ওয়েব সিরিজ রিভিউ : রে

লেখক: রুবাই শুভজিৎ ঘোষ

  • ওয়েব সিরিজের বর্ণনা: রে (Ray)
  • পরিচালনা: সৃজিত মুখোপাধ্যায়, অভিষেক চৌবে এবং ভাসান বালা
  • প্রযোজনা: ভায়াকম১৮ স্টুডিও
  • অভিনয়: আলি ফজল, কে কে মেনন, মনোজ বাজপেয়ী, হর্ষবর্ধন কাপুর এবং অন্যান্য সাবলীল শিল্পীরা।
  • সময়: চারটি পর্ব বা এপিসোড। প্রতিটি পর্বের সময়সীমা গড়ে ১ ঘণ্টা।

সত্যজিৎ রায়ের চারটি গল্প নিয়ে নির্মিত অ্যান্থলজি সিরিজ রে (Ray) নেটফ্লিক্সে মুক্তি পেয়েছে। তিনজন পরিচালক মিলে সত্যজিৎ রায়ের চারটে আলাদা গল্পের ওপর কাজ করেছেন। চারটি গল্প নিয়ে চারটি পর্ব। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন কাগজে এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচুর রিভিউ বেরিয়েছে। দুটি দলও তৈরি হয়ে গেছে। একটি দল এই সিরিজের বিশাল প্রশংসা করছেন তো অন্য দল প্রচুর খুঁত বার করছেন। এত আলোচনার পরেও আমি আমার মত করে সিরিজের রিভিউ লিখব। এখানে জানিয়ে রাখি আমি এই দুটো দলের কোন দলেই নই। কারণ দুটো দলই একটি বিশেষ বিশ্বাস নিয়ে এগিয়ে চলেছে। প্রথম দলের বক্তব্য যেহেতু এইরকম চেষ্টা করা হচ্ছে তাই যে কোন ত্রুটি বা বলা ভালো সাত খুন মাফ করে সিরিজের প্রশংসা করতে হবে। দ্বিতীয় দলের বক্তব্য কেন না বুঝে সত্যজিৎ রায়ের গল্পে হাত দেওয়া হয়েছে। তাদের লেখা পড়ে মনে হয়েছে সত্যজিৎ রায় তাদের আলাদাভবে গল্পগুলো বুঝিয়ে গেছিলেন। যাই হোক প্রতিটি পর্ব যেহেতু আলাদা পরিচালক পরিচালনা করেছেন, তাই পর্বগুলোকে নিয়ে আলাদা অনুচ্ছেদে আলোচনা করছি।

প্রথম পর্ব – ফরগেট মি নট

সৃজিত মুখোপাধ্যায় পরিচালিত “ফরগেট মি নট” পর্বটি সত্যজিৎ রায়ের লেখা “বিপিন চৌধুরীর স্মৃতিভ্রম” গল্প থেকে নেওয়া। তবে গল্পে আমূল পরিবর্তন করেছেন তিনি। মূল গল্পের কাঠামো একই আছে, কিন্তু তাতে নিজের ছাপ রেখে গল্পের মধ্যে সাসপেন্স এবং টুইস্ট তৈরি করার চেষ্টা করেছেন। এই চেষ্টাটা পরিচালকের প্রায় সব সিনেমাতেই দেখা যায়। তিনি যে গল্পটি বুনেছেন, সময়ের সাথে দেখতে গেলে মানানসই। প্রধান চরিত্রে আলি ফজল মানানসই অভিনয় করেছেন। অন্যান্য অভিনেতারাও তাদের চরিত্র ভালভাবেই ফুটিয়ে তুলেছে। তবে সাউন্ড এডিটিং ভালো না। মাঝে মাঝেই শুনতে পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক মনোযোগ দিয়ে শুনতে হচ্ছে। অবশ্য নির্মাতারা যদি মনোযোগ কুড়নোর জন্য এই পন্থা নিয়ে থাকেন তাহলে আলাদা কথা। যাই হোক গল্পটি সময়ের সাথে বিশ্বাসযোগ্য হলেও চিত্রনাট্যর বিশ্বাসযোগ্যতা অনেক কম এবং তাড়াহুড়ো অনেক বেশি। যেই তাড়াহুড়ো পরিচালক জুলফিকর মত থেকেই শুরু করেছিলেন। যৌক্তিকতা থাক বা না থাক, গল্পের পরিণতি যেহেতু ভেবে রাখা হয়েছে টুইস্টে ইপ্সিতকে পাগল করা হবে, তাই যেন তেন প্রকারেণ তাকে পাগল করেই ছাড়তে হবে। গল্পকে বেড়ে ওঠার কোন সময় দেওয়া যাবে না, কারণ হাতে মাত্র এক ঘণ্টাই সময়। সেই এক ঘণ্টায় মূল গল্পের মত কাঠামোও চাই আবার তাতে নিজের মত টুইস্টও চাই। এই করতে গিয়েই আমার মনে হয়েছে শেষের দিকে চিত্রনাট্যর বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছে। নাহলে শুরু থেকে গতি ভালোই ছিল। আরেকটি পরিচালকের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য যা খুব কানে লেগেছে, তা হল গালাগালির যত্রতত্র ব্যবহার। “বাইশে শ্রাবণ” করার পর থেকে পরিচালকের মনে হতে পারে গালাগালি বর্তমান সিনেমার অন্যতম স্তম্ভ। আগামী দিনে পরিচালক আরও সংযমী হবেন এমন আশা করব।

দ্বিতীয় পর্ব – বহুরূপীয়া

দ্বিতীয় পর্ব “বহুরূপীয়া” এবং এটিও সৃজিত মুখোপাধ্যায় দ্বারাই পরিচালিত। এই পর্বটি সত্যজিৎ রায়ের লেখা “বহুরূপী” গল্প থেকে নেওয়া। এখানেও গল্পে নিজের ছাপ রেখে গল্পের মধ্যে সাসপেন্স এবং টুইস্ট তৈরি করার চেষ্টা করেছেন। তিনি যে গল্পটি বুনেছেন, সময়ের সাথে দেখতে গেলে মানানসই এবং এখানে পরিণতিটি মূল গল্পের থেকে আলাদা হলেও এই গল্পের সাথে যথার্থ হয়েছে। প্রধান চরিত্রে কে কে মেনন মানানসই অভিনয়ও করেছেন। তবে পিরবাবার চরিত্রে দিব্যেন্দু ভট্টাচার্যের অভিনয় আমার সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে। অন্যান্য অভিনেতারাও তাদের চরিত্র ভালভাবেই ফুটিয়ে তুলেছে। তবে এখানেও চিত্রনাট্যর দুর্বলতা লক্ষণীয়। প্রধান চরিত্র ইন্দ্রাশিসের মধ্যে হীনমন্যতা কাজ করে আর মেক আপের আড়ালে সে প্রতিহিংসা চালাতে থাকে। কিন্তু পরিচালক এই গল্প নির্মাণের সময় ভিঞ্চিদার মেক আপের ভালবাসা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেননি। তাই চরিত্রের থেকে মেক আপের দিকে বেশি নজর গেছে। এবং সেই কারণে চরিত্রটি লাফাতে লাফাতে পিরবাবাকে গিয়ে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয় এবং সেটাই যেন তার লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। পিরবাবা বা ধর্মগুরুদের প্রতি তার অশ্রদ্ধাকে প্রতিষ্ঠা করা হয়নি, ঐ একবার ভগবানকে একটু রেগেমেগে কিছু বলা ছাড়া। একইসাথে অপ্রয়োজনীয় যৌন দৃশ্যের ব্যবহার বিরক্ত করে তোলে।

তৃতীয় পর্ব – হাঙ্গামা হ্যায় কিউঁ বড়পা

অভিষেক চৌবে পরিচালিত “হাঙ্গামা হ্যায় কিউঁ বড়পা” পর্বটি সত্যজিৎ রায়ের লেখা “বারীন ভৌমিকের ব্যারাম” গল্প থেকে নেওয়া। মূল গল্পের সাথে পার্থক্য সামান্যই, যেটুকু পার্থক্য তা চিত্রনাট্যের প্রয়োজনেই এবং এই পরিবর্তনটিও বেশ ভালো লেগেছে। যদিও শিল্পীর স্বাধীনতা নিয়ে আমার আপত্তি নেই, যেটা ওপরের দুটি গল্পে পরিচালক স্বাধীনভাবে করেছেন। তবু আমার মনে হয়েছে যদি সত্যজিৎ রায়ের গল্পকেই সকলের সামনে তুলে ধরতে হয় তাহলে বাচ্চা থেকে বুড়ো সকলের জন্য করলেই ভালো হয়। ওনার গল্পগুলোও আমার কিশোর বয়সেই পড়া। কিন্তু প্রথম দুটি পর্ব অবশ্যই আমি পরিবারের সাথে বসে দেখতে পারব না, হতে পারে আমরা একটু ব্যাকডেটেড। সেট এখানে খুব সুন্দর বানানো হয়েছে, অবশ্যই সেটা এই পর্বের অন্যতম ভিত। চিত্রনাট্যে লজিক্যাল খুব একটা ভুল চোখে পড়ে না। তবে নেহাতই ভুল খুঁজতে গেলে বলব হাকিমের কাছে গিয়ে মুসাফির যখন তার দোষ কবুল করল, তখন হাকিমের যে জ্ঞান দেখি, বাস্তবে কি তার পক্ষে এমন এক কঠিন মানসিক ব্যাধি সম্বন্ধে জানা সম্ভব! মনোজ বাজপেয়ীর অভিনয় অসাধারণ! গজরাজ রাওয়ের অভিনয় ও দুর্দান্ত, বিশেষ করে যখন ঘড়ি ফিরে পেয়ে উনি বাচ্চাদের মত অভিমান করে মুখ ঘুরে দাঁড়ান, আমার সেই দৃশ্য দেখে মনে হয়েছে গল্পটা পর্দায় এমনই হওয়া উচিত ছিল। তাছাড়া আগের গম্ভীর দুটি গল্প থেকে বেরিয়ে এই পর্বে এসে যেন দর্শক একটু স্বস্তি পায়। চারটি পর্বের মধ্যে এই পর্বটিই আমার কাছে সেরা মনে হয়েছে।

চতুর্থ পর্ব – স্পটলাইট

ভাসান বালা পরিচালিত চতুর্থ পর্ব স্পটলাইট সত্যজিৎ রায়ের লেখা একই নামের গল্পের উপরেই তৈরী। সব পর্বেই কমবেশি সত্যজিৎ রায়কে শ্রদ্ধা জানিয়ে বেশ কিছু দৃশ্য বা সিন আছে। এই পর্বে সেটার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। সেটা খুবই ভাল লেগেছে। সঙ্গে ক্যামেরার কাজ খুব ভালো। গল্প তো বুঝতেই পারলাম না কি হল বা এমন কেন হল! কোন কিছুকেই সঠিক ভাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। এর জন্য অনেকাংশে হর্ষবর্ধন কাপুরের অভিনয় দায়ী। চরিত্রটিকে মোটেই ফুটিয়ে তুলতে পারেননি তিনি। আর তার যে লুক গল্পটার একটি ভিত্তি, সেই লুক তো দেখতেই পেলাম না। বরং পার্শ্বচরিত্রে চন্দন রায় সান্যাল দারুণ অভিনয় করেছেন। শেষের গানটিই বেশ ভালো এবং কখনও মনে হয়েছে এইটাই শুধু এই পর্বে দেখার আছে।

5 Comments

    • অরিত্র

      ভালো লাগলো পড়ে। সৃজিতের কাজ খুব ভালো লাগেনি, তবে ক্যামেরার কাজ বেশ ভালো। কিছু কিছু দৃশ্য মনে রাখার মত। যৌনতা নিয়ে সমস্যা এটা নয় যে আমি বাড়ির সবার সাথে বসে দেখবো কি না (কারণ এডাল্ট সিনেমার দর্শকরা এখনও যদি ‘বড়’ না হয় তার দায় পরিচালকের নয়), বরং এটা হতে পারে দর্শক হিসেবে আমার কাছে তা কতটা প্রাসঙ্গিক মনে হয়েছে। বিশ্লেষণ সেই জায়গা থেকে হলে আরও ভালো লাগতো।
      তৃতীয় অর্থাৎ হাঙ্গামা….খুব ভালো। প্রসঙ্গত বলি, হাকিম শব্দের অর্থ জ্ঞানী মানুষ। একসময় এঁরা শুধুই চিকিৎসক ছিলেন না, বরং পরামর্শদাতা ছিলেন অনেক ক্ষেত্রেই। আজকের দিনেও আছেন হয়তো।
      শেষ ছবি স্পটলাইট এ যে লুকের কথা বলা হয়েছে সেটা সম্ভবত সার্কসটিক্যালি। আসলে ম্যানারিজম দিয়ে স্পটলাইট পাবার ধারণাকে হয়তো ব্যঙ্গ করেই বলা।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন। ধন্যবাদ।