতে। ওর কথাতে যা শব্দবাজি। আমাদের হয়ে কিছু বলতে হলে, প্রণয়। যে কোন প্রোগ্রামের পরিকল্পনা, সেখানেও প্রণয়। প্রণয়কেন্দ্রিক অজস্র গল্প থেকে এ লেখায় উল্লেখ থাকবে মাত্রই তার কয়েকটি।

প্রণয়ের মুরাদনগর প্রবাসের গল্প শুনতে চাইলে ও বেশ অকপট। ‘আর বলিস না, শুরু শুরুতে তো বেশ হকচকিয়ে গেছি। অমুক আমার বড়ভাই হচ্ছে। পানিট্যাঙ্কির বগলেই কারোর কোয়ার্টার। দরকারে ডক্টর বুলিয়ে নেবে। কাকিমা, অনীশকে আমার বাড়ি ভেজে দিয়ো।… প্রথম প্রথম এগুলো কানে বাজলেও মন্দ কাটেনিরে তেরোটা বছর !’ প্রণয়ের কথাগুলো শুনে সমীর একটু বেশিই হেসে উঠেছিল। প্রণয় বলল, ‘এত হাসির কী আছে ? এখানেও তো শুনি কেন কি, বল তো দেখি এটা কোন ধরনের বাংলা ? ও সব ছাড়’ বলেই সমীরের হাত থেকে সেদিনের আনন্দবাজার কেড়ে নিয়ে খবরের একটা হেডিং দেখিয়ে বলল, ‘এটা কী ?’ মন দিয়ে হেডিংটা আমরা সবাই দেখলাম, খালের পারে মিলল যুবতী লাশ। প্রণয় জানতে চাইল ‘মিলল’ কেমন বাংলা ? ওখানে ‘কিঁউ কি’-র বাংলা কেন কি আর কাগজে ‘মিলা হ্যায়’-এর বাংলা মিলল। কখনো মন দিয়ে এফ এমে বলা বাংলাগুলো শুনেছিস ? আমি তো যখন শুনি, মনে হয় বাংলার মত কোন একটি ভাষা শুনছি যেন !

বাইরে তুমুল বৃষ্টি। শীতের এক সন্ধ্যায় ক্লাবঘরে বন্দি আমরা কয়েক বন্ধু। প্রণয়ের প্রস্তাবেই শুরু হল অভিনব এক খেলা। আড্ডা চলবে। কোন ইংরেজি শব্দের ব্যবহার চলবে না। যে যে-কটি ইংরেজি শব্দ বলবে তত টাকা তার জরিমানা হবে। ঘোষণা করে দু ঘন্টা চলেছিল আড্ডা-খেলা। শ্যামলের জরিমানা হয়েছিল সবচেয়ে বেশি। উনিশ টাকা। অঞ্জনের দশ, সমীরের সাত। আমার দুই। আমার তাও হত না। একটা ইংরেজি শব্দ বলে ফেলেছি বুঝতে পেরে পরক্ষণেই সরি বলায় আর এক টাকা। বেচারা শ্যামল উনিশ টাকা দিতে দিতে প্রণয়কে বলল, ‘উইন্ডচিটারের আবার বাংলা হয় নাকি ?’ সবাই একমত – হোক বা না-হোক, উইন্ডচিটার নির্ভেজাল একটি ইংরেজি শব্দ। প্রণয় খানিকক্ষণ মাথা খাটিয়ে প্রস্তাব দিয়েছিল, ‘উইন্ডচিটারকে বাতাসপ্রতারক বললে কেমন হয় !’

আড্ডা মারব, আর কারোর পেছনে লাগা হবে না, তা তো হয় না ! কী এক অজ্ঞাত কারণে অঞ্জনের পেছনেই সবাই লাগত বেশি। কথায় কথায় একবার সামনে পড়ে থাকা একটা মোটা বাঁশ দেখিয়ে প্রণয় অঞ্জনকে জিজ্ঞেস করল, ‘এটা কত লম্বা হবে ?’ সিধাসাদা অঞ্জন তখনও প্রণয়ের বদমাইশি আন্দাজ করতে পারেনি। ভালো করে বাঁশটিকে পর্যবেক্ষণ করে নিষ্পাপ উত্তর দিল, ‘দশ ফুট।’ বিলম্ব না করেই অশ্লীল একটা ইঙ্গিত করে প্রণয় হিন্দিতে শুরু করল, ‘আধা ডাল্ লো।’ হেসে উঠেছে সবাই। হাসি তীব্রতা পায় যত, অঞ্জনের মুখটাও শুকিয়ে ম্লান। ঘটনার গুরুত্ব বুঝে প্রণয় অঞ্জনকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিতে শুরু করল, ‘কিছু মনে করিস না।’ অঞ্জন স্বাভাবিক স্বরে বলল, ‘আরে মনে করার কিছু নেই। বন্ধুদের মধ্যে এ সব চলে।’ মুহূর্ত দেরি না করে প্রণয়ের পরবর্তী প্রস্তাব, ‘তব্ পুরা ডাল লো।’ তারপর যে হো হো হাসি শুরু হল, তা থামতেও সময় লাগল মিনিট দশেক।

আমাদের মধ্যে কমবয়সে হারাধন ভালো ফুটবল খেলত। প্রণয় ওকে ডাকত হারাদোনা বলে। একইভাবে সুদীপ আর শ্যামলের নামকরণ করেছিল যথাক্রমে ছায়াসঙ্গী এবং উমাপতি। সুদীপ বহুদিন ধরে ছায়া নামের একটি মেয়ের সঙ্গে প্রেম করেছিল, সে প্রেম অবশ্য বিয়ের পরিণতি পায়নি। আর শ্যামল, ওর বউয়ের নাম উমা। আমরা তখন মারাদোনার অন্ধভক্ত, প্রণয়ের ফেভারিট ফুটবলার ব্যতিক্রমী অন্য কেউ। কিন্তু কে ? জানতে চেয়েছিল হারাধন। ধাঁধায় মোড়া উত্তর দেবার আগে প্রণয় বলল, ‘তেজ নেই, তাকে কী বলবি ?’
‘নিস্তেজ।’
‘গুড্ ! তেল ছাড়া ?’
কিচ্ছু ধরতে না পেরে সতর্ক হারাধন নীরব।
প্রণয় বলল, ‘তেল কই জানিস ?’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ, জানব না কেন !’
‘বেশ। তেল কই হলে তেল রুইও সম্ভব ? এবার সেই রুই যদি হয় বিনা তেলে ?’
নেদারল্যান্ডসের ফুটবলার রুড ভান নিস্তেলরুই যে প্রণয়ের ফেভারিট এটুকু জানতে এতগুলো সিঁড়ি !

‘গোরু পাচার কেলেঙ্কারি নিয়ে সিবিআই যা করছে , কোথায় যে থামবে বিষয়টি বোঝা মুশকিল ‘ আড্ডার ধরতাই ধরিয়ে দিগগজের মত বলল অঞ্জন। শ্যামল বলল, ‘যা-ই করো, দোষীদের মূলে যে, তাকে ধরা দরকার।’ প্রণয়ের আলটপকা মন্তব্য, ‘দোষী অর্পিতা।’ আমরা সবাই চিৎকার করে আপত্তি জানালাম, গোরু পাচার মামলায় অর্পিতা আসছে কোত্থেকে ? প্রণয় সাফাই দিল, ‘যে দোষী, তাকে তার বাবা যদি ঠিকঠাক মানুষ করত, তাহলে কি এসব হত ! ফলে আমার মতে মূল দোষী ওর পিতা।’ কথাগুলো বলার সময় ‘ওর পিতা ‘ শব্দ দুটি ভেঙে ভেঙে বলায় বিষয়টি অবশেষে স্পষ্ট হল।

একদিন শ্যামল ওর পিসতুতো ভাইকে নিয়ে এলো ক্লাবে। অর্ণব। ওর বাড়ি বেথুয়াডহরী। বেশ গুডবয় গুডবয় মার্কা চেহারা। পরণে একটা টি শার্ট আর আটটা পকেটওয়ালা প্যান্ট। হাতে একটা মিনারেল ওয়াটারের বোতল। শ্যামল অর্ণবকে আমাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবার পর প্রণয় অর্ণবের প্যান্ট দেখিয়ে বেশ ঘনিষ্ঠ স্বরে জিজ্ঞেস করল, ‘এটা কার গো ?’ অর্ণবের সংক্ষিপ্ত সলাজ উত্তর, ‘আমার।’ প্রণয়ের আবারও জিজ্ঞাসা, ‘এটা কার্গো ?’ স্বীকার করে নিই, বহু পকেটবিশিষ্ট প্যান্টকে যে কার্গো বলে এর আগে আমার জানা ছিল না। প্রণয়ের শব্দবাজি অর্ণব কতখানি টের পেল, ওর অভিব্যক্তিতে তখনও স্পষ্ট নয়। খানিক পরেই জলের বোতল দেখিয়ে প্রণয় জিজ্ঞেস করল, ‘এটা কিনলে ?’ কেন এই প্রশ্ন, কী যে জিজ্ঞাস্য কিছুই বোধগম্য না হওয়ায় অর্ণব বেচারা নিরুত্তর থাকল। সামাল দিল শ্যামল, ‘চোখে দেখছিস না, গায়েই তো লেখা আছে, কিনলে !’ সন্দেহ নেই, প্রথম সাক্ষাতেই প্রণয়ের এহেন ধন্দময় আচরণ অর্ণবের মত নবীন অতিথির পক্ষে বেশ অস্বস্তিকর ছিল।

অনেকদিন ধরেই অঞ্জনদের বাড়ির টিভিটা খুব ভোগাচ্ছে। ছবি থাকলে সাউন্ড নেই তো কখনো শুধু সাউন্ডই সম্বল। চলতে চলতে হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়া তো আছেই। এইসব রোগ নিয়ে বেশ কয়েকবার রিপেয়ারিংয়ের দোকান ঘুরে এসেও টিভি তার চরিত্র বদল করেনি। অঞ্জন ক’দিন আগের ইন্ডিয়া পাকিস্তানের সেমিফাইনালের ম্যাচটাও দেখতে পারেনি।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘টিভিটা কোন্ কোম্পানির ?’
অঞ্জন জানাল, ‘এল.জি.।’
অঞ্জনের হতাশাকে পাত্তা না দিয়েই প্রণয় বলল, ‘কোম্পানির নামেই তো বিপর্যয়ের আগাম ইঙ্গিত ছিল !’
‘সেটা কীরকম ?’ আমরা জানতে চাইলাম।
প্রণয়ের জবাব, ‘এলজি কিনে নাজেহাল হবারই কথা। ল্যাজেগোবরে শব্দটার শর্ট ফর্মই যে এল.জি।’

এই শর্ট ফর্ম নিয়ে প্রণয়ের আমদানি আর একটা মজার গল্প মনে পড়ে গেল। তখন বাজারে সদ্য মোবাইল ফোন এসেছে। আজকের মত এত বিভিন্ন কোম্পানির মোবাইল কানেকশন ছিল না। অনেকের মত আমার ছিল বি.এস.এন.এলের কানেকশন। একদিন বাড়ি থেকে প্রণয়কে বহুবার চেষ্টা করেও ফোনে যোগাযোগ করতে পারিনি। পরের দিনই প্রণয়কে বললামও সে কথা। প্রণয় জিজ্ঞেস করল, ‘ফোন যখন করছিলিস, তুই তখন কোথায় ?’
আমার অকপট উত্তর, ‘কেন, ঘরে !’
প্রণয় বলল, ‘ওই জন্যেই !’
‘মানে ?’
‘আরে বি এস এন এল মানে ভিতর সে নহী লগতা।’

মুরাদনগরে চাকরির সময় প্রণয়ের সার্ভিস বুকে ওর নাম নিয়ে একটা ত্রুটি অনেকদিন ধরে চলছিল। প্রণয় সেনগুপ্তর পরিবর্তে বারবার নাম লেখা হত প্রণয় এস গুপ্ত। এ নিয়ে বিস্তর আবেদন নিবেদনেও কিছুতেই ত্রুটিটি সংশোধিত হচ্ছিল না। ডিলিং ক্লার্ক চন্দ্রপ্রকাশ শ্রীবাস্তবের কাছে গিয়ে প্রণয় পুনর্বার দরবার করলে শ্রীবাস্তবজীর বক্তব্য ছিল, ‘প্রণয় সেনগুপ্তা অওর প্রণয় এস গুপ্তা তো একই বাত হ্যায় দাদা। ইসমে গলতি কহাঁ হ্যায় !’ সম্মতিসূচক মাথা নেড়ে প্রণয় বলেছিল, ‘বিলকুল সহী কহা হ্যায় এস বাস্তবজী !’ চমকে উঠে শ্রীবাস্তবজীর প্রতিক্রিয়া, ‘কেয়া মতলব?’ প্রণয় বোঝাল, ‘শ্রীবাস্তব অওর এস বাস্তব তো এক হী বাত, হ্যায় না !’ এরপরে এ বিষয়টিতে আর কোন তদবিরের দরকার পড়েনি। দীর্ঘ দিনের ত্রুটিটি এক সপ্তাহেই সংশোধিত হয়ে গেছিল।

বাংলা ভাষাকে হেয় করে একবার প্রণয়কে সাক্সেনাজী বলেছিল, ‘বংগাল মে লোগ তো পানী ভী খাতে হ্যায়।’ প্রণয়ের পাল্টা ছিল, ‘অগর আপলোগ হাওয়া খানে নিকল সকতে হো তো পানী খানে মে কেয়া পরেশানি হ্যায় ?’

সেদিন কথা হচ্ছিল নেতাদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা উদ্ধার হওয়া প্রসঙ্গে। সুদীপ মন্তব্য করল, ‘ইডি নেতাগুলোকে ধরুক আর জেলে ভরে দিক। দ্যাখ কেমন লাগে।’ প্রণয়ের তাৎক্ষণিক নির্বিকার জবাব, ‘কেমন আর লাগবে ! নেতাদের জেল মানে তো পেনোরাব।’ প্রণয়ের এই শব্দবাজির মর্মোদ্ধারে আমরা সবাই অসহায় দেখে প্রণয় বোঝাল, ‘পেনোরাব জানিস না ! বঙ্গজীবনের অঙ্গ রে ! আরামদায়ক জেল্ !’ হো হো করে হেসে উঠি আমরা। সবাই হাসলাম বটে। সুদীপের ক্রুদ্ধ ইচ্ছেটা তো ফেলে দেওয়া যায় না। বলল, ‘যা-ই বল, চোর তো চোরই। ইচ্ছে হয় পারলে মারি।’ সঙ্গে সঙ্গে প্রণয় মুখে চুকচুক শব্দ করতে করতে রসিকতা করল, ‘আমার ইচ্ছে ব্রিটানিয়া কিংবা বিস্কফার্ম মারী।’


লেখক পরিচিতি : স্বপন নাগ
জন্ম ১৯৫৭ সালের ১০ জুলাই, হাওড়া জেলার এক গ্রামে। ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের চাকরি থেকে অধুনা অবসরপ্রাপ্ত। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ : ইচ্ছে আমার বনকাপাসী মাঠ, স্থির স্বপ্নে জেগে আছি, প্রিয় ২৫, বিষাদ এসে ঘর বেঁধেছে। কবি কেদারনাথ সিং-এর পঁচিশটি বাছাই হিন্দি কবিতার অনুবাদ গ্রন্থ , প্রিয় পঁচিশ। রম্যগদ্যের একটি সংকলন, ONLY FOR তোমার জন্য। এছাড়াও আছে ইংরেজিতে করা প্রত্যূষা সরকারের এক ডজন বাংলা কবিতার পুস্তিকা IDIOT.।

শেয়ার করে বন্ধুদেরও পড়ার সুযোগ করে দিন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।

বিভিন্ন লেখকের কবিতা গল্প পাঠ শুনতে এখানে ক্লিক করুন

লেখালিখি লোগো