ধনতেরাস ও বাঙালি

লেখক : রানা চক্রবর্তী

লেখক: রানা চক্রবর্তী

প্রায়ই প্রশ্ন ওঠে, বাঙালি কি বিত্তলক্ষ্মী ভজনায় ব্যর্থ? বলা হয়ে থাকে সরস্বতীর কৃপাদৃষ্টি যতটা বাঙালি পেয়েছে , লক্ষ্মীর কাছ থেকে সেটা ততটা জোটেনি৷ আর বাঙালিও লক্ষ্মীর চেয়ে সরস্বতী আরাধনায় বেশি মগ্ন বলেই পরিচিত৷ যদিও একটা সময় বাংলার বাণিজ্যে লক্ষ্মী অচলা ছিল৷ কিন্তু বহু যুগ হল সে দিন গিয়েছে৷ বর্তমানে ব্যবসাবিমুখ চাকরিসর্বস্ব বাঙালিকে লক্ষ্মী ছেড়ে গিয়েছে বলেই মনে করা হয়৷ তবে বাংলার গৃহলক্ষ্মীরা তো লক্ষ্মীর আরাধনা কম করেন না৷ গোটা বছর ধরেই বাড়িতে বাড়িতে প্রতি বৃহস্পতিবার লক্ষ্মীপুজো হয়৷ তাছাড়া শরৎকালে দফায় দফায় লক্ষ্মীকে তুষ্ট করার চেষ্টা চলে৷ দুর্গাপুজোর সময় অন্য ভাইবোনেদের সঙ্গে লক্ষ্মীও পুজোমণ্ডপ আলোকিত করে থাকেন৷ দশমীতে সকলের বিসর্জনের কয়েক দিন পরে আবার কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো৷ তখন পটে অথবা প্রতিমারূপে একাই পূজিত হন তিনি৷ তাছাড়া কালীপুজোর দিন অমাবস্যায় অলক্ষ্মী বিদায় করে লক্ষ্মীকে গৃহে নিয়ে আসে একদল বাঙালি৷ এরপরেও কি বলা উচিত বাঙালির কাছে লক্ষ্মী উপেক্ষিতা? নাকি ধনসন্ধানে অন্যভাবে এগতে হবে বাঙালিকে?

বাঙালির জীবনে ধনতেরাসের তেমন চল ছিল না৷ সময়ের সঙ্গে বদলেছে বাঙালিও৷ যা অবস্থা তাতে আর বলা চলে না, বাঙালি আজ যা করে বাকি ভারত তা করে আগামীকাল৷ বরং, উল্টে এখন বাঙালিকে দেখা যায় অন্যদের অনুকরণ করতে৷ উত্তর এবং পশ্চিম ভারতের প্রভাবে গত কয়েক বছর ধরে বাংলার মাটিতেও ধনতেরাস উৎসবের রমরমা৷ ধনতেরাসের দিন গভীর রাত পর্যন্ত সোনার দোকানে ভিড় জমতে দেখা যায়৷

ধনতেরাস হল ধনত্রয়োদশী৷ এটা একপ্রকার দেওয়ালি উৎসবের সূচনাও বলা চলে৷ ধনতেরাস কথাটার দুটো অংশ– ধন মানে অর্থসম্পদ এবং তেরাস মানে তেরো, অর্থাৎ ত্রয়োদশী৷ দিনটি কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের ত্রয়োদশীকেই ইঙ্গিত করে, ফলে সাধারণত দীপাবলির দু’দিন আগের ধনতেরাস থাকে৷ এইদিনে সোনা কেনার চল আছে৷ সোনা না পারলে রুপো বা অন্য কোনও ধাতুও কিনতে দেখা যায়৷ ফলে অনেককে ধনতেরাসের দিনে বাসন কিনতেও দেখা যায়৷

ধনতেরাসের উৎসবকে ঘিরে রয়েছে বেশ কিছু প্রচলিত কাহিনীও৷ গল্প রয়েছে, বিয়ের চারদিনের মাথায় সাপের কামড়ে রাজা হিমের মৃত্যু লেখা ছিল ৷ তা জানতে পেরে রানি ব্যবস্থা নেন৷ রাতেই অনেক সোনার গহনা সংগ্রহ করে দরজার সামনে দীপ জ্বালিয়ে রেখে যান৷ আর ওই আলোতেই চোখ ধাঁধিয়ে যায় সাপের ছদ্মবেশে আসার যমরাজের৷ প্রাণরক্ষা হয় রাজার৷ সেই থেকেই এই দিনে সোনা কেনার একটা প্রথা তৈরি হয়৷ আর একইসঙ্গে এই দিনে সারা রাত দীপ জ্বালিয়ে রাখারও প্রথা রয়েছে৷ যার জন্য বলা হয় যমদীপদান৷

তবে ধনতেরাস উপলক্ষে বাংলায় নতুন করে মাতামাতি বাড়লেও ,দীপাবলি উৎসব অবশ্য বেশ পুরনো৷ মূলত অবাঙালি ব্যবসায়ীদের গদিকে কেন্দ্র করে গণেশ-লক্ষ্মীর পুজো হয়৷ আর থাকে তখন হালখাতার উৎসবও৷ সময়ের তালে তালে ব্যবসার ক্ষেত্রেও অনেক বিবর্তন এলেও, সেই ট্রাডিশন এখনও বজায় রয়েছে৷ অর্থবর্ষ অনুসারে আয়-ব্যয়ের হিসেবের ব্যবস্থা রেখে প্রথামাফিক হালখাতা চলে৷ এখন কম্পিউটারে সব কিছুর হিসাব রাখা হয় ঠিকই, তবুও দুই কালের মধ্য একটা সমন্বয় রাখতে কম্পিউটার থেকে একটা প্রিন্ট আউট বের করে গণেশ-লক্ষ্মীর সামনে রাখা হয়৷ তারপরে চলে কিছু ব্যবসায়িক লেনদেন, যা প্রতীকী হয়ে উঠে আসে হালখাতায়৷ শুধু তাই নয়, এই দিনের পুজোর জন্য পুরোহিতকে নিয়ে রীতিমতো টানাটানি চলে ধনকুবেরদের মধ্যে৷ দু’তিন মাস আগে থেকে পুরোহিতকে বুকিং করে রাখা হয়৷ জয়পুর বা বারাণসী থেকে রীতিমতো প্লেনে করে উড়িয়ে আনা হয় এদিনের পুজো করানোর জন্য৷ শহরের ধনপতিরা এদিন একবার ইতিহাসের পাতা উল্টে পিছন ফিরে তাকান৷ তাই হালআমলের ঝাঁ-চকচকে অফিস ছেড়ে একবার অন্তত বড়বাজারের গলিতে বংশের আদিগদিতে হাজির  হন৷ দেড়শো- দুশো বছর আগে সেখানেই তাঁদের পূর্বপুরুষেরা ব্যবসা করতে এসেছিলেন , তখন কুলুঙ্গি বা লোহার সিন্দুকে লক্ষ্মীর আরাধনা শুরু করেছিলেন৷

এই পুজোর শ্রেষ্ঠ সময় হল সিংহলগ্ন, যার শুরু সন্ধ্যাযামিনীতে৷ সিন্দুক থেকে সম্পদ ও লক্ষ্মী সযন্তে বের করে পুজো সারতে কেটে যায় কয়েক ঘণ্টা৷ তব দেওয়ালির রাতে অনেকেই ওই ঘিঞ্জি গলির পুরনো গদিতে যেতে চান না, তখন মিথুনলগ্নে বা গোধূলিবেলায় পুজো সেরে নেওয়া হয়৷প্রথামাফিক অমাবস্যার দিনে গভীর রাতে পুজো করলেও এর পিছনের কারণটা অনেকেই ব্যাখ্যা করতে পারেন না৷ তবে অনেকের ধারণা, লক্ষ্মীর বাহন পেঁচা রাতে ভালো দেখতে পায়, তাই ওই সময়টাকে বেছে নেওয়া হয়েছে৷ তবে কোনও কোনও অবাঙালি ব্যবসায়ীর ধারণা, এদিনের পুজোটা শুধু লক্ষ্মী-গণেশের নয় ৷ বাঙালি প্রভাবে মা কালী ও সরস্বতীকেও আরাধনা করেন তাঁরা৷ তাঁদের যুক্তি হল, যেহেতু হালখাতার পুজো, সেহেতু সেখানে লেখাপড়া অর্থাৎ সরস্বতীর পুজো হচ্ছে৷আর লেখার জন্য কালি ব্যবহার করা হয়, তার মানে মা কালীকেও স্মরণ করা হল৷ অর্থাৎ দেওয়ালির দিনে চার ঠাকুরের পুজো হয়ে গেল৷

প্রচলিত ধারণায় বলছে, এদিন নাকি লক্ষ্মী ঘুরে বেড়ান আর দেখে নেন কারা কারা তাঁর প্রতীক্ষায় বসে আছেন৷ যার বাড়ির দরজা খোলা থাকে সেই বাড়িতেই তিনি প্রবেশ করেন বলে অনেকের বিশ্বাস৷ সেই বিশ্বাসের জন্য কেউ কেউ এদিন ওই গদির সিন্দুকের দরজাও একটু ফাঁক করে রাখেন, যাতে মা লক্ষ্মী এসে ঢুকে পড়তে পারেন৷ কারণ লক্ষ্মীর কৃপাদৃষ্টি পেলেই তো সম্পদে ভরে উঠবে বাড়ি৷ মাটির প্রতিমার বদলে অনেকে সাক্ষাৎ লক্ষ্মীর বা প্রত্যক্ষ লক্ষ্মীরও পুজো সারেন এদিন৷ বাঙালির কাছে তো ‘নগদ নারায়ণ’ শব্দটি পরিচিত৷ সোনা বা রুপোর মু্দ্রা নিয়ে পুজোরও চল রয়েছে৷ ফলে দীপাবলির দিনে পুজোর জন্য সিন্দুক থেকে এই মূল্যবান কয়েনগুলি বের করা হয়৷ প্রয়োজনমতো গঙ্গাজল, ঘি, দুধ, মধু দিয়ে ওইসব মুদ্রার স্নানপর্ব চলে৷ তারপরে পুরানো কয়েনগুলির সঙ্গে নতুন কেনা কয়েনগুলি মিশিয়ে দেওয়া হয়৷ ধনতেরস থেকে দীপাবলি ধনপতিদের নজরে থাকায় পুরোন সোনা বা রুপোর কয়েনের চাহিদা বেড়ে যায়৷

আবার গদি বা কর্মস্থলে পুরোহিত এলেও অনেক সময় ধনপতিদের বাড়িতে মা লক্ষ্মীকে ডাকার দায়িত্ব বর্তায় গৃহকর্ত্রী বা গৃহবধূর উপর৷ গদিতে পুজোর সময় সাধারণত মহিলারা থাকতেন না৷ তবে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এক্ষেত্রেও কিছু পরিবর্তন এসেছে৷ তবে কথিত আছে মা লক্ষ্মী কোনও রকম অপচয় অপছন্দ করেন না৷ তাই এদিন যথেষ্ট সতর্ক থাকেন ধনকুবেররা৷ সেই বিশ্বাসের জেরে এই দিনে শুধু নেওয়া হয় কোনও কিছু দেওয়া হয় না, অর্থাৎ ধন বা অর্থ ঢোকে৷

কিন্তু লক্ষ্মীদেবী বড়ই চঞ্চলা, সহজে কোনও জায়গায় বসতে চান না৷ বিত্তকে বেঁধে রাখা যে বড়ই কঠিন কাজ, তা নতুন করে বলার নয়৷ সবারই জানা রয়েছে, কোনও স্থানে অশান্তি দেখলে পুঁজি সরে যায়, মানে লক্ষ্মী পালান৷ রাজ্যের শিল্প ও অর্থনৈতিক হাল দেখে সেটা কিছুটা অনুভব করা যাচ্ছে৷ যদিও এই বাংলায় ধনতেরস থেকে দীপাবলির রাত অন্য কথা বলে৷ অন্তত এই সময় কলকাতার অবস্থা দেখলে মনে হয়– বঙ্গে লক্ষ্মী বিরাজমান৷ আশা জাগে, বর্তমানে বাঙালিকে লক্ষ্মী ছাড়লেও একেবারে লক্ষ্মীছাড়া নয় এই বাংলা৷

লেখক পরিচিতি : রানা চক্রবর্তী
রানা চক্রবর্তী পেশায় সরকারী কর্মচারী। নেশা ইতিহাসের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে পড়াশোনা আর লেখালিখি। নিজেকে ইতিহাসের ফেরিওয়ালা বলতে ভালবাসেন।

শেয়ার করে বন্ধুদেরও পড়ার সুযোগ করে দিন
  •  
  •  
  •  
  •  

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।