সিনেমা রিভিউ : লক্সমী

লেখক: রুবাই শুভজিৎ ঘোষ

  • সিনেমার নাম: লক্সমী
  • পরিচালনা: রাঘভ লরেন্স
  • প্রযোজনা: ফক্স স্টার স্টুডিও, কেপ অফ গুড ফিল্মস, শাবিনা এন্টারটেইনমেন্ট এবং তুষার এন্টারটেইনমেন্ট হাউস।
  • অভিনয়: অক্ষয় কুমার, কিয়ারা আদবানি, আয়েশা রাজা মিশ্র, রাজেশ শর্মা, অশ্বিনী কালসেকর, শরদ কেলকার এবং অন্যান্য সাবলীল শিল্পীরা।
  • সময়: ২ ঘণ্টা ২১ মিনিট

রাঘভ লরেন্স পরিচালিত ২০২০ সালের ৯ নভেম্বর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ডিজনি প্লাস হটস্টারে মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমা লক্সমী। এটিই প্রথম বিগ বাজেটের ভারতীয় সিনেমা যা কিনা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে মুক্তি পেয়েছে। এই সিনেমার রিভিউ নিয়ে খুব বেশি কথা লিখব না কারণ সত্যিই খুব বেশি কথা লেখার নেই।

চিত্রনাট্য খুবই দুর্বল। তার ফলে বাকি সবকিছুতেই তার প্রভাব পড়েছে। অভিনেতারা জোর করে হাসানোর চেষ্টা করেছেন। এবং সেই চেষ্টা পুরোপুরি চিত্রনাট্যের দোষেরই জন্য। কোথাও গিয়ে মনে হয়েছে সিনেমা বানানোর জন্যই যেন বানানো হয়েছে। কারণ আমি মনে করি যেকোন সিনেমার গল্পের একটা উদ্দেশ্য থাকে। গল্পের সব উপাদানই কোন না কোন দিক নির্দেশ করে। এখানে সেইরকম কিছু নেই। যেমন গল্পের শুরু হল ঝাড়ফুঁক যে আসলে হাতের কারসাজি সেটা দিয়ে। সেখানে আসিফ চরিত্রে অভিনয় করা অক্ষয় কুমার সকলকে এটাই বোঝাল এগুলো সব বুজরুকি, সবটাই আসলে বিজ্ঞান এবং কোনোদিন যদি তার সামনে ভূত আসে তাহলে সে হাতে চুড়ি পড়ে নেবে। ভবিষ্যতে ভূত এল, তাকেই ভূতে ধরল এবং সে আক্ষরিক অর্থেই চুড়ি পড়ে নিল। ভূতের সিনেমায় ভূত থাকবে ভালো কথা। কিন্তু সেক্ষেত্রে বিজ্ঞানের সাথে শুরুতে লড়াই দেখানো কেন? তাহলে কি উদ্দেশ্য এটাই যে বিজ্ঞান বনাম ভূতের লড়াইতে ভূতকে জয়ী করানোটা উদ্দেশ্য! যদি সেটা হয় তাহলে বলব এই উদ্দেশ্য একদমই ভালো না। ভূতের সিনেমায় বিজ্ঞানকে আলাদা রাখলেই ভালো হত।

তেমনিভাবেই ট্রান্সজেন্ডার ভূতের কি দরকার পড়ল সেটাও বুঝলাম না। যদি তাদের দুঃখ, বেদনা মানুষকে জানানোর উদ্দেশ্য থাকত, তাহলেও না হয় বুঝতাম। আমার যেহেতু ট্রান্সজেন্ডার মানুষ নিয়ে খুব বেশি জানা নেই, তাই এই নিয়ে বেশি লিখব না। তবে সিনেমা যে বানিয়েছে তারও যে জানা নেই সেটাও বোঝা যাচ্ছে। কারণ আমি তো সেখান থেকে কিছু জানতে পারলাম না। বাঁধাধরা কিছু জিনিস যেমন ট্রান্সজেন্ডার হলেই হাততালি দিতে হবে, যদি তার ভূত কারও শরীরে আসে তাহলে সেই ব্যক্তিও হাততালি দেবে! তাছাড়া শুনেছি বিভিন্ন ট্রান্সজেন্ডার সংগঠন থেকে সিনেমাটি মুক্তির আগেই ব্যান করার আবেদন জানিয়েছে। তাদেরকে ভুলভাবে ব্যাখা করা হয়েছে বলে তাদের দাবী।

তেমনি বুঝলাম না কেনই হিন্দু মুসলিম প্রেম আর তাতে পরিবারের আপত্তি নিয়ে গল্প কিছুটা এগোল! এই নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ কপচাল। মেয়ের বাবা এত বছর এই বিয়েতে রেগে ছি তারপর হঠাৎ করেই মেনে নিল, তারপর জামাইয়ের শরীরে ভূত এল, তারপর কি যে হল! কেন যে হল সে সিনেমা নির্মাতারাই জানে। অনেকে তো এই প্রেমের মধ্যে লাভ জেহাদের গন্ধ পাচ্ছে এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় বহু জায়গায় দেখলাম সেই কারণে এই সিনেমা বয়কট করার আহ্বান জানিয়েছে।

তবে ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিদের অপমান করা উদ্দেশ্য না লাভ জেহাদের প্রচার, আমি জানি না, আমার যেটা মনে হয়েছে এত জনের ক্ষোভের কারণ একটাই, ভুলে ভরা চিত্রনাট্য।

সিনেমাটোগ্রাফিও বিশাল কিছু নয় যে মনে রাখার মত, খারাপ না। সেইভাবে খুঁত পাইনি। আসলে চিত্রনাট্যে এত বেশিই খুঁত যে অন্য কোন ভালো মন্দ কিছুই আর চোখে পড়েনি। অভিনয় যাকে বলে ন্যাচারাল সেটা নয়। জোর করে কমেডি আনার চেষ্টা। নাহলে যে শ্বশুর জামাইয়ের ওপর বছরের পর বছর রেগে ছিল, সে হঠাৎ সেই জামাইয়ের হাতের চড় খেয়ে টম অ্যান্ড জেরি মার্কা লুক দিল আর ভাবল আমরাও হাসব। কিন্তু হিসাবমত তো হাসার কথা নয় এতে। হঠাৎ করে বউমা শাশুড়িকে চড় মেরে দিল, আর সেই টম অ্যান্ড জেরি মার্কা লুক, ভাবল আমরা হাসব। রাত্রিবেলা মুখে লাইট মেরে কিছু ডায়লগ দিল, ভাবল আমরা হাসব।

জোর করে হাসানো না গেলেও স্বাভাবিকভাবেই হাসি পেয়েছে। গল্পের যুক্তিতে হাসি পেয়েছে। যখন দেখছি ভূত শরীরে ঢুকলে পোশাক আশাক সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে, তখন বুঝতে পারছিনা এ ভূত না টারমিনেটর ২ এর সেই রোবট! বাবার ঘটি থেকে জল ছুঁড়ে যে দেওয়ালে পড়ল তাতে এত পরিষ্কার ভাবে দেওয়ালের কেমিক্যালের সাথে বিক্রিয়া হয়ে লেখা ফুটে উঠল তাতে বাবা দেওয়াল লিখনের কাজ পেয়ে যাবে, কি সুন্দর লেখা! আরও প্রচুর কিছু লিখব ভাবছিলাম, কিন্তু লিখে লাভ নেই, কারণ ঐ সিনেমাটায় কিছুই নেই।

লেখকের কথা: রুবাই শুভজিৎ ঘোষ
লেখকের জন্ম পশ্চিমবাংলায়। পেশায় একটি বহুজাতিক সংস্থার তথ্যপ্রযুক্তিবিদ। নেশায় লেখক এবং পরিচালক। বাঙালির জনপ্রিয় ওয়েবসাইট সববাংলায় এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা তিনি। কবিতা থেকে শুরু করে গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস, চিত্রনাট্য সবকিছুই লিখতে ভালবাসেন। লিটিল ম্যাগাজিন থেকে শুরু করে বাণিজ্যিক বিভিন্ন ম্যাগাজিনে নিয়মিত লিখেছেন। স্রোত থেকে প্রকাশিত তাঁর কবিতার সংকলন দৃষ্টি এবং বালিঘড়ি। এছাড়া তথ্যচিত্র, শর্ট ফিল্ম বা অন্যান্য বিভিন্ন ধরনের ভিডিও পরিচালনা করেন। ধর্ম এবং বিজ্ঞান তাঁর প্রিয় বিষয়। ভ্রমণ তাঁর অন্যতম শখ। অন্যান্য শখের মধ্যে রয়েছে স্কেচ, ফটোগ্রাফি, ছবি ডিজাইন করা।

শেয়ার করে বন্ধুদেরও পড়ার সুযোগ করে দিন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।