কবিগুরুর বিজ্ঞানভাবনা

লেখক : হৃদয় হক

১.

ছোটবেলায় বোর্ড বইয়ের কল্যাণে কবিগুরুর অনেক লেখাই আমরা পড়েছি। সেইসাথে বইয়ের লেখক-পরিচিতি-তে উনার সম্পর্কে পড়েছি অসংখ্য বার। সেখান থেকেই উল্লেখ করতে চাই – “…… বস্তুত তাঁর একক সাধনায় বাংলাভাষা ও সাহিত্য সকল উন্নতি লাভ করে এবং বিশ্বদরবারে গৌরবের আসনে প্রতিষ্ঠিত হয়। …… তিনি একাধারে সাহিত্যিক, দার্শনিক, শিক্ষাবিদ, সুরকার, নাট্য প্রযোজক ও অভিনেতা। কাব্য, ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, গান ইত্যাদি সকল শাখাই তাঁর অবদানে সমৃদ্ধ। ……” অতঃপর বলা শুরু হয় একে একে উনার অসংখ্য বইপত্রের কথা।

কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে, ঐ ছোট্ট পরিচিতি পড়ে কেউই একবারের জন্যও ভাববে না বা ভাবতে পারে না যে – বাংলায় বিজ্ঞানচর্চায় রবীন্দ্রনাথের গুরুত্ব, যাকে আমরা পরীক্ষার খাতায় সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তরে শুরুতেই লিখি – এক্কেবারে অপরিসীম।

“রবীন্দ্রনাথের বিজ্ঞানভাবনা” প্রসঙ্গে পরে আসছি। তার আগে উক্ত ব্যাপারটি না ভাবতে পারা নিয়ে একটু বলি। প্রথমত, সেই লেখক-পরিচিতি-তে “বিশ্বপরিচয়” বইটির কথা বলা হয় না। দ্বিতীয়ত, “সাহিত্যের সকল শাখা” ও “প্রবন্ধ”-তে যে “বিজ্ঞানসাহিত্য” ও “বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ” বলে দুটো বিষয় আছে – এ নিয়ে ভাববার মানুষ এ দেশে খুবই কম এবং তৃতীয়ত, “বিশ্বপরিচয়” বইটি যে বিজ্ঞানের তথা জ্যোতির্বিদ্যার বই – তা সরাসরি উল্লেখ না করলে বইটিকে “ভ্রমণকাহিনী” কিংবা শিক্ষার্থী সমাজে কুখ্যাত “বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়” বইয়ের মতো কোনো একটি বই ভেবে বসার লোক এদেশে বেশি। এ প্রসঙ্গে “Don’t judge a book by it’s cover”- এর ভিত্তিতে বলা যেতেই পারে, “Don’t judge a book by it’s name”।

২.

শীতের ভোরে নারকেল গাছের কম্পমান পাতায় সূর্যের আলো পড়ার ফলে শিশিরবিন্দুর ঝলমল করা দেখতে ভোরের ঘুম বিসর্জন দেয়া বালক রবীন্দ্রনাথ, বিদ্যালয় থেকে ফেরার পথে বাড়ির তেতলার ওপরে ঘননীল মেঘপুঞ্জ দেখে আশ্চর্য হওয়া বালক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে বিজ্ঞানে, বিশেষত জ্যোতির্বিদ্যায় যে আগ্রহী হবেন না – একথা ভাবাই বোধহয় ছোটখাটো পাপ।

ছোটবেলায় রবীন্দ্রনাথের বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহের একটি দলিল “বিশ্বপরিচয়” বইটির ভূমিকা-স্বরূপ লিখিত “শান্তিনিকেতন” নামের প্রবন্ধটি। সেখানে তিনি বলেছেন, “আমি বিজ্ঞানের সাধক নই সে কথা বলা বাহুল্য। কিন্তু বাল্যকাল থেকে বিজ্ঞানের রস আস্বাদনে আমার লোভের অন্ত ছিলো না। আমার বয়স বোধ করি তখন নয়-দশ বছর মাঝে মাঝে রবিবারে হঠাৎ আসতেন সীতানাথ দত্ত [ঘোষ] মহাশয়। আজ জানি তাঁর পুঁজি বেশি ছিল না, কিন্তু বিজ্ঞানের অতি সাধারণ দুই একটি তত্ত্ব যখন দৃষ্টান্ত দিয়ে তিনি বুঝিয়ে দিতেন আমার মন বিস্ফোরিত হয়ে যাতো।”

উনার বয়স যখন সম্ভবত বারো, তখন পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে ড্যালহৌসি পাহাড়ে যান। সেখানে তাঁর পিতা তাঁকে আকাশ চিনিয়েছিলেন। এ প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, “সমস্ত দিন ঝাঁপানে করে গিয়ে সন্ধ্যাবেলায় পৌঁছতুম ডাকবাংলায়। তিনি চৌকি আনিয়ে আঙিনায় বসতেন। দেখতে দেখতে, গিরিশৃঙ্গের বেড়া-দেওয়া নিবিড় নীল আকাশের স্বচ্ছ অন্ধকারে তারাগুলি যেনো কাছে নেমে আসতো। তিনি আমাকে নক্ষত্র চিনিয়ে দিতেন, গ্রহ চিনিয়ে দিতেন। শুধু চিনিয়ে দেওয়া নয়, সূর্য থেকে তাদের কক্ষচক্রের দূরত্বমাত্রা, প্রদক্ষিণের সময় এবং অন্যান্য বিবরণ আমাকে শুনিয়ে যেতেন। তিনি যা বলে যেতেন তাই মনে ক’রে তখনকার কাঁচা হাতে আমি একটা বড়ো প্রবন্ধ লিখেছি। স্বাদ পেয়েছিলুম বলেই লিখেছিলুম, জীবনে এই আমাত প্রথম ধারাবাহিক রচনা, আর সেটা বৈজ্ঞানিক সংবাদ নিয়ে।”

শুধু জ্যোতির্বিদ্যা নয়। উনার পঠিত এবং আগ্রহের বিষয়বস্তুর মধ্যে ছিলো – গণিত, পদার্থবিজ্ঞান, ভূগোল, প্রাকৃতবিজ্ঞান, প্রাণবিজ্ঞান এমনকি অস্থিবিদ্যাও। তবে, জ্যোতির্বিদ্যা ও প্রাণবিজ্ঞানে আগ্রহ ছিলো সবচেয়ে বেশি। এসব বিষয়ে ছোটকালে তিনি যখন যেভাবে পেরেছেন, শিখেছেন।

বাল্যকালেতো আমরাও অনেকে আকাশকে ঘিরে আগ্রহী হই। তবে, ক’জনই বা তা ধরে রাখতে পারি? কিন্তু, আকাশের সাথে কবির ভালোবাসা কোনো কালেই কমেনি। তার প্রমাণ মেলে – রবীন্দ্রনাথের ভাইঝি শ্রীমতী ইন্দিরা দেবীকে যেসকল চিঠি লিখেছিলেন সেগুলি নিয়ে প্রকাশিত “ছিন্নপত্র” গ্রন্থের ২৪ মার্চ ১৮৯৪ তারিখ লিখিত চিঠিতে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, বিশ্বপরিচয় প্রকাশিত হয় ১৯৩৭ সালে। চিঠিটি –

“আজকাল আমার সন্ধ্যাভ্রমণের একমাত্র সঙ্গীটির অভাব হয়েছে। সেটি আর কেউ নয়, আমাদের শুক্লপক্ষের চাঁদ। কাল থেকে আর তাঁর দেখা নেই। ভারী অসুবিধে হয়েছে, শীঘ্রই অন্ধকার হয়ে যায়, যথেষ্ট বেড়াবার পক্ষে একটু ব্যাঘাত জন্মায়।

আজকাল ভোরের বেলায় চোখ মেলেই ঠিক আমার খোলা জানলার সামনেই শুকতারা দেখতে পাই — তাকে আমার ভারী মিষ্টি লাগে – সেও আমার দিকে চেয়ে থাকে, যেন বহু কালের আমার আপনার লোক। মনে আছে, যখন শিলাইদহে কাছারি ক’রে সন্ধেবেলায় নৌকো করে নদী পার হতুম, এবং রোজ আকাশে সন্ধ্যাতারা দেখতে পেতুম, আমার ভারী একটা সান্তনা বোধ হত। ঠিক মনে হ’ত, আমার নদীটি যেন আমার ঘর সংসার এবং আমার সন্ধ্যাতারাটি আমার এই ঘরের গৃহলক্ষ্মী — আমি কখন কাছারি থেকে ফিরে আসব এই জন্যে সে উজ্জল হয়ে সেজে বসে আছে। তার কাছ থেকে এমন একটি স্নেহস্পর্শ পেতুম! তখন নদীটি নিস্তব্ধ হয়ে থাকত, বাতাসটি ঠাণ্ডা, কোথাও কিছু শব্দ নেই, ভারী যেন একটা ঘনিষ্ঠতার ভাবে আমার সেই প্রশান্ত সংসারটি পরিপূর্ণ হয়ে থাকত। আমার সেই শিলাইদহে প্রতি সন্ধ্যায় নিস্তব্ধ অন্ধকারে নদী পার হওয়াট খুব স্পষ্টরূপে প্রায়ই মনে পড়ে। ভোরের বেলায় প্রথম দৃষ্টিপাতেই শুকতারাটি দেখে তাকে আমার একটি বহুপরিচিত সহাস্য সহচরী না মনে করে থাকতে পারি নে; সে যেন একটি চিরজাগ্রত কল্যাণকামনার মতো ঠিক আমার নিদ্রিত মুখের উপর প্রফুল্ল স্নেহ বিকিরণ করতে থাকে।

আজ বেড়িয়ে বোটে ফিরে এসে দেখি, বাতির কাছে এত বেশি পতঙ্গের ভিড় হয়েছে যে টেবিলে বসা অসাধ্য। আজ তাই বাতি নিবিয়ে দিয়ে বাইরে কেদারা নিয়ে অন্ধকারে বসেছিলুম; আকাশের সমস্ত জ্যোতির্জগৎ, অনন্ত রহস্তের অন্তঃপুরবাসিনী সমস্ত মেয়ের দলের মতো উপরের তলার খড়খড়ি থেকে আমাকে দেখছিল, আমি তাদের কিছুই জানি নে এবং কোনো কালে জানতে পাব কিনা তাও জানি নে— অথচ ঐ জ্যোতির্মণ্ডলীর মধ্যে বিচিত্র জীবনের অনন্ত ইতিহাস প্রবাহিত হয়ে যাচ্ছে। আজ সন্ধের সময় আর চিঠি লেখা হয়ে ওঠে নি, তাই এখন লিখছি। এখন কত রাত হবে? এগারোটা। যখন চিঠিটা পৌছবে তখন দিনের বেলাকার প্রখর অালোকে জগৎটা খুবই সজাগ চঞ্চল, নানান কাজে ব্যস্ত; তখন কোথায় এই স্বযুপ্ত নিস্তব্ধ রাত্রি, কোথায় ঐ অনন্ত বিশ্বলোকের জ্যোতির্ময় শব্দহীন বার্তা। এত সুতীব্র প্রভেদ। কিছুতে ঠিক ভাবটি আনা যায় না। মানুষের মনের ক্ষমতা এত সামান্য। যে খুবই পরিচিত, চোখ বুজে তার আকৃতির প্রত্যেক রেখাটি মনে আনা যায় না— এক সময় যা সর্বপ্রধান আর-এক সময় তা যথার্থরূপে স্মৃতিগম্য করাও শক্ত হয়ে ওঠে। দিনের বেলায় রাতকে ভুলি, রাতের বেলায় দিনকে ভুলি।

চাঁদের খণ্ড অনেকক্ষণ হল উঠেছে; চতুর্দিক একেবারে নিস্তব্ধ নিদ্রিত; কেবল গ্রামের গোটাছুই কুকুর ওপার থেকে ডাকছে; আমার এই বোটে কেবল একটি বাতি জ্বলছে, আর-সব জায়গায় আলো নিবেছে; নদীতে একটু গতিমাত্র নেই, তাতেই মনে হয় মাছগুলো রাত্তিয়ে ঘুমোয়। জলের ধারে সুপ্ত গ্রাম এবং জলের উপর গ্রামের সুপ্ত ছায়া!”

জানি, বেশ বড়ো উদ্ধৃতি হলো। কিন্তু কিছু বাদ দেয়ার সাহস হলো না। তবে, এতো কেবলমাত্র একখানা চিঠি। “ছিন্নপত্র” গ্রন্থের অন্যান্য চিঠিগুলোতেও আকাশ ও জ্যোতিষ্ক এসেছে অনেকবার।

জ্যোতির্বিদ্যা নিয়ে অনেক বকাবকি করায়, বোধকরি অনেকের মনেই প্রশ্ন জেগেছে – তবে কি কবিগুরু এটি বাদে বিজ্ঞানের অন্যকিছু নিয়ে লেখেননি? আসলে লেখেছেনে। তবে, আমি যেহেতু জ্যোতির্বিদ্যার ভক্ত এবং এই বিষয়টি কবিগুরু মূল একটি আগ্রহ ছিলো বিধায় এ নিয়ে একটু বেশি বকাই স্বাভাবিক।

ঠাকুরবাড়ির বিজ্ঞানভাবনা ও বিজ্ঞানচর্চাও কবিকে প্রভাবিত করেছে। কবিগুরু ঠাকুরবাড়ি থেকে ছোটদের প্রকাশিত বালক পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। তখন তাঁর বয়স মাত্র ২৪ বছর। সেখানে তিনি গল্প, উপন্যাস, কবিতা ছাড়াও “বৈজ্ঞানিক সংবাদ” লিখতেন। এতে থাকতো অনেক মজার এবং অজানা তথ্য। সেখান থেকে একটি এখানে তুলে ধরার লোভ সামলাতে পারলাম না –

“আহারান্বেষণ ও আত্নরক্ষার উদ্দেশ্যে ছদ্মবেশ ধারণ কীটপতঙ্গের মধ্যে প্রচলিত আছে তারা বোধ করি অনেকে জানেন। তাহা ছাড়া, ফুল, পত্র প্রভৃতির সহিত স্বাভাবিক আকার সাদৃশ্য থাকাতেও অনেল পতঙ্গ আত্নরক্ষা ও খাদ্যসংগ্রহের সুবিধা করিয়স থাকে। একটা নীল প্রজাতি ফুলে ফুলে মধু অন্বেষণ করিয়া বেড়াইতেছিল। পুষ্পস্তবকের মধ্যে একটি ঈষৎ শুষ্কপ্রায় ফুল দেখা যাইতেছিলো, প্রজাপতি যেমন তাহাতে শুঁড় লাগাইয়াছে অমনি তাহার কাছে ধরা পড়িয়াছে। সে ফুল নহে সে একটি সাদা মাকড়সা। কিন্তু এমন একরকম করিয়া থাকে যাহাতে তাহাকে সহসা ফুল বলিয়ে ভ্রম হয়৷”

এছাড়া, বঙ্গদর্শন সাময়িকীতে কবিগুরু ১৩০৮ সনে দুটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। প্রথমটি আষাঢ় সংখ্যায়, “আচার্য জগদীশের জয়বার্তা” এবং দ্বিতীয়টি শ্রাবণ সংখ্যায়, “জড় কি সজীব?”। তবে, এর আগেও তিনি বিজ্ঞান নিয়ে লিখেছিলেন। তারমধ্যে একটি হলো তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায়, ” গ্রহগণ জীবনের আবাসভূমি” এবং অপর একটি হলো, “সামুদ্রিক জীব”।

শুধু তাই নয়, কবিগুরুর “রোগশত্রু ও দেহরক্ষক সৈন্য” শীর্ষক লেখাটি আজো প্রাসঙ্গিক এবং আপেক্ষিকতা তত্ত্ব নিয়েও লেখতে ভোলেননি তিনি। উক্ত এ-সব রচনা ছাড়াও উনার লিখিত আরো কিছু বৈজ্ঞানিক রচনা হলো – দেবতায় মনুষ্যত্ব আরোপ, বৈজ্ঞানিক সংবাদ, ইচ্ছামৃত্যু, গতি নির্ণয়ের ইন্দ্রিয়, উটপক্ষীর লাথি, জীবনের শক্তি, মানব শরীর, ভূতের গল্পের প্রমাণিকতা, উদয়াস্তের চন্দ্রসূর্য, ঈথর, অভ্যাসজনিত পরিবর্তন, ওলাউঠার বিস্তার, ভূগর্ভস্থ জল এবং বায়ুপ্রবাহ ইত্যাদি।

রবীন্দ্রনাথের কিছু কিছু বৈজ্ঞানিক রচনা “পাঠপ্রচয়” নামক গ্রন্থে ছড়িয়ে আছে।

তাছাড়া, নিজে বিজ্ঞান লেখালেখি বাদেও জগদানন্দ রায়, চারুচন্দ্র ভট্টাচার্য প্রমুখ বিজ্ঞানলেখকদের সাধনার প্রেরণাদাতাও কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

৩.

বিখ্যাত বাঙালি বিজ্ঞানী আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর সাথে কবিগুরুর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিলো। বিশ্ববিখ্যাত বাঙালি পদার্থবিদ সত্যেন্দ্রনাথ বসুর সাথেও উনার সুসম্পর্ক ছিলো। বিশ্বপরিচয় বইটি কবিগুরু সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে উৎসর্গ করেছিলেন। যদিও বইতে সরাসরি উৎসর্গ লেখা হয়নি, কিন্তু “শান্তিনিকেতন” লেখাটি পড়ে আমরা তা বুঝতে পারি। আবার, বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী আইন্সটাইনের সাথেও কবিগুরুর দেখা হয় কয়েকবার। একথা বোধহয় অনেকেই জানেন। কিন্তু, আইন্সটাইন বাদেও উনার সাথে বিজ্ঞানী হাইজেনবার্গ ও বিজ্ঞানী সামারফিল্ডের সাথেও সাক্ষাৎ ও আলাপ হয়। যারা পদার্থবিজ্ঞান বা কোয়ান্টাম মেকানিক্স নিয়ে টুকিটাকি জানেন উনাদের নিকট এই দুই বিজ্ঞানী অচেনা নন। এই দুই বিজ্ঞানী জাপান যাওয়ার পথে স্বেচ্ছায় কবিগুরুর সাথে সাক্ষাৎ করতে এসেছিলেন। যদিও দুঃখজনক ভাবে বিজ্ঞানী হাইজেনবার্গ ও সামারফিল্ডের সাথে কবিগুরু কি কি নিয়ে আলোচনা করেছিলেন তা জানা যায়নি, কিন্তু আইন্সটাইনের সাথে কবিগুরুর কথোপকথনটি বেশ জনপ্রিয়।

১৯২৬ সালে কবিগুরুর সাথে আইন্সটাইনের প্রথম সাক্ষাতের পর, ১৯৩০ সালের ১৪ই জুলাই আইন্সটাইন বার্লিনে তাঁর বাড়িতে কবিগুরুকে আমন্ত্রণ জানান। স্বাভাবিকভাবেই সেখানে তাঁদের মধ্যে দীর্ঘ বাক্যালাপ হয়। উনাদের আলোচনার বিষয়বস্তু ছিলো সত্য, সুন্দর ও চেতনা নিয়ে। সেই বিখ্যাত কথোপকথনের অংশবিশেষ নিয়ে “মহাকাশ বার্তা” সাময়িকীর ৫৮ তম সংখ্যায় বঙ্গানুবাদ প্রকাশিত হয়েছে। দুঃখজনক ভাবে সেখানে অনুবাদকের নাম উল্লেখ করা হয়নি। এখানে উক্ত অনুবাদের কিছু অংশ তুলে ধরছি –

“রবীন্দ্রনাথ: আপনি গণিত দিয়ে স্থান-কাল ব্যাখ্যা করতে ব্যস্ত আছেন। আর আমি এ দেশে এসে চিরন্তন জগত ও বাস্তবতার জগত সম্বন্ধে লেকচার দিচ্ছি।
আইন্সটাইন: আপনি কি মনে করেন স্বর্গ পৃথিবী থেকে আলাদা কোনো বস্তু?
রবীন্দ্রনাথ: না, আলাদা নয়। মানুষের আচরণেই মহাবিশ্বের রূপ ধরা পড়ে। এমন কিছু নেই যা মানুষ দিয়ে বোঝা যায় না। এ থেকে বোঝা যায় মানব সত্য মহাবিশ্বের সত্য এক।

আমি এ ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করার জন্য বিজ্ঞানের একটা দিক উদাহরণ হিসেবে নিয়েছি। বস্তু ইলেকট্রন-প্রোটন দিয়ে গঠিত। যদিও আপাততদৃষ্টিতে বস্তুকে কঠিন মনে হয়, এর ভেতরটা ফাঁকা। একইভাবে মানবতা এমন অনেক স্বতন্ত্র মানুষ দিয়ে তৈরি। কিন্তু তাদের মাঝে এল ধরনের ভেতরকার যোগসূত্র আছে, যা এই পৃথিবীকে একতাবদ্ধ করে। আমি কলা, সাহিত্য আর মানুষের ধর্মীয় বোধ নিয়ে চিন্তা করে এই ভাবনাটি পেয়েছি।

………………………………………………

রবীন্দ্রনাথ: বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে টেবিল যে একটি কঠিন বস্তু তা হলো একটি দৃশ্যমান অনুভূতি। তাই মানব মন বলে কিছু না থাকলে টেবিলের বাস্তবতা বলে কিছু থাকতো না। এটা স্বীকার করতে হবে যে, আমাদের বস্তুজগত অসংখ্য বিচ্ছিন্ন ঘূর্ণায়মান তড়িৎ শক্তির কেন্দ্রের দ্বারা তৈরি।

সত্যের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড়ো দ্বন্দ্ব হলো বিশ্ব মন এবং আমার ব্যক্তি মন আসলে এক। এই দু’ইয়ের মধ্যে মিল ঘটানোর চেষ্টা চলছে বিজ্ঞান, দর্শন ও আমাদের মূল্যবোধের মাধ্যমে। মানুষের বাইরে যদি কোনো বাস্তবতা থেকে থাকে, তাহলে মানুষের কাছে সেই বাস্তবতার কোনো অস্তিত্ব নেই।

যদি এমন কোনো মন থেকে থাকে যার কাছে ঘটনাগুলো স্থানে ঘটে না, বরং সময়ে ঘটে অনেকটা সুরের নোটের মতো, এ ধরনের মনের কাছে পিথাগোরাসের জ্যামিতির কোনো মানে নেই। কাগজ ও সাহিত্যের বাস্তবতা সম্পূর্ণ আলাদা। মথের যে মন আছে, তা অনুযায়ী সে কাগজ খায়, তার কাছে তখন সাহিত্যের কোনো মানে নেই৷ কিন্তু মানুষের কাছে কাগজের চেয়ে সাহিত্যের মূল্য অনেক বেশি। তাই এমন কোনো সত্য যদি থাকে যা মানুষের অনুভূতি ও যুক্তির বাহিরে, তাহলে সে সত্যের কোনো মানে থাকবে না যতক্ষণ আমরা মানুষ থাকবো।”

৪.

জানি অনেক বেশি বকবক করছি। তাই এ পর্বে ইতি টানবো৷

আসলে কবিগুরুর মন শুধু বিজ্ঞান নয়, জ্ঞানের সকল শাখায় বিচরণের ভাবনায় ভরপুর। এ প্রসঙ্গে সৈয়দ মুজতবা আলী যখন শান্তিনিকেতনে পড়তে যান তখন কবিগুরুর সাথে সেই সুবিখ্যাত কথোপকথনটি বলা যেতে পারে। কথোপকথনটি সৈয়দ মুজতবা আলীর “অপ্রকাশিত রচনা” থেকে তুলে ধরছি –

“প্রথম সাক্ষাতে গুরুদেব জিজ্ঞেস করলেন, কী পড়তে চাও?
আমি বললুম, তা তো ঠিক জানিনে তবে কোনো একটা জিনিস খুব ভালো করে শিখতে চাই।
তিনি বললেন, নানা জিনিস শিখতে আপত্তি কী?
আমি বললুম, মনকে চারিদিকে ছড়িয়ে দিলে কোনো জিনিস বোধহয় ভালো করে শেখা যায় না।
গুরুদেব আমার দিকে স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, এ কথা কে বলেছে?
আমার বয়স তখন সতেরো— থতমত খেয়ে বললুম, কনান ডয়েল।
গুরুদেব বললেন, ইংরেজের পক্ষে এ বলা আশ্চর্য নয়।
কাজেই ঠিক করলুম, অনেক কিছু শিখতে হবে৷ সম্ভব অসম্ভব বহু ব্যাপারে ঝাঁপিয়ে পড়লুম।”

আবার, এই জ্ঞানের সকল শাখায় বিচরণী মনে কবিগুরু বিজ্ঞান শেখা নিয়ে বিশ্বপরিচয় গ্রন্থে বলেছেন, “শিক্ষা যারা আরম্ভ করেছে, গোড়া থেকেই বিজ্ঞানের ভাণ্ডারে না হোক, বিজ্ঞানের আঙিনায় তাদের প্রবেশ করা অত্যাবশ্যক।”

আর বিজ্ঞানচর্চা নিয়ে বলেছেন, “বড়ো অরণ্যে গাছতলায় শুকনো পাতা আপনি খসে পড়ে, তাতেই মাটিকে করে উর্বরা। বিজ্ঞানচর্চার দেশে জ্ঞানের টুকরো জিনিসগুলি কেবলই ঝরে ঝরে ছড়িয়ে পড়ছে। তাতে চিত্তভূমিতে বৈজ্ঞানিক উর্বরতার জীবধর্ম জেগে উঠতে থাকে। তারই অভাবে আমাদের মন আছে অবৈজ্ঞানিক হয়ে। এই দৈন্য কেবল বিদ্যার বিভাগে নয়, কাজের ক্ষেত্রে আমাদের অকৃতার্থ করে রাখছে।”

তবে, জনসাধারণে বিজ্ঞানের ছোয়ায় বৈজ্ঞানিক মেজাজ গঠনকে তিনি দেখেছেন তাঁর কর্তব্যরূপে এবং বিজ্ঞানের সাথে প্রথমপরিচয় ঘটিয়ে দেয়ার কাজে সাহিত্যের সাহায্য নেয়া কে তিনি অগৌরবের কিছু মনে করেন নি। আসলে সাহিত্যের অদ্ভুত এক ক্ষমতা আছে। দুনিয়ায় সবচেয়ে তিক্ত জিনিসকে সাহিত্যের পরশপাথরের ছোয়ায় মধুর চেয়েও মিষ্টি করে ফেলা সম্ভব বলে আমি বিশ্বাস করি।

আর এই বৈজ্ঞানিক মেজাজ গঠনের কর্তব্য পালনেই তিনি লিখতেন বিজ্ঞান নিয়ে, লিখেছিলেন বাংলায় বিজ্ঞানসাহিত্যে অমর গ্রন্থ “বিশ্বপরিচয়”, যা ছিলো “লোকশিক্ষা গ্রন্থমালা” নামে গ্রন্থ সিরিজের প্রথম বই এবং লেখানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন এই গ্রন্থ সিরিজের অন্তর্গত – ব্যাধির পরাজয়, পদার্থবিদ্যার নবযুগ, প্রাণতত্ত্ব, আহার ও আহার্য, পৃথ্বীপরিচয়, আমাদের অদৃশ্য শত্রু, নবযুগে ধাতুচতুষ্টয় ইত্যাদি গ্রন্থমালা।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিজ্ঞানভাবনার ইতি টানতে চাই সুব্রত বড়ুয়া স্যারের ভাষায় –

“জনসমাজকে আধুনিক বিজ্ঞানের সঙ্গে পরিচিত করে দেশকে অশিক্ষা, কুশিক্ষা, অন্ধসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস ইত্যাদি থেকে মুক্ত করার যে চিন্তা রবীন্দ্রনাথের বিজ্ঞানভাবনার মূল বিষয় ছিলো তা আজো আমাদের সমাজ, জীবন ও মানসিকতার জন্য অপরিহার্য। সেজন্যই রবীন্দ্রনাথের বিজ্ঞানভাবনার সঙ্গে আমাদের পরিচয় নিবিড়তর হওয়া প্রয়োজন।”


সহায়ক গ্রন্থ:
১. সাহিত্যের স্বরূপ – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
২. বিশ্বপরিচয় – ঐ
৩. ছিন্নপত্র – ঐ
৪. সাহিত্য সমাজ ও বিজ্ঞান – সুব্রত বড়ুয়া
৫. অপ্রকাশিত রচনা – সৈয়দ মুজতবা আলী
৬. মহাকাশ বার্তা, ৫৮ তম সংখ্যা, অক্টোবর ২০২০


লেখক পরিচিতি : হৃদয় হক
শিক্ষার্থী। প্রধানত জ্যোতির্বিদ্যা নিয়ে লেখালেখি করি। আকাশজোড়া গল্পগাথা গ্রন্থের লেখক।

শেয়ার করে বন্ধুদেরও পড়ার সুযোগ করে দিন
  •  
  •  
  •  
  •  

2 Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।