আসল হীরা – শেষপর্ব

লেখক: রানা চক্রবর্তী

আসল হীরা – প্রথম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন

তত দিনে হেমাঙ্গিনী দেবীর সঙ্গে হীরালালের বিয়ে হয়ে গিয়েছে। সিনেমা-পাগল হীরালালের সব পাগলামির শরিক হেমাঙ্গিনী। বাবা-মা, স্ত্রী সকলের আশকারা না পেলে তিনি হয়তো এ ভাবে সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছতে পারতেন না। তিন মেয়ে এবং এক ছেলের পিতা হীরালাল না ছিলেন সংসারী, না ছিলেন বিষয়ী। দ্বিতীয়টির জন্য ভবিষ্যতে তাঁকে অনেক পস্তাতেও হয়। কিন্তু কিছু মানুষ তো থাকেন, যাঁদের বিষয়-আশয়ের গণ্ডির মধ্যে আটকানো যায় না। সোনার চামচ মুখে নিয়ে যে ব্যক্তির জন্ম, তাঁর শেষ জীবন কেটেছিল চূড়ান্ত দারিদ্র্যে। এমনকি বিক্রি করে দিতে হয় প্রাণের চেয়ে প্রিয় ক্যামেরাও। সৃষ্টির নেশায় মত্ত হীরালালের সংসারটা বেঁধে রেখেছিলেন হেমাঙ্গিনী। কিন্তু যে স্বামীর জন্য হেমাঙ্গিনীর এত কিছু, আঘাত পেয়েছিলেন তাঁর কাছ থেকেও। তবু শেষ দিনে অসুস্থ, নিঃস্ব হীরালালকে তিনিই আগলে রেখেছিলেন।

বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহারের কারণে হীরালালের চেনাজানার পরিধি ছোট ছিল না। সমাজের উঁচু তলাতেও তাঁর মেলামেশা ছিল। কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত তাঁর বন্ধু ছিলেন। চলচ্চিত্রকারের শেষ দিনেও পাশে ছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ। অমর দত্তের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব অত্যন্ত গাঢ় ছিল। কিন্তু শেষের দিকে সেখানেও ফাটল ধরে। সৃষ্টিশীল সিদ্ধান্তে অমিল না কি ক্লাসিকের নায়িকা কুসুমকুমারীকে নিয়ে তাঁদের দ্বন্দ্ব, তা অবশ্য স্পষ্ট জানা যায়নি।

সমস্যা হল, বিখ্যাত হওয়ার চেয়ে সেই জায়গাটা ধরে রাখা বেশি শক্ত। হীরালালের প্রতিভায় কোনও খাদ ছিল না। কিন্তু তাঁর চরিত্রে নানা রকম দোষ দেখা দিতে থাকে। তাঁর পিসতুতো দাদা দীনেশচন্দ্র সেন নিজের লেখায়, হীরালাল ‘বখে গিয়েছিল’ বলে উল্লেখ করেছেন। মদ্যপান তো শুরু করেছিলেনই, তার উপরে অভিনেত্রী কুসুমকুমারীর সঙ্গে একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল বলেও শোনা যায়। ক্লাসিকের প্রধান অভিনেত্রী তখন কুসুমকুমারী। ‘আলিবাবা…’র মর্জিনা। যদিও কুসুমকুমারীর সঙ্গে অমর দত্তেরও সম্পর্ক ছিল। থিয়েটারের দৃশ্য ক্যাপচার করার সময়ে দিন-রাত ক্লাসিকেই পড়ে থাকতেন হীরালাল।

এর মধ্যেই আবার একটা মারাত্মক ভুল করে বসলেন। ‘আলিবাবা…’র লাভের শেয়ার লিখে দিলেন কুসুমকুমারীর নামে। কাজ, থিয়েটার, কুসুমকুমারী, মদ্যপান— এ সবে যত নিমজ্জিত হতে থাকলেন, সংসারের সঙ্গে দূরত্ব ততই বাড়তে লাগল। হেমাঙ্গিনী রাশ টানার চেষ্টা করলেও তা ফলপ্রসূ হয়নি। এর মধ্যে ছিল হীরালালের বেহিসেবি খরচ। প্রভূত অর্থ উপার্জন করা সত্ত্বেও আর্থিক কষ্টের মধ্যে পড়তে হয়েছিল তাঁকে। ছোট ছোট ভুলই হীরালালকে এগিয়ে দিচ্ছিল মস্ত এক খাদের কিনারে।

যেমন ভাবে প্রথম সিনেমা তৈরিতে হীরালাল পথ দেখিয়েছিলেন, তেমন ভাবেই প্রথম রাজনৈতিক তথ্যচিত্রও তিনিই তুলেছিলেন। তখন রাজনৈতিক দিক থেকেও বড়সড় পরিবর্তন আসছে। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন প্রসঙ্গে টাউন হলে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক সভা, রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে শোভাযাত্রা এবং তাঁর বক্তৃতা-সহ একাধিক রাজনৈতিক ঘটনার সাক্ষী ছিল হীরালালের ক্যামেরা। রাজনৈতিক তথ্যচিত্র দেখানোর জন্য তাঁকে সমস্যায়ও পড়তে হয়েছিল।

বিজ্ঞাপনের ছবি তোলার ক্ষেত্রেও তাঁকে পথিকৃৎ বলা যেতে পারে। সি.কে সেনের ‘জবাকুসুম কেশতৈল’, বটকৃষ্ণ পালের ‘এডওয়ার্ডস এন্টিম্যালেরিয়া স্পেসিফিক’, ডব্লিউ মেজর অ্যান্ড কোম্পানির ‘সার্সাপেরিয়া’র বিজ্ঞাপন করেন। বলা হয়, বিদেশ থেকে ক্যামেরা আনানোর জন্য বটকৃষ্ণ পালের কাছে গিয়ে অনুরোধ করেন হীরালাল। সটান গিয়ে বলেন, বিদেশ থেকে ক্যামেরা আনিয়ে দিলে তিনি এডওয়ার্ডস টনিকের বিজ্ঞাপন চিত্র তুলে দেবেন এবং সেটি বিভিন্ন জায়গায় দেখাবেন। সন্দেহ নেই তখনকার দিনে এই ভাবনায় অভিনবত্ব ছিল। জবাকুসুম কোম্পানির মালিকের কাছেও তিনি নিজে থেকেই গিয়েছিলেন। ওই বিজ্ঞাপনে কুসুমকুমারীকে নিয়েছিলেন হীরালাল। বিজ্ঞাপনে অভিনেত্রীদের ব্যবহার করার চল যে শুধু এখনকার নয়, হীরালালের এই পদক্ষেপই তাঁর প্রমাণ। তবে তিনি মোট ক’টি ছবি, ক’টি তথ্যচিত্র তুলেছিলেন, তা নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনও তথ্য পাওয়া যায় না।

এখনো পর্যন্ত পাওয়া তথ্যসূত্রের হিসাবে হীরালাল সেনের চলচ্চিত্রপঞ্জি নিম্নরূপ:

কাহিনীচিত্র:
১) ভ্রমর;
২) আলিবাবা;
৩) হরিরাজ;
৪) দোল লীলা;
৫) সরলা;
৬) বুদ্ধ;
৭) সীতারাম।
( ১৯০০-১৯০১ সময়সীমায় তোলা এই ছবিগুলির দৈর্ঘ্য ১০০ থেকে ১৫০ ফিট পর্যন্ত)।
৮) দুটি প্রাণ;
৯) মৃণালিনী;
১০) সোনার স্বপন;
১১) মনের মতন;
১২) মজা;
১৩) বধু;
(১৯০২- ১৯০৫ সময়সীমায় তোলা এই ছবিগুলির দৈর্ঘ্য ২০০ থেকে ৩০০ ফিট পর্যন্ত – বিদেশ থেকে ক্যামেরা এনে নতুন ক্যামেরায় তোলা)।
১৪) চাবুক;
১৫) গুপ্তকথা;
১৬) ফটিকজল;
১৭) দলিতা ফনিনী
(১৯০৩-১৯০৫ সময়সীমায় তোলা ছায়াছবি )।

সংবাদচিত্র:
১৮) করোনেশন দরবার -দিল্লি (১৯০৩);
১৯) করোনেশন দরবার -কলকাতা ( ১৯০৩);
২০) গ্র্যান্ড প্যাট্রিওটিক ফিল্ম (১৯০৫);
২১) সুরেন্দ্রনাথের শোভাযাত্রা (১৯০৫);
২২) দিল্লি কলকাতার দরবার চিত্র ( ১ম) ( ১৯১১-১২);
২৩) দিল্লি কলকাতার দরবার চিত্র ( ২য়) ( ১৯১১-১২);
২৪) দিল্লি কলকাতার দরবার চিত্র (৩য়) ( ১৯১১-১২);
২৫) দিল্লি কলকাতার দরবার চিত্র (৪র্থ) ( ১৯১১-১২);
২৬)দিল্লি কলকাতার দরবার চিত্র ( ৫ম) ( ১৯১১-১২);
২৭) দিল্লি কলকাতার দরবার চিত্র (৬ষ্ঠ) ( ১৯১১-১২)

তথ্যচিত্র:
২৮) পথের ছবি;
২৯) গঙ্গার ঘাটের ছবি;
৩০) প্যাথে নৃত্য দৃশ্য;
৩১) প্যাথে ছবি (গুচ্ছ) (১৯০০ সালে তোলা);
৩২) চিৎপুর রোডে চলমান দৃশ্য; (১৯০০- ১৯০১ সময়সীমায় তোলা ছায়াছবি);
৩৩) বগজুরি গ্রামের বিবাহোৎসব;
৩৪) বগজুরি গ্রামের স্নানার্থী তথ্যচিত্র (১৯০২- ১৯০৩ সময়সীমায় তোলা ছায়াছবি);
৩৫) রাজেন্দ্র মল্লিকের বাড়ির বিবাহোৎসব;
৩৬) দুলিচাঁদ মল্লিকের বাড়ির বিবাহোৎসব;
৩৭) শিবচরণ লাহার বাড়ির বিবাহোৎসব;
৩৮) রাজেন্দ্র মল্লিকের বাড়ির বিভিন্ন উৎসব;
৩৯) শিবচরণ লাহার বাড়ির বিভিন্ন উৎসব (১৯০২-১৯০৫ সময়সীমায় তোলা ছায়াছবি)।

প্রচারচিত্র:
৪০) এডওয়ার্ড অ্যান্টি ম্যালেরিয়া স্পেসিফিক কম্পানির পেটেন্ট ওষুধ;
৪১) জবাকুসুম তেল (সি কে সেন-এর আগরপাড়া বাগানবাড়িতে গৃহীত);
৪২) সার্সাপেরিলা (ডব্লিউ মেজর কম্পানির তৈরি, সি কে সেনের বাগানবাড়িতে গৃহীত) ১৯০৩ সালে তৈরি।

২৪ মার্চ ১৯১৭ শনিবার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্যের বাংলা নির্বাক কাহিনিচিত্রটি ময়দানের নতুন তাঁবুতে সন্ধ্যে ৬-১৫ ও রাত ৯-৩০-এর দুটি শো-এ দেখানো হয়।

হীরালালের দেখাদেখি তখন আরও অনেকে বায়োস্কোপের ব্যবসায় আসছেন। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ ছিলেন জামশেদজী ফ্রামজী ম্যাডান। ভারতীয় সিনেমায় ম্যাডান একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই পারসি ভদ্রলোকের যেমন ছিল অর্থ, তেমনই ব্যবসায়ী বুদ্ধি। তিনি বিদেশ থেকে ছবি আনিয়ে দেখাতেন। সিনেমা দেখানোর ব্যবসা যে কালক্রমে বাড়বে, তা বুঝেছিলেন ম্যাডান। তথ্য বলছে, কলকাতার প্রথম চিত্রগৃহ ‘এলফিনস্টোন বায়োস্কোপ’ (১৯০১)। এটাই নাকি পরবর্তী কালের ‘চ্যাপলিন’। তখন গড়ের মাঠে তাঁবু খাটিয়ে বায়োস্কোপ দেখানোর চল ছিল। রয়্যাল বায়োস্কোপও সে ভাবেই দেখাত। হীরালালের তোলা ছবি ম্যাডানের তাঁবুতে দেখানো হয়েছে, এমনও ঘটেছে। কিন্তু ম্যাডান আর রয়্যালের বন্ধুত্ব বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। তার ফলে আদপে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল রয়্যাল।

ম্যাডান তো প্রতিদ্বন্দ্বী, কিন্তু সংঘাত বেঁধেছিল আপন সম্পর্কেই। হীরালাল প্রথম ধাক্কা খান ভাগ্নে কুমারশঙ্কর গুপ্তর কাছ থেকে। কুমারশঙ্কর অনেক দিন ধরেই আলাদা হয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন। ১৯০৩ সাল নাগাদ তিনি অন্য এক ব্যক্তির সঙ্গে পার্টনারশিপে ‘লন্ডন বায়োস্কোপ’ খুললেন। যদিও সেখানে বেশি দিন থাকতে পারেননি। তবে হীরালাল সবচেয়ে বেশি আস্থা রাখতেন যাঁর উপরে, সেই মতিলালের আলাদা হয়ে যাওয়ায় রয়্যালের জয়যাত্রা থমকে যায়।

শুরু থেকেই ঠিক ছিল ক্যামেরা-যন্ত্রপাতির মালিকানা হীরালালের আর সিনেমার স্টক মতিলালের। দুই ভাই যে দিন আলাদা হয়ে গেলেন, সে দিন হীরালালের নিজের সৃষ্টির উপরে আর কোনও দাবি রইল না। এই ভাঙনের জন্য অনেকে মতিলালকে দোষ দেন। কিন্তু হীরালালের চরিত্রের পতনও এর জন্য কম দায়ী নয়। খরচপত্রের হিসেব রাখতেন মতিলাল। কিন্তু দাদার উল্টোপাল্টা খরচ সামলাতে বেগ পেতে হত তাঁকে। দুই ভাইয়ের তিক্ততা চূড়ান্ত মাত্রায় পৌঁছয় যখন কুসুমকুমারী ‘আলিবাবা…’র জন্য নিজের লভ্যাংশ দাবি করেন। কুসুমকুমারীর প্রেমে অন্ধ হয়ে, মতিলালকে না জানিয়েই হীরালাল এই কাজ করেছিলেন। পরে কুসুমকুমারী মামলাও করেন। যদিও তাতে তিনি জিততে পারেননি।

মতিলালের ছেলে বলরাম সেনের বয়ানে পাওয়া যায়— প্রত্যক্ষদর্শী জগদীশ সেন বলেছেন, একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে দাদার কাছে কৈফিয়ত দাবি করলে মতিলালকে সকলের সামনে চড় মারেন হীরালাল। ১৯১৩ সালে আলাদা হয়ে যান দুই ভাই। ওখানেই শেষ হয়ে যায় চলচ্চিত্র ইতিহাসের একটি অধ্যায়। হীরালালের তোলা সব ছবির মালিক ছিলেন মতিলাল। পরে দুই ভাই আলাদা করে ব্যবসা করার চেষ্টা করলেও সুবিধে হয়নি। মতিলালের কাছে ছিল না হীরালালের সৃজনশীলতা। আর হীরালালের ছিল না ব্যবসায়িক বুদ্ধি।

শেখর দাস যোগাযোগ করেছিলেন মতিলালের নাতি দেবু সেনের সঙ্গে। হীরালালের আত্মীয়দের পাওয়া না গেলেও মতিলালের উত্তরাধিকারীরা রয়েছেন। কলকাতার জামির লেনে তাঁদের বড় বাড়িও রয়েছে। দুই ভাইয়ের ভাগাভাগির সময়ে বলা হয়েছিল, সব টাকা মতিলাল নিয়েছিলেন। অবশ্য ওঁর নাতি তা অস্বীকার করেন।

রয়্যাল বায়োস্কোপ ভেঙে যাওয়ার শোক নিতে পারেননি হীরালাল। তত দিনে তাঁর শরীর ভেঙেছে। ভেঙেছে মনও। কুসুমকুমারীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে তিনি ফিরে এসেছেন তাঁর চিরসুহৃদ হেমাঙ্গিনীর কাছে। বরাবরের মতো আবার হেমাঙ্গিনী স্বামীর পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়ালেন। কিন্তু শেষ রক্ষা করতে পারলেন না। কারণ তত দিনে হীরালালকে ধরে নিয়েছে রাজব্যাধি— ক্যানসার।

অভাবের তাড়নায় তখন পরপর বাড়ি বদলেছেন হীরালাল। জুটি বেঁধেছেন অন্যত্র। কিন্তু কোথাও সুবিধে করতে পারেননি। বন্ধুবৎসল হীরালালের বড় দুর্বলতা ছিল যে, তিনি চট করে অন্যকে বিশ্বাস করতেন। রাম দত্ত নামে এক জনের সঙ্গে সিনেমা হল চালানোর ব্যবসা শুরু করলেন। রাম দত্ত মোটেও সুবিধের লোক ছিলেন না। কিছু দিনের মধ্যেই হীরালালের ব্যবসায়িক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে রাম দত্ত গোটা ব্যবসা নিজের নামে করে নেন।

এ দিকে স্ত্রী হেমাঙ্গিনী নিজের গয়না, বাড়ির আসবাব বিক্রি করে স্বামীর চিকিৎসার খরচ জোগাড় করেছেন। দু’হাতে রোজগার করেছিলেন হীরালাল। কিন্তু রাখতে পারেননি কিছুই। শেষ জীবনে দারিদ্র্যের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াটা হেমাঙ্গিনীর পক্ষে সহজ ছিল না। তিনি নিজে সচ্ছল পরিবারের সন্তান ছিলেন। বিয়ে হয়েছিল ধনী পরিবারে। সেখান থেকে চূড়ান্ত অভাবের মধ্যে সংসার টানতে হয় হেমাঙ্গিনীকে।

হীরালাল তখনও স্বপ্ন দেখছেন, সুস্থ হয়ে ফের সকলকে তাক লাগিয়ে দেবেন! হরিতকী বাগানের বাড়ি বিক্রি করে চলে এলেন ব্ল্যাকি স্কোয়ারে। এর মধ্যে মারা গেলেন তাঁর বড় মেয়ে। ক্রমশ বুঝতে পারছিলেন, নতুন করে শুরু করা বোধহয় তাঁর আর হবে না। নিদারুণ শোক ও অর্থকষ্টে কেটেছে তাঁর জীবনের শেষ চারটে বছর। অভাবের তাড়নায় নিজের দু’টি ক্যামেরা নিয়ে এক দিন গেলেন আংটি মল্লিকের কাছে। তখনকার দিনে আংটি মল্লিক নামজাদা ধনী। আসল নাম পান্না মল্লিক। এই ব্যক্তি হীরালালের সুহৃদ ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতে পারছিলেন না, হীরালালের মতো ব্যক্তিত্ব ক্যামেরা বন্ধক রেখে টাকা চাইতে এসেছেন। পান্না মল্লিক টাকা দিতে রাজি, কিন্তু ক্যামেরা রাখতে চান না! চিকিৎসার জন্য টাকা চাইলেও হীরালাল বুঝতে পারছিলেন, তাঁর সময় আসন্ন। তাই জোর করে ক্যামেরা দিয়ে আসেন। এটা ভেবেই তিনি আশ্বস্ত ছিলেন যে, তাঁর ক্যামেরা এমন এক জনের কাছে থাকছে, যে তার মূল্য বুঝবে, যত্ন করবে।

ঈশ্বরের কী নির্মম পরিহাস! স্রষ্টার সঙ্গে তাঁর সৃষ্টিও গেল। ১৯১৭ সালের ২৯ অক্টোবর মারা গেলেন হীরালাল। সে বছরই মতিলালের রায় বাগান স্ট্রিটের বাড়িতে আগুন লাগে। সেখানে ছিল হীরালালের তোলা সব ছবির স্টক। সমস্ত ভস্মীভূত হয়ে যায়।

ইংরেজি ২৯শে অক্টোবর ১৯১৭ সাল, বাংলা ৮ই কার্ত্তিক ১৩২৪ বঙ্গাব্দ। আজ থেকে প্রায় ১০৩ বছর আগে মৃত্যু ঘটে হীরালালের। মৃত্যুকালে তাঁর ছোটোবেলার বন্ধু কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত উপস্থিত ছিলেন। মৃত্যু ঘটে ১৮ নং, ব্ল্যাকি স্কোয়ারের বাড়িতে এবং এখানেই শ্রাদ্ধাদি সম্পন্ন হয়েছিল। স্টার থিয়েটার ছাড়িয়ে হেদুয়ার দিকে যেতে ডানহাতে পড়ে নেতাজী নামাঙ্কিত একটি বিখ্যাত তেলেভাজার দোকান। পাশ গলি দিয়ে এগোলে পড়বে হরি ঘোষ স্ট্রিট। সেখানে ননীলাল ঘোষের মিষ্টির দোকানের পাশের গলি দিয়ে গেলে যে পার্কটি আছে সেটিই সাবেক ব্ল্যাকি স্কোয়ার (অধুনা সাধক রামপ্রসাদ উদ্যান)।

মৃত্যু হয়েছিল ক্যান্সারে। কিন্তু সে তো চিকিৎসাবিদ্যার পরিভাষা। ডেথ সার্টিফিকেটে যা ছিল না সেটা জানা দরকার বইকি। মৃত্যুর চার বছর আগে (১৯১৩) পরিবারের সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়। হরিতকী বাগান লেনের বাড়ি ছেড়ে দু-ভাই গেলেন দু-জায়গায় । দু-ভাইয়ের ঝগড়া যে বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কত বড়ো সর্বনাশ করেছিল তা হীরালাল-পড়ুয়া ও গবেষক মাত্রই ওয়াকিবহাল আছেন। হীরালাল উঠে আসেন ১৮ নং ব্ল্যাকি স্কোয়ারের এই বাড়িতে। ভাই মতিলাল উঠে যান রায়বাগানের ভাড়াবাড়িতে, যার নীচ তলার গুদাম ঘরে থাকত রয়াল বায়োস্কোপ কম্পানি (হীরালাল সেন প্রতিষ্ঠিত ভারতের প্রথম সিনেমা কম্পানি) ও প্যাথে কম্পানির চলচ্চিত্র সরঞ্জাম অর্থাৎ ওই গুদামেই ছিল হীরালালের সারা জীবনের যাবতীয় ফিল্ম ও ফোটোগ্রাফ, বলা ভালো, বাংলা-তথা ভারতীয় চলচ্চিত্র ইতিহাসের প্রামাণ্য নথি বা দলিলসমূহ (প্রিন্ট রিল স্টিল নেগেটিভ ইত্যাদি)। পুরোটাই সহজদাহ্য পদার্থে ভরা ঘর। ১৯১৭ সালের ২৪ অক্টোবর এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে দোতলা থেকে সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসার সময় হীরালালের প্রাণাধিক প্রিয় ভাইঝি অমিয়বালাকে (মতিলালের বড়ো মেয়ে) চারদিক থেকে আগুন ঘিরে ধরে, অগ্নিদগ্ধ হয়ে নবমীর রাতে চলে যান তাঁর ভাইঝি। নীচের গুদামে তখনও জ্বলছে হীরালালের সারাজীবনের কাজ অথবা বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাস। এর ঠিক চারদিন বাদে চলে যান ভারতীয় তথা বঙ্গীয় চলচ্চিত্রের প্রথম পুরুষ হীরালাল সেন।

ভাগাভাগির পরে দাদার সঙ্গে কোনও সম্পর্ক রাখেননি মতিলাল। মৃত্যুর সময়েও যাননি। কিন্তু ভাগ্যের খেলা… যখন আগুন লাগে, তখন মতিলালের বড় মেয়ে অমিয়বালা সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আগুনের গ্রাস থেকে তিনি বেরোতে পারেননি। এর পরে মতিলালও ভেঙে পড়েন। ব্যবসার সব দায়িত্ব তুলে দেন ছেলেদের হাতে। স্বামীর মৃত্যুর পরে হেমাঙ্গিনী চলে যান শ্বশুর চন্দ্রমোহনের কাছে ডালিমতলা লেনে। তখনও বেঁচে হীরালালের বাবা-মা।

চলচ্চিত্রে বম্বে ইন্ডাস্ট্রির দাপট চিরকালই। যে কারণে দাদাসাহেব ফালকে ভারতীয় চলচ্চিত্রের জনক হওয়ার স্বীকৃতি লাভ করেছেন। ভারতীয় সিনেমার আদিপুরুষ হিসেবে হীরালাল সেনের অবিস্মরণীয় অবদানের কথা এখানেই কেউ সে ভাবে মনে রাখেনি! বাংলাদেশ বা এখানে কিছু গবেষণা অবশ্য হয়েছে। পরিচালক অরুণ রায় তাঁকে নিয়ে ছবি তৈরি করেছেন। অনেক আলোচনার পরে হীরালালের মৃত্যুর শতবর্ষে তাঁর নামে পুরস্কার চালু করা হয় ইন্ডাস্ট্রিতে। কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবে তাঁর নামে মঞ্চ হয়। প্রয়োজনের তুলনায় হয়তো সামান্যই। কিন্তু যেটুকু হয়েছে তাই বা কম কী!

আলোচনাসভায় হীরালালের অবদান নিয়ে তর্ক-বিতর্ক চলেছে। অনেকের মতে, যেহেতু তিনি থিয়েটারের দৃশ্য ক্যাপচার করেছিলেন, তাই তাঁকে প্রথম সিনেমার জনকের স্বীকৃতি দেওয়া যায় না। কিন্তু তিনি যে সময়ে দাঁড়িয়ে কাজটি করেছিলেন, তা অস্বীকার করা যাবে কী করে? শুধু ছবি তোলা নয়, এডিটিং, লাইটিং সব কিছুতেই তিনি পথ প্রদর্শক। হীরালালের যখন শেষ অবস্থা, তখন শুরু করেছেন দাদাসাহেব ফালকে। তাঁর প্রথম ছবি ‘রাজা হরিশ্চন্দ্র’ মুক্তি পায় ১৯১৩-এর ৩ মে। তার প্রায় দশ বছর আগে হীরালালের ‘আলিবাবা…’

বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক আদুর গোপালকৃষ্ণণ এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট করে জানিয়েছিলেন, ভারতীয় চলচ্চিত্রের পথিকৃতের স্বীকৃতি যদি কাউকে দিতে হয় তো তিনি হীরালাল সেন। প্রথম সিনেমা তিনিই করেছেন। আরও অনেকে সমর্থন করেছেন তাঁকে।

স্বীকৃতি পেলেন হীরালাল। কিন্তু মাঝে যে কেটে গিয়েছে প্রায় একশো বছরের বেশি সময়!


তথ্যসুত্র:
1. ঘরের কথা ও যুগ সাহিত্য, ড. দীনেশচন্দ্র সেন, জিজ্ঞাসা (জ্যৈষ্ঠ, ১৩৬৯)
2. বাংলা চলচ্চিত্রশিল্পের ইতিহাস, কালীশ মুখোপাধ্যায়, পত্র ভারতী
3. সোনার দাগ, গৌরাঙ্গপ্রসাদ ঘোষ, যোগমায়া প্রকাশনী (২০১০)
4. আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৫ই জুন ২০১৯ সাল
5. অক্টোবর ২০১৭ সালে বঙ্গদর্শন পত্রিকায় শ্রী আলেকজান্ডার বন্দ্যোপাধ্যায় লিখিত প্রবন্ধ


লেখকের কথা: রানা চক্রবর্তী
রানা চক্রবর্তী পেশায় সরকারী কর্মচারী। নেশা ইতিহাসের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে পড়াশোনা আর লেখালিখি। নিজেকে ইতিহাসের ফেরিওয়ালা বলতে ভালবাসেন।

শেয়ার করে বন্ধুদেরও পড়ার সুযোগ করে দিন

One Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.